Oops! It appears that you have disabled your Javascript. In order for you to see this page as it is meant to appear, we ask that you please re-enable your Javascript!
সংবাদ শিরোনাম

আতঙ্ক পিছু ছাড়ছে না

অনলাইন ডেস্ক : চকবাজার অগ্নিকা-ে চুড়িহাট্টার হাজি ওয়াহেদ ম্যানশনে আগুনের তা-ব ছিল সর্বাধিক। এর ঠিক পেছনের ভবনটিই নাসিরউদ্দিনের। ভবনটির তৃতীয় তলায় তার সপরিবারে বসবাস। গত বুধবার রাতের খাবার খেয়ে সোফায় বসে কার্টুন দেখছিল নাসিরউদ্দিনের ৫ বছরের নাতিন শোভা। পাশের ঘরে হোমওয়ার্ক করছিল তার ভাই শাকিল (৯)। ঘড়ির কাঁটা যখন রাত ১০টা বেজে ৩২ মিনিট ২৩ সেকেন্ড, তখন তীব্র ঝাঁকুনিতে কেঁপে ওঠে ওয়াহেদ ম্যানশন; নাসিরউদ্দিনের ভবনটিও হেলে-দুলে ওঠে। আচমকা এমন ঘটনায় হতবাক শোভা দৌড়ে মায়ের কাছে যায়, তার কোলে ঝাঁপিয়ে পড়ে; শাকিলও ততক্ষণে মায়ের পাশে চলে এসেছে। ওদের মা সুমীর চোখ চলে যায় বারান্দা গলে ওয়াহেদ ম্যানশনের দিকে। সেখানে আগুনের লেলিহান শিখা।

কালবিলম্ব না করে তিনি সন্তানদের নিয়ে প্রায় দৌড়ে সিঁড়ি বেয়ে নামেন। এর পর ভবনের পেছনের নোংরা আবর্জনায় ভরা একটি নালাসম গলি দিয়ে প্রাণ নিয়ে ছুটতে থাকেন। শোভা-শাকিলের বুড়ো দাদির বয়স ষাট বছর পেরিয়েছে। তিনিও সেই আড়াই ফুট চওড়া গলি দিয়ে ঊর্ধ্বশ্বাসে ছুট লাগান। শুধু তারাই নন, ততক্ষণে আশপাশের সব ভবনের বাসিন্দারাই নেমে গেছেন, ছুটছেন প্রাণ বাঁচানোর দায়ে। পুরো দৃশ্যপট দেখে মনে হতে পারে, যুদ্ধ বেধে গেছে; যে কোনো সময় শত্রুপক্ষের গোলায় প্রাণ যাবে; তাই এমন পলায়ন।

স্মরণকালের ভয়াবহ চকবাজার অগ্নিকা-ের পর পেরিয়ে গেছে তিন দিন। নিভে গেছে আগুন; উদ্ধার তৎপরতাও শেষ প্রায়। সবকিছু ধীরে ধীরে স্বাভাবিক হয়ে আসছে। কিন্তু স্বাভাবিক হচ্ছে না শিশু শোভা ও শাকিলের মন, তাতে ভর করেছে মারাত্মক আতঙ্ক। বাড়িতে এলে পুড়ে মরতে হবে ভয়ে বাসা ছেড়ে পাশের এলাকায় এক আত্মীয়ের বাড়িতে আশ্রয় নিয়েছে। গত শুক্রবার শোভাকে ওর বাবা আশরাফউদ্দিন স্বাধীন একবার বাসায় নিয়ে এসেছিলেন। কিন্তু আতঙ্কে নীল হয়ে গিয়েছিল শিশুটির মুখ; কাঁদতে কাঁদতে বলছিল, ‘বাবা, আমাকে এখান থেকে নিয়ে যাও। নইলে আমি আগুনে পুড়ে যাব, মরে যাব।’

গতকাল আমাদের সময়কে এমন তিক্ত অভিজ্ঞতার কথা জানান সুমী। অভিন্ন মন্তব্য চুড়িহাট্টার ওয়াহেদ ম্যানশনের পার্শ্ববর্তী ভবনের বাড়িওয়ালা আসলাম, নাসিরউদ্দিন, মাইনুদ্দিন, নাজিমউদ্দিন, মাখন হাজি, লাভলু, হাজি সুলতান ও কাইয়ুমের বাড়ির ভাড়াটিয়া ও দোকানদারদেরও। ওইসব ভবনে বসবাসকারী অনেকেই গতকাল বিকাল পর্যন্ত নিজ ঘরে ফেরেননি আতঙ্কে। সপরিবারে কবে ফিরবেন তা অজানা বলে জানিয়েছেন কেউ কেউ। শুধু শোভা-শাকিল কিংবা ওদের মা সুমীই নন, আশপাশের বাড়ির শিশু-যুবা-বৃদ্ধ সবার মনেই জেঁকে বসেছে ভয়াল আতঙ্ক।

শুধু ওয়াহেদ ম্যানশন ও পাশের ক্ষতিগ্রস্ত ৪টি ভবনের বাসিন্দারাই নন, পুরান ঢাকার অধিকাংশ মানুষের মধ্যেই চকবাজার অগ্নিকা-ের পর ছড়িয়ে পড়েছে আতঙ্ক। তাদের এ আতঙ্কের কারণ দুটি। প্রথমত গত বুধবার রাতের ভয়াবহ অগ্নিকা-ের তিক্তকর অভিজ্ঞতা এবং দ্বিতীয়ত চকবাজার ও আশপাশের এলাকার অর্থাৎ পুরান ঢাকার আবাসিক ভবনগুলোতে যেসব গুদাম রয়েছে, সেসবের অধিকাংশ গুদাম থেকেই এখনো সরিয়ে নেওয়া হয়নি রাসায়নিক জাতীয় দাহ্য ও ঝুঁকিপূর্ণ পদার্থের মজুদ।

এদিকে বুয়েটের পরিদর্শক দলের মতামত অনুযায়ী, যে কোনো সময় ধসে পড়তে পারে অগ্নিকা-ে ক্ষতিগ্রস্ত চকবাজারের ভবনগুলোর তিনটি। উপরন্তু এগুলো বিল্ডিং কোড মেনে নির্মাণ করা হয়নি। তাই এসব ভবনের বাসিন্দারা ন্যূনতম ভরসা পাচ্ছেন না বাসায় ফেরার। গতকাল সরেজমিনে চকবাজারের চুড়িহাট্টা তো বটেই, পুরান ঢাকার অনেক এলাকা ঘুরেই দেখা গেছে, প্রায় সব অধিবাসীই কমবেশি আতঙ্কিত। গত বুধবার রাতে চুড়িহাট্টায় ভয়াবহ সেই অগ্নিকা-ের ঘটনায় ওয়াহেদ ম্যানশনসহ প্রায় ভস্মীভূত হয়েছে পাঁচটি ভবন।

আগুনে পুড়ে প্রাণ হারিয়েছেন ৬৭ জন। এ তালিকায় ওয়াহেদ ম্যানশনের পাশের ভবনের মালিক নাসিরউদ্দিনের একমাত্র পুত্র মো. ওয়াসিউদ্দিন মাহিদও রয়েছেন। সুমীর স্বামী আশরাফউদ্দিন স্বাধীন আহত হলেও এ যাত্রায় প্রাণে বেঁচেছেন। অন্যদিকে সেই অগ্নিকা-ে আহতদের মধ্যে ঢাকা মেডিক্যাল কলেজ (ঢামেক) হাসপাতালের বার্ন ইউনিটে চিকিৎসাধীন যে ৯ জন, তাদের অবস্থা গুরুতর, এখনো কাটেনি আশঙ্কাজনক অবস্থা। চকবাজারের যেখানে অগ্নিকা-ের ঘটনা ঘটেছে, সেই এলাকাটি এখন সত্যি সত্যিই ভয়াল এক মৃত্যুপুরীতে পরিণত হয়েছে। নেই সেই প্রাণচাঞ্চল্য, যানবাহনের শব্দ, হর্ন। কর্মব্যস্ত মানুষের দমবন্ধ ছুটে চলার দৃশ্যও নেই। শোকের চাদরে ঢাকা চুড়িহাট্টায় আতঙ্কের জাল।

সেই জাল ক্রমেই বিস্তারিত হয়ে ছড়িয়ে পড়ছে পুরান ঢাকাজুড়ে। সর্বত্র চাপা উত্তেজনা। এদিকে অগ্নিকা-ের সূত্রপাত ও কারণ নিয়ে বিতর্ক সৃষ্টি হলেও ক্ষতিগ্রস্ত ভবনগুলোর গুদামে মজুদ রাসায়নিক থেকেই যে আগুন ছড়িয়েছে এবং ভয়াল রূপ নিয়েছে, এ বিষয়ে দ্বিমত নেই কারও। ইতোমধ্যে ঢাকা দক্ষিণ সিটি করপোরেশন (ডিএসসিসি) আগুনে ক্ষতিগ্রস্ত পাঁচটি ভবনের মধ্যে ওয়াহেদ ম্যানশনসহ ৩টি ভবনকে ‘বাস অযোগ্য ঝুঁকিপূর্ণ’ বলে ঘোষণা করেছে; ভবনগুলোর সামনে ঝুলিয়ে দিয়েছে এ সংক্রান্ত নোটিশ।

স্থানীয়দের সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে, চকবাজার এলাকার ৮০ শতাংশ ভবনেই গুদাম রয়েছে যেগুলোতে নানারকম ঝুঁকিপূর্ণ পণ্য রাখা হয়। ভবন মালিকদের মধ্যে অধিক অর্থের লোভ, প্রশাসনের দেখভালে অবহেলা এবং স্থানীয় অধিবাসীদের উদাসীনতাই এর কারণ বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা। বিষয়টি অনুধাবন করে গত শুক্রবারও প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা বলেছেন, পুরান ঢাকায় কোনো রাসায়নিক দ্রব্য থাকতে পারবে না।

Editor in Chief : Sayed Shakil
Office: Evan plaza, sador model thana road, cox’sbazar-4700. Email: dailycoxsbazar@gmail.com / phone: 01819099070
অনুমতি ছাড়া অথবা তথ্যসূত্র উল্লেখ না করে এই ওয়েব সাইট-এর কোন অংশ, লেখা বা ছবি নকল করা বা অন্য কোথাও প্রকাশ করা বেআইনী