সংবাদ শিরোনাম

লক্ষাধিক কোটি টাকার খেলাপি ঋণ আটকা

অনলাইন ডেস্ক : অর্থঋণ আদালতের মামলা নিষ্পত্তিতে দীর্ঘসূত্রতার কারণে হাজার হাজার কোটি টাকার খেলাপি ঋণ অনাদায়ী থেকে যাচ্ছে। উল্টো মামলাগুলোর পেছনে ব্যাংকের যেমন ব্যয় হচ্ছে, তেমনি ব্যবস্থাপনায় সৃষ্টি হচ্ছে জটিলতা। সরকারের নীতিনির্ধারক, ব্যবসায়ী ও বিশেষজ্ঞ মহলে বছরের পর বছর ধরে বিষয়টি নিয়ে আলোচনা-সমালোচনা হলেও এ বৃত্ত থেকে বের হতে পারছে না ব্যাংকগুলো। এ অবস্থায় অর্থঋণ আদালতের মামলা দ্রুত নিষ্পত্তির পথ খুঁজছে অর্থ মন্ত্রণালয়। এজন্য আদালতের বাইরে মামলা নিষ্পত্তির ব্যবস্থা ও আইন সংশোধন করা হবে বলে সংশ্নিষ্ট সূত্রে এ তথ্য জানা গেছে। সূত্র জানায়, সরকার অর্থনীতির স্বার্থে খেলাপি ঋণ কমিয়ে আনতে চায়। আর খেলাপি ঋণ কমানোর অন্যতম উপায় হচ্ছে অর্থঋণ আদালতের মামলা দ্রুত নিষ্পত্তির ব্যবস্থা করা। সেজন্য সারাদেশের কোনো আদালতে কতটি মামলা রয়েছে, কেন মামলা নিষ্পত্তি হচ্ছে না এবং কী উদ্যোগ নিলে দ্রুত নিষ্পত্তি হবে, সে বিষয়ে ব্যাংকগুলো থেকে তথ্য ও মতামত সংগ্রহ করেছে অর্থ মন্ত্রণালয়ের আর্থিক প্রতিষ্ঠান বিভাগ। সম্প্রতি বাংলাদেশ ব্যাংকে চিঠি পাঠিয়ে এসব তথ্য সংগ্রহ করা হয়েছে। বাংলাদেশ ব্যাংক অর্থঋণ আদালতের মামলা, সার্টিফিকেট মামলা, দেউলিয়া ও ফৌজদারি আদালতের মামলাসহ সব ধরনের মামলার তথ্য প্রতিবেদন আকারে আর্থিক প্রতিষ্ঠান বিভাগে পাঠিয়েছে। বাংলাদেশ ব্যাংকের তথ্য অনুযায়ী, ২০১৮ সালের ডিসেম্বর শেষে সারাদেশের অর্থঋণ আদালতে ব্যাংকগুলোর করা মোট মামলার সংখ্যা দাঁড়িয়েছে ৫৭ হাজার ৪১৬টি। এসব মামলায় ১ লাখ ১০ হাজার ৭২৬ কোটি টাকা পাওনা রয়েছে ব্যাংকগুলোর। এর মধ্যে রাষ্ট্রমালিকানাধীন ছয় বাণিজ্যিক ব্যাংকের মামলার সংখ্যা ১৯ হাজার ৬৩টি। এতে পাওনা অর্থের পরিমাণ ৪৯ হাজার ৭৮৩ কোটি টাকা। আর বিশেষায়িত ব্যাংকগুলো অর্থঋণ আদালতে ৭ হাজার ৩৯৪টি মামলা করেছে, যার বিপরীতে ২ হাজার ৮৬১ কোটি টাকা পাওনা। অর্থঋণ আদালতে দেশের বেসরকারি ব্যাংকগুলোর ২৮ হাজার ৫৮২টি মামলা রয়েছে। এসব মামলায় ৫২ হাজার ৩৪০ কোটি টাকা পাওনা। আর ব্যাংকবহির্ভূত আর্থিক প্রতিষ্ঠানগুলোর অর্থঋণ আদালতে ২ হাজার ৩৭৭টি মামলা রয়েছে। এসব মামলায় ৫ হাজার ৭৪২ কোটি টাকা পাওনা। মামলাগুলো নিষ্পত্তি না হওয়ায় এই বিপুল পরিমাণ অর্থ আটকে আছে।

অন্যদিকে, ব্যাংকের ঋণ বিষয়ে হাইকোর্টে ৫ হাজার ৩৭৬টি রিট মামলা রয়েছে, যার বিপরীতে ৫২ হাজার ৭৭৫ কোটি টাকা আটকে আছে। এসব রিটের মাধ্যমে আবেদনকারীরা আদালত থেকে স্থগিতাদেশ পেয়েছেন। ফলে এসব ঋণ গ্রহীতাদের থেকে ব্যাংক টাকাও পাচ্ছে না, আবার তাদের ঋণখেলাপি হিসেবে উল্লেখও করতে পারছে না। শীর্ষ ব্যাংকাররা এই ‘রিট আবেদনই’ খেলাপি ঋণ আদায়ে সবচেয়ে বড় বাধা হিসেবে দেখছেন। 

অগ্রণী ব্যাংকের চেয়ারম্যান জায়েদ বখত এ বিষয়ে সমকালকে বলেন, এক্ষেত্রে পর্যাপ্ত সংখ্যক আদালত নেই। আবার বিচারকের ঘাটতি রয়েছে। আবার বিচার প্রক্রিয়ার মধ্যেই সময়ক্ষেপণের সুযোগ রয়েছে। অর্থঋণ আদালতে মামলা শেষ হওয়ার পরে গ্রাহক উচ্চ আদালতে রিট করেন। যা বছরের পর বছর ধরেও শেষ হয় না। দ্রুত মামলা নিষ্পত্তির জন্য অর্থঋণ বিষয়ে ডেডিকেটেড বেঞ্চ করতে হবে। পাশাপাশি রিট করার ক্ষেত্রে কিছু শর্ত আরোপ করা দরকার। যাতে যে কেউ যে কোনো সময় রিট করতে না পারে। আবার রিট করার সময় যাতে কিছু টাকা জমা দিতে হয়, সে ধরনের ব্যবস্থা রাখতে হবে। 

অগ্রণী ব্যাংকের ব্যবস্থাপনা পরিচালক শামস উল ইসলাম সমকালকে বলেন, প্রয়োজন অনুযায়ী আদালত ও বিচারক নেই। আবার রিটের কারণে দেরি হচ্ছে। এছাড়া আইনজীবীদের সক্রিয় ভূমিকা না থাকা, ব্যাংকগুলোতে আইন কর্মকর্তা না থাকাও একটি কারণ। তিনি বলেন, দ্রুত নিষ্পত্তির জন্য আদালত বাড়াতে হবে। আদালতের বাইরে নিষ্পত্তির ব্যবস্থা করতে হবে। 

পূবালী ব্যাংকের ব্যবস্থাপনা পরিচালক এমএ হালিম চৌধূরী বলেন, অর্থঋণ আদালতগুলোতে বিচারক কম। ঢাকা ও চট্টগ্রামে অনেক মামলা, কিন্তু সে অনুযায়ী বিচারক নেই। আবার অন্যান্য জেলায় মামলা কম থাকলেও বিচারক আছেন। এক্ষেত্রে সমন্বয় দরকার। আবার রিট মামলা নিষ্পত্তির অন্যতম বাধা। কারণ গ্রাহক এক আদালতে রিটে হেরে আরেক আদালতে চলে যান। এ যেন একটা খেলা চলছে। 

এদিকে সম্প্রতি আর্থিক প্রতিষ্ঠান বিভাগের সচিব মো. আসাদুল ইসলামের সভাপতিত্বে ব্যাংকগুলোর খেলাপি ঋণ আদায় নিয়ে একটি বিশেষ সভা অনুষ্ঠিত হয়েছে। এতে সোনালী, জনতা, অগ্রণী, রূপালী, বেসিক, বিডিবিএল, বাংলাদেশ ব্যাংক ও আর্থিক প্রতিষ্ঠান বিভাগের কর্মকর্তারা অংশ নেন। খেলাপি ঋণ কমিয়ে আনার উপায় অনুসন্ধান ছিল ওই সভার উদ্দেশ্য। 

সভায় অংশ নেওয়া একজন ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তা জানান, খেলাপি ঋণ আদায়ের জন্য মামলার সুযোগ সৃষ্টি করা হলেও এই মামলা এখন ঋণ আদায়ে এক ধরনের বাধা। নানা কারণে অর্থঋণ আদালতে মামলা নিষ্পত্তিতে সময় লাগছে। বিচারকের অভাব একটি কারণ। তবে অনেক ক্ষেত্রে ব্যাংক ও আইনজীবীদের সমন্বয়হীনতার কারণেও দেরি হচ্ছে। আবার আইনের দুর্বলতাও রয়েছে। উদাহরণ হিসেবে তিনি বলেন, অর্থঋণ আদালত আইন-২০০৩ এর ৩৩(৭) ধারায় সম্পত্তির স্বত্ব ডিক্রিদারের অনুকূলে ন্যস্ত হয়েছে মর্মে ঘোষণামূলক সনদপত্র পাওয়ার পর সম্পত্তির দখল গ্রহণ এবং মিউটেশন করতে জটিলতা সৃষ্টি হয়। ফলে পরবর্তীতে সম্পত্তি বিক্রি করতে পারে না ব্যাংক। এতে মামলায় জিতেও অর্থ আদায় হয় না। 

এর পরিপ্রেক্ষিতে আদালতের বাইরে মামলা নিষ্পত্তির উদ্যোগ নেওয়া হবে। ব্যাংক কোম্পানি আইন-১৯৯১ ও অর্থঋণ আদালত আইন-২০০৩ এ কোনো সংশোধনী আনার দরকার হলে সে উদ্যোগও নেবে সরকার। আদালতগুলোতে বিচারকের সংখ্যা বাড়ানোর উদ্যোগ নিচ্ছে মন্ত্রণালয়। এজন্য আইন মন্ত্রণালয়ের সঙ্গে আলোচনা হচ্ছে। যদিও এর আগে সাবেক অর্থমন্ত্রী আবুল মাল আবদুল মুহিত কয়েকবার অর্থঋণ আদালতের মামলার রিট শুনানিতে আলাদা বেঞ্চ গঠনের সুপারিশ করলেও তা কার্যকর হয়নি। আইনজীবীদের ফি ও মামলার দায়িত্বে থাকা ব্যাংক কর্মকর্তাদের দক্ষতা বাড়ানোর উদ্যোগ নেওয়া হচ্ছে। 

বাংলাদেশ ব্যাংকের প্যানেল আইনজীবী মো. রুহুল আমিন ভূঁইয়া সমকালকে বলেন, অর্থঋণ আদালতের পুরো বিচার প্রক্রিয়াটাই দীর্ঘমেয়াদি। মামলা নিষ্পত্তিতে সময় লাগার অনেকগুলো কারণ রয়েছে। এর মধ্যে যে কারণগুলো সব মামলার ক্ষেত্রে বলা যায়, সেটা হচ্ছে সমন জারিতে অনেক সময় লাগে। বিবাদী পক্ষ নিম্ন আদালত থেকে মামলা উচ্চ আদালতে নিয়ে যায়। উচ্চ আদালতে মামলাজট থাকায় শুনানিতে দেরি হয়। আবার অনেকে রিট মামলা করেন। রিটের চূড়ান্ত শুনানিতেও অনেক সময় লেগে যায়। তিনি বলেন, সমন জারি, রিটের শুনানি দ্রুত করার ব্যবস্থা করতে হবে। এজন্য আদালত, বাদী, বিবাদী, আইনজীবী সবার সমন্বিত উদ্যোগ দরকার। 

Editor in Chief : Sayed Shakil
Office: Evan plaza, sador model thana road, cox’sbazar-4700. Email: dailycoxsbazar@gmail.com / phone: 01819099070
অনুমতি ছাড়া অথবা তথ্যসূত্র উল্লেখ না করে এই ওয়েব সাইট-এর কোন অংশ, লেখা বা ছবি নকল করা বা অন্য কোথাও প্রকাশ করা বেআইনী