সংবাদ শিরোনাম

পাহাড়ে অপরাধ : সাক্ষীরা আতঙ্কে এগোয় না তদন্ত

তিন মাস পেরিয়ে গেলেও খাগড়াছড়ির চাঞ্চল্যকর সাত খুন মামলার কোনো অগ্রগতি ঘটেনি। হত্যায় জড়িত কাউকে গ্রেফতার করতে পারেনি পুলিশ। তদন্ত-সংশ্নিষ্টরা বলছেন, শুধু এই সাত খুন মামলা নয়, পাহাড়ের চাঞ্চল্যকর অধিকাংশ হত্যা-ধর্ষণের ঘটনায় তদন্ত এগোয় না। আতঙ্কে ভুক্তভোগী পরিবার মামলা করতে চায় না। পরে আইন-শৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী বাদী হয়ে মামলা করলেও সাক্ষীর অভাবে মামলার তদন্ত এগোয় না।

সাত খুন মামলার ক্ষেত্রেও অনেকটা তাই হয়েছে। চলতি বছরের ১৮ আগস্ট খাগড়াছড়ির স্বনির্ভর বাজার এলাকায় দিন-দুপুরে ব্রাশফায়ার ও গুলিতে ইউনাইটেড পিপলস ডেমোক্রেটিক ফ্রন্টভুক্ত (ইউপিডিএফ) পাহাড়ি ছাত্র পরিষদের নেতা তপন চাকমাসহ সাতজন নিহত হয়েছিলেন। নিহতদের স্বজনরা এ ঘটনায় কোনো মামলা করেননি। পরে পুলিশ বাদী হয়ে হত্যা মামলা করলেও তদন্ত এগোয়নি। পাহাড়ের অধিকাংশ ফৌজদারি অপরাধের তদন্ত করতে গিয়ে এমন সমস্যার মুখোমুখি হতে হচ্ছে প্রশাসনকে। এতে অপরাধীরা পার পেয়ে যাচ্ছে। তৈরি হচ্ছে আরও কোনো অপরাধের ক্ষেত্র।

এ ব্যাপারে খাগড়াছড়ি থানার ওসি শাহাদাত হোসেন টিটু সমকালকে বলেন, সাক্ষী ও তথ্য-উপাত্ত না পাওয়ায় সাত খুন ঘটনার তদন্ত খুব একটা এগোয়নি। একজনকে গ্রেফতার করা হয়েছিল। তবে সে তেমন তথ্য দিতে পারেনি। পার্বত্য এলাকার যেসব ঘটনায় ইউপিডিএফ কিংবা জেএসএস-এর মতো সংগঠনের সংশ্নিষ্টতা পাওয়া যায়, সেগুলোয় কেউই মুখ খুলতে চায় না। অনেক সময় হত্যা-ধর্ষণের মতো ঘটনায় পাহাড়িদের জড়িত থাকার তথ্য পাওয়া গেলেও মামলা করতে রাজি হয় না ভুক্তভোগী পরিবার।

চলতি বছর খুন আবারও বেড়েছে :শুধু চলতি বছরেই পার্বত্য চট্টগ্রামে হত্যার শিকার হয়েছেন ৬৭ জন। অপহরণ হয়েছেন ৪৭। ২০১৭ সালে খুন হয়েছিল ৩৮ জন। অপহরণের ঘটনা ঘটেছিল ৯০টি। বিভিন্ন ধরনের অস্ত্র উদ্ধার করা হয়েছিল ১১৯টি। অতীতে পাহাড়ে ২০১৬ সালে ৪১, ২০১৫ সালে ৬৯ এবং ২০১৪ সালে ৫৪টি খুনের ঘটনা ঘটে। পার্বত্য অঞ্চলে রেকর্ডকৃত এ পরিসংখ্যান অনুযায়ী, গত দুই বছর খুনের ঘটনা কমে আসতে শুরু করলেও চলতি বছর তা আবার বেড়ে গেছে।

চলতি বছরের ১৬ এপ্রিল খাগড়াছড়িতে দুর্বৃত্তদের গুলিতে সূর্য বিকাশ চাকমা (৫৫) নিহত হন। জেলা সদরের আপার পেরাছড়া এলাকায় এ ঘটনা ঘটে। স্থানীয়ভাবে তিনি ইউপিডিএফ কর্মী হিসেবে পরিচিত।

এই হত্যা মামলারও কোনো কূলকিনারা হয়নি।

ফৌজদারি মামলা কম : পার্বত্য এলাকায় দায়িত্বরত একাধিক পুলিশ কর্মকর্তার সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে, পাহাড়ি এলাকায় এমন অনেক থানা রয়েছে যেখানে দু-একটি মাদক-সংক্রান্ত মামলা ছাড়া পুরো মাসে কোনো মামলা হয় না। এখানকার কোনো কোনো থানায় ১২ মাসেও ১৫-২০টির বেশি মামলা হয় না। অন্যদিকে রাজধানীর একেকটি থানায় প্রতি মাসে মামলা হয় গড়ে ১১০ থেকে ১২০টি।

খাগড়াছড়ির লক্ষ্মীছড়ি থানার ওসি মো. আবদুল জব্বার সমকালকে জানান, তার এলাকায় ফৌজদারি অপরাধের ঘটনা খুবই কম। নভেম্বর মাসে মাত্র ২টি মামলা হয়েছে। বছরে তার থানায় ১৫-২০টির বেশি মামলা হয় না।

এ ব্যাপারে অনেকের ধারণা, খুনোখুনি-ধর্ষণ বা অন্য কোনো ফৌজদারি অপরাধে জড়ালেও পাহাড়িরা পুলিশ পর্যন্ত যেতে চান না। তাদের মধ্যে কোনো সমস্যা হলে ‘হেডম্যান’রাই তার মীমাংসা করে থাকেন। তবে বাংলাদেশের প্রচলিত আইন অনুযায়ী, ফৌজদারি অপরাধের ঘটনায় মামলা হওয়া ‘বাধ্যতামূলক’।

অনেকে জানান, পার্বত্য এলাকায় দীর্ঘদিন ধরে নীরব চাঁদাবাজি চলছে। পাহাড়ে সক্রিয় সংগঠনগুলোই এ চাঁদাবাজি করে থাকে। তাদের মতে, নির্মাণ কাজ তো বটেই, ‘কলা-মুরগি বিক্রি করলেও চাঁদা দিতে হয়।’

স্বাভাবিক জীবনে ফিরতে চান কলেজছাত্রী :চলতি বছরের ১৭ আগস্ট রাঙামাটি কলেজের এক ছাত্রীকে অপহরণ করে দুর্বৃত্তরা। তিন মাস পর ১৯ নভেম্বর তাকে উদ্ধার করা হয় গহীন অরণ্য থেকে। উদ্ধারের পর জানা যায়, অপহরণ করে তাকে ধর্ষণসহ নির্মম নির্যাতন করা হয়েছে। পরে রাঙামাটি সদর হাসপাতালে তার ডাক্তারি পরীক্ষা ও চট্টগ্রাম ক্রাইসিস সেন্টারে ডিএনএ পরীক্ষা করা হয়।

উদ্ধার হওয়া ছাত্রী সমকালকে জানান, অপহরণের কয়েক মাস আগে থেকে তাকে ইউপিডিএফের হয়ে কাজ করার প্রস্তাব দেওয়া হচ্ছিল। তবে তিনি তাতে রাজি হচ্ছিলেন না। ১৭ আগস্ট তাকে বাসার কাছ থেকে অপহরণ করে একটি সিএনজি অটোরিকশায় তুলে নেওয়া হয়। এরপর দিনের পর দিন তার ওপর নির্যাতন চালানো হয়। প্রাণের ভয়ে এখন রাঙামাটি ছেড়ে খাগড়াছড়িতে অবস্থান করছেন ওই তরুণী। লেখাপড়া বন্ধ হয়ে গেছে তার। তার দাবি, যারা তার জীবন তছনছ করেছে, তাদের দৃষ্টান্তমূলক শাস্তি নিশ্চিত করা হোক।

এ ব্যাপারে রাঙামাটি সদর থানার ওসি মীর জাহিদুল হক বলেন, এ ঘটনায় ইউপিডিএফের কয়েকজনকে আসামি করে মামলা হয়েছে। তিনজন গ্রেফতার হয়েছে। ডিএনএ প্রতিবেদন পেলে পরবর্তী আইনি পদক্ষেপ নেওয়া হবে। তিনি বলেন, কোনো অপরাধের ঘটনায় পাহাড়ি জনগোষ্ঠীকে মামলা করতে বলা হলে তারা জানতে চান, তাদের নিরাপত্তা দেবে কে? আর এটাও বাস্তবতা, গহীন জঙ্গলে তাদের সবসময় নিরাপত্তা দেওয়া সম্ভব নয়।

Editor in Chief : Sayed Shakil
Office: Evan plaza, sador model thana road, cox’sbazar-4700. Email: dailycoxsbazar@gmail.com / phone: 01819099070
অনুমতি ছাড়া অথবা তথ্যসূত্র উল্লেখ না করে এই ওয়েব সাইট-এর কোন অংশ, লেখা বা ছবি নকল করা বা অন্য কোথাও প্রকাশ করা বেআইনী