আজকের দিন-তারিখ

  • সোমবার ( সন্ধ্যা ৬:২৯ )
  • ২১শে অক্টোবর, ২০১৯ ইং
  • ২২শে সফর, ১৪৪১ হিজরী
  • ৬ই কার্তিক, ১৪২৬ বঙ্গাব্দ ( হেমন্তকাল )

Archive Calendar

অক্টোবর ২০১৯
সোম মঙ্গল বুধ বৃহস্পতি শুক্র শনি রবি
« জুলাই    
 
১০১১১২১৩
১৪১৫১৬১৭১৮১৯২০
২১২২২৩২৪২৫২৬২৭
২৮২৯৩০৩১  
জাতীয়রোহিঙ্গা

রোহিঙ্গায় মাথাব্যথা : প্রত্যাবাসন অনিশ্চিত

40views

কক্সবাজার ডেস্ক :

রোহিঙ্গাদের নিয়ে স্বস্তিতে নেই বাংলাদেশ। একটি নির্যাতিত জনগোষ্ঠীর পাশে দাঁড়িয়ে যে মানবিকতা দেখিয়েছিল, তা এখন অনেকটা বিষফোঁড়ায় রূপ নিয়েছে। খাদ্য-বাসস্থানের সংস্থান আর নিজ দেশে তাদের ফেরত পাঠানোর ইস্যুতে প্রতিটি মুহূর্তে উদ্বেগে কাটছে বাংলাদেশের।গত বছরের ১৫ নভেম্বর থেকে প্রত্যাবাসন শুরু হওয়ার কথা থাকলেও নিরাপত্তার কথা বলে রোহিঙ্গারা ফিরতে অস্বীকৃতি জানান। ফলে প্রত্যাবাসন প্রক্রিয়া অনির্দিষ্টকালের জন্য আটকে যায়। তাদের দীর্ঘমেয়াদি অবস্থানের কারণে আর্থ-সামাজিক ক্ষেত্রে বিরূপ প্রভাব পড়বে। তা ছাড়া ক্যাম্পগুলোতেও রোহিঙ্গারা নানা অপরাধে জড়িয়ে পড়ছেন। ফলে রোহিঙ্গারা বড় ধরনের মাথাব্যথার কারণ হয়ে দাঁড়িয়েছে।গত বছরের ১৫ নভেম্বর আনুষ্ঠানিকভাবে রোহিঙ্গা প্রত্যাবাসন শুরু হওয়ার কথা। প্রত্যাবাসনের জন্য বাংলাদেশ-মিয়ানমারের গঠিত যৌথ ওয়ার্কিং গ্রুপ প্রস্তুতি নেয়। কিন্তু নিরাপত্তার অজুহাত তুলে রোহিঙ্গারা রাখাইনে ফিরতে অস্বীকৃতি জানান। ফলে থমকে যায় প্রত্যাবাসন। এ প্রক্রিয়া কবে শুরু হবে তাও অনিশ্চিত হয়ে পড়ে।রোহিঙ্গাদের জন্য প্রথম বছর বাংলাদেশের নিজস্ব তহবিল থেকে উল্লেখযোগ্য খরচ হয়নি। জাতিসংঘের শরণার্থীবিষয়ক হাইকমিশনসহ (ইউএনএইচসিআর) বিভিন্ন দাতা সংস্থা, বিভিন্ন দেশ ও সংগঠনের পক্ষ থেকে যাবতীয় ব্যয় নির্বাহ করা হয়। তবে চলমান অর্থবছরের জন্য বাজেটে সরকার ৪০০ কোটি টাকা বরাদ্দ রাখে। এ ছাড়া অনুদান আসবে বলেও সংশ্লিষ্ট সূত্রে জানা যায়।সংশ্লিষ্ট সূত্রে জানা গেছে, রোহিঙ্গাদের পুনর্বাসনে সরকারি অর্থ বরাদ্দের পাশাপাশি বিশ্বব্যাংকের কাছ থেকে অনুদান হিসেবে পাওয়া যাবে ৫০০ কোটি টাকা। তবে রাস্তাঘাট নির্মাণ থেকে শুরু করে টয়লেট, টিউবওয়েল, ল্যাট্রিন, গোসলখানা নির্মাণ, বিদ্যুতের লাইন টানা ও চিকিৎসা খাতে প্রায় ২০০ কোটির বেশি ব্যয় হয়। চার হাজার একর বনভূমি উজাড় হওয়ায় ভয়াবহ ক্ষতি হয়েছে পরিবেশের। রোহিঙ্গা শিবিরে সামরিক-বেসামরিক মিলিয়ে তিন হাজারের বেশি কর্মকর্তা-কর্মচারী কাজ করছেন। তাদের বেতনভাতা থেকে শুরু করে যাবতীয় খরচ সরকারের তহবিল থেকেই বহন করা হচ্ছে।বাংলাদেশে অবস্থান করা ১৩ লাখ রোহিঙ্গার মধ্যে আট লাখের বেশি এসেছে ২০১৭ সালের ২৫ আগস্টের পর। এ ছাড়া গত দেড় মাসে ভারত থেকে বাংলাদেশে আশ্রয় নিয়েছে এক হাজার ৩০০ মতো রোহিঙ্গা। আর গত মে মাস থেকে ধরলে এ সংখ্যা আড়াই হাজারের বেশি। অনানুষ্ঠানিক হিসাবে এটি আরও বেশি হতে পারে বলে ধারণা সংশ্লিষ্টদের। কক্সবাজারের উখিয়ার অন্তর্বর্তীকালীন ট্রানজিট পয়েন্টের আশ্রয়শিবিরে জাতিসংঘের সংস্থা ইউএনএইচসিআরের তত্ত্বাবধানে তাদের রাখা হয়েছে। তারা চিঠি দিয়ে বিষয়টি বাংলাদেশ সরকারকে জানায়। এ ছাড়া গত ৭ জানুয়ারি সৌদি থেকে ১৩ বাংলাদেশি পাসপোর্টধারী রোহিঙ্গাকে দেশে ফেরত পাঠানো হয়েছে। আরও রোহিঙ্গা ফেরত পাঠানোর প্রক্রিয়ায় আছে বলে জানা গেছে। সৌদি আরবের কারাগারে ৫-৬ বছর ধরে আটক থাকা রোহিঙ্গাদের বাংলাদেশে পাঠানোর উদ্দেশ্যে জেদ্দার সুমাইসি কারাগারে তাদের স্থানান্তর করা হয়। তাদের ফেরত না পাঠানোর জন্য অনশন করছেন রোহিঙ্গারা। এ অবস্থায় বাংলাদেশ হয়ে উঠছে রোহিঙ্গাদের প্রধান আশ্রয়স্থল।সম্প্রতি বাংলাদেশের গণমাধ্যম খবর দিয়েছেÑ রোহিঙ্গারা গত আট মাসে ১৫টি হত্যাকা-সহ ১৬৩টি অপরাধে জড়িয়েছে বলে হিসাব দিয়েছে পুলিশ। খুনের পাশাপাশি অপহরণ, চোরাচালানের মতো অপরাধও সংঘটন করেছে। তাদের বিরুদ্ধে রয়েছে ১২টি অস্ত্র মামলা, ৫৮টি মাদকসংক্রান্ত, দুটি ধর্ষণ, ৪০টি মামলা রয়েছে ফরেন অ্যাক্টে, চোরাচালানে পাঁচটি, চুরিসংক্রান্ত একটি, অপহরণ তিনটি এবং অন্যান্য ২২টি। এসব ঘটনায় করা মামলায় আসামি করা হয়েছে ৩৩৬ রোহিঙ্গাকে।সরকারের সংশ্লিষ্ট একটি সূত্র প্রত্যাবাসন প্রক্রিয়া সম্পর্কে বলেন, অনেক সময় মিয়ানমারের সঙ্গে যোগাযোগ করা দুরূহ হয়ে পড়ে। প্রত্যাবাসন দিনক্ষণ এখন নির্দিষ্ট করে বলা যাচ্ছে না। জয়েন্ট ওয়ার্কিং গ্রুপের পরবর্তী বৈঠক কবে হবে সে বিষয়ে কোনো তারিখ এখনো নির্ধারিত হয়নি। এ অবস্থায় রোহিঙ্গা সমস্যার সমাধানে আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়ের সহযোগিতা চেয়েছেন পররাষ্ট্রমন্ত্রী ড. আবদুল মোমেন। তিনি বলেন, রোহিঙ্গা একটি গুরুত্বপূর্ণ ইস্যু। এটি অগ্রাধিকারমূলক একটি বিষয়। এ সমস্যা সহজেই সমাধান হবে না। মিয়ানমার বাংলাদেশের বন্ধু দেশ। তারা যদি বন্ধুত্বের প্রতিফলন দেখায়, তবে এ সমস্যা সহজেই মিটে যাবে। এর জন্য অনেক কাঠখড় পোড়াতে হবে। সমস্যার সমাধানে আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়ের আরও ভূমিকা চাই। রোহিঙ্গা ইস্যু জিইয়ে থাকলে ভারত-চীনসহ সবার স্বার্থ ব্যাহত হবে। তিনি বলেন, বাংলাদেশে রোহিঙ্গাদের অবস্থান নিয়ে আমি একটি স্টাডি করতে বলেছি। এ গবেষণা থেকে রোহিঙ্গাদের কারণে আমাদের দেশের সামাজিক, আর্থিক ও নিরাপত্তাব্যবস্থায় কী কী প্রভাব পড়েছে তা জানার চেষ্টা করা হবে। এ ছাড়া গত বৃহস্পতিবার ঢাকায় কর্মরত বিদেশি কূটনীতিকদের ব্রিফিংয়ে রোহিঙ্গাদের নিরাপদ প্রত্যাবাসনে দেশগুলোর সহযোগিতা চান পররাষ্ট্রমন্ত্রী।রোহিঙ্গা প্রত্যাবাসন কোন পর্যায়ে আছে জানতে চাইলে শরণার্থী, ত্রাণ ও প্রত্যাবাসন কমিশনার আবুল কালাম আমাদের সময়কে বলেন, প্রত্যাবাসন কবে থেকে শুরু হবে সে বিষয়ে কোনো কিছু আমি জানি না। আমরা প্রত্যাবাসনের জন্য আর যেসব কাজ হয়েছে সেগুলো চালিয়ে যাচ্ছি। রোহিঙ্গাদের কাউন্সেলিং করছি যাতে ফিরে যেতে তারা মানসিকভাবে প্রস্তুত হয়। ভারত থেকে রোহিঙ্গা আসছে যেটি একটি বাড়তি চাপ উল্লেখ করে তিনি বলেন, রাখাইনে এখন মিয়ানমার সেনাবাহিনীর সঙ্গে আরাকান আর্মির লড়াই চলছে। ফলে স্বাভাবিকভাবে সেখানে নিরাপদ পরিবেশ নেই। এ অবস্থায় কেউ এখন ফিরে যেতে চাইবে না। সামগ্রিকভাবে বিষয়গুলো নিয়ে আমরা উদ্বিগ্ন।রোহিঙ্গারা বাংলাদেশে দীর্ঘমেয়াদি অবস্থান করবে ধরে নিয়েই নোয়াখালীর ভাসানচরে আবাসনের ব্যবস্থা করা হয়েছে। বাংলাদেশ নৌবাহিনীর তত্ত্বাবধানে সম্পূর্ণ নিজস্ব অর্থায়নে দ্বীপটি এখন সম্পূর্ণ প্রস্তুত। সেখানে গড়ে তোলা হয়েছে জেটি, সাইক্লোন শেল্টার, ঘরসহ প্রয়োজনীয় স্থাপনা। নোয়াখালীর হাতিয়ার কাছাকাছি ভাসানচরে প্রায় ১০ হাজার একর জায়গায় রোহিঙ্গাদের জন্য আশ্রয়ণ নির্মাণ করা হয়েছে। প্রত্যাবাসন প্রক্রিয়া সম্পন্ন না হওয়া পর্যন্ত এক লাখ রোহিঙ্গাকে সেখানে রাখা হবে। কিন্তু জাতিসংঘসহ বিভিন্ন দেশ ও সংস্থা ভাসানচরে রোহিঙ্গাদের স্থানান্তরের বিরোধিতা করছে।জাতিসংঘের অভিবাসন ও শরণার্থীবিষয়ক সংস্থা, রিলিফ ওয়েব এবং সংশ্লিষ্ট দেশের তথ্যানুযায়ী, বিশ্বের বিভিন্ন দেশে বর্তমানে ২৮ লাখ ৯ হাজার রোহিঙ্গা অবস্থান করছে। অর্ধেকের মতো রোহিঙ্গা অর্থাৎ ৪৬ দশমিক ২৮ শতাংশের অবস্থান বাংলাদেশে। নিজ ভূমি মিয়ানমারে বর্তমানে অবস্থান করছে মাত্র চার লাখ। এ ছাড়া সৌদি আরবে ৫ লাখ, পাকিস্তানে সাড়ে তিন লাখ, মালয়েশিয়ায় দেড় লাখ, সংযুক্ত আরব আমিরাতে ৫০ হাজার ও ভারতে ৪০ হাজার রোহিঙ্গা রয়েছে। এর বাইরে যুক্তরাষ্ট্রে অবস্থান করছে ১২ হাজার, থাইল্যান্ডে পাঁচ হাজার, ইন্দোনেশিয়ায় এক হাজার, জাপানে ৩০০, নেপালে ২০০, কানাডায় ২০০, আয়ারল্যান্ডে ১০৪ ও শ্রীলংকায় ৩৬ রোহিঙ্গা রয়েছে।মূলত ২০১৭ সালের ২৫ আগস্ট থেকে মিয়ানমারের রাখাইন রাজ্য থেকে সেনাবাহিনীর নির্মম নির্যাতন থেকে বাঁচতে বাংলাদেশে পালিয়ে আসেন লাখ লাখ রোহিঙ্গা।