আজকের দিন-তারিখ

  • শুক্রবার ( সকাল ৮:৩৯ )
  • ১৩ই ডিসেম্বর, ২০১৯ ইং
  • ১৬ই রবিউস-সানি, ১৪৪১ হিজরী
  • ২৯শে অগ্রহায়ণ, ১৪২৬ বঙ্গাব্দ ( হেমন্তকাল )

Archive Calendar

ডিসেম্বর ২০১৯
সোম মঙ্গল বুধ বৃহস্পতি শুক্র শনি রবি
« জুলাই    
 
১০১১১২১৩১৪১৫
১৬১৭১৮১৯২০২১২২
২৩২৪২৫২৬২৭২৮২৯
৩০৩১  
কক্সবাজার

ঐতিহ্যের মাতামুহুরী নদী এখন মরণ ফাঁদ!

301views

বর্ষা আসলে কক্সবাজারের চকরিয়ার মাতামুহুরী নদী ভয়ংকর রূপ ধারণ করে। তার উপর নদীর বিভিন্ন এলাকায় একশ্রেণীর বালি খেকো প্রভাবশালী মহলের অবৈধভাবে ড্রেজার ও শ্যালো মেশিন বসিয়ে বালি উত্তোলনে মরণ ফাঁদে পরিণত হয়েছে এ নদী। মরণ ফাঁদে পড়ে গত এক বছরে শিক্ষার্থীসহ ২০ জনের মৃত্যু হয়েছে।

জানা যায়, জেলার দ্বিতীয় বৃহত্তম নদী চকরিয়ার মাতামুহুরী। ভারী বর্ষণে উজান থেকে নেমে আসা পাহাড়ি ঢলে নদীর দু’পাড়ে বসবাসরত মানুষের জীবন বিপদসংকুল হয়ে উঠে। কিন্তু কিছু বালি খেকো প্রভাবশালী মহল বালু মহালে পরিণত করেছে মাতামুহুরী চরকে।

প্রতিনিয়ত মাতামহুরী নদীতে শক্তিশালী ড্রেজার ও শ্যালো মেশিন বসিয়ে অবৈধভাবে বালু উত্তোলনের কারণে অসংখ্য স্থানে তৈরি হচ্ছে গভীর গর্তসহ চোরাবালি। মানবসৃষ্ট এই চোরাবালির কারণে নদীতে গোসল করতে নেমে সলিল সমাধি হচ্ছে মানুষের। বিশেষ করে দুরন্তপণা শিশু-কিশোররা এই বিপদের সম্মুখীন হচ্ছে বেশি।

এক সময়ের নিরাপদ মাতামুহুরী এমন রূপ কেন ধারণ করছে? এই প্রশ্নের উত্তর খুঁজতে গেলে নদীর বিভিন্নস্থানে মানবসৃষ্ট চোরাবালিকেই দায়ী করছেন সচেতন মহল। গত দুইমাসে নদীর চকরিয়া অংশের বিভিন্ন ইউনিয়নের অন্তত ৩০টি পয়েন্টে শক্তিশালী ড্রেজার ও শ্যালো মেশিন বসিয়ে বালু উত্তোলন করায় সেখানে নতুন করে তৈরি হচ্ছে চোরাবালি। কিন্তু বরাবরের মতোই প্রশাসনের কর্মকর্তারা রয়েছেন একেবারেই নির্বিকার। প্রশাসন সবকিছুই অবগত থাকলেও রাজনৈতিক নেতাদের হস্তক্ষেপে তারাও অনেকটা অসহায় বলে অভিযোগ উঠেছে।

উপজেলা প্রশাসন সূত্রে জানা যায়, সর্বশেষ রোববার (২৬ মে) সকালে উপজেলার কাকারা ইউনিয়নের পূর্ব কাকারা এলাকায় মাতামুহুরী নদীতে গোসল করতে নেমে মারা যায় আমজাদ হোসেন (৮) নামের এক শিশু। সম্প্রতি প্রভাবশালীরা মাতামুহুরী নদীর পূর্ব কাকারা পয়েন্টে শ্যালো মেশিন বসিয়ে অবৈধভাবে বালু উত্তোলন করে। এতে ঐ পয়েন্টের একাধিক স্থানে গভীর গর্ত হয়ে চোরাবালির সৃষ্টি হয়।

গত বছরের ১৪ জুলাই মাতামুহুরী নদীর চিরিঙ্গা সেতুর কাছের বালুরচরে ফুটবল খেলার পর গোসল করতে নদীতে নামে চকরিয়া গ্রামার স্কুলের একদল স্কুল শিক্ষার্থী। তন্মধ্যে চোরবালিতে তলিয়ে গিয়ে প্রাণ হারায় পাঁচ শিক্ষার্থী। একসঙ্গে পাঁচ শিক্ষার্থীর মৃত্যুর ঘটনায় পুরো কক্সবাজারে নেমে আসে শোকের ছায়া। দাবি উঠে, নদীতে তলিয়ে যাওয়ার পয়েন্টে স্মৃতিস্তম্ভ নির্মাণের। পরবর্তীতে সেই ঘটনা ধামাচাপা পড়ে যায়। ঐ সময় চকরিয়া ফায়ার সার্ভিসের প্রধান জি এম মহিউদ্দিন শ্যালো মেশিন বসিয়ে অবৈধভাবে বালু উত্তোলন চোরাবালি সৃষ্টির জন্য দায়ী করেছিলেন।

খোঁজ নিয়ে জানা যায়, গত দুই মাসে মাতামুহুরী নদীর চকরিয়ার ঘুনিয়া, সুরাজপুর-মানিকপুর, কাকারা, পৌরসভার বিভিন্ন পয়েন্ট, সাহারবিলের রামপুর, মাইজঘোনা, কৈয়ারবিল, বাঘগুজারা, বেতুয়া বাজার, কোনাখালীর কন্যারকুম, চিরিঙ্গা ইউনিয়নের সওদাগরঘোনা, চরণদ্বীপসহ অন্তত ৩০টি পয়েন্টে এখন চলছে প্রভাবশালী বালুদস্যুদের অপতৎপরতা। এতে নদীতে সৃষ্টি হচ্ছে ২০-৩০ ফুট গর্তসহ অসংখ্য চোরাবালি।

চকরিয়া কাকারা ইউনিয়ন পরিষদের চেয়ারম্যান মো. শওকত ওসমান জানান, এর আগেও মাতামুহুরী নদীর বিভিন্ন এলাকায় সৃষ্ট চোরাবালিতে পড়ে অকালে প্রাণ হারিয়েছে এই এলাকার অনেকেই।

চোরবালি কেন হয়- এমন প্রশ্ন করা হলে মাতামুহুরী নদীর তিন কিলোমিটারে ড্রেজিয়ের দায়িত্বপ্রাপ্ত ঠিকাদারী প্রতিষ্ঠান এস এস ন্যাশনের কর্ণধার নূরে বশির বার্তা২৪.কম-কে বলেন, ‘যেখানে শ্যালো মেশিন বা ড্রেজার বসিয়ে অবৈধভাবে বালু উত্তোলন করা হয়, সেখানে নির্দিষ্ট জায়গায় বড় ধরণের একটি গর্তের সৃষ্টি হয়। আর সেই গর্ত ভরাট হয় পলিমাটিতে। তখন সেই গর্তের মধ্যে কেউ ঢুকে গেলে সহজে বের হতে পারে না।’

তিনি বলেন, ‘পানি উন্নয়ন বোর্ড আমাদের নদীর তিন কিলোমিটারে ড্রেজিং করার জন্য নিয়োজিত করেছে। সেই মোতাবেক ডিজাইন ও তিনটি কাটার ড্রেজার মেশিন পরিকল্পিতভাবে ড্রেজিয়ের মাধ্যমে নদীর তলদেশ থেকে বালু অপসারণ করছেন। নদীর অন্যান্য পয়েন্টে যেসব শ্যালো মেশিন ও ড্রেজার বসিয়ে অবৈধভাবে বালু উত্তোলন করছে, তাতে আমার কোন ধরণের সম্পৃক্ততা নেই।‘

কক্সবাজার পানি উন্নয়ন বোর্ডের নির্বাহী প্রকৌশলী তয়ন কুমার ত্রিপুরা বলেন, ‘শক্তিশালী ড্রেজার ও শ্যালো মেশিন বসিয়ে বালু উত্তোলনের কারণে নদীর বুকে বিভিন্ন স্থানে বড় ধরণের গর্ত তৈরি হয়ে চোরাবালিতে পরিণত হচ্ছে। এতে আগামী বর্ষা মৌসুমে নদীর তীর ভেঙে বহু স্থাপনা বিলীন হওয়ার আশঙ্কা দেখা দিয়েছে।‘

এ বিষয়ে কক্সবাজারের অতিরিক্ত জেলা প্রশাসক (রাজস্ব) মো. আশরাফুল আফসার বলেন, ‘মাতামুহুরী নদী থেকে বালু উত্তোলনের জন্য কাউকে অনুমতি দেওয়া হয়নি। যারা এই অপকর্ম করে নদীতে চোরাবালি সৃষ্টি করছেন তাদের বিরুদ্ধে প্রয়োজনীয় আইনগত ব্যবস্থা নিতে সংশ্লিষ্টদের নির্দেশ দেওয়া হয়েছে।’