সংবাদ শিরোনাম

শিল্পায়নে বদলে যাচ্ছে কর্ণফুলী

অনলাইন ডেস্ক : নতুন নতুন শিল্পকারখানা গড়ে উঠায় দিন দিন বদলে যাচ্ছে কর্ণফুলী নদীর দক্ষিণ পাড়ের কর্ণফুলী উপজেলা। এক সময়ের নীরব এই জনপদ হয়ে উঠেছে শিল্প নগর। নানা সমস্যার মাঝেও সরকারি- বেসরকারি শতাধিক শিল্প কারখানা গড়ে উঠেছে এই এলাকায়। তাতে হয়েছে বহু মানুষের কর্মসংস্থান। বদলে গেছে জীবনমান। নদীপথে সহজ যোগাযোগ, কম মজুরিতে শ্রমিক পাওয়া, কারখানার জন্য কম দামে পর্যাপ্ত জায়গা পাওয়া ইত্যাদি কারণে এখানে ছোট-মাঝারি ও ভারি কলকারখানা গড়ে উঠছে বলে জানান শিল্পখাতে সাথে সংশ্লিষ্টরা।
স্থানীয়রা জানান, ইছানগরে একটি সরকারি ও দুটি বেসরকারি ড্রাইডক স্থাপিত হয়। শিকলবাহায় ১৯৮৪ সালে স্থাপিত হয় বিদ্যুৎ উৎপাদন কেন্দ্র। এরপর থমকে ছিল বিনিয়োগ। স্থাপিত হয়নি কোন শিল্প কারখানা। কর্ণফুলী উপজেলার দৃশ্যপট পাল্টাতে থাকে ১৯৮৯ সালে কর্ণফুলী নদীর শাহ আমানত সেতু চালু হওয়ার পর। এই সেতু চালু হলে দক্ষিণ চট্টগ্রাম ও কক্সবাজারের সঙ্গে যোগাযোগব্যবস্থা অনেক সহজ হয়ে যায়। সেতু হওয়ায় পর কারখানা গড়ে তোলার উদ্যোগ নেয় বেসরকারি উদ্যোক্তারা। কর্ণফুলী উপজেলার শিকলবাহা থেকে জুলধা, কর্ণফুলী নদীর তীর ঘেঁষে কয়েক কিলোমিটার জুড়ে যে এলাকাটি একসময় ছিল পরিত্যক্ত, সেখানে গড়ে উঠে একের পর এক শিল্প কারখানা। নির্জন জনপদ এখন উৎপাদনশীলতায় মুখর। বিশাল এলাকাজুড়ে এখন যে শিল্পায়ন, তার সূচনা নব্বই দশকের মাঝামাঝি সময়ে। তাতে প্রথম কারখানাটি ছিল ডায়মন্ড সিমেন্ট’র। এরপরই বদলাতে শুরু করে এখানকার চেহারা।
জানতে চাইলে কর্ণফুলীর প্রথম বেসরকারি শিল্পোদ্যোক্তা ও ডায়মন্ড সিমেন্ট লিমিটেড পরিচালক লায়ন হাকিম আলী পূর্বকোণকে বলেন, ’কর্ণফুলী নদীর অবকাঠামোগত আর শাহ আমানত সেতুর সুবিধাকে কাজে লাগিয়ে কর্ণফুলীতে একে একে গড়ে উঠে নানা ধরনের শিল্প কারখানা। যা গেল ৩০ বছরে ছাড়িয়েছে একশটি। ভারি এবং হালকা-সব ধরনের শিল্প কারখানাই আছে কর্ণফুলীর দক্ষিণ পাড়ে। এসব কারখানায় ব্যাপক কর্মসংস্থানের সুযোগ সৃষ্টি ছাড়াও সরকারের তহবিলে যাচ্ছে বিপুল পরিমাণ রাজস্ব। এছাড়াও এসব শিল্পকারখানা থেকে উৎপাদিত পণ্য যাচ্ছে দেশের প্রত্যন্ত অঞ্চলে। দেশের চাহিদা মিটিয়ে বিদেশেও রপ্তানি হচ্ছে এখানকার পণ্য’। ৯০ এর দশকের পর মইজ্জারটেকে এস আলম গ্রুপের এস. আলম সিআর কয়েল লিমিটেড, এস. আলম স্টিল লিমিটেড, এস. আলম সিমেন্ট লিমিটেড, চেমন ইস্পাত লিমিটেড, এস. আলম ঢেউটিন লিমিটেড, এস আলম স্টিলস লিমিটেড, এস আলম ভেজিটেবল অয়েল লিমিটেড, এস আলম সুপার এডিবল অয়েল লিমিটেড, চেমন ইস্পাত লিমিটেড, এস আলম সিমেন্ট লিমিটেড, এস আলম ব্যাগ ম্যানুফেকচারিং লিমিটেড গড়ে উঠে। শিল্প কাঁচামাল ও পণ্য পরিবহন এবং যাতায়াতের সুবিধার কারণে কর্ণফুলী নদীর দক্ষিণ তীরবর্তী উপজেলা কর্ণফুলীতে গত কয়েক দশকে গড়ে উঠেছে প্রিমিয়ার সিমেন্ট লিমিটেড, বিএসএম গ্রুপের মডার্ন পলি ইন্ডাস্ট্রিজ, মমতা টেক্সটাইল, এহসান স্টিল রি-রোলিং মিল, এস আলম সুগার রিফাইনারি ইন্ডাস্ট্রিজ মিল, ইছানগর সি রিসোর্স লিমিটেড, কর্ণফুলী শিপ বিল্ডার্স, ফোর এইচ বেলামি টেক্সটাইল মিল, ব্যাঞ্চমার্ক এ্যাপারেল গার্মেন্টস, গোল্ডেন সন লিমিটেড, এপিটি গার্মেন্টস, ইছানগর ড্রাই ডক, ডিভাইন ট্যাক্সটাইল লিমিটেড, মাসুদ এগ্রো ফুড লিমিটেড, এস. আলম তৈল রিফাইনারি, কর্ণফুলী শিপ ইয়ার্ড, বিএফডিসি মৎস্য বন্দর, ইছানগর কোল্ডস্টোর, মিল্কভিটা দুগ্ধ শীতলীকরণ কেন্দ্র, মোস্তফা-হাকিম ব্রিকস, পেট্রো কেমিকেল লিমিটেড, আবু মেরিন শিপ বিল্ডার্স, বিন হাবিব গ্যাস লিমিটেড, এসএ গ্রুপের তৈল শোধনাগার, এএইচ তৈল রিফাইনারি ইন্ডাস্ট্রিজ, আবুল খায়ের ক্যারিয়ার শিপিং ওয়ার্কশপ, জুলধা ইন্ডাস্ট্রিয়াল পার্ক তৈল শোধানাগার, স্টার পার্নেস অয়েল ও বিটুমিন উৎপাদনকারী প্রতিষ্ঠানসহ শতাধিক শিল্পকারখানা।
১৯৯৬ সালে অনুমোদন লাভের পর ৯৯ সালে অবকাঠামো তৈরির কাজ শুরু করে দেশের প্রথম বেসরকারি রপ্তানি প্রক্রিয়াকরণ অঞ্চল কোরিয়ান এক্সপোর্ট প্রসেসিং জোন (কেইপিজেড)। বর্তমানে কেইপিজেডে প্রায় ৪০ হাজার মানুষের কর্মসংস্থান রয়েছে। ওখানে কর্ণফুলী ও আনোয়ারা উপজেলার হাজার হাজার মানুষ চাকরি পেয়েছেন। এখানকার শ্রমিকরা ভালো বেতন ও নিয়মিত বেতন ভাতাসহ অন্যান্য আনুষঙ্গিক সুযোগ সুবিধা পাচ্ছেন। ফলে কর্ণফুলী এলাকার মানুষ স্বাবলম্বী হচ্ছেন।
কর্ণফুলী উপজেলা স্বেচ্ছাসেবক লীগ সভাপতি শাহেদুর রহমান শাহেদ বলেন, ‘নানা ধরনের কলকারখানা স্থাপনের কারণে কর্ণফুলীর দক্ষিণ তীরের এ জনপদ এখন খুবই ব্যস্ত। স্থানীয় মানুষের জীবনযাত্রার তেমন মান না বাড়লেও মাঝেমধ্যে মনে হয় আমরা শহরে বাস করছি। তিনি আরো বলেন, এখানে নতুন নতুন শিল্প কারখানা স্থাপনের ফলে জমির দাম বাড়ছে। সাধারণ মানুষ ভিটে মাটি হারাচ্ছে। তাই শিল্প মালিকদের কাছে অনুরোধ থাকবে তাঁরা যেন যোগ্যতা অনুসারে সব ধরনের চাকরিতে স্থানীয়দের অগ্রাধিকার দেন।
চরলক্ষ্যা ইউনিয়ন পরিষদ চেয়ারম্যান মুহাম্মদ আলী বলেন, কর্ণফুলী এলাকায় সরকারি-বেসরকারি অনেক শিল্প প্রতিষ্ঠান রয়েছে। এলাকার অনেকে ওই সব শিল্পকারখানায় কাজ করে জীবিকা নির্বাহ করছেন। অনেকে আবার ওই সব কারখানায় নিয়োজিত শ্রমিক-কর্মচারীদের বাসা ভাড়া দিয়ে বেশ আয় করছেন। এতে মানুষের সচ্ছলতা বাড়ছে। মনে হচ্ছে কয়েক বছরের মধ্যে কর্ণফুলীর দক্ষিণ তীর হয়ে উঠবে বড় শিল্পাঞ্চল।
তবে চরপাথরঘাটা ইউনিয়নের ৩ নম্বর ওর্য়াডের সদস্য ফরিদ জুয়েল জানান, ‘আমাদের এলাকা উপ-শহর হয়ে উঠছে, কিন্তু সরকারের নজরে আসছে না। প্রত্যাশিত উন্নয়ন হচ্ছে না। উন্নয়ন কাজে কোন গতি নেই। শিল্প কারখানায় স্থানীয় মানুষের তেমন কর্মসংস্থান হচ্ছে না। সাধারণ মানুষ থেকে প্রায় অভিযোগ শুনি, শিল্প কারখানাগুলো শ্রমিক হিসেবে নিয়োগ দিলেও অফিসিয়াল পদে স্থানীয়দের নেয়া হয় না’।
কর্ণফুলী উপজেলা পরিষদ চেয়ারম্যান ফারুক চৌধুরী বলেন, ‘ভৌগলিকভাবে শিল্পকারখানার জন্য কর্ণফুলী উপজেলা খুবই সুবিধা জনক অবস্থানে আছে। কর্ণফুলী নদী ও সড়ক পথের সুবিধা কাজে লাগিয়ে আমাদের এলাকা কল-কারখানায় শিল্পনগরী হয়ে উঠছে। কর্ণফুলী যেন পরিকল্পিত শিল্পনগরী হয় সেজন্য আমরা মাস্টার প্ল্যান করার উদ্যোগ নিয়েছি। তিনি আরো বলেন, কোরিয়ান রপ্তানি প্রক্রিয়াকরণ অঞ্চল (কেইপিজেড), ডায়মন্ড সিমেন্ট ও এস আলম গ্রুপের বিভিন্ন কলকারখানাসহ সরকারি-বেসরকারি শিল্প প্রতিষ্ঠান গড়ে উঠায় এখানকার মানুষের কর্মসংস্থান হচ্ছে। যার ইতিবাচক প্রভাব এলাকায় পড়ছে। তবে শিল্পকারখানার মালিকদের কাছে আমার অনুরোধ থাকবে তাঁরা যেন আরো বেশি করে অগ্রাধিকার ভিত্তিতে স্থানীয় জনসাধারণকে কাজে লাগান’।

Editor in Chief : Sayed Shakil
Office: Evan plaza, sador model thana road, cox’sbazar-4700. Email: dailycoxsbazar@gmail.com / phone: 01819099070
অনুমতি ছাড়া অথবা তথ্যসূত্র উল্লেখ না করে এই ওয়েব সাইট-এর কোন অংশ, লেখা বা ছবি নকল করা বা অন্য কোথাও প্রকাশ করা বেআইনী