সংবাদ শিরোনাম

টিকাদান কর্মসূচিতে বিশ্বে বাংলাদেশ এখন রোল মডেল

শিশুকে মারাত্মক ১০টি রোগ থেকে রক্ষার জন্য টিকাদান কর্মসূচিতে অবিস্মরণীয় সাফল্য দেখিয়েছে বাংলাদেশ। রুবেলা ভাইরাস নিয়ন্ত্রণে সাফল্য পাওয়ায় এ বছর জাতিসংঘের বৈঠকে পুরস্কৃত হয়েছে দেশটি। শিশুকে টিকাদানের ক্ষেত্রে বাংলাদেশের কর্মকর্তারা এখন বিশ্বের বিভিন্ন দেশের স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়ের কর্মকর্তাদের প্রশিক্ষণ দিচ্ছেন। টিকাদান কর্মসূচিতে বিশ্বে বাংলাদেশ এখন রোল মডেল বলে জানিয়েছেন স্বাস্থ্য অধিদফতরের মহাপরিচালক অধ্যাপক ডা. আবুল কালাম আজাদ ।
স্বাস্থ্য অধিদফতর সূত্র জানায়, ১৯৭৯ সালের ৭ এপ্রিল বাংলাদেশে সম্প্রসারিত টিকাদান কর্মসূচি (ইপিআই) শুরু হয়। এরপর ১৯৮৫ সালের জরিপে দেখা যায়, ১ বছরের কম বয়সী শিশুদের পূর্ণ টিকা প্রাপ্তির হার মাত্র ২ শতাংশ। সেই সময় শুধুমাত্র উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্স এবং বড় বড় হাসপাতালে টিকা দেওয়া হতো। পরবর্তী ৫ বছরে কর্মসূচির ব্যাপক সম্প্রসারণ ও নিবিড় টিকাদান কর্মসূচি বাস্তবায়িত হয়।
১৯৯০ সালের মধ্যে শতকরা ৬০ ভাগ শিশু টিকা পায়। এরপর সময়মত সব টিকা গ্রহণ না করার কারণগুলো দূর করার লক্ষ্যে বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা, ইউনিসেফ, সিডিসি, সিভিপি/পাথ এবং ইউএসএআইডি সম্মিলিতভাবে কিছু উদ্যোগ নেয় – যা রেড স্ট্র্যাটেজি নামে পরিচিত। ২০০৩ সালে সরকার হেপাটাইটিস বি এর টিকা কর্মসূচিতে যুক্ত করে এবং এডি সিরিঞ্জ প্রবর্তন করে। ২০০৯ সালে সারা দেশে হিব পেন্টাভ্যালেন্ট এবং ২০১২ সাল থেকে ৯ মাস বয়সে দেওয়া হামের টিকার পরিবর্তে হাম রুবেলা (এমআর) টিকা এবং ১৫ মাস বয়সে এমআর ২য় ডোজ টিকা সংযোজন করা হয়।
২০১৫ সালে নিউউমোকক্কাল কনজুগেট ভ্যাকসিন (পিসিভি) এবং আইপিভি টিকা সংযোজন করা হয়। এছাড়াও ২০১৭ সাল থেকে সারাদেশে ফ্রাকশনাল আইপিভি টিকা সংযোজন করা হয়। ২০১৬ সালের জরিপ অনুযায়ী, ১ বছরের মধ্যে পূর্ণ টিকাপ্রাপ্ত শিশুর হার ছিল ৮২.৩ শতাংশ। যদিও বিসিজি টিকাদানের হার ছিল শতকরা ৯৯.৩। ২০১৮ সালে ৮৫ শতাংশ শিশুকে টিকাদানের আওতায় আনার টার্গেট ধরা হয়।
সূত্র জানায়, সম্প্রসারিত টিকাদান কর্মসূচির আওতায় ধনুষ্টংকার, ডিফথেরিয়া, হুপিংকাশি, যক্ষ্মা, পোলিও, হাম, রুবেলা, হিমোফাইলাস, ইনফ্লুয়েঞ্জা-বি, হেপাটাইটিস বি ও নিউমোনিয়া শিশুদের ১০টি মারাত্মক রোগের টিকা দেওয়া হচ্ছে। শিক্ষা প্রতিষ্ঠান, নিয়মিত টিকাদান কেন্দ্র, স্থায়ী টিকাদান কেন্দ্রে শিশুদের এই টিকাগুলো দেওয়া হয়। এরমধ্যে বাদ পড়া শিশুদের টিকার আওতায় আনতে অতিরিক্ত টিম-রেল স্টেশন, লঞ্চ টার্মিনাল, বিভিন্ন কারখানা, বেদে বহর, হাসপাতালে ভর্তি শিশু, জেলখানায় মায়েদের সঙ্গে অবস্থানরত শিশু, যৌনপল্লী, শোধনাগার, বস্তি এলাকায় শিশুদের খুঁজে খুঁজে টিকা দেয়। এইকাজে স্বাস্থ্য অধিদফতরের ইপিআই কর্মসূচির কর্মকর্তা, কর্মচারী ছাড়াও স্বেচ্ছাসেবীরা দেশজুড়ে এই কাজ করছে।
আজিমপুর স্বাস্থ্যকেন্দ্রের কাউন্সিলর হাবিবা সুলতানা বাংলা ট্রিবিউনকে বলেন, ‘শিশুদের এই টিকাগুলোর মধ্যে জন্মের পরপরই দিতে হয় যক্ষ্মার বিসিজি টিকা। এরপর ৬ সপ্তাহ, ১০ সপ্তাহ ও ১৮ সপ্তাহে দিতে হয় বাকি ডোজ। ৯ মাস পূর্ণ হলে হাম ও রুবেলার প্রথম ডোজ এবং দ্বিতীয় ডোজ দিতে হয় ১৫ মাস পূর্ণ হওয়ার পর। জন্ম থেকে ১৫ মাস পর্যন্ত সময়ে শিশুকে কমপক্ষে মোট পাঁচবার টিকা কেন্দ্রে নিয়ে যেতে হয়। আমাদের এখানে আমরা শিশুদের জন্য একটি টিকা কার্ড করে দেই। শিশুর এই কার্ডটি সারাজীবন সংরক্ষণ করার জন্য উদ্বুদ্ধ করি। ’
স্বাস্থ্য অধিদফতরের মহাপরিচালক অধ্যাপক ডা. আবুল কালাম আজাদ বলেন, ‘আমাদের দেশে জাতিসংঘের তৎকালীন মহাসচিব বান কি মুন ও বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার পরিচালক ইপিআই কর্মসূচি দেখে বলেন যে, আমরা যেভাবে ইপিআই কর্মসূচি করেছি সেটা অন্য দেশের জন্য রোল মডেল। এখনও পৃথিবীর যেকোনও দেশে আলোচনা যখন হয় তখন বাংলাদেশের প্রসঙ্গটি আসে। কারণ শুধু টিকা প্রদানে সাফল্য অর্জন করা নয়, এটিকে ধরে রাখাও বটে। এক্ষেত্রে বাংলাদেশ সাফল্য দেখিয়েছে। এজন্য অন্যান্য দেশে যখন বিশেষ কর্মসূচি নেওয়া হয় তখন আমাদের কর্মকর্তাদের নিয়ে যাওয়া হয়। ’
তিনি আরও বলেন, ‘আমরা ২০১৪ সালে পোলিও উচ্ছেদ করেছি। মা ও শিশুর ধনুষ্টংকার রোধ করেছি। শিশুর জন্মগত রুবেলা প্রতিরোধে আমাদের সাফল্য খুবই ভালো।’
কিছু ইপিআই কর্মীর বেতন-ভাতার অসুবিধা প্রসঙ্গে তিনি বলেন, ‘আমাদের যারা সরকারিকর্মী তাদের বেতন-ভাতা নিয়ে কোনও সমস্যা নেই। আমাদের কিছু শূন্য পদ ছিল সেগুলো পূরণ করার চেষ্টা করছি। এখানে একটা বাধা ছিল। এটি পূরণ করতে সরকারিবিধি লাগে। আগে যে নিয়োগবিধি ছিল তা ১৯৮৫ সালে করা। সেইটা মার্শাল ল’র সময়ে করা ছিল। সেটি হাইকোর্ট বন্ধ করে দেয়। যার কারণে কিছু নিয়োগ বন্ধ থাকায় বেতন-ভাতা নিয়ে সমস্যা হয়েছিল। তবে, সেটি এখন আর থাকবে না। আমরা বর্তমান হেলথ প্রোগ্রামে ৬৫ হাজার ভলান্টিয়ার নেওয়ার সিদ্ধান্ত নিয়েছে। ১৯টি উপজেলায় নেওয়া শুরু করছি। এটি সফল হলে আমরা সারাদেশে স্বেচ্ছাসেবক নেবো। তখন আর কোনও সমস্যা থাকবে না।’
টিকাদান কর্মসূচিতে এত সাফল্যের পরও কিছু অপপ্রচার রয়েছে। কেউ কেউ ধর্মের দোহাই দিয়ে মা-বাবাদের সন্তানকে টিকাকেন্দ্রে নিয়ে যেতে বাধা দেয়। মা-বাবাদের কোনও ধরনের অপপ্রচারে বিভ্রান্ত না হয়ে সন্তানকে সবগুলো টিকা দেওয়ার আহ্বান জানিয়ে ইসলামিক ফাউন্ডেশনের উপ পরিচালক আল্লামা মুশতাক আহমদ বাংলা ট্রিবিউনকে বলেন, ‘শিশুর জন্মের পর টিকা দেওয়া অত্যন্ত জরুরি। আমি এটাকে পুরোপুরি সমর্থন করি। ইসলামের দৃষ্টিতে টিকা প্রদানের কোনও আপত্তি নেই।

Editor in Chief : Sayed Shakil
Office: Evan plaza, sador model thana road, cox’sbazar-4700. Email: dailycoxsbazar@gmail.com / phone: 01819099070
অনুমতি ছাড়া অথবা তথ্যসূত্র উল্লেখ না করে এই ওয়েব সাইট-এর কোন অংশ, লেখা বা ছবি নকল করা বা অন্য কোথাও প্রকাশ করা বেআইনী