সংবাদ শিরোনাম

অনেক সমীকরণ এখনও বাকি একাদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচন

একাদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনের মনোনয়নপত্র বাছাই শেষ। এখন চলছে বাতিল হওয়া প্রার্থীদের মনোনয়ন ফিরে পেতে আপিলের পালা। আপিলের শুনানি নিষ্পত্তি হবে আগামীকাল থেকে শনিবার পর্যন্ত। এরপরই নির্বাচন কমিশন এই নির্বাচনে বিভিন্ন দলের বৈধ প্রার্থীদের প্রতীক বরাদ্দ দেবে ১০ ডিসেম্বর। বরাদ্দকৃত প্রতীক নিয়ে সেদিন থেকেই আনুষ্ঠানিকভাবে নির্বাচনী প্রচারণায় নামবেন প্রার্থীরা। কিন্তু এরই মধ্যে নির্বাচন কমিশনের যাচাই-বাছাইয়ে বিভিন্ন রাজনৈতিক দলের রেকর্ড পরিমাণ প্রার্থীর মনোনয়ন বাতিল হওয়ায় নির্বাচনী রাজনীতিতে নতুন মাত্রা যুক্ত হয়েছে। সামনে চলে আসছে ভোটের মাঠের বেশকিছু সমীকরণ। জয় পরাজয়ের লক্ষ্য নিয়ে নির্বাচনী মাঠে নামতে যাওয়া রাজনৈতিক দলগুলো এসব সমীকরণ কীভাবে সমাধান করেন, সেদিকেই তাকিয়ে সবাই। এ নিয়ে ব্যস্ত দলগুলোও।

এবার নির্বাচনকে কেন্দ্র করে এরই মধ্যে বেশকিছু রেকর্ডের ঘটনা ঘটেছে। বিশেষ করে গত নবম ও দশম জাতীয় সংসদ নির্বাচনের তুলনায় এবার মনোনয়ন বাতিল হয়েছে বেশি। এর মধ্যে সবচেয়ে বেশি বাতিল হয়েছে বিএনপির প্রার্থীদের। অবশ্য অন্য যেকোনোবারের চেয়ে এবার প্রতি আসনে দলের মনোনয়নপত্রও জমা পড়েছিল বেশি। অর্থাৎ ২৯৫টি আসনে বিএনপির ৬৯৬ জন মনোনয়নপত্র জমা দিয়েছিলেন। কোনো কোনো আসনে দুই থেকে ৯ জন বিকল্প প্রার্থীও দেয় দলটি। তবুও শেষ রক্ষা হয়নি। নিজেদের গাফিলতি এবং আদালতের দণ্ডাদেশ ও খেলাপি ঋণসহ নানা ধরনের ত্রুটিবিচ্যুতির কারণে মনোনয়ন খোয়াতে হয়েছে প্রার্থীদের। এমনও হয়েছে দলের চেয়ারপারসন খালেদা জিয়াসহ অনেক হেভিওয়েট প্রার্থীর মনোনয়নও বাতিল হয়েছে। ছয়টি আসনে বিএনপির কোনো প্রার্থীই নেই। ঋণ খেলাপি হওয়ায় ঢাকার ১৫টি আসনের মধ্যে চারটি গুরুত্বপূর্ণ আসনে হেভিওয়েট প্রার্থীদের মনোনয়ন বাতিল হয়েছে। অন্য আসনগুলোতেও মনোনয়ন খোয়াতে হয়েছে হেভিওয়েট প্রার্থীদের।

৩০০ আসনের মনোনয়নপত্র বাছাই শেষে গত সোমবার নির্বাচন কমিশন জানিয়েছে, এবারের নির্বাচনে মনোনয়নপত্র বাছাইয়ে আওয়ামী লীগের তিনটি, জাতীয় পার্টির ৩৮টি ও বিএনপির ১৪১টি মনোনয়নপত্র বাতিল হয়েছে। স্বতন্ত্র প্রার্থীর মনোনয়নপত্র বাতিল হয়েছে ৩৮৪টি। ইসি কর্মকর্তারা জানান, বাছাইয়ে বৈধভাবে মনোনীত প্রার্থীর মধ্যে আওয়ামী লীগের ২৭৮ জন, জাতীয় পার্টির ১৯৫ জন ও বিএনপির ৫৫৫ জন রয়েছেন। মোট জমা পড়েছিল ৩০৬৫টি মনোনয়নপত্র। এর মধ্যে বৈধ হয়েছে ২২৭৯টি ও বাতিল হয়েছে ৭৮৬টি। ইসির যাচাই-বাছাই শেষে এমন তথ্যও মিলেছে যে, মনোনয়নপত্র বাছাইয়ের পর ৩৯টি আসনে আওয়ামী লীগের এবং ১০টি আসনে বিএনপির কোনো প্রার্থী রইল না। এর মধ্যে মনোনয়নপত্র জমা দেওয়ার সময় ৩৬ আসনে নৌকার প্রার্থী ছিল না। পরে বাছাইয়ে বাতিল হয়েছে তিনটি। অনুরূপভাবে ৫টি আসনে বিএনপির কেউই মনোনয়নপত্র জমা দেয়নি। পরে ৫টি আসন বাতিল হয়।

এর ফলে যে ৩৬ আসনে আওয়ামী লীগের কোনো প্রার্র্থী এখন নেই, এসব আসন দলটি জোটের শরিক দলগুলোর জন্য রেখেছে কি না; সেটি এখন দেখার বিষয়। একইভাবে যে ১৭টি আসনে দলের প্রত্যয়ন নিয়ে একাধিক প্রার্থী মনোনয়নপত্র দাখিল করেছেন ও বৈধ হয়েছেন; সেখানে শেষ পর্যন্ত কে টিকবেন; সে প্রশ্নও সবার মধ্যে। ফলে এসব সমীকরণ এখন ক্ষমতাসীনদের সামনে। কেননা আওয়ামী লীগের সঙ্গে জাতীয় পার্টি ও বিকল্প ধারার আসন ভাগাভাগি নিয়ে সমঝোতা এখনো হয়নি। এসব সমীকরণের সমাধান পেতে অপেক্ষা করতে হবে মনোনয়নপত্র প্রত্যাহারের শেষ দিন ৯ ডিসেম্বর পর্যন্ত। তারপরই জানা যাবে আওয়ামী লীগ নেতৃত্বাধীন জোটের কোন দল কতটি আসনে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করছে।

দলীয় সূত্রগুলো বলছে, আওয়ামী লীগ জোট শরিকদের ৬৫-৭০টি আসন ছাড়তে পারে। তবে শেষ মুহূর্তের পরিস্থিতিতে এই সংখ্যা কিছু কমতেও পারে। শরিকদের সঙ্গে সমঝোতার পর প্রতি আসনে একজন প্রার্থী রেখে অন্যদের মনোনয়নপত্র প্রত্যাহার করা হবে।

অন্যদিকে, দুর্নীতিসহ নানা অপরাধের মামলায় জর্জরিত বিএনপি এবার প্রায় প্রতিটি আসনে একাধিক প্রার্থীকে প্রত্যায়ন দিয়ে মনোনয়নপত্র দাখিল করিয়ে রেখেছে। দলের নেতারা বলছেন, কোনো কারণে কারো প্রার্থী হওয়া আটকে গেলে বিকল্প প্রার্থী ভোট করবেন। এ কারণেই আওয়ামী লীগের চেয়ে আড়াই গুণ বেশি মনোনয়নপত্র জমা হয়েছে বিএনপির নামে। কিন্তু বিভিন্ন আসন থেকে হেভিওয়েট প্রার্থীদের মনোনয়ন বাতিল হওয়ায় এবং বাতিলের ফলে শূন্য আসনগুলোতে এখন কাকে ও কীভাবে প্রার্থী দেবে বিএনপি সেদিকেও তাকিয়ে সবাই। তাছাড়া জাতীয় ঐক্যফ্রন্টের সঙ্গে আসন ভাগাভাগি নিয়েও বিএনপির সমঝোতা এখনো চূড়ান্ত হয়নি। ফলে এই জোটেও কোন দল কতটি আসনে লড়বে তা জানার জন্য অপেক্ষা করতে হবে ৯ ডিসেম্বর পর্যন্ত।

অবশ্য এসব নির্বাচনী সমীকরণ ও বিদ্যমান সংকট সমাধানে এরই মধ্যে ভাবতে শুরু করেছে আওয়ামী লীগ ও বিএনপি এবং এই দুই দলের নেতৃত্বাধীন জোটের শরিক দলগুলো। নৌকাকে জেতাতে মাঠে নেমেছে দল। মূল লক্ষ্য তৃণমূলে ঐক্য। মনোনয়ন যাচাই-বাছাইয়ে বিদ্রোহীরা বাদ পড়া দলে স্বস্তি দেখা দিয়েছে। কেন্দ্র থেকে তৃণমূলে সতর্ক মনিটরিং করা হচ্ছে। যেকোনো সংকট সমাধানে প্রয়োজনে প্রধানমন্ত্রী ও দলের সভাপতি শেখ হাসিনা কথা বলবেন বলে জানিয়েছেন। অন্যদিকে, আওয়ামী লীগ দলীয় সূত্র মতে, প্রায় আসনেই তৃণমূলে এখন ঐক্য বিরাজ করছে। যেসব আসনে দলের নেতারা মনোনয়নবঞ্চিত হয়েছেন কিংবা যেসব আসনে এমপি-মন্ত্রীদের সঙ্গে স্থানীয় নেতাকর্মীদের দূরত্ব ছিল; সেখানে ঐক্য আসতে শুরু করেছে। সবারই লক্ষ্য নৌকা প্রতীকের জয় ও পুনরায় ক্ষমতায় আসা। বিশেষ করে কিছু কিছু আসনে মনোনয়নবঞ্চিতরা স্বতন্ত্র প্রার্থী হওয়া নিয়ে অস্বস্তি ছিল দলে, মনোনয়ন যাচাই-বাছাই শেষে তাদের অধিকাংশই বাতিল হওয়ায় দলে স্বস্তি এসেছে। এছাড়া যেসব আসনে ছোটো-খাটো সমস্যা রয়েছে, সেগুলো নিরসন করতে কাজ শুরু করেছেন দলের কেন্দ্রীয় নেতারা। একই সঙ্গে যেসব আসনে আওয়ামী লীগের একাধিক প্রার্থী রয়েছে সেখানেও কীভাবে একক প্রার্থী নিশ্চিত করা যায় তাও দল ভাবছে বলে জানান দলের নীতিনির্ধারকরা। তারা জানান, ওইসব আসনে প্রার্থীদের ব্যাপারে খোঁজখবর নেওয়া হচ্ছে। এতে যার অবস্থান সবচেয়ে ভালো হবে তার পক্ষে নৌকা প্রতীক নিশ্চিত করতে দলের পক্ষ থেকে চিঠি দেওয়া হবে।

জানা গেছে, এবার একটি আসনে আওয়ামী লীগের ৫২টি মনোনয়ন ফরম কেনার মতো রেকর্ডও হয়েছে। আশঙ্কা ছিল এসব বিদ্রোহী প্রার্থীদের নিয়ন্ত্রণ করতে হিমশিম খেতে হবে দলকে। কিন্তু এখন পর্যন্ত তা হয়নি। বরং বেশির ভাগ আসনেই এসব প্রার্থী নৌকা প্রতীকের নিচে সমবেত হচ্ছেন। অনৈক্য ও বিভেদ ভুলে দলের সভাপতি শেখ হাসিনার প্রতি শ্রদ্ধা রেখে কাজ করছেন।

এ ব্যাপারে আওয়ামী লীগের সাংগঠনিক সম্পাদক আ ফ ম বাহাউদ্দিন নাছিম বলেন, প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার সিদ্ধান্তই চূড়ান্ত। সেই সিদ্ধান্তের প্রতি শ্রদ্ধা রেখেই নৌকার প্রার্থীর পক্ষে সবাই কাজ করছে। এ প্রশ্নে কোনো আপস নেই।

অন্যদিকে, যেকোনো প্রতিকূল পরিবেশেও শেষ পর্যন্ত ভোটে থাকার নীতিগত সিদ্ধান্ত নিয়েছে বিএনপি। ইসির যাচাই-বাছাইয়ে বিপুুলসংখ্যক প্রার্থী বাতিল হওয়ার পরও একক প্রার্থী তালিকা তৈরি করছে দলটি। নির্বাচন কমিশনে উত্তীর্ণ হওয়ার পর যেকোনো দিন ১৫০ থেকে ২০০ আসনে দলীয় প্রার্থী তালিকা ঘোষণা করতে পারে। এ নিয়ে দলের নীতিনির্ধারকরা কাজ করছেন বলে দলীয় সূত্রগুলো জানিয়েছে।

দলের নীতিনির্ধারক নেতারা জানান, জাতীয় ঐক্যফ্রন্ট ও ২০ দলীয় জোটের নেতাদের সঙ্গে এখনো আসন বণ্টন চূড়ান্ত হয়নি। এ নিয়ে এখনো আলোচনা চলছে। তবে তারা আশা করছেন ৮ ডিসেম্বরের মধ্যেই দল, জোট ও ফ্রন্টের ধানের শীষের একক প্রার্থী তালিকার চিঠি দেওয়া হতে পারে।

এ ব্যাপারে দলের মহাসচিব মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর বলেন, আমরা দলের চেয়ারপারসন খালেদা জিয়ার মুক্তি আন্দোলনের অংশ হিসেবে নির্বাচনে যাচ্ছি। কিন্তু দিন যতই যাচ্ছে পরিস্থিতি অবনতির দিকে যাচ্ছে। লেভেল প্লেয়িং ফিল্ড দূরের কথা কোনো ধরনের ব্যবস্থাই নিচ্ছে না নির্বাচন কমিশন। যেকোনো পরিস্থিতিতে আমরা নির্বাচনে থাকতে চাই। কিন্তু অবস্থা যদি একেবারেই প্রতিকূলে চলে যায় ও আরো অবনতি হয় তাহলে নির্বাচনের ব্যাপারে যেকোনো সিদ্ধান্ত নিতে পারি আমরা।

Editor in Chief : Sayed Shakil
Office: Evan plaza, sador model thana road, cox’sbazar-4700. Email: dailycoxsbazar@gmail.com / phone: 01819099070
অনুমতি ছাড়া অথবা তথ্যসূত্র উল্লেখ না করে এই ওয়েব সাইট-এর কোন অংশ, লেখা বা ছবি নকল করা বা অন্য কোথাও প্রকাশ করা বেআইনী