সংবাদ শিরোনাম

পাহাড়গুলোতে এখন শোভা পাচ্ছে জুম ধানের সোনালি হাসি চলছে নবান্নের প্রস্তুতি

পাহাড়ে জুমের ফসল ঘরে তুলতে ব্যস্ত এখন বান্দরবানের পাহাড়ি জুমিয়ারা। শিশু কিশোর এবং বাবা-মা কেউই বসে নেই ঘরে। পরিবারের সকলে জুমের ধান কাটতে নেমেছে পাহাড়ে জুমখেতে। ফসল ঘরে তোলার আনন্দে পাহাড়ি পল্লীগুলোতে চলছে নবান্ন উৎসবেরও প্রস্তুতি।

কৃষি বিভাগের দেওয়া তথ্যমতে, চলতি বছর জেলায় প্রায় আট হাজার ৯৮৮ হেক্টর জমিতে জুম চাষ করা হয়েছে। গতবছর ২০১৭ সালে জুম চাষ হয়েছিল আট হাজার ৯৬৭ হেক্টর জমিতে। এ ছাড়া ২০১৬ সালে আট হাজার ৯৩৭ হেক্টর জমিতে এবং ২০১৫ সালে জুম চাষ হয়েছিল ৯ হাজার ৫০ হেক্টর পাহাড়ি জমিতে। গতবছরের তুলনায় এ বছর বান্দরবান জেলায় জুম চাষ বেড়েছে ২১ হেক্টর। এ বছর উৎপাদনের লক্ষ্য মাত্রা ধরা হয়েছে ১২ হাজার ৭৩৫ মেট্টিকটন।

জেলা কৃষি সম্প্রসারণ বিভাগের উপ-সহকারী কৃষি কর্মকর্তা ভবতোষ চক্রবর্তী বলেন, ‘জেলায় প্রতিবছর জুমের চাষ ক্রমান্বয়ে বাড়ছে। গত তিন বছরের হিসাবে দেখা গেছে ২১ হেক্টর থেকে ৩০ হেক্টর পর্যন্ত প্রতিবছর জুম চাষ বেড়েছে। এ বছর জুমের বাম্পার ফলন হয়েছে। জুমের ধান কেটে ঘরে তোলা শুরু করেছে জুমিয়ারা। পাহাড়ের জুম চাষ থেকে জুমিয়ারা সারা বছরের খাদ্য সংরক্ষণ করে।’

স্থানীয় সূত্রে জানা গেছে, পার্বত্য চট্টগ্রামে বসবাসরত পাহাড়িরা প্রতিবছর জেলার বিভিন্নস্থানের পাহাড় আগুনে পুড়িয়ে জুম চাষ করে। জুমিয়ারা পাহাড়ে ধানের পাশাপাশি ভূট্টা, মরিচ, যবসরিষা, মিষ্টি কোমড়া, মারফা, টকপাতা, ফুলসহ বিভিন্ন রকমের সবজি উৎপাদন করেন।

তবে একটি পাহাড়ে একাধিকবার জুম চাষ করা যায় না বলে জুমিয়ারা প্রতিবছর ভিন্ন ভিন্ন পাহাড়ে জুমের চাষ করে। জেলায় বসবাসরত ম্রো, মারমা, তঞ্চঙ্গ্যা, খুমী, লুসাই, চাকমা, পাংখো, বম, চাকসহ ১১টি পাহাড়ি জনগোষ্ঠীর অধিকাংশরাই জুম চাষের ওপর নির্ভরশীল।

জেলা শহরের বসবাসরত কিছু সংখ্যক শিক্ষিত পরিবার ছাড়া দুর্গমাঞ্চলে পাহাড়ি গ্রামগুলোতে বসবাসরত পাহাড়িরা আজও জুম চাষের মাধ্যমে জীবিকা নির্বাহ করে। তবে ১১টি পাহাড়ি জনগোষ্ঠীর মধ্যে একমাত্র ম্রো সম্প্রদায় আদিকাল থেকে এখনো পর্যন্ত জুম চাষের মাধ্যমেই সারাবছরের জীবিকা সংগ্রহ করে।

জুমিয়া পরিবারগুলো প্রতিবছর মার্চ-এপ্রিল মাসের দিকে জুম চাষের জন্য পাহাড়ে আগুন লাগান। আর মে-জুন মাসের দিকে আগুনে পোড়ানো পাহাড়ে জুম চাষ আরম্ভ করেন। প্রায় ৩/৪ মাস পরিচর্যার পর বছরের সেপ্টেম্বর মাস থেকে পাহাড়ে জুমের ধান কাটা শুরু করে জুমিয়ারা।

জুমের পাঁকা ধানসহ উৎপাদিত অন্যান্য ফসল ঘরে তোলতে ব্যস্ত সময় কাটাচ্ছে এখন পাহাড়িরা। বান্দরবানের রুমা, থানছি, রোয়াংছড়ি, আলীকদম, লামা উপজেলা এবং ট্যুরিস্ট স্পট নীলাচল, নীলগিরি-চিম্বুক এলাকায় গিয়ে দেখা যায়, রাস্তার দুপাশের পাহাড়গুলোতে এখন শোভা পাচ্ছে জুম ধানের সোনালি হাসি। জুমে কাচা-পাঁকা ধানের ছড়িগুলো দুলছে বাতাসে। জুমের পাঁকা ধানের গন্ধ ছড়াচ্ছে এখন পাহাড়ি জনপদগুলোতে।

চিম্বুক সড়কের ম্রোলং পাড়ার জুমচাষি মেনুলু ম্রো, রিংরাং ম্রো বলেন, এ বছর জুমের আশানুরুপ ভালো ফসল হয়েছে। পাহাড়ে প্রায় পাঁচ-সাত একর জমিতে জুম চাষ করে ধানসহ বিভিন্ন ধরনের সবজি চাষ করা হচ্ছে। জুমের পাঁকা ধান কেটে ঘরে তোলা হচ্ছে।

ওয়াইজংশন পাড়ার জুমচাষি মাংরি ম্রো বলেন, ‘আগাম লাগানো জুমখেতের ধান পেকেছে। কিন্তু যারা একটু দেরীতে চাষ করেছিল, তাদের খেতের ধান এখনো পরিপক্ক হয়নি। তবে জুমের খুবই ভালো ফলন হয়েছে এবার। ফসল গড়ে তোলার আনন্দে নবান্ন উৎসবের প্রস্তুতিও চলছে পাহাড়ি গ্রামগুলোতে।’

স্থানীয় ম্রো সম্প্রদায়ের লেখক ও গবেষক সিইয়ং ম্রো বলেন, ‘জুমচাষ পাহাড়ি জনগোষ্ঠীর একটি আদি চাষাবাদ পদ্ধতি। এটি প্রাকৃতিক ভারসাম্য রক্ষায় ক্ষতিকারক হলেও এটি পাহাড়ি জনগোষ্ঠীদের ঐতিহ্যের অংশ। জুমিয়া পরিবারগুলো পাহাড়ে ধান ছাড়াও ভূট্টা, মরিচ, যবসরিষা, মিষ্টি কোমড়া, মারফা, টকপাতাসহ বিভিন্ন রকমের সবজির উৎপাদন করে। জুমে উৎপাদিত ফসলের মাধ্যমেই সারা বছরের জীবিকা নির্বাহ করে জুমিয়া পরিবারগুলো। জুমের ফসল ঘরে তোলার সময়টায় পাহাড়ি পল্লীগুলোতে ঢাক ঢোল পিটিয়ে নবান্ন উৎসবও আয়োজন করে তারা। জুম চাষ লাভজনক না হওয়ায় অনেকে জুম চাষ ছেড়ে মিশ্র ফল চাষের দিকেই ঝুঁকছে।’

এ ব্যাপারে জেলা কৃষি সম্প্রসারণ বিভাগ বান্দরবানের উপ-পরিচালক মো. আলতাফ হোসেন বলেন, ‘জুমে উৎপাদিত ফসল এ অঞ্চলের খাদ্য চাহিদার অনেকাংশই পূরণ করে। তবে আদিপদ্ধতিতে জুম চাষের কারণে পাহাড়ের ক্ষয়সৃষ্টি এবং জমির উর্বরতা হ্রাস পাচ্ছে। বৈজ্ঞানিক পদ্ধতিতে জুম চাষ করা গেলে উৎপাদিত ফসলের পরিমাণ আরও বাড়বে। সেই সঙ্গে পরিবেশের ভারসাম্য রক্ষা করা সম্ভব হবে। জুম চাষিদের নতুন নতুন প্রযুক্তি ব্যবহারের জন্য বিভিন্ন ধরনের প্রশিক্ষণ দিয়ে উদ্বুদ্ধ করা হচ্ছে।’

Editor in Chief : Sayed Shakil
Office: Evan plaza, sador model thana road, cox’sbazar-4700. Email: dailycoxsbazar@gmail.com / phone: 01819099070
অনুমতি ছাড়া অথবা তথ্যসূত্র উল্লেখ না করে এই ওয়েব সাইট-এর কোন অংশ, লেখা বা ছবি নকল করা বা অন্য কোথাও প্রকাশ করা বেআইনী