সংবাদ শিরোনাম

জিডিপিভিত্তিক উন্নয়নে পরিবেশ সুরক্ষার বিষয়টি উপেক্ষিত থাকছে

ড. মো. খালেকুজ্জামান :

খ্যাতনামা ভূতত্ত্ববিদ ও পরিবেশ গবেষক। বর্তমানে যুক্তরাষ্ট্রের লক হ্যাভেন বিশ্ববিদ্যালয়ে ভূতত্ত্ব বিভাগের অধ্যাপক হিসেবে দায়িত্ব পালন করছেন। পাঠদানের বিষয় মূলত হাইড্রোজিওলজি, কোস্টাল এনভায়রনমেন্টাল ওশেনোগ্রাফি ও জিআইএস। ১৯৫৭ সালে কিশোরগঞ্জে জন্মগ্রহণ করেন তিনি। মাধ্যমিক ও উচ্চ মাধ্যমিক শিক্ষা শেষে পড়তে যান সাবেক সোভিয়েত ইউনিয়নের আজারবাইজানে। সেখানে মাস্টার্স সম্পন্ন করে দেশে ফিরে ভূতাত্ত্বিক জরিপ দপ্তরে কাজ করেন ১৯৮২-৮৭ সাল পর্যন্ত। এরপর যুক্তরাষ্ট্রের ইউনিভার্সিটি অব ডেলাওয়ার থেকে উপকূলীয় ভূতত্ত্ব বিষয়ে ১৯৮৯ সালে স্নাতকোত্তর ও ১৯৯৮ সালে পিএইচডি ডিগ্রি অর্জন করেন। বাংলাদেশের জলবায়ু পরিবর্তন, নদী, নিরাপদ কৃষি, পরিবেশ সুরক্ষাসহ নানা বিষয়ে তার সঙ্গে কথা হয় বণিক বার্তার। সাক্ষাৎকার নিয়েছেন এম এম মুসা

প্রতি বছরই দেশে গরম  ঠাণ্ডার প্রকোপ বাড়ছে। অনেকেই বলছেনজলবায়ু পরিবর্তনের প্রভাবেএমনটি হচ্ছে। বিষয়টিকে কীভাবে দেখেন?

আসলে দিন দিন জলবায়ু পরিবর্তন অনেকটাই দৃশ্যমান হচ্ছে। শুধু বাংলাদেশে নয়, বিশ্বের অন্য দেশেও। আমার কর্মস্থল যুক্তরাষ্ট্রেও ইদানীং বিষয়টি বুঝতে শুরু করেছে মানুষ। এখন পরিবর্তনটা অনেক বেশি দৃষ্টিগ্রাহ্য। যেমন— শীতে সেখানে ব্যাপক তুষারপাত হচ্ছে, যা আগে খুব বেশি মাত্রায় হয়নি। সুনির্দিষ্ট মৌসুম বাদেও গরম থাকে। বাংলাদেশেও খেয়াল করলাম, ওয়েদার এক্সট্রিমিটি বেড়ে গেছে। অর্থাৎ গ্রীষ্মকালে গরম ও শীতকালে শীত বেশি থাকছে। এসব বিষয় জলবায়ু পরিবর্তনের বিভিন্ন মডেলে আগেই প্রাক্কলন করা হয়েছে। বলা হয়েছে, এমন হবে। এখন প্রভাবগুলো ধীরে ধীরে দৃশ্যমান হয়ে উঠছে বাংলাদেশে।

আবার দেখুন, বর্তমানে বাংলাদেশে প্রচুর বৃষ্টিপাত হচ্ছে। এবার শীতকালেও বৃষ্টি হলো। এটি জলবায়ু পরিবর্তনের আরেকটি উদাহরণ। পশ্চিমা বিশ্বে বৃষ্টি বৃষ্টিপাত হিসেবে হয় না, তুষারপাত হিসেবে হয়। সেখানে ব্যাপক তুষারঝড় হয়েছে এ মৌসুমে। এ বিষয়গুলো খুবই দৃশ্যমান। আরেকটি বিষয়, ব্যক্তিগত অভিজ্ঞতা থেকে এবার দেখলাম, প্রচুর বৃষ্টিপাতের কারণে আমাদের হাওড় অঞ্চলে বোরো ধান রোপণ ব্যাহত হয়েছে। ২০১৭ সালে যে আগাম বন্যা (ফ্লাশফ্লাড) হয়ে গেল, সেটিও আসলে জলবায়ু পরিবর্তনেরই একটি প্রকাশ।

হাওড়ের বন্যা নিয়ে বেশকিছু বিশ্লেষণ এ বছর করেছি। এক্ষেত্রে আমি গত ১০০ বছরের বৃষ্টিপাতের উপাত্ত আমলে নিয়েছি; মূলত ভারতের মেঘালয়, বাংলাদেশের সুনামগঞ্জ, নেত্রকোনা ও কিশোরগঞ্জ এসব এলাকার বৃষ্টিপাত। কারণ এসব এলাকায় বেশি বন্যা হয়েছে। এক্ষেত্রে একটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয় আমার বিশ্লেষণে উঠে এসেছে, বৃষ্টিপাতের ধরন পরিবর্তন হয়ে যাচ্ছে। আমি দুই ভাগে বিষয়টি দেখেছি: এক. ১৯০১-১৯৫০ অর্থাৎ গত শতকের প্রথমার্ধ এবং দুই. ১৯৫১-২০০০ সাল পর্যন্ত। এ দুই সময় পর্বে বৃষ্টিপাতের উপাত্তগুলো আলাদাভাবে বিশ্লেষণ করে দেখলাম, শেষের অর্ধেকে বৃষ্টিপাতের ধরনটা পুরোপুরি পরিবর্তন হয়ে যাচ্ছে। কীভাবে বদলে যাচ্ছে, সেটিও বলি। গত শতকের প্রথমার্ধে এপ্রিলের তুলনায় মে মাসে বৃষ্টি বেশি হতো। এটা ৫০ বছর ধরেই। হাওড়াঞ্চল ও মেঘালয় অঞ্চলে মোট বৃষ্টিপাতের পরিমাণ এপ্রিলের তুলনায় মে মাসে বেশি ছিল। পরের শেষার্ধে দেখা যাচ্ছে, দুটি মাসে বৃষ্টিপাতের যে ব্যবধান ছিল, তা ধীরে ধীরে কমে আসছে এবং এপ্রিলের বৃষ্টিপাত বেড়ে যাচ্ছে; মে মাসের বৃষ্টিপাত কমে যাচ্ছে। মে মাসের বৃষ্টিপাত কমে এপ্রিলের বৃষ্টিপাত বেড়ে যাওয়া আমাদের জন্য জলবায়ু পরিবর্তনের পুরোপুরি লক্ষণ। শুধু এটি নয়, এ পরিপ্রেক্ষিতে আগাম বন্যা বা ফ্লাশফ্লাড বেড়ে যাবে এবং এপ্রিলে বন্যা বেড়ে যাওয়া আমাদের জন্য ব্যাপকভাবে দুর্যোগের কারণ। কেননা পুরো হাওড়ের ধান কাটা হয় এপ্রিলের মাঝামাঝিতে। নিশ্চয়ই মনে আছে, গত বছর বৃষ্টি হয়েছে ২৮ মার্চ থেকে ৪ এপ্রিল পর্যন্ত। ধান কাটার কথা ছিল ১৫-১৬ এপ্রিল বা নববর্ষের দিকে। মাত্র ১০-১২ দিনের ব্যবধান ব্যাপক ক্ষতি করল কৃষকের তথা দেশের। হাওড়ের প্রায় ৮০ শতাংশ ফসল নষ্ট হয়ে গেল শুধু বৃষ্টিপাত ১০-১২ দিন আগে হওয়ার কারণে।

গেল বছর একটি বড় দুর্যোগ হয়ে গেল বটে, কিন্তু আমার বিশ্লেষণ থেকে এটি স্পষ্ট যে, এ প্রবণতা  বাড়তে থাকবে। মানে এপ্রিলে বৃষ্টিপাতের পরিমাণ বাড়ছে, মে মাসে কমছে। এটি আমাদের জন্য খুব দুর্যোগপূর্ণ। এবার বাংলাদেশের অনেক জায়গায় বেড়াতে গেলাম। প্রতিটি এলাকায় একটি বিষয় দৃশ্যমান, জমিগুলোয় শীতকালে যে পরিমাণ পানি থাকার কথা, তার চেয়ে অনেক বেশি পানি আছে। সবকিছু যেন জলাবদ্ধ। কৃষিজমিগুলো স্থায়ীভাবে পানিবন্দি হয়ে আছে। ফলে জমিতে ধান রোপণ ব্যাহত হচ্ছে বা পিছিয়ে যাচ্ছে। কারণ পানি না সরলে ধান লাগানো যায় না। ফলে বোরো ধান আবাদ করা যাচ্ছে না।

সাধারণত বোরো ধানের বীজ কিছুটা উঁচু জমিতে বপন করা হয়। ১৫-২০ দিন পর সেখান থেকে তুলে নিয়ে বোরোর চারা রোপণ করা হয়। এবার আমাদের এলাকায় (হাওড়াঞ্চল) বিশেষ করে দেখলাম বীজ বপন করা হচ্ছে স্যাঁতসেঁতে জায়গায়, সেখানেও পানি রয়েছে। এটি হচ্ছে অতিবৃষ্টি ও পানি না সরার প্রবণতার কারণে। মোটাদাগে দুটি বিষয় স্পষ্ট: এক. বৃষ্টিপাতের ধরন পুরোপুরি বদলে গেছে এবং দুই. বোরো ধানের প্রস্তুতিতেও ব্যত্যয় ঘটছে।

জলবায়ু পরিবর্তনের বিরূপ প্রভাব মোকাবেলায় সরকারের প্রস্তুতি কেমন?

সরকারের প্রস্তুতি যদি বলি, সেটি অনেক বড় ইস্যু। সরকার দাবি করে, অনেক চেষ্টা করে যাচ্ছে। অভিযোজনের ক্ষেত্রে কিছু কাজ বাংলাদেশে হচ্ছে। যেমন— বন্যাসহনশীল ধান কিংবা লবণাক্ততাসহিষ্ণু ধান। আমি নিজে কৃষিবিদ নই। কিন্তু কৃষিক্ষেত্রে আমাদের গবেষক-বিজ্ঞানীরা যথেষ্ট ভালো করছেন। তবে বিপুল পরিসরে ভালোভাবে প্রস্তুতি আছে, এমনটা মনে হয় না। কারণ আমাদের দেশের মডেলটা উন্নয়নের মডেল। সবাই বলছে, উন্নয়ন হচ্ছে। রাস্তাঘাট, বৃহৎ অবকাঠামো হচ্ছে। এতে তারা জোর দিচ্ছে। একই সঙ্গে ২০১৫-৩০ সালের জন্য স্থায়িত্বশীল উন্নয়ন লক্ষ্যের (এসডিজি) কথা বলা হচ্ছে। সেটিই হওয়া উচিত উন্নয়নের চাবিকাঠি। বাংলাদেশ এসডিজিতে স্বাক্ষরকারী (সিগনেটরি) দেশ। সরকার দাবি করে যে, এমডিজিতে যেহেতু আমরা ভালো করেছি, সেহেতু এসডিজিতেও ভালো করব। এসডিজি কিন্তু খুবই ভারসাম্যপূর্ণ উন্নয়ন দৃষ্টিভঙ্গি। এটি শুধু উন্নয়ন নয়, এতে পরিবেশ রক্ষা হবে এবং সামাজিক অন্তর্ভুক্তিও বাড়ানো হবে। অর্থাৎ আমাদের উন্নয়নের সুফল বৃহত্তর জনগোষ্ঠীও ভোগ করবে। তিনটি বিষয়ের সমন্বয়কে এসডিজি বলে।

বাংলাদেশে এখন জিডিপিভিত্তিক উন্নয়নে বেশি জোর দেয়া হচ্ছে। কিন্তু জলবায়ু পরিবর্তন মোকাবেলা ও পরিবেশ সুরক্ষার দিকে যেভাবে নজর দেয়া দরকার, সেটি হচ্ছে বলে মনে হয় না। এর কতগুলো সুনির্দিষ্ট কারণ বলি। এসডিজির সময়সীমার মধ্যে এক বছর পার হওয়ার পর ১৫৭টি দেশের এ লক্ষ্য বাস্তবায়নে কার অগ্রগতি কতটুকু, তার একটি মূল্যায়ন হয়েছে। সেখানে বাংলাদেশেরও মূল্যায়ন হয়েছে। ওই মূল্যায়নে দেখা যাচ্ছে, ১৫৭টি দেশের মধ্যে বাংলাদেশের অবস্থান ১৪২তম। তাতে বোঝা যায়, আমরা অনেকটাই পিছিয়ে আছি।

দুঃখজনক বিষয় হলো, এসডিজির সঙ্গে সংশ্লিষ্ট সরকারের ব্যক্তিরা নিউইয়র্কে জাতিসংঘের কার্যালয়ে হাইপ্রোফাইল পলিটিক্যাল ফোরামের বৈঠকে এসডিজির অগ্রগতি রিপোর্ট দেয়ার জন্য মিলিত হন। এসডিজির সমন্বয়ক হলেন ড. আবুল কালাম আজাদ। তিনিসহ আরো কয়েকজন গিয়েছিলেন নিউইয়র্কে। সেখানে তারা প্রবাসী বাংলাদেশী সাংবাদিকদের নিয়ে একটি সংবাদ সম্মেলনও করেন। সেখানে ড. আবুল কালাম আজাদ স্পষ্টভাবে বলেন, আমরা সহস্রাব্দ উন্নয়ন লক্ষ্যমাত্রায় যেভাবে সাফল্য দেখিয়েছিলাম, একইভাবে স্থায়িত্বশীল উন্নয়ন লক্ষ্যমাত্রায়ও সাফল্য দেখাচ্ছি এবং আমরা যদি এ গতিতে চলতে পারি, ২০২৩ সালের মধ্যে লক্ষ্যমাত্রাগুলো অর্জন করব। এটা তার কথা। এটি রেকর্ডে আছে। খুঁজলেই পাওয়া যাবে। তিনিও এটি অস্বীকার করবেন বলে আমার মনে হয় না। কিন্তু সেই বাগাড়ম্বরতার পরই মূল্যায়ন প্রতিবেদনটি প্রকাশ হয়। সেই প্রতিবেদনে আমাদের অবস্থান ১৪২তম। কথার সঙ্গে কাজের সমন্বয় হচ্ছে না।

নিঃসন্দেহে আমাদের জিডিপি বাড়ছে কিন্তু ধনী-গরিবের ব্যবধানটা বেড়ে যাচ্ছে। সেটা তো সামাজিক অন্তর্ভুক্তির প্রতিফলন নয়। এসডিজির তিনটি উপাদান। এক. অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি, দুই. পরিবেশ সুরক্ষা এবং তিন. সামাজিক অন্তর্ভুক্তি। আমরা সামাজিক অন্তর্ভুক্তিতে পিছিয়ে যাচ্ছি। আর পরিবেশের বিষয়টি আমার কাছে মনে হয় ধ্বংসাত্মক পর্যায়ে রয়েছে। নদীগুলো দূষিত হচ্ছে, মরে যাচ্ছে, বনভূমি ধ্বংস হচ্ছে এবং বায়ুর মানের ভয়াবহ অবনমন ঘটছে। এটা ঢাকায় আরো ভয়াবহ। আমরা এটি অনুভব করতে পারি।

দেশের অনেক জায়গায় ভ্রমণ করেছি। যেখানে নদী পেয়েছি, সেখানে একটি ছবি তোলার চেষ্টা করেছি। কেবল বোঝার জন্য যে, নদীগুলো কী অবস্থায় রয়েছে। মোটাদাগে আমার মনে হয়েছে, বাংলাদেশে একটি নদী দেখিনি, যেটি নদীর মতো আছে। কোথাও না কোথাও দখল হয়েছে, কোথাও না কোথাও সরু হয়ে এসেছে। কোথাও না কোথাও বাঁধ দেয়া হয়েছে। খুব বড় নদী বাদ দিলে ছোটখাটো সব নদ-নদীর অবস্থা খারাপ।

আরেকটি দিক হলো, ভূ-উপরস্থ পানিদূষণের বড় দুটো ক্ষেত্র চামড়া ও তৈরি পোশাক শিল্প। এ দুটি শিল্প সেভাবে নিয়ন্ত্রণে নেই। এ দুটো শিল্প-কারখানায় ইটিপি থাকা দরকার। সেটি নেই। চামড়া শিল্প সাভারে স্থানান্তর হয়েছে। এখন বুড়িগঙ্গার বদলে ধলেশ্বরী ধ্বংস হয়ে যাবে। চামড়া ও পোশাক শিল্প বাদেও দূষণের অনেক উৎস আছে। দেখা যাচ্ছে, কঠিন বর্জ্য (সলিড ওয়েস্ট), গৃহস্থালি বর্জ্য, এমনকি চিকিৎসা বর্জ্য যেখানে-সেখানে ফেলা হয়। এছাড়া পয়োনিষ্কাশন খুবই দুর্বল প্রকৃতির। পরিবেশ আমার দৃষ্টিতে সোনার ডিম পাড়া হাঁসের মতো। এটিকে বাদ দিলে তো আর কিছুই থাকবে না। আপাতত জিডিপি প্রবৃদ্ধি বাড়বে, কিন্তু চূড়ান্তভাবে পরিবেশ বিপর্যয়ের কারণে জাতি নানামুখী সমস্যায় পড়বে।

সরকার বলছেঅন্য দেশের তুলনায় আমরা কার্বন নির্গমন কম করেছি। এক্ষেত্রে আমাদের কার্বন স্পেসের সুযোগ রয়েছে। আপনার কাছে বক্তব্য ঠিক মনে হয়?       

বক্তব্যটি মোটেই ঠিক নেই। বৈশ্বিক মাত্রায় হয়তো আমাদের কার্বন নির্গমন হার কম, এটি সত্য। আমরা যদি আরো কার্বন নির্গমন করি, সেটি বিশ্বের মোট কার্বন নির্গমন হারে হয়তো নেতিবাচক প্রভাব ফেলবে না; কিন্তু আমরা অভ্যন্তরীণভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হব। বলতে গেলে, বৈশ্বিক মাত্রায় আমরা হয়তো খুব বেশি যোগ করতে পারব না; কিন্তু অভ্যন্তরীণভাবে আমরা আমাদের ক্ষতি বাড়িয়ে তুলব। পরিবেশদূষণ কমানো এবং বৃহত্তর সামাজিক সুফল নিশ্চিতে আমরা অনেকটাই পিছিয়ে আছি।

বণিক বার্তার প্রতিবেদনে এসেছেদূষিত পানিতে চাষ করায় ফসলসহ পুরো খাদ্যচক্রে বিষ ঢুকে যাচ্ছে। এটা কি মানুষের স্বাস্থ্যে ক্ষতিকরপ্রভাব ফেলবে না?

অবশ্যই ফেলবে। তার চেয়ে যেটি আরো ভয়ঙ্কর মনে হয়, আমাদের সরকারি সংস্থার ঘাটতি নেই, অনেক সংস্থা আছে। এখানে পরিবেশ ও বন মন্ত্রণালয়, পরিবেশ অধিদপ্তর আছে, তাদের কাজটি কতটা কার্যকর, এটি আসলে আমার চোখে দৃশ্যমান নয়। মাটি ও পানিতে আর্সেনিকসহ বিভিন্ন ধরনের ধাতব পদার্থ কী মাত্রায় রয়েছে এবং আমাদের খাদ্যচক্রে কীভাবে পদার্থগুলো উঠে আসছে, এ নিয়ে জাতীয় পর্যায়ে একটি ব্যাপকতর গবেষণা দরকার। কিন্তু এমন কোনো গবেষণার উদ্যোগ আমি দেখি না। প্রতিরোধের কোনো ব্যবস্থা তো নেই-ই; এটি মূল্যায়নেরও প্রচেষ্টা চোখে পড়ে না।

উন্নয়নের নামে বিশ্বের অন্য দেশগুলো যেভাবে পরিবেশের ক্ষতি করেছেবাংলাদেশও একই ক্ষতি করছে। আপনার কী মনে হয়?

আমারও তা-ই মনে হয়। পরিবেশ সূচকে বাংলাদেশের অবস্থা আরো খারাপ। এসডিজির অগ্রগতির ক্ষেত্রে আমি আগেই বলেছি, ১৫৭টি দেশের মধ্যে ১৪২তম অবস্থানে আমরা ছিলাম। এর মধ্যে পরিবেশ একটি গুরুত্বপূর্ণ উপাদান (কম্পোনেন্ট)। শুধু পরিবেশ নিয়েও দুনিয়ায় মূল্যায়ন হয়। সেটিকে বলা হয়, এনভায়রনমেন্টাল পারফরম্যান্স ইনডেক্স (ইপিআই)। সেখানে ২০১৬ সালে ১৪৮টি দেশের মূল্যায়ন করা হলো, তাতে আমাদের অবস্থান ১১০তম। এর মধ্যে পানি ও বায়ুদূষণই সর্বোচ্চ। এগুলো প্রকৃত তথ্য যে, পরিবেশ ধ্বংসের বিনিময়ে আমাদের উন্নয়নটা হচ্ছে।

আমরা কি হিসাব করতে পারি নাকী পরিমাণ জিডিপিতে অবদান রাখছি আর কী পরিমাণ পরিবেশের ক্ষতি করছি। দুটো মিলে আসলে কিআমাদের জিডিপি বাড়ছে

আমার মনে হয়, এক্ষেত্রে পরিবেশবাদী অর্থনীতিবিদরা বড় ভূমিকা পালন করতে পারেন। এখনো এ রকম বড় গবেষণা দেখিনি যে, উন্নয়নের বিনিময়ে পরিবেশের ক্ষতি করলে প্রকৃত জিডিপি কী দাঁড়ায়। আজকাল পরিবেশের অনেক ধরনের মূল্যায়ন করা হচ্ছে। প্রাইস ট্যাগ ধরে দেয়া হয়। একটি নদীর মূল্য কত? যদিও শুনতে ভালো শোনায় না; কিন্তু পশ্চিমা বিশ্বে এ প্রবণতা খুব বেশি। কারণ অনেকেই বলছেন, টাকার অংকে ধরে না দেয়া গেলে সাধারণ মানুষ জিনিসটির মূল্য বুঝতে পারে না। তারা টাকার অংকটা আন্দাজে ধরে না, অনেক গবেষণা করে এ নিয়ে। বাংলাদেশে এরূপ গবেষণা হওয়া দরকার।

আমি তিস্তা নিয়ে একটি গবেষণা দেখেছি, একজন তরুণ অর্থনীতিবিদ বোধহয় করেছেন। তিনি দেখিয়েছেন, তিস্তার পানি না আসার কারণে আমাদের ফসলের যে ক্ষতি হচ্ছে, তার বার্ষিক মূল্য কত। আমি যদি ভুল না করি, তাহলে এর বার্ষিক ক্ষতি ৪ হাজার কোটি টাকা। পানি ঠিকভাবে এলে আমরা সেচকাজে ব্যবহার করতে পারতাম, ৪ হাজার কোটি টাকার বেশি পরিমাণ ধান হতে পারত। এ ধরনের গবেষণা অনেক বেশি হওয়া প্রয়োজন।

একইভাবে দরকার আমাদের চামড়া শিল্প যেভাবে নদীগুলোকে ধ্বংস করছে, তাতে আমাদের খাদ্যচক্রে যে ক্ষতি হচ্ছে এবং তার জন্য যে স্বাস্থ্যের ঝুঁকি বেড়ে যাচ্ছে, সেই আন্তঃসম্পর্কগুলো বের করা। এগুলো অর্থের অংকে নির্ধারণ করা জরুরি বলে মনে করি। হয়তো এটি পুঙ্খানুপুঙ্খ হবে না; কিন্তু একটি সূচনাবিন্দু (স্টার্টিং পয়েন্ট) হবে।

নদীর পানি বা সুপেয় পানি কোন কোন প্রক্রিয়ায় দূষিত হচ্ছে এবং কীভাবে সেটা বন্ধ করা সম্ভব?

প্রথমত. পানির মান নির্ধারণের অনেক মানদণ্ড আছে। ধরুন, নদীতে পিএইচের পরিমাণ কত, নদীতে অম্লত্বের (অ্যাসিডিটি) পরিমাণ কত কিংবা সুনির্দিষ্ট ধাতুর পরিমাণ কত। প্রতিটির আবার নির্ধারিত পরিমাপক রয়েছে। পানীয় জলে বিভিন্ন পদার্থের সর্বোচ্চ মান কত হতে পারে, তার নিচে থাকা জরুরি। আমার ধারণা, সব নদীনালা, খালবিল ও ভূগর্ভস্থ পানি নিয়ে একটি ব্যাপক বিশ্লেষণ প্রথমে দরকার। দূষণের মাত্রা কত, তা পরীক্ষা করা প্রয়োজন। তারপর নির্ধারণ করা যাবে দূষণের উৎসগুলো কী। দূষণের মূলত দুই ধরনের উৎস। এক. পয়েন্ট সোর্স এবং দুই. নন-পয়েন্ট সোর্স। পয়েন্ট সোর্স আমরা জানি। যেমন— চামড়া শিল্প। আমরা জানি, চামড়া কারখানা আছে। এর ডিসচার্জ পাইপে নিষ্কাশিত বর্জ্য বিশ্লেষণ করে জানতে পারি, এতে কী কী রয়েছে। এটা পয়েন্ট সোর্স। এ ধরনের উৎস অনেক আছে বাংলাদেশে। এগুলোর আগে ম্যাপ করা দরকার। প্রতিটি ম্যাপে থাকা যে, এ জায়গায় অমুক শিল্পগুলো আছে এবং সেখান থেকে সম্ভাব্য এজাতীয় দূষণ পদার্থগুলো বের হয়ে আসে। এটি হলো একটি দিক।

অজানা উৎসও অনেক রয়েছে। যেমন— কৃষিজমি। কৃষিতে আমরা অতিরিক্ত কীটনাশক ব্যবহার করি। কীটনাশকের একটি অংশ নদীগুলোয় চলে যায়। এটি নদীতে বা ফসলে পাওয়া যাচ্ছে। কিন্তু ঠিক কোন কৃষকের জমি থেকে কীটনাশক নদীতে এসে পড়ল, সেটি নির্ধারণ করা তো কঠিন। সব কৃষকই তো ব্যবহার করছেন। এজাতীয় উৎসগুলোকে নন-পয়েন্ট সোর্স (অনির্ধারিত উৎস) বলে। আমাদের দেশে জানা উৎসগুলো এখনো নির্ধারণ করা হয়নি যে, এতগুলো শিল্প আছে এবং প্রতিটি শিল্প থেকে এ পরিমাণ দূষণ নদীতে যাচ্ছে। এছাড়া অসংখ্য অজানা উৎস সক্রিয়। সেপটিক ট্যাংক থেকে অনেক ধরনের ক্ষতিকর ব্যাকটেরিয়া যোগ হচ্ছে পানিতে। পয়োনিষ্কাশনে অনেক ধরনের রোগবাহিত জীবাণু থাকে এবং কিছু অন্য অধাতব পদার্থ (যেমন— নাইট্রেট, ফসফরাস) থাকে। পানিদূষণে সারা দেশের ল্যাট্রিনগুলোর ভূমিকা কী, সেটি সেভাবে নির্ধারণ করা হয়নি। আরেকটি হলো, আজকাল দেশে অনেক মুরগির খামার আছে। সেগুলোয় প্রচুর বিষ্ঠা তৈরি হয়। তাতে প্রচুর নাইট্রেট, ফসফেট ও অনেক ধাতু (আর্সেনিক, ক্যাডমিয়াম) থাকে। আবার আমাদের দেশে প্রচুর ফিশারিজ আছে। পুকুরে মাছ চাষ করা হয়। মাছকে যে খাবার দেয়া হচ্ছে, তাতে ক্ষতিকর উপাদান থাকছে। আমি বলছি না যে, উন্নয়নের স্বার্থে আমাদের মাছের প্রয়োজন নেই। সবকিছুর প্রয়োজন তো অবশ্যই রয়েছে। কিন্তু এক্ষেত্রে ভারসাম্য থাকতে হবে। পরিবেশদূষণে মাছের খামারগুলোর কোনো ভূমিকা আছে কিনা, তা যাচাই করা দরকার। আমার মতে, এসব ব্যাপারে বিশ্ববিদ্যালয়গুলো বড় ভূমিকা পালন করতে পারে। কারণ প্রতিটি বিজ্ঞান অনুষদে বিভিন্ন ধরনের গবেষণা হতে পারে। কিন্তু সেটি হতে হলে বাংলাদেশে গবেষণার পরিবেশ তৈরি করতে হবে।

এটা খাদ্যশৃঙ্খলে কী ধরনের প্রভাব ফেলছে?

আমি তো সেভাবে গবেষণা করিনি। তবে অন্যান্য দেশের জ্ঞান থেকে জানা যায়, মাটিতে ধাতবদূষণ থাকলে তা খাদ্যশৃঙ্খলে উঠে আসবেই। সেটির পরিমাণও ঠিকভাবে যাচাই করা দরকার। বিশেষ করে ধাতব পদার্থ, যেমন— আর্সেনিক, সিসা, ক্যাডমিয়াম, লেড, ক্রোমিয়াম প্রভৃতি। এগুলোকে হেভি মেটাল বা ট্রেস মেটাল বলে। এগুলোর যে অভিঘাত, তা এরই মধ্যে ভালোভাবে জানা গেছে। কোথায় কীভাবে এগুলো আছে, সেটি জাতীয় পর্যায়ে গবেষণা করা দরকার। এর মাত্রা ও উৎস জানা গেলে পরবর্তীতে কাজ হবে সেগুলো কীভাবে কমিয়ে আনা যায়। (বাকি অংশ আগামীকাল)

Editor in Chief : Sayed Shakil
Office: Evan plaza, sador model thana road, cox’sbazar-4700. Email: dailycoxsbazar@gmail.com / phone: 01819099070
অনুমতি ছাড়া অথবা তথ্যসূত্র উল্লেখ না করে এই ওয়েব সাইট-এর কোন অংশ, লেখা বা ছবি নকল করা বা অন্য কোথাও প্রকাশ করা বেআইনী