আজকের দিন-তারিখ

  • বুধবার ( রাত ১:০২ )
  • ২০শে আগস্ট, ২০১৯ ইং
  • ১৯শে জিলহজ্জ, ১৪৪০ হিজরী
  • ৬ই ভাদ্র, ১৪২৬ বঙ্গাব্দ ( শরৎকাল )

Archive Calendar

আগস্ট ২০১৯
সোম মঙ্গল বুধ বৃহস্পতি শুক্র শনি রবি
« জুলাই    
 
১০১১
১২১৩১৪১৫১৬১৭১৮
১৯২০২১২২২৩২৪২৫
২৬২৭২৮২৯৩০৩১  
জাতীয়

আঞ্চলিক রাজনীতির অনৈক্যই দায়ী

11views

সবুজ পাহাড়ে রক্তপাত

বাঘাইছড়ি সদর থেকে চার কিলোমিটার দূরে প্রশিক্ষণ টিলা এলাকা পেরিয়ে আরও পাঁচ কিলোমিটার গেলেই পড়ে নয় কিলোমিটার এলাকা। এর উত্তরে বঙ্গলতলী ইউনিয়ন, পশ্চিমে দীঘিনালার মেরুং ইউনিয়ন এবং দক্ষিণ ও পূর্বে রূপকারী ইউনিয়ন। নয় কিলোমিটার এলাকায় বিকল্প একটি পথ আছে পাহাড়ের কোলঘেঁষে। দুর্বৃত্তরা নির্বাচনী কর্মকর্তার গাড়িবহরে হামলা করে বঙ্গলতলী ইউনিয়নের পূর্ব দিক থেকে। এরপর পাহাড়ের ঢালুতে থাকা বিকল্প সড়ক দিয়ে পালিয়ে যায় নির্বিঘ্নে। ভৌগোলিক এ সুবিধার কারণেই হয়তো এই পয়েন্টকে হামলার জন্য বেছে নিয়েছিল দুর্বৃত্তরা। 

এ এলাকার উত্তর ও পশ্চিমে আধিপত্য বিস্তার করে আছে পার্বত্য আঞ্চলিক রাজনৈতিক দল ইউনাইটেড পিপলস ডেমোক্রেটিক ফ্রন্ট (ইউপিডিএফ)। ইউপিডিএফ ভাঙনের পর গণতান্ত্রিক ইউপিডিএফ নামে একটি অংশ আবির্ভূত হলেও এখানে আদি ইউপিডিএফের প্রভাব রয়েছে। আবার দক্ষিণ ও পূর্বে প্রভাব বিস্তার করছে সংস্কারপন্থি জনসংহতি সমিতি, যে দলটি জেএসএস (এমএন লারমা) নামে পরিচিত। তাই ঠিক কোন গ্রুপ এ হামলা করেছে তা এখনও নিশ্চিত হতে পারেনি আইন-শৃঙ্খলা বাহিনী। তবে কয়েকটি বিষয় সামনে রেখে তদন্ত শুরু করেছে তারা। কেন ভোটের পরে হামলার ঘটনা ঘটল? কেন নির্বাচন কর্মকর্তাদের টার্গেট করা হলো? হামলাকারীরা কোন এলাকা দিয়ে আক্রমণ করে কোন দিকে পালাল? এ ঘটনার পর পাহাড়ের রাজনৈতিক মেরুকরণে কার কী লাভ হবে- প্রকৃত দোষীদের শনাক্ত করতে হলে এমন সব প্রশ্নের উত্তর খুুঁজতে হবে বলে মনে করছেন নিরাপত্তা বিশ্নেষকরাও। এই সব ঘটনার নেপথ্যে যে পাহাড়ের আঞ্চলিক রাজনীতির অনৈক্যই দায়ী এ নিয়ে কারোর সংশয় নেই।

এদিকে বাঘাইছড়ি হত্যাযজ্ঞের ২৪ ঘণ্টা না যেতেই পাহাড়ে ফের লাশ পড়েছে। গতকাল মঙ্গলবার রাঙামাটি জেলার বিলাইছড়ি উপজেলা আওয়ামী লীগের সভাপতি সুরেশ কান্তি তঞ্চঙ্গ্যাকে গুলি করে হত্যা করেছে দুর্বৃত্তরা। 

নিরাপত্তা বিশ্নেষক মেজর (অব.) এমদাদুল ইসলাম বলেন, ‘নয় কিলোমিটার এলাকাটি ভৌগোলিক কারণে হামলাকারীদের জন্য নিরাপদ ছিল। পাহাড়ের কোলঘেঁষে বিকল্প একটি পথ থাকায় তারা পালানোর সুযোগ পেয়েছে সহজে।’ পার্বত্য শান্তিচুক্তির সময় পার্বত্য এলাকায় চিফ সিকিউরিটি নেগোশিয়েটিং অফিসারের দায়িত্বে ছিলেন এই নিরাপত্তা বিশ্নেষক। সমকালের সঙ্গে আলাপে তিনি বলেন, ‘কেন ভোটকেন্দ্র না হয়ে নির্বাচনের দায়িত্ব পালনকারীরা টার্গেট হলেন তা নিয়ে ভাবতে হবে নতুন করে। পাহাড় ক্রমশ অশান্ত হলে তার প্রভাব পড়বে সমতলেও। তাই বিষয়টিকে পাহাড়ের রাজনীতির অভ্যন্তরীণ কোন্দল হিসেবে না দেখে আরও গুরুত্বের সঙ্গে দেখতে হবে সরকারকে। গোয়েন্দা তৎপরতা আরও বাড়িয়ে অবৈধ অস্ত্র উদ্ধার করতে হবে। বিবদমান গ্রুপগুলোর সঙ্গে আলোচনার পথ খোলা রাখতে হবে। কেন পাহাড়ে একের পর এক লাশ পড়ছে এবং একাধিক দল সৃষ্টি হচ্ছে সেটিরও জবাব চাইতে হবে আঞ্চলিক দলপ্রধানদের কাছ থেকে। কারণ পাহাড়ে শান্তি স্থাপনে অঙ্গীকারবদ্ধ ছিলেন তারাও।’ অপর এক প্রশ্নের জবাবে পার্বত্য চট্টগ্রাম নাগরিক কমিটির সভাপতি গৌতম দেওয়ান বলেন, ‘গত দুই বছরে শতাধিক লাশ পড়েছে পাহাড়ে। সরকার যদি বিষয়টিকে এখনই গুরুত্বের সঙ্গে না নেয় তবে বড় ধরনের ভুল হবে। অভ্যন্তরীণ দ্বন্দ্ব বলে খুনিরা পার পেয়ে গেলে লাশের সংখ্যা ক্রমশ বাড়তেই থাকবে।’ 

নির্বাচন কর্মকর্তারা কেন টার্গেট হলেন :নির্বাচন কর্মকর্তাদের ওপর হামলার বিষয়টিকে নতুন ডাইমেনশন বলে মনে করছে আইন-শৃঙ্খলা বাহিনী। দৃষ্টি অন্যত্র ঘুরিয়ে দিতে এটি হামলাকারীদের একটি কৌশলও হতে পারে বলে ধারণা করছেন রাঙামাটির পুলিশ সুপার আলমগীর কবির। জানা গেছে, বাঘাইছড়ি উপজেলা নির্বাচনে এবার ক্ষমতাসীন দল আওয়ামী লীগের কোনো প্রার্থী ছিল না। তবে আওয়ামী লীগের মৌন সমর্থন ছিল জেএসএস এমএন লারমা গ্রুপের প্রার্থীদের প্রতি। এদিকে ভোটে কারচুপির অভিযোগ এনে সন্তু লারমার নেতৃত্বাধীন জেএসএস ভোট শুরুর পরপরই নির্বাচন বর্জনের ঘোষণা দেন। স্বাভাবিকভাবে তাই কারও কারও ধারণা ক্ষুব্ধ হয়ে নির্বাচন কর্মকর্তাদের ওপর হামলা করতে পারে সন্তু লারমার নেতৃত্বাধীন জেএসএস। তবে নিরাপত্তা বিশ্নেষক মেজর এমদাদ মনে করছেন, এ ধারণাটির উল্টোও হতে পারে। নির্বাচন কর্মকর্তাদের ওপর হামলা হলে সন্তু লারমার নেতৃত্বাধীন জেএসএসের দিকে যাবে সন্দেহের তীর, এমনটি ভেবে তৃতীয় কোনো পক্ষও নিতে পারে হামলার সুযোগ। যে এলাকায় হামলা হয়েছে সেটির আশপাশে ইউপিডিএফের প্রভাব বেশি বলে উল্লেখ করেন তিনি।

পুলিশ সুপার আলমগীর কবির বলেন, ‘নির্বাচন নাকি অন্য কোনো কারণে এ হামলা হয়েছে সেটি আমরা খতিয়ে দেখব। আমাদের গোয়েন্দা ইউনিট এটি নিয়ে কাজ করছে। কেন নির্বাচন কর্মকর্তাদের টার্গেট করা হলো, যে এলাকা থেকে হামলা হয়েছে, সেটির চারপাশে কার নিয়ন্ত্রণ বেশি, কোন পথ দিয়ে হামলাকারীরা পালাল- এসব খতিয়ে দেখা হবে। এ ঘটনায় এখনও কেউ দায় স্বীকার করেনি। তাই অনেক বিষয় সামনে রেখে কাজ করছি আমরা।’ পুলিশ সুপার জানান, এ ঘটনাকে কেন্দ্র করে নতুন যেন কোনো অস্থিরতা তৈরি না হয় সেদিকে নজর রাখছেন তারা।

সন্দেহের তীর কোন দিকে :পার্বত্য চট্টগ্রামে আধিপত্য বিস্তারে সংঘাতে লিপ্ত থাকা দলগুলোকেই এ হামলার জন্য সন্দেহ করছে আইন-শৃঙ্খলা বাহিনী। তবে ঠিক কোন দল এ হামলায় জড়িত তা এখনই বলতে চাচ্ছেন না তারা। রাঙামাটির বাঘাইছড়ি হত্যাযজ্ঞের পর গতকাল মঙ্গলবার বিলাইছড়িতে আবার একজনের লাশ পড়ার ঘটনাটির মধ্যে কোনো যোগসূত্র আছে কি-না সেটিও খতিয়ে দেখছে তারা। তবে বিলাইছড়ির ঘটনায় স্থানীয় আওয়ামী লীগ সন্তু লারমার নেতৃত্বাধীন জেএসএসকে দায়ী করছে। রাঙামাটি জেলা আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক হাজী মো. মুসা মাতব্বর বলেন, ‘উপজেলা নির্বাচনে দলীয় প্রার্থীর পক্ষে কাজ করায় তাকে সন্তু লারমার দলের সন্ত্রাসীরা গুলি করে হত্যা করেছে।’ তবে অভিযোগ অস্বীকার করে জনসংহতি সমিতির জেলা সম্পাদক নীলোৎপল খীসা বলেন, ‘আমরা এ ধরনের রাজনীতি করি না। এসব ঘটনার সঙ্গে আমাদের জড়ানোর চেষ্টা আসলে রাজনৈতিক প্রতিহিংসা চরিতার্থ করার হীনপ্রচেষ্টা।’ এদিকে বাঘাইছড়ির ঘটনা নিয়েও পরস্পরবিরোধী বক্তব্য দিচ্ছে বিবদমান দলগুলো। সেখানে আওয়ামী লীগের সরাসরি কোনো প্রার্থী না থাকলেও সংস্কারপন্থি জেএসএসকে সমর্থন দেওয়ায় সন্তু লারমার নেতৃত্বাধীন জেএসএস ক্ষুব্ধ হয়ে এ হামলা চালিয়েছে বলে ধারণা করছে স্থানীয়দের কেউ কেউ। আবার আরেকটি পক্ষ বলছে, যে এলাকায় হামলা হয়েছে সেটি ইউপিডিএফ অধ্যুষিত এলাকা। তাই হামলায় তারা জড়িত থাকতে পারে। তবে অভিযোগ অস্বীকার করে ইউপিডিএফের কেন্দ্রীয় সদস্য সচিব চাকমা এক সংবাদ বিজ্ঞপ্তিতে বাঘাইছড়িতে নির্বাচন পরিচালনাকারী টিমের ওপর হামলা এবং হতাহতের ঘটনায় তীব্র নিন্দা জানিয়েছেন। ঘটনাস্থল ইউপিডিএফ সমর্থক অধ্যুষিত হওয়ায় কোনো কোনো সংবাদমাধ্যম এবং এক শ্রেণির গোয়েন্দা সংস্থা কর্তৃক দলটিকে সন্দেহের তালিকায় যুক্ত করায় ইউপিডিএফ ক্ষোভ প্রকাশ করে অবিবেচনাপ্রসূত মন্তব্য করা থেকে বিরত থাকার আহ্বান জানিয়েছে। সংবাদ বিজ্ঞপ্তিতে বলা হয়- ‘ওই উপজেলায় ইউপিডিএফ নির্বাচনী প্রক্রিয়ার বাইরে নিষ্ফ্ক্রিয় ছিল এবং ইউপিডিএফের কোনো প্রার্থীও ছিল না, তাহলে ইউপিডিএফ কেন নির্বাচনী টিমের ওপর হামলা করে নিজেদের অহেতুক বিতর্কে জড়াবে?’ ইউপিডিএফের ওপর দায় না চাপিয়ে প্রকৃত দোষীদের চিহ্নিত করে আইনানুগ ব্যবস্থা গ্রহণ করতেও আহ্বান জানায় দলটি। 

দুই বছরে শতাধিক লাশ :১৯৭২ সালে পাহাড়ের মানুষের অধিকার নিয়ে কথা বলার জন্য গঠিত হয় জেএসএস। ১৯৯৭ সালে পার্বত্য চুক্তি হওয়ার পর জেএসএসের বাইরে ইউপিডিএফ নামে নতুন দল গঠিত হয়। পরে ২০১০ সালে মূল জেএসএস ভেঙে গঠিত হয় জেএসএস (এম এন লারমা)। ২০১৭ সালের ১৫ নভেম্বর পার্বত্য চট্টগ্রামের অন্যতম আঞ্চলিক দল ইউপিডিএফ ভেঙে আরও একটি নতুন দল গঠিত হয়। ইউপিডিএফের সাবেক নেতা তপনজ্যোতি চাকমার নেতৃত্বে ইউপিডিএফ গণতান্ত্রিক নামে নতুন সংগঠনটি আত্মপ্রকাশ করে। এরপরই আবার পুরনো রূপে ফিরতে থাকে আঞ্চলিক দলগুলো। নতুন এ সংগঠনটি আত্মপ্রকাশের ২০ দিনের মাথায় ২০১৭ সালের ৫ ডিসেম্বর রাঙামাটির নানিয়ারচরে সাবেক ইউপি সদস্য ও ইউপিডিএফ নেতা অনাদী রঞ্জন চাকমাকে ব্রাশফায়ারে খুন করে সন্ত্রাসীরা। আবার গত বছরের ৪ মে ইউপিডিএফ গণতান্ত্রিক দলের আহ্বায়ক তপনজ্যোতি চাকমাসহ পাঁচজন খুন হন। তার আগের দিন খুন হয়েছিলেন রাঙামাটির নানিয়ারচর উপজেলা পরিষদের চেয়ারম্যান জেএসএস এমএন লারমা গ্রুপের নেতা শক্তিমান চাকমা। এরই ধারাবাহিকতায় সোমবার এবং মঙ্গলবারের হত্যাযজ্ঞ। গত দুই বছরে পাহাড়ে পড়েছে দুই শতাধিক লাশ।