সংবাদ শিরোনাম

রহস্যময়ী নাকি ধ্রব

মো. সাঈদ মাহাদী সেকেন্দার :

প্রভাতে সোনালী রোদ্দুর চোখে পড়তেই ঘুমের আবহ ভেঙ্গে উঠে পড়লাম ফ্রেশ হতে। দাঁত ব্রাশ করতে করতে ঘড়িতে তাকিয়ে দেখি সকাল ৮টা ৪৫ মিনিট। টিকটিক করে ঘড়ির কাটায় সময় যেমন বেড়ে চলেছে; তেমনি আমার মনের মাঝে অস্থির মৃদু কম্পন প্রকম্পিত আকার ধারণ করছে।

আজ থেকে বছর দুই আগে একটি উৎসবে আফরিনের সঙ্গে আমার পরিচয়। ঘটনাটি মনে পড়তেই শিহরিত হয়ে উঠি। সেদিন আফরিনের প্রজেক্ট প্রদর্শিত হবে বিজ্ঞান উৎসবে। আমি আসলে গিয়েছিলাম সেই উৎসবটিতে বন্ধু মমিনের প্রজেক্ট দেখতে।

মমিন খুব ভালো প্রজেক্ট তৈরি করে। তার প্রজেক্ট একদিন সমাজ বদলে দিবে বলে সে বিশ্বাস করে। এবার তার প্রদর্শিত প্রজেক্টে স্থান পেয়েছে পাহাড়ে সুপেয় পানি সংরক্ষণের বিষয়টি। পাহাড়ে বসবাসকারী মানুষগুলো প্রতিনিয়ত সুপেয় পানি সংগ্রহে সংগ্রাম করে চলেছে। বিষয়টি তাকে খুব ব্যথিত করে। তাই এবার সে তার গবেষণায় বিষয়টি গুরুত্ব দিয়েছে। ছোটবেলা থেকেই ও এমন ক্ষ্যাপাটে। কথায় নয় কাজে বিশ্বাসী।

আমি মানবিক বিভাগের ছাত্র ছিলাম। এখন পড়ি দর্শন নিয়ে। বিজ্ঞানের আবিষ্কার বোঝার সাধ্য আমার আছে বুঝি! তবে বন্ধু আমাকে দারুণ বোঝায়। নিজের মধ্যে আমার তখন কৌতূহল জাগে ভীষণ রকম।

ও ভুলেই গেছি- আফরিন, মেয়েটি দেখতে শ্যামলা তবে মায়াবী অনেক। লাজুক চাহনী তার। অদ্ভুত সুন্দর বললে খুব বেশি অপরাধ হবে না। আমার বিশ্বাস, প্রথম দেখাতেই ভালো লাগতে যে কেউ বাধ্য। আর আমার মতো সিঙ্গেল হলে প্রেমে পড়বেই। আরে শুধু পড়া কী? সুযোগ হলে একটু হাবুডুবু খেয়ে নিবে। একদম তা-ই। গোলাপী নাকি ম্যাজেন্ডা ড্রেসের রং বোঝা মুশকিল। কিন্তু তাকে মানিয়েছে দারুণ।

বন্ধু মমিনের পাশের স্টলটি তার। সুতরাং তাকে নয়নে নয়নে রাখতে খুব বেশি সমস্যা হচ্ছে না আমার। কিন্তু মেয়েটিকে বেশ বিচলিত লাগছে। হুম, একদম তাই। মমিনকে ডেকে বললো, ‘দেখেন ভাইয়া, আমার বান্ধবীর প্রজেক্ট প্রেজেন্টেশন দেওয়ার কথা। কিন্তু ফোন ধরছে না। আমি নিজে এ ব্যাপারে পটু না। কী করি বলেন তো!’ মমিন প্রত্যুত্তরে সহজেই বললো, ‘অন্য কাউকে ম্যানেজ করে নিন।’ কিন্তু বেচারী এখানে সুবক্তা, ভালো বোঝাতে পারে- এমন কাউকে কোথায় খুঁজে পাবে! অনেকটা অভাগা যেখানে যায়, সাগর শুকিয়ে যায় অবস্থা।

আমি তার প্রজেক্ট দেখলাম। এটি এমন একটি আবিষ্কার, যা কিনা মাদক নির্মূলে খুবই উপযোগী। তার আবিষ্কৃত সফটওয়্যারটিতে মাদক কোনো ব্যক্তির কাছে থাকলে বা সেবন করলে অপর একটি সফটওয়্যারে তথ্য দিবে এবং উভয় মাধ্যমে ব্যবহার হবে মোবাইল ফোন। অর্থাৎ আমার মোবাইলে সফটওয়্যারটি থাকলে এই সফটওয়্যার লিংক কানেকশনযুক্ত অপর সফটওয়্যারটি আমার বাবার কাছে থাকলে দু’জনের যে কোনো একজন মাদক বহন বা সেবন করলে অপর সফটওয়ারে অ্যালার্ম বা সংকেত বাজতে থাকবে। যার ফলে শনাক্ত হয়ে যাবে মাদক সেবন বা বহনকারী। সব সফটওয়্যারের কেন্দ্রে নজরদারীর জন্য থাকবে একটি প্রধান সফটওয়্যার।

আমার দারুণ লাগলো প্রজেক্টটি। যা সমসাময়িক প্রেক্ষাপটে এক উপযোগী আবিষ্কার। আজ তরুণ সমাজ মাদকে আসক্ত হয়ে ধ্বংসের দ্বারপ্রান্তে। দেশে মাদকের বাজারও মন্দ নয়। সুতরাং এ মুহূর্তে অভিভাবকদের নিজ সন্তান নিয়ন্ত্রণে, রাষ্ট্রের ও মাদক নিয়ন্ত্রণে প্রজেক্টটি দারুণ ভূমিকা রাখবে।

আমি তার প্রজেক্টের সবকিছু দেখে প্রশংসা করলাম কাজের এবং তার সৃষ্টিশীল মননের। প্রশংসা করতেই ঝলসানো উওর, ‘প্রশংসা লাগবে না, আমার লাগবে হেল্প’। আমি তার ক্রোধে অবাক হলাম। কারণ আমি যেন সেই অপরাধী ব্যক্তি যে কিনা তাকে হেল্প করার কথা বলে আজ আসেনি। তাই আমাকে পেয়ে এক ধমক মেরে দিলো। আমি সাহস নিয়ে বললাম, ‘জ্বী বলেন, কেমন হেল্প। চেষ্টা করে দেখবো।’ বলতেই কেমন জানি তার চোখ চনমনিয়ে উঠলো, ‘আপনি সত্যি পারবেন?’ আমি প্রত্যুত্তরে সাহস জোগালাম। বললাম, ‘বলেই দেখেন’।

তিনি বললেন, ‘এই যে প্রজেক্ট, এটি দর্শনার্থীদের ব্রিফ করতে হবে। ঘণ্টাখানেকের ভেতর উৎসব পাবলিক হবে, তখন এটা বোঝানোর উপর নাম্বারিং হবে।’

আমি ভালো বিতার্কিক, সেই সূত্র ধরে সাহস নিয়ে রাজি হয়ে গেলাম। যদিও এর মূলে মমিনের ইন্ধন ছিলো, থাক সে কথা। সেই থেকে আফরিনের সঙ্গে আমার পথচলা শুরু।

ব্রাশ শেষ করতে না করতেই আম্মুর ডাকাডাকি। ‘কোথায় গেলি বাবা, আয় নাস্তা করে নে। তোকে নিয়ে আর পারি না। অগোছালো ছেলে আমার।’ যদিও এটি আম্মুর কমন ডায়লগ। আমি প্রতি সকালে এই ডায়লগ হজম করতে করতে অভ্যস্ত হয়ে গেছি। মনে মনে বললাম, ‘আম্মু আসলে আমি এমন বান্ধবী গুছিয়েছি, যা তুমি জানতে পারলে আমি নিশ্চিত আমাকে আর অগোছালো বলবে না।’ তবে সেই বিতর্কে কাজ নেই। আমাকে এখনই বের হতে হবে। নাস্তা করার সময় নেই। ওদিকে আফরিনকে দেওয়া সময় পার হতে চলেছে। আম্মুকে ফাঁকি দিয়ে আয়নাতে নিজেকে দেখে বেরিয়ে পড়লাম বেইলি রোডের উদ্দেশ্যে। রোডটি আমার পূর্বপরিচিত। আসলে নটর ডেম কলেজে পড়াকালীন আমরা এখানে আড্ডা মারতাম। এর পেছনে কারণও আছে। থাক সে দু’টি বিদ্যাপিঠের নাম এখন নাইবা বলি।

হুম, আজকের দিনটি একটু স্পেশাল। কারণ আজ সেই দিন, যেদিন আমার আর আফরিনের বন্ধুত্বের সূচনা হয়। তাই তো একটু দিনটি উদযাপনে এই সাক্ষাৎ। যদিও আজ আফরিন বিশেষ করে বললো, আমাকে সে নাকি সারপ্রাইজ দিবে। আসলে আমিও প্রতিনিয়ত তার সেই সারপ্রাইজ পাওয়ার প্রতীক্ষায় থাকি। কিন্তু কেন যে, সে বোঝে না! আজ প্রতীক্ষিত সেই সারপ্রাইজ দিবে ভাবতেই জানি কেমন লাগছে। রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের ছোটগল্প ‘হৈমন্তী’তে অপু তার স্ত্রী হৈমন্তীকে যেমন বলেছিল, ‘সে আমার সম্পত্তি নয় সে আমার সম্পদ।’ আমারও আজ তেমনি ইচ্ছা করছে বলতে, ‘তুমি আমার বান্ধবী নও, তুমি আমার প্রেমিকা।’

যাই হোক, রিকশা থেকে নেমে দেখি অাফরিন আজ রবিন ভাইয়ের কফি হাউজে আগেই হাজির। কালো রং আমার দারুণ লাগে। সাথে চোখে কালো সানগ্লাস। আফরিন এই নান্দনিকতা কোথায় শিখলো? নন্দনতত্ত্ব পড়েছি আমি আর শিখলো বুঝি সে।

রীতিমতো এলো কফি। আড্ডাও জমে উঠলো। তবে আমার কাছে কেন জানি জমছে না। আমার মন আজ দু’বছর ধরে যে সারপ্রাইজ পাওয়ার অপেক্ষা করছে; সেটি পাবার ব্যাকুলতায় উদগ্রীব।

আফরিন বলেই ফেললো, ‘তেমাকে কেমন জানি লাগছে। নার্ভাস নাকি?’ আসলে মেয়েরা কেন জানি সব বুঝতে পারে। আমি বললাম, ‘না তেমন কিছু নয়। আসলে সারপ্রাইজ দিবে তো, তাই ভাবছি আর কি।’ ‘ওহ, তাই বলো। আসলে তোমাকে বলাই হয়নি। আব্বু দেশের বাইরে থেকে এসেই আমার বিয়ে ঠিক করেছেন। এই যে তোমার জন্য আমার বিয়ের কার্ড। আর শোন, তোমাকে কিন্তু সবকিছু করতে হবে। আমি আব্বুকে বলেছি, তুমি বিয়ের সবকিছু সামলাবে।’ কথা শেষ না হতেই আমি চমকে উঠলাম।

আমি স্বপ্ন দেখছি না তো? না দেখছি না। তবে এটি নিশ্চিত আমার স্বপ্ন ভঙ্গ হয়েছে। আমি স্বপ্নে ছিলাম। এখন বাস্তব দৃশ্যে আছি। আফরিনের কালো রঙের ড্রেস যেন আজ আমার বেদনার প্রতীক। বেদনার রং কালোকে বুঝি এই পরিস্থিতিতে আমি পাশে পাবো বলে দারুণ ভালো লাগে কালো রং আমার। আমি কেমন যেন থমকে গোলাম। আফরিনের দিকে অপলক চেয়ে থাকার পর পলক ফেলে নিজেকে সামলে নিলাম। আসলেই আমি অগোছালো। আম্মু ঠিকই বলেন। কেন যেন গুছিয়ে উঠতে পারি না।

Editor in Chief : Sayed Shakil
Office: Evan plaza, sador model thana road, cox’sbazar-4700. Email: dailycoxsbazar@gmail.com / phone: 01819099070
অনুমতি ছাড়া অথবা তথ্যসূত্র উল্লেখ না করে এই ওয়েব সাইট-এর কোন অংশ, লেখা বা ছবি নকল করা বা অন্য কোথাও প্রকাশ করা বেআইনী