সংবাদ শিরোনাম

ভুয়া ডাক্তারদের ‘বৈধতা’ দিচ্ছে বিএমডিসি!

অনলাইন ডেস্ক : ভুয়া চিকিৎসকদের পেশাগত ‘বৈধতা’ দেওয়ার অভিযোগ উঠেছে খোদ বাংলাদেশে মেডিকেল অ্যান্ড ডেন্টাল কাউন্সিলের (বিএমডিসি) বিরুদ্ধে।  চিকিৎসকরা বলছেন, বিএমডিসিই দুর্নীতির মাধ্যমে ভুয়া চিকিৎসকদের প্র্যাকটিস করার বৈধতা দিচ্ছে। তাদের অভিযোগ, এতদিন কোনও চিকিৎসকের সনদ নিয়ে সন্দেহ হলে তা যাচাই করার উপায় ছিল বিএমডিসির দেওয়া রেজিস্ট্রেশন নম্বর চেক করা। কেবল বিএমডিসির এই নম্বর দিয়েই প্রকৃত চিকিৎসকদের নির্ণয় করা যেতো। এসব কারণেই চিকিৎসকদের ভিজিটিং কার্ড ও প্রেসক্রিপশনে বিএমডিসির দেওয়া রেজিস্ট্রেশন নম্বর উল্লেখ করা বাধ্যতামূলক ছিল। কিন্তু এখন বিএমডিসি নিজেই সেসব নিয়ম-কানুন মানছে না। দুর্নীতির মাধ্যমে ভুয়া চিকিৎসকদেরও রেজিস্ট্রেশন নম্বর দিচ্ছে বলে অভিযোগ করেন তারা। তাদের মতে, দেশের স্বাস্থ্য ব্যবস্থাকে ধ্বংস করার জন্য এর চেয়ে ক্ষতিকার কিছু হতে পারে না।

সংশ্লিষ্টরা বলছেন, দেশে চিকিৎসক হিসেবে প্র্যাকটিসের পূর্ব শর্ত হলো—সরকার অনুমোদিত কোনো মেডিকেল বা ডেন্টাল কলেজ থেকে এমবিবিএস বা বিডিএস পাস করে একবছরের ইন্টার্ন করা। আর বিএমডিসি-ই এই অনুমোদনের কাজ করে থাকে। তারা বলছেন, বাংলাদেশে হাজার হাজার ভুয়া চিকিৎসক রয়েছেন। তারা দেশের বিভিন্ন স্থানে প্র্যাকটিস করে যাচ্ছেন, চিকিৎসা দিচ্ছেন। অনেকেই কোনো মেডিকেলে না পড়েও বিএমডিসি থেকে রেজিস্ট্রেশন নম্বর ম্যানেজ করে দিব্যি ‘ডাক্তারি’ করে যাচ্ছেন বলেও তারা অভিযোগ করেন।

ভুয়া চিকিৎসকদের সম্পর্কে অনুসন্ধান করতে গিয়ে বেশ কয়েকজনের তথ্য পাওয়া গেছে। তাদেরই একজন রেজাউল করিম। তিনি রাজশাহীতে অ্যানেস্থেসিওলজিস্ট হিসেবে পোস্ট গ্রাজুয়েশন করেছিলেন বলে দাবি করেছেন। এরপর বিএসএমএমইউতে ডিপ্লোমা ইন অ্যানেস্থেসিয়ায় ভর্তি পরীক্ষায় সুযোগ পেয়ে তিনি কাজ করেছেন। কিন্তু পরে জানা গেছে, তিনি এমবিবিএসই পাস করেননি। সিলেটের জালালাবাদ রাগীব রাবেয়া মেডিকেল কলেজ থেকে ভুয়া সার্টিফিকেট বানিয়ে বিএমডিসি থেকে রেজিস্ট্রেশন নিয়েছেন। তারপর থেকে দীর্ঘদিন ধরে ৬০৯১৯ নাম্বার নিয়ে ‘ডাক্তারি’ করে গেছেন। বিষয়টি নিয়ে পত্রিকায় সংবাদ প্রকাশিত হলে বিএমডিসি তার লাইসেন্স বাতিল করে।

এমনই আরেকজন ভুয়া চিকিৎসক একেএম আলমগীর। তার বিএমডিসি রেজিস্ট্রেশন নম্বর ৭৮২২৬। সংশ্লিষ্টরা বলছেন, নম্বর অনুযায়ী তার চিকিৎসক হওয়ার কথা এক থেকে দুই বছর আগে। তিনি উচ্চ মাধ্যমিক পাস করছেন ১৯৭৭ সালে। তার কার্ডে লেখা রয়েছে ঢাকার ন্যাশনাল মেডিকেল কলেজের মেডিসিন, হৃদরোগ ও অ্যাজমা রোগের অধ্যাপক। ইতোমধ্যে ভ্রাম্যমাণ আদালত তাকে ভুয়া চিকিৎসক হিসেবে দুই বছরের কারাদণ্ডও দিয়েছেন।

ওমর ফারুকের রেজিস্ট্রেশন নম্বর ছিল ৮৪৭৩৩। চাঁদপুরের মতলবে তিনি দীর্ঘদিন ধরে চিকিৎসা দিয়ে আসছিলেন। এলাকায় দীর্ঘদিন কার্ডিওলজি, মেডিসিন ও গাইনি রোগের বিশেষজ্ঞ চিকিৎসক হিসেবে কাজ করেছেন। প্রতিষ্ঠা করেছিলেন পল্লীমঙ্গল হাসপাতাল। সেখানে তিনি রোগীদের অস্ত্রোপচারও করতেন। চাঁদপুরের সিভিল সার্জন সূত্রে জানা গেছে, ওমর ফারুক একজন আয়ুর্বেদিক হেকিম, তার এমবিবিএস বা সমমানের পরীক্ষার কোনো সনদ নেই।

এসব চিকিৎসকদের বিরুদ্ধে অভিযোগ পাওয়ার পর আজ মঙ্গলবার (১২ ফেব্রুয়ারি) বিএমডিসির ওয়েবসাইটে গিয়ে তাদের প্রত্যেকের নম্বর লিখে অনুসন্ধান করলেই এসব চিকিৎসকের নম্বরসহ ছবি ভেসে আসে। অথচ তারা কেউ এমবিবিএস পাস নন। এসব ভুয়া চিকিৎসকের কেউ কেউ ভ্রাম্যমাণ আদালতে সাজাপ্রাপ্তও।

এই বিষয়ে নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক একাধিক তরুণ চিকিৎসক সারাবাংলাকে বলেন, কিছুদিন আগে ঘুষ দেওয়া-নেওয়ার অভিযোগ পেয়ে দুদক বিএমডিসির অফিসে গিয়ে জিজ্ঞাসাবাদ করেছে। অথচ তারা যে বছরের পর বছর ভুয়া ডাক্তারদের রেজিস্ট্রেশন দিয়ে যে সমাজে অসংখ্য মানুষ মারার যন্ত্র ছেড়ে দিচ্ছে, সেদিকে কারও খেয়াল নেই।

নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক আরেক চিকিৎসক বলেন, এভাবে যদি জেনুইন রেজিস্ট্রেশন নম্বর পাওয়া যায়, তাহলে অনর্থক কষ্ট করে এমবিবিএস পড়া কেন? তিনি আরও বলেন, শুধু বিএমডিসি নয় প্রতিটা মেডিকেল শিক্ষা প্রতিষ্ঠানের শিক্ষার্থীদের ইউনিক রেজিস্ট্রেশন নম্বর দেওয়া হোক, যা পরবর্তী সময়ে বিএমডিসিও ব্যবহার করতে পারবে। মিনিমাম ডাটাবেইজ (যেমন: নাম, শিক্ষা প্রতিষ্ঠানের নাম ও ছবি) যাচাই করার জন্য উন্মুক্ত রাখা হোক। দুর্নীতির সিস্টেম বন্ধ না করলে, দুর্নীতি বন্ধ করা যাবে না।

জানতে চাইলে ইব্রাহিম কার্ডিয়াক হাসপাতালের ভাসকুলার সার্জারি বিভাগের সহকারী অধ্যাপক ডা. এসএমজি সাকলায়েন রাসেল বলেন, ‘এর আগে নামের আগে অবৈধভাবে ডাক্তার লিখলে ধরা যেতো। বিএমডিসির ওয়েবসাইটে গিয়ে যেকোনো চিকিৎসকের রেজিস্ট্রেশন নম্বর লিখলেই বোঝা যেতো তিনি ভুয়া না প্রকৃত চিকিৎসক।’

এসব অভিযোগের বিষয়ে জানতে বাংলাদেশ মেডিকেল অ্যান্ড ডেন্টাল কাউন্সিলের (বিএমডিসি) রেজিস্ট্রার জাহিদুর রহমান বসুনিয়ার মোবাইলফোনে একাধিক বার কল দিয়েও বন্ধ পাওয়া গেছে। তার মোবাইলফোনে এসএমএস পাঠিয়েও এই প্রতিবেদন লেখাপর্যন্ত মঙ্গলবার রাত সাড়ে দশটা পর্যন্ত কোনো বক্তব্য পাওয়া যায়নি।

Editor in Chief : Sayed Shakil
Office: Evan plaza, sador model thana road, cox’sbazar-4700. Email: dailycoxsbazar@gmail.com / phone: 01819099070
অনুমতি ছাড়া অথবা তথ্যসূত্র উল্লেখ না করে এই ওয়েব সাইট-এর কোন অংশ, লেখা বা ছবি নকল করা বা অন্য কোথাও প্রকাশ করা বেআইনী