সংবাদ শিরোনাম

কওমি মাদ্রাসা এবং শেখ হাসিনা

সায়েদুল আরেফিন  :

আমাদের প্রধানমন্ত্রী কওমি মাদ্রাসার শিক্ষার্থীদের সনদ দেওয়ার সিদ্ধান্তে ভিতরে ভিতরে অনেক মানুষের আর প্রকাশ্যে কিছু অতি উৎসাহী বামের সঙ্গে মুক্তচিন্তার মানুষের নানা কথা শোনা যাচ্ছে। তাঁরা কেউ বলছেন বঙ্গবন্ধুর কন্যার কাছে এটা আশা করা যায় না, দেশটা মৌলবাদী হতে শেখ হাসিনা একধাপ এগিয়ে দিলেন, আখেরে ফল ভালো হবে না। ধর্মীয় সংখ্যালঘুরা বিপদে পড়বে, ইত্যাদি বিস্তর অভিযোগ, অনুযোগ, আক্ষেপ আর রাগ। আসলে ঘটনা কি? কেন দেওয়া হলো এই কওমি মাদ্রাসার শিক্ষার্থীদের শিক্ষার স্বীকৃতি? কেউ মুখ খোলে না, তাই স্পষ্ট হয় না কোনো কিছু। তাই আসুন একটু চিন্তা করে দেখি সম্ভাব্য কি কারণ থাকতে পারে এর পিছনে।

প্রাচীন ভারতীয় শিক্ষাধারা ছিল গুরুমুখী, শুনে শেখার ঐতিহ্য। কারণ, বেদ কণ্ঠস্থ করতে হতো এবং মুখস্থ রাখতে হতো। ছাত্রদের জন্য কোনো গ্রন্থ ছিল না। তাই বই পড়ে বেদ মুখস্থ করা চলত না। জোর গলায় পাঠ করা এবং বেদ বর্ণ কর্ণগোচর করা বেদ-অধ্যয়নের অঙ্গ এবং গুরুর কাছে শুনেই তা করতে হতো।৬ শ্রবণ হলো শিক্ষক বা গুরু কর্তৃক উচ্চারিত শব্দ বা পাঠ্যবিষয়। এই ব্যবস্থাটিকে ‘গুরু-শিষ্য পরম্পরা’ বলা হয়। গুরুর কাছ থেকে শিষ্য, শিষ্য থেকে তাঁর শিষ্য—এই রূপে পরম্পরায় জ্ঞান প্রবাহিত ও সংরক্ষিত হতো। এই কারণে সে যুগে জ্ঞান গ্রন্থনাকে বলা হতো ‘স্মৃতি’ বা ‘শ্রুতি’। অর্থাৎ যা স্মৃতিতে ধরে রাখা হয়েছে বা যা শোনা গেছে। গুরুর মুখে শুনে শুনে শিক্ষালাভের আর একটি উদ্দেশ্য হলো, শিক্ষার সুযোগ সীমাবদ্ধ করে রাখা। এতে শূদ্ররা শিক্ষালাভের সব ধরনের সুযোগ হারাল। পাঠদানের লিখিত পদ্ধতি বা গ্রন্থ না থাকায় শূদ্ররা চাইলেও লুকিয়ে এই শিক্ষালাভ করতে পারত না। ঠিক এভাবে সমাজের বিরাট এক অংশকে শোষণ করার জন্য প্রাচীন ভারতে ব্রাহ্মণ্য শিক্ষাব্যবস্থা প্রথম থেকেই চাতুর্যের পথ গ্রহণ করেছিল, পরবর্তী সময়ে যা শূদ্রদের জন্য শাপে বর হয়েছিল।

গোটা অখণ্ড ভারতের তথা এই অঞ্চলের মুসলিম সম্প্রদায়ের ছেলে মেয়েদের মাদ্রাসায় হুজুরের অধীনে শিক্ষাদান বা পাঠদান শুরু হয়, যা ইদানীং কালের কওমি মাদ্রাসা নামে চলে আমাদের এই বাংলায়। এঁদের শিক্ষাদান পদ্ধতি অনেকটাই গুরুগৃহে পাঠদানের মতো মনে হলেও বিবর্তিত হয়ে এটা একেকটা বিশাল প্রতিষ্ঠানে পরিণত হয়েছে। সিলেবাস অনেক কঠিন, হয়তো যুগোপযোগী না। তবে এটা আমাদের দেশের আলেমদের জন্য একটা বিরাট অর্জন, অন্য পথে।

ব্রিটিশ শাসন আমলে ১৭৮১ সালে ওয়ারেন হেস্টিংস কলকাতা মাদ্রাসা (অধুনা আলিয়া বিশ্ববিদ্যালয়) চালু করেন। ১৭৯১ সালে জোনাথান ডানকান বারাণসীতে একটি সংস্কৃত কলেজ প্রতিষ্ঠা করেন।

গুরু গৃহের শিক্ষা, তার পরে আলিয়া মাদ্রাসা, সংস্কৃত কলেজ হয়ে আধুনিক কলেজ বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষা দেশে চালু হলেও প্রাচীন সেই শিক্ষা পদ্ধতি এখনো দেশ থেকে মুছে যায় নি। কারণ মানুষের মনে ধর্মের শক্ত ভিত্তি এখনো বিদ্যমান। যারা যুক্তি বা বিজ্ঞান মানে না, মানে তাঁদের মুরুব্বীদের কথা, আমাদের উপমহাদেশের চিত্রটা এটাই, এখানে মুক্তচিন্তার সুযোগ তো নেই বরং আছে বাধা, কেউ বলেন ‘চাপাতি’ বাধা।

আমাদের দেশের কওমি মাদ্রাসায় কারা পড়েন? এই ধরনের মাদ্রাসায় যারা ভর্তি হন তাঁরা খুব গরীব পরিবারের (দুই একটা ব্যতিক্রম বাদে)। জন্মই হয় গরীব ঘরে অপুষ্টির শিকার মায়ের গর্ভে। জন্মানোর পরেও অপুষ্টির কারণে এঁদের ব্রেইনের গঠন যা হবার কথা, তা হয় না। তাই আইকিউ অনেক কম থাকে যারা অপুষ্টির শিকার নয় তাদের তুলনায়। অধিকাংশ ক্ষেত্রেই এঁদের ব্রেইনের অ্যানালিটিক্যাল ফ্যাকাল্টি দুর্বল থাকে, মানে বিবেচনা শক্তি দুর্বল থাকে। ভবিষ্যতের চিন্তায় থাকে খামতি, ‘জি হুজুর’ বলা এঁদের আদত হয়ে দাঁড়ায়। তাই যুক্তির চেয়ে মুরুব্বীর কথায় অন্ধ বিশ্বাসকে তাঁরা আঁকড়ে থাকে। এরা বাংলার যত না দক্ষ তাঁর চেয়ে উর্দু আর আরবিতে বেশি দক্ষ তাঁরা।

এরা আসলে বাংলাদেশের পশ্চাৎপদ বা অবহেলিত জনগোষ্ঠীর একটা অংশ (যদিও অনেকে তাঁদের অনগ্রসর গ্রুপ বলতে নারাজ)। অবহেলা, হতাশা থেকে তাঁরা আল্লাহ্‌র কাছে আত্মসমর্পণের সিদ্ধান্ত নেয়। এটাকে পুঁজি করে কেউ কেউ উপরে উঠার কৌশল হিসেবে, আবার ধর্মীয় অগাধ বিশ্বাস থেকে করে এটা, কেউ করে রাজনীতি। যারা রাজনীতি করেন তাঁরা তাঁদের ছেলে মেয়েদের কাউকেই মাদ্রাসায় পড়ান না, পড়ান ইংলিশ মিডিয়াম স্কুলে। কিন্তু মিটিং এ লোক দরকার হলে নেন মাদ্রাসা থেকে,  ইসলাম প্রতিষ্ঠার লড়াইয়ে। যেন তাঁরা দেশে ইসলাম প্রতিষ্ঠার একমাত্র এজেন্সি পেয়েছেন।

যদিও আমার আপনার মত রাষ্ট্রের কাছ থেকে অন্ন, বস্ত্র, শিক্ষা চিকিৎসা, বাসস্থান পাওয়া তাঁদের সাংবিধানিক অধিকার আছে।কিন্তু বাস্তবে তাঁরা কিছুই পান না, অন্যদের তুলনায়। এছাড়াও তাঁদের আপনি স্কুলে আনতে পারছেন না নানা কারণে। তাই তাঁদের ধর্মীয় বিশ্বাসের আলোকে তাঁরা এই মাদ্রাসায় যায়, অর্থনৈতিক কারণে মাদ্রাসায় যায়, কারণ সেখানে পড়ালে থাকা খাওয়া ফ্রি। থাকার জায়গাও পায় তাঁরা ফ্রি। চিকিৎসার ক্ষেত্রে ঝাড় ফুঁকে বিশ্বাস করতে হয়, যদিও তা বিজ্ঞান সমর্থন করে না। কিন্তু পারিবারিক ভাবে পাওয়া নিজেদের বিশ্বাসে তাঁরা অটল- এটাই বুঝতে হবে আমাদের।

নদী ভাঙ্গন, প্রাকৃতিক দুর্যোগ, শোষণ নির্যাতন, ধর্মের অপব্যাখ্যা, পরিবারের কর্তাদের ভুল সিদ্ধান্ত, নিজের পাপ কর্ম থেকে আত্মমুক্তির আশা, দারিদ্র, দুনিয়া গতি প্রকৃতি সম্পর্কে তথ্য বা পরামর্শের অভাব, ইত্যাদি মানুষকে এসব মাদ্রাসা শিক্ষার পথে আনে। ক্ষমতা, শক্তি থাকা অবস্থায় কেউ ঈশ্বরভক্ত হয় না বলে কথা প্রচলিত আছে। বিপদে না পড়লে কেউ আল্লাহকে ডাকে না। বিপদগ্রস্ত মানুষ শুকরিয়া আদায়ের জন্য আল্লাহ / ভগবান ভক্ত হয়।

এই ধরনের মানুষের সংখ্যা উন্নত দেশেও কম নেই, যদিও সে সব দেশে ধর্মের অবস্থান এখন দুর্বল হয়ে আসছে দিনই দিন। দীর্ঘদিন একটা প্রক্রিয়ার মধ্যে থাকতে থাকতে উন্নত দেশে বহু মানুষ ধর্মহীন হয়ে পড়লেও, ধর্মের আচার ও বিশ্বাস সে সব দেশ থেকে মুছে যায় নি। তাই নিজ নিজ দেশের মৌলবাদীরা উন্নত দেশের বিভিন্ন স্থানে হামলা করে। ব্রিটিশের একটা ক্ষুদ্র অংশের মুসলিম মেয়েরা সেবাদাসী হতে আইএস এ যোগ দেয়। কী বলে ব্যাখ্যা দেবেন তার!

দারিদ্র ও শিক্ষার অভাবে বাংলাদেশে মানুষের বিরাট অংশের মাঝে ধর্মের বিশ্বাস খুব শক্ত। মুক্তবুদ্ধির চর্চা এখানে জনপ্রিয়তা পাচ্ছে খুব ধীরে। আবার মুক্তচিন্তার মানুষ বলে যারা নিজেদের দাবী করলেও পরে জীবনের বেলা শেষে এসে আবার হয়ে যাচ্ছে ইসলামী চিন্তাবিদ। যা মুক্তচিন্তা চর্চার বিকাশে বড় অন্তরায়, কঠিন করে দিচ্ছে পথ চলা। নিজেকে নাস্তিক দাবি করা ফরহাদ মাজাহার, বৈজ্ঞানিক সমাজতন্ত্রের কবি আল মাহমুদ তাঁদের মধ্যে অন্যতম। কঠোর মার্ক্সবাদী বহু মানুষ এখন জামায়াত করে, বিএনপি করেন, বিশেষ কোন আকর্ষণে।

যারা মাদ্রাসা চালান তাঁদের সবাই সৎ তা আমি দাবি বা বিশ্বাস কোনটাই করি না। কিন্তু তাঁদের বুদ্ধির চেয়ে বিশ্বাস বড় তাই- যে কোনো গুজব তাঁরা ও তাঁদের সাগরেদরা খুব সহজেই বিশ্বাস করেন। একটা আহ্বান দিলে লাখ লাখ তালেবে ইলম এসে যোগ দেয় তাঁদের কর্মসূচিতে। কিন্তু আমাদের দেশে যারা মুক্ত চিন্তায় বিশ্বাসী তাঁরা সোশ্যাল মিডিয়া আর পত্রিকায় লেখা লেখি, বই ছাপানো, আর টেলিভিশনে টক শো করেন, রাস্তায় নামেন না, নামলেও লোক হয় ১০/২০ জন সাকুল্যে।

আমাদের দেশের প্রচলিত গণতন্ত্রে সংখ্যাগরিষ্ঠের মতামত গ্রহণ করা বাধ্যতামূলক। বর্তমান সরকার তাই গ্রহণ করেছেন, অধিকাংশের দাবি পূরণ করে চলেছেন। সরকারের সবাই এটার বিষয়ে একমত না, তা অনেকেই জানেন, কিন্তু প্রচলিত গণতন্ত্রের ফর্মুলায় পড়ে গেছেন, সবাই। তাই মুক্তচিন্তার মানুষেরা নিজেদের ব্যর্থতা ঢাকতে এখন সরকারের নিন্দা জানাচ্ছেন। আইন অনুসারে সংখ্যাগরিষ্ঠের মত তাঁরা মানেন না।

কী হতে পারে এর ফল? কওমি মাদ্রাসার মানুষ এখন সরকারি চাকরী পাবেন যদিও তা সংখ্যায় কম হবে খুব। তখনই তাঁরা সেই আলিয়া মাদ্রাসা থেকে কলেজের মতো করে তাঁরা ধীরে ধীরে কারিকুলাম চেঞ্জ করবেন, ফিরে আসবেন শিক্ষার মূল ধারায়, হয়তো সময় নেবে কয়েক বছর, বা যুগ, যেমনটি হচ্ছে খোদ সৌদি আরবে। মেয়েরা টিভিতে খবর পড়ে, গাড়ি চালায়, স্টেডিয়ামে খেলা দেখে, ইত্যাদি। আমাদের দেশে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা মাদ্রাসার শিক্ষার্থীদের সম্মান দিয়ে পরিবর্তনের আর উন্নয়নের ট্রেনে উঠার সুযোগ করে দিয়েছেন, ফল কী হবে তা ভবিষ্যৎ বলবে। তবে দেশের জন্য খুব খারাপ হবে না তা পারিপার্শ্বিক দেশের অভিজ্ঞতা থেকেই বলা যায়।

লেখক: উন্নয়ন কর্মী ও কলামিস্ট

তথ্যঋণঃ বিভিন্ন অনলাইন পোর্টাল, উইকিপিডিয়া, অন্যান্য

Editor in Chief : Sayed Shakil
Office: Evan plaza, sador model thana road, cox’sbazar-4700. Email: dailycoxsbazar@gmail.com / phone: 01819099070
অনুমতি ছাড়া অথবা তথ্যসূত্র উল্লেখ না করে এই ওয়েব সাইট-এর কোন অংশ, লেখা বা ছবি নকল করা বা অন্য কোথাও প্রকাশ করা বেআইনী