আজকের দিন-তারিখ

  • মঙ্গলবার ( সকাল ৬:৩১ )
  • ২৩শে জুলাই, ২০১৯ ইং
  • ২০শে জিলক্বদ, ১৪৪০ হিজরী
  • ৮ই শ্রাবণ, ১৪২৬ বঙ্গাব্দ ( বর্ষাকাল )

Archive Calendar

জুলাই ২০১৯
সোম মঙ্গল বুধ বৃহস্পতি শুক্র শনি রবি
« জুন    
১০১১১২১৩১৪
১৫১৬১৭১৮১৯২০২১
২২২৩২৪২৫২৬২৭২৮
২৯৩০৩১  
ধর্মমনীষী জীবনী

মনীষীদের জীবনী : আবু উবায়দা ইবনুল জাররাহ (রা.)

8views

দুনিয়ায় থাকতেই যে ক’জন সাহাবায়ে কেরাম রাসুল (সা.) এর পবিত্র মুখে জান্নাতের সুসংবাদ পেয়েছেন তাদের অন্যতম হলেন হজরত আবু উবায়দা ইবনুল জাররাহ (রা.)। আবু বকর (রা.) যেদিন ইসলাম গ্রহণ করেন তার পরদিন তারই হাতে তিনি ইসলাম গ্রহণ করেন। মক্কার বিভীষিকাময় দিনগুলোতে অত্যন্ত অবিচলতার সঙ্গে তিনি দ্বীন অাঁকড়ে ধরে থাকেন। অবস্থা চরম আকার ধারণ করলে হাবশায় হিজরত করেন। পরে স্থায়ীভাবে মদিনায় হিজরত করেন। মদিনায় রাসুল (সা.) তাঁর ও সাদ বিন মুয়াজ বা আবু তালহা (রা.) এর সঙ্গে ভ্রাতৃত্বের সম্পর্ক তৈরি করে দেন। ইবনে ওমর (রা.) বলেন, কোরাইশ গোত্রের তিনজন লোক সবচেয়ে বেশি মর্যাদাবান, সর্বোত্তম চরিত্রের অধিকারী এবং সদা লজ্জাবোধসম্পন্ন। তারা তোমাদের সঙ্গে কথা বললে কখনোই মিথ্যার আশ্রয় নেবেন না। তাদের সঙ্গে কথা বললে তারাও তোমাদের মিথ্যারোপ করবেন না। তারা হলেন আবু বকর সিদ্দিক, ওসমান বিন আফফান আর আবু উবায়দা ইবনুল জাররাহ (রা.)।

আরবের খ্রিস্টান অধ্যুষিত এলাকা নাজরান থেকে এক প্রতিনিধি দল রাসুল (সা.) এর কাছে আসে। রাসুল (সা.) কে তারা বলে, হে আবুল কাসেম! আপনার সঙ্গীদের ভেতর থেকে আপনার পছন্দমতো একজন লোক আমাদের সঙ্গে নাজরান পাঠিয়ে দিন। অর্থ-সম্পদ ও অন্য যেসব বিষয়ে আমাদের মাঝে মতভিন্নতা হয় সে বিষয়ে তিনি আমাদের মাঝে সঠিক সিদ্ধান্ত প্রদান করবেন। আপনাদের সবার প্রতি আমাদের যথার্থ আস্থা আছে। রাসুল (সা.) বললেন, ঠিক আছে। তোমরা একটু বেলা হলে আমার সঙ্গে দেখা করো। তোমাদের সঙ্গে আমি অত্যন্ত বিশ্বস্ত ও শক্তিমান একজন লোক পাঠিয়ে দেব। ওমর (রা.) বলেন, সেদিন একটু সকাল সকাল আমি জোহরের নামাজে গিয়ে উপস্থিত হলাম। সেদিনকার মতো অন্য কোনো দিন আমার নেতৃত্বের প্রতি ভালোবাসা তৈরি হয়নি। আশা ছিল আমিই যেন রাসুলের জবানে বের হওয়া ওই গুণের মানুষটি হয়ে যাই। রাসুল (সা.) আমাদের সঙ্গে জোহরের নামাজ আদায় করে ডানে-বাঁয়ে তাকাতে লাগলেন। আমিও বারবার একটু উঁচু হয়ে নিজের উপস্থিতি জানান দিচ্ছিলাম। এক পর্যায়ে তাঁর দৃষ্টি আবু উবায়দা ইবনুল জাররাহর ওপর গিয়ে স্থির হয়ে গেল। তাকে ডেকে তিনি বললেন, ‘তুমি এদের সঙ্গে যাও। যেসব বিষয়ে তাদের পারস্পরিক মতভিন্নতা দেখা দেয় সেসব বিষয়ে তুমি তাদের মাঝে ন্যায়সঙ্গতভাবে ফয়সালা করবে।’ (বোখারি)।

আবু উবায়দা (রা.) শুধু বিশ্বস্তই ছিলেন না। তার মাঝে বিশ্বস্ততা ও বীরত্বের যুগপৎ সমাবেশ ঘটেছিল। রাসুল (সা.) এর সঙ্গে সব জেহাদে শরিক হওয়া ছাড়াও তার একক নেতৃত্বে বেশ কিছু ছোট ছোট অভিযান পরিচালিত হয়েছে। ওহুদ যুদ্ধে অন্য কয়েকজনের সঙ্গে মিলে তিনি রাসুল (সা.) এর চতুর্দিকে নিরাপত্তা বূ্যহ তৈরি করে রেখেছিলেন। যুদ্ধের এক পর্যায়ে রাসুল (সা.) এর গ-দেশে লৌহবর্মের একটা আংটা ঢুকে গেলে নিজের দাঁত দিয়ে তিনি তা টেনে বের করেন। এতে তার সামনের দাঁত দুইটি ভেঙে যায়।

রাসুল (সা.) এর ওফাতের পর খেলাফতের দায়িত্ব পালনের প্রশ্ন দেখা দিলে ওমর (রা.) আবু উবায়দা (রা.) কে বললেন, আপনার হাত সামনে বাড়িয়ে দিন। আমি আপনার হাতে বায়াত করব। কারণ রাসুল (সা.) কে আমি নিজ কানে বলতে শুনেছি ‘প্রতিটি উম্মতেরই একজন বিশ্বস্ত লোক থাকে। আর এই উম্মতের বিশ্বস্ত লোক হলো আবু উবায়দা ইবনুল জাররাহ।’ মৃত্যুর আগ পর্যন্ত ওমর (রা.) বলতেন, আবু উবায়দা ইবনুল জাররাহর জীবদ্দশায় যদি আমার মৃত্যু এসে যায় তাহলে তাকেই আমি পরবর্তী খলিফা মনোনীত করে যাব। যদি আল্লাহ তায়ালা আমাকে জিজ্ঞেস করেন কী কারণে তুমি আবু উবায়দাকে উম্মতে মুহাম্মাদির খলিফা নিযুক্ত করে এলে? তাহলে আমি বলব, আমি নিজে রাসুল (সা.) কে বলতে শুনেছি, প্রত্যেক নবীর একজন করে বিশ্বাসভাজন লোক থাকে। আমার সেই বিশ্বাসভাজন লোক হলো আবু উবায়দা ইবনুল জাররাহ। (কানজুল উম্মাল)।

আয়েশা (রা.) কে একবার জিজ্ঞেস করা হয়েছিল, রাসুল (সা.) কাউকে খলিফা নিযুক্ত করতে চাইলে আগে কাকে করতেন। তিনি বললেন, আবু বকরকে। জিজ্ঞেস করা হলো, আবু বকরের পর কাকে? তিনি বললেন, ওমরকে। আবার বলা হলো, তারপর কাকে? তিনি বললেন, আবু উবায়দা ইবনুল জাররাহকে। (মুসলিম)।

একবার ওমর (রা.) তার কাছে উপবিষ্ট লোকদের বলছিলেন, আচ্ছা বলো তো! তোমাদের কার কী মন চায়? একজন বললেন, আমার মন চায়, যদি এই ঘরভর্তি দিরহাম থাকত তাহলে তা সবই আমি আল্লাহর রাস্তায় দান করে দিতাম। আরেকজন বললেন, আমার মন চায়, যদি এই ঘরভর্তি দিনার থাকত তাহলে তা সবই আমি আল্লাহর রাস্তায় দান করে দিতাম। ওমর (রা.) তখন বললেন, কিন্তু আমার মন চায়, যদি এই ঘরভর্তি আবু উবায়দা ইবনুল জাররাহ, মুয়াজ বিন জাবাল আর হুজাইফা বিন ইয়ামানের মতো লোক থাকত তাহলে তাদের সবাইকে আমি আল্লাহর আনুগত্যে কাজে লাগাতাম। (বোখারি)।

আবু উবায়দা (রা.) খুবই সাদামাটা জীবনযাপন করতেন। সিরিয়ায় তিনি যখন বিশাল মুসলিম বাহিনীর সেনাপতি ছিলেন তখনও তার ঘরে একটা ঢাল, তরবারি আর বাহন ছাড়া অতিরিক্ত কোনো সম্পদ ছিল না। এ দেখে ওমর (রা.) তাকে বললেন, আরও কিছু জিনিসপত্র রাখলেও তো পারেন। উত্তরে তিনি বলেছিলেন, আমিরুল মোমিনিন! এগুলোই আমাকে কবর পর্যন্ত পেঁৗছে দিতে পারবে। তখন ওমর (রা.) আবেগমথিত হয়ে তাকে বলেছিলেন, দুনিয়া আমাদের সবাইকে বদলে দিয়েছে। কিন্তু আপনাকে বদলাতে পারেনি হে আবু উবায়দা!

Leave a Response