সংবাদ শিরোনাম

মিয়ানমারের ওপর আন্তর্জাতিক চাপ বাড়ছে রোহিঙ্গাদের ফেরাতে কূটনৈতিক তৎপরতা অব্যাহত

বাংলাদেশে পালিয়ে আসা রোহিঙ্গাদের ফিরিয়ে নিতে এবং রোহিঙ্গা সংকটের সমাধানে মিয়ানমারের ওপর আন্তর্জাতিক চাপ বাড়ছে। জাতিসংঘ ও কমনওয়েলথসহ বিভিন্ন আন্তর্জাতিক সংস্থা এবং প্রভাবশালী দেশগুলো মিয়ানমারের ওপর চাপ অব্যাহত রেখেছে। এসব চাপ ও দুই দেশের মধ্যে অনুষ্ঠিত দ্বিপক্ষীয় চুক্তি সত্ত্বেও রোহিঙ্গাদের ফিরিয়ে নিতে গড়িমসি করায় মিয়ানমারের ওপর আন্তর্জাতিক চাপে কৌশলও বদল হচ্ছে। আন্তর্জাতিক সংস্থা ও রাষ্ট্রগুলো ধীরে ধীরে মিয়ানমারকে নানা সুযোগ-সুবিধার বাইরে রাখার উদ্যোগ নিচ্ছে। এমনকি নির্বিচারে রোহিঙ্গা হত্যা ও নির্যাতনের অভিযোগে দেশটিকে ইতোমধ্যেই আন্তর্জাতিকভাবে কালো তালিকাভুক্ত করা হয়েছে। রোহিঙ্গা গণহত্যার অভিযোগ তুলে আন্তর্জাতিক আদালতে বিচারের দাবিও জোরালো হচ্ছে।

সর্বশেষ শেষ হওয়া কমনওয়েলথ সম্মেলনে রোহিঙ্গা সংকটে বাংলাদেশের সরকার ও জনগণের প্রতি সংহতি প্রকাশ করে কমনওয়েলথ। একই সঙ্গে ৫৩ জাতির সংস্থাটির সরকারপ্রধানরা সহিংসতা ও মানবাধিকার লঙ্ঘন বন্ধ ও যারা এসব নিষ্ঠুরতার জন্য দায়ী, স্বাধীন তদন্তের মাধ্যমে তাদের জবাবদিহি নিশ্চিত করার আহ্বান জানিয়েছেন। রোহিঙ্গাদের ফিরিয়ে নিতে মিয়ানমারের ওপর আন্তর্জাতিক চাপকে ইতিবাচক হিসেবে দেখছেন দেশের আন্তর্জাতিক সম্পর্ক বিশ্লেষক ও রোহিঙ্গা গবেষকরা। তাদের মতে, আন্তর্জাতিক চাপ ব্যতিরেকে সংকট সমাধানে মিয়ানমারকে বাধ্য করা যাবে না। তাদের মতে, প্রাণভয়ে বাংলাদেশে পালিয়ে আসা রোহিঙ্গাদের দ্রুত প্রত্যাবাসনে গড়িমসি শুরু করেছে মিয়ানমার। নানা অজুহাত, শর্ত আর কৌশলে প্রত্যাবাসন প্রক্রিয়াকে বিলম্বিত করতে চায় দেশটির সরকার। এ সময়ের মধ্যে নামমাত্র মুখে রোহিঙ্গাদের ফিরিয়ে নেওয়ার কথা বলে আন্তর্জাতিক চাপ সামাল দিতে চায় দেশটি। ফলে সংকট সমাধানে আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়ের চাপ বাড়াতে বাংলাদেশ সরকারের কূটনৈতিক তৎপরতা অব্যাহত রাখতে হবে।

পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় সূত্রমতে, রোহিঙ্গাদের ফিরিয়ে নিতে মিয়ানমারের ওপর আন্তর্জাতিক চাপ বাড়াতে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা নানা তৎপরতা অব্যাহত রেখেছেন। আনুষ্ঠানিক কূটনৈতিক তৎপরতার পাশাপাশি তিনি নিজেও বিভিন্ন সংস্থা ও রাষ্ট্রপ্রধানের সঙ্গে টেলিফোনে কথা বলছেন। গত সপ্তাহে তিনি মিয়ানমারকে চাপ দিতে জাতিসংঘ মহাসচিবকে ফোন করেন। এ ছাড়া বিভিন্ন আন্তর্জাতিক সম্মেলনে অংশ নিয়ে ও সফরকালীন সময় দ্বিপক্ষীয় আলোচনায়ও তিনি চাপ বাড়াতে আহ্বান জানাচ্ছেন। ইতোমধ্যে প্রধানমন্ত্রীর আহ্বানে সাড়া দিয়ে মিয়ানমারের ওপর নতুন করে চাপ বাড়াচ্ছে এসব রাষ্ট্র ও সংস্থা। এ ছাড়া আন্তর্জাতিক আদালতে মিয়ানমারের বিরুদ্ধে মামলা করা যায় কি না, তাও খতিয়ে দেখা হচ্ছে বলেও জানা গেছে। তবে বাংলাদেশ চাইছে, দ্বিপক্ষীয় সম্পর্ক অক্ষুণ্ন রেখে কূটনৈতিকভাবেই সংকটের সমাধান করতে। এজন্য ভারত, যুক্তরাষ্ট্র, চীনসহ প্রভাবশালী রাষ্ট্রগুলোকে পাশে চাইছে ঢাকা। সূত্রগুলো আরো বলছে, প্রধানমন্ত্রীর উদ্যোগের ফলে নতুন করে সাড়া মিলছে। আবারও বাংলাদেশের পক্ষে একাট্টা হচ্ছে বিভিন্ন রাষ্ট্র ও সংস্থা।

এ ব্যাপারে পররাষ্ট্রমন্ত্রী এ এইচ মাহমুদ আলী বলেন, আন্তর্জাতিক সম্প্রদায় মিয়ানমারকে আরও চাপ না দিলে তারা রোহিঙ্গা সংকট সমাধানে উদ্যোগী হবে না। সেজন্য সরকার চাপ বাড়াতে কূটনৈতিক তৎপরতা অব্যাহত রেখেছে। এর ফলে দেশটির ওপর আন্তর্জাতিক চাপ বাড়ছে। এই চাপ অব্যাহত থাকা প্রয়োজন। দেশটির সেনাবাহিনীর ওপর নিষেধাজ্ঞা আসতে পারে বলেও জানান মাহমুদ আলী। তিনি বলেন, মিয়ানমারকেই রাখাইনে নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে হবে। ফিরিয়ে নিতে হবে সব রোহিঙ্গা।

এ ব্যাপারে পররাষ্ট্র সচিব শহীদুল হক বলেন, রোহিঙ্গাদের নিজ দেশে ফেরত পাঠাতে সম্প্রতি জেনেভায় একটি চুক্তি স্বাক্ষরিত হয়েছে। একই সঙ্গে মিয়ানমার সরকার যাতে তাদের নাগরিকদের দ্রুত ফেরত নেয়, সেজন্য সরকার আন্তর্জাতিক চাপ অব্যাহত রেখেছে। যে পরিস্থিতিতে রোহিঙ্গারা এ দেশে পালিয়ে এসেছে, তখন তাদের এখানে আশ্রয় না দিলে বড় ধরনের মানবিক সংকট তৈরি হতো। প্রধানমন্ত্রী অত্যন্ত মানবিকভাবে এসব নিপীড়িত মানুষের পাশে দাঁড়িয়েছেন। এজন্য বিশ্ব সম্প্রদায়ের কাছে তিনি ভূয়সী প্রশংসিত হয়েছেন।

পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় ও কূটনৈতিক সূত্রগুলো থেকে মিয়ানমারের ওপর আন্তর্জাতিক চাপ বৃদ্ধির তথ্য পাওয়া গেছে। খোঁজ নিয়ে জানা গেছে, রোহিঙ্গারা যেন স্বেচ্ছায় ও সম্মানের সঙ্গে দেশে ফিরতে পারে আগে সেই পরিবেশ নিশ্চিতে বেশ কিছুদিন ধরেই জাতিসংঘ, অ্যামনেস্টি ইন্টারন্যাশনাল, এইচআরডব্লিউসহ বেশ কিছু সাহায্য সংস্থা মিয়ানমারকে আহ্বান জানাচ্ছে। প্রত্যাবাসন সুষ্ঠু করতে বাংলাদেশ এরই মধ্যে জাতিসংঘ শরণার্থী সংস্থা ইউএনএইচসিআরকে এ প্রক্রিয়ায় যুক্ত করেছে। এমনকি প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা গত সপ্তাহে মিয়ানমারকে রোহিঙ্গাদের ফেরত নিতে চাপ দেওয়ার জন্য জাতিসংঘের মহাসচিবকে ফোন করেন।

এমন প্রেক্ষাপটে গত সপ্তাহে মিয়ানমারের সেনাবাহিনীকে কালো তালিকাভুক্ত করেছে জাতিসংঘ নিরাপত্তা পরিষদ। প্রথমবারের মতো মিয়ানমারের সেনাবাহিনী জাতিসংঘের এই তালিকাভুক্ত হলো। জাতিসংঘের মহাসচিব অ্যান্তোনিও গুতেরেসের প্রস্তুত করা এ-সংক্রান্ত এক প্রতিবেদন গত সোমবার জাতিসংঘ নিরাপত্তা পরিষদের বৈঠকে উত্থাপন করা হয়। ওই প্রতিবেদনে বলা হয়, বাংলাদেশে আন্তর্জাতিক মেডিকেল স্টাফ ও অন্যরা মিয়ানমার থেকে পালিয়ে আসা প্রায় সাত লাখ রোহিঙ্গা মুসলিম যে নৃশংস নির্যাতনের শারীরিক ও মানসিক ক্ষত নিয়ে পালিয়ে আসতে বাধ্য হয়েছে তার প্রমাণ পেয়েছে। মিয়ানমারের সেনাবাহিনী ২০১৬ সালের অক্টোবরে এবং ২০১৭ সালের আগস্ট থেকে স্থানীয় কথিত উগ্রপন্থিদের বিরুদ্ধে জাতিগত নিধন চালানোর সময় এই নৃশংসতা চালিয়েছে। রোহিঙ্গাদের তাদের দেশ ছাড়া হতে বাধ্য করতে এবং দেশে ফেরত যাওয়া বন্ধ করতে মিয়ানমারের সেনাবাহিনী ব্যাপক হুমকি ও যৌন সহিংসতার আশ্রয় নিয়েছে। তারা সমন্বিতভাবে এ সহিংসতার আশ্রয় নিয়েছে। অমানবিকভাবে নির্যাতন করেছে।

কূটনৈকিত সূত্রগুলো জানায়, গত শুক্রবার সদস্য দেশগুলোর সর্বসম্মত সিদ্ধান্তে কমনওয়েলথের যৌথ ইশতেহারে রোহিঙ্গাদের ওপর গণহারে মানবাধিকার লঙ্ঘনকারী অপরাধীদের স্বাধীন তদন্ত প্রক্রিয়ায় জবাবদিহিতার আওতায় আনার দাবি জানায় কমনওয়েলথ। কমনওয়েলথ রাষ্ট্র ও সরকারপ্রধানরা রোহিঙ্গা সংকটের মূল কারণ খুঁজে বের করা এবং শিগগিরই রাখাইন অ্যাডভাইজরি কমিশনের (কফি আনান কমিশন) সুপারিশ বাস্তবায়নের তাগিদ দেন। ওই সম্মেলনে উদ্বাস্তু রোহিঙ্গাদের নিজ দেশে প্রত্যাবর্তনে বাংলাদেশ সরকারের সঙ্গে মিয়ানমারের চুক্তির কথা উল্লেখ করে কমনওয়েলথ রাষ্ট্র ও সরকারপ্রধানরা রোহিঙ্গাদের টেকসই প্রত্যাবর্তন শুরুর কথা বলেন। রোহিঙ্গাদের মিয়ানমার সমাজে সমান সদস্য হিসেবে প্রতিষ্ঠিত করার কথাও বলেন তারা।

পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় সূত্রমতে, কমনওয়েলথ সম্মেলনে অংশ নেওয়া প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা ভারতের প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদির সঙ্গে বৈঠক করেছেন। এই বৈঠকে রোহিঙ্গা ইস্যুসহ দুই দেশের স্বার্থসংশ্লিষ্ট বিভিন্ন বিষয়ে আলোচনা হয়। বৈঠক শেষে পররাষ্ট্র সচিব শহীদুল হক সাংবাদিকদের জানান, রোহিঙ্গা ইস্যুতে ভারত তাদের অবস্থান থেকে সরে এসেছে। মানে পরিবর্তন করেছে। তারা এখন এ বিষয়ে বাংলাদেশের অনেক কাছে এসেছে। রোহিঙ্গা পুনর্বাসনের জন্য সহযোগিতা করছে। তিনি বলেন, ‘ভারত তার অবস্থান পরিবর্তন করায় রোহিঙ্গা ইস্যুতে আমাদের অবস্থান আরো শক্তিশালী হয়েছে।’

এমনকি লন্ডন সফরকালীন এক সংবাদ সম্মেলনে রোহিঙ্গাদের ফিরিয়ে নিতে মিয়ানমারের ওপর আরো আন্তর্জাতিক চাপ বাড়ানোর আহ্বান জানান প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা। সেখানে তিনি বলেন, মিয়ানমার যাতে তার নিজেদের লোকজনকে ফিরিয়ে নেয় এবং তাদের নিরাপত্তা নিশ্চিত করে এজন্য তাদের ওপর আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়ের আরো চাপ সৃষ্টি করা উচিত। তিনি বলেন, মিয়ানমার বলছে, তারা রোহিঙ্গাদের ফিরিয়ে নিতে প্রস্তুত। কিন্তু এ ক্ষেত্রে তারা কোনো পদক্ষেপ নিচ্ছে না।

মিয়ানমারের ওপর আন্তর্জাতিক চাপ বাড়াতে সরকারের নেওয়া উদ্যোগকে ইতিবাচক হিসেবে দেখছেন দেশের আন্তর্জাতিক সম্পর্ক বিশ্লেষকরা। এ ব্যাপারে আন্তর্জাতিক সম্পর্ক বিশ্লেষক ড. আমেনা মহসিন বলেন, ‘চুক্তি করা থেকে শুরু করে মিয়ানমার যেসব শর্ত দিয়েছে, তা পূরণ করা কঠিন। তাদের উদ্দেশ্যই হলো, রোহিঙ্গা জাতিকে রাখাইন থেকে নির্মূল বা বিতাড়িত করা। তাই তাদের ফেরত নিতে চাইবে না, নানা ধরনের টালবাহানা করবে। এ অবস্থায় আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়কে মিয়ানমারের ওপর চাপ প্রয়োগ করতে হবে, যাতে তারা সক্রিয় হয় এবং নাগরিক অধিকার দিয়ে রোহিঙ্গাদের ফেরত নেয়।’

Editor in Chief : Sayed Shakil
Office: Evan plaza, sador model thana road, cox’sbazar-4700. Email: dailycoxsbazar@gmail.com / phone: 01819099070
অনুমতি ছাড়া অথবা তথ্যসূত্র উল্লেখ না করে এই ওয়েব সাইট-এর কোন অংশ, লেখা বা ছবি নকল করা বা অন্য কোথাও প্রকাশ করা বেআইনী