সংবাদ শিরোনাম

চিকিৎসায় রেফারেল পদ্ধতি চালুতে বাধা কোথায়

রোগীর মানসিক শারীরিক ও আর্থিক ক্ষতি রোধে এ পদ্ধতি চালু জরুরি

পটুয়াখালীর বাসিন্দা সঞ্চিতা রানী বুকে ব্যথা অনুভব করার পর প্রতিবেশীদের পরামর্শে চিকিৎসার জন্য সম্প্রতি রাজধানীর জাতীয় হৃদরোগ ইনস্টিটিউট ও হাসপাতালে আসেন। সেখানে ইসিজি, ইকো, এক্স-রে, ইটিটি পরীক্ষার পাশাপাশি রক্তে কোলেস্টেরলের মাত্রা পরিমাপ করে জানা যায়, তার হৃদরোগ নেই। গ্যাস্ট্রিকের কারণে তার বুকে ব্যথা হচ্ছে। হৃদরোগ বিশেষজ্ঞ চিকিৎসক রোগীকে মেডিসিন বিশেষজ্ঞের কাছে চিকিৎসা নিতে বলেন। তিনি আরও জানান, রোগী এর চিকিৎসা উপজেলা পর্যায়ের হাসপাতালেই নিতে পারতেন।

সঞ্চিতার স্বামী গ্রামে একটি ছোট মুদি দোকান চালান। সেই দোকানের আয় দিয়ে তাদের ছয়জনের সংসার চলে। চিকিৎসার জন্য ঢাকায় আসার সময় এক আত্মীয়ের কাছ থেকে তিনি ১০ হাজার টাকা ধার করেছিলেন। ঢাকায় আসা-যাওয়া ও পরীক্ষা-নিরীক্ষার পেছনে সে টাকার পুরোটাই খরচ হয়েছে। অথচ সঠিক পরামর্শ পেলে তিনি ইউনিয়ন উপ-স্বাস্থ্যকেন্দ্র অথবা উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্স থেকেই চিকিৎসা নিতে পারতেন। কিন্তু তা না পাওয়ায় তাকে আর্থিক ক্ষতির পাশাপাশি মানসিক ও শারীরিক ভোগান্তির শিকারও হতে হয়েছে।

বিভিন্ন রোগে আক্রান্ত হাজার হাজার রোগী এভাবেই ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছেন। রোগের প্রাথমিক পরামর্শের জন্য রোগী কোথায় যাবেন, কোন চিকিৎসকের তত্ত্বাবধানে চিকিৎসা নেবেন, কতটুকু অসুস্থ হলে কোন পর্যায়ের হাসপাতাল কিংবা বিশেষজ্ঞের কাছে যাবেন- স্বাস্থ্য বিভাগের এ-সংক্রান্ত কোনো গাইডলাইনই নেই। এ অবস্থায় রোগী নিজের সিদ্ধান্তেই বড় হাসপাতাল ও বিশেষজ্ঞ চিকিৎসকের কাছে যান। বেশিরভাগ ক্ষেত্রেই রোগী ভুল করে অন্য রোগের বিশেষজ্ঞের কাছে যান।

এভাবে বড় হাসপাতাল ও বিশেষজ্ঞ চিকিৎসকের কাছে রোগী অযথাই ভিড় করছেন। রোগীর যেমন মানসিক, শারীরিক ও আর্থিক অপচয় ঘটছে, তেমনি ঘটছে চিকিৎসকের মেধার। এ অবস্থা নিরসনে বিশেষজ্ঞরা চিকিৎসা ক্ষেত্রে স্ট্রাকচারাল রেফারেল পদ্ধতি চালুর ওপর গুরুত্ব আরোপ করেছেন। তবে বারবার উদ্যোগ নেওয়া হলেও দীর্ঘদিনেও এ পদ্ধতি চালু করা সম্ভব হয়নি। কেন এ পদ্ধতি চালু করা যাচ্ছে না-এমন প্রশ্নে সংশ্নিষ্টরা বলছেন, বিশেষজ্ঞ চিকিৎসকদের এ পদ্ধতিটি চালুর বিষয়ে অনীহা রয়েছে, তেমনি সংশ্নিষ্ট কর্মকর্তাদের কার্যকর উদ্যোগ নেই। এ কারণে আলোচনা হলেও বিষয়টি এগোচ্ছে না।

চিকিৎসকদের শীর্ষ সংগঠন বাংলাদেশ মেডিকেল অ্যাসোসিয়েশনের সাবেক সভাপতি অধ্যাপক ডা. রশীদ-ই মাহবুব বলেন, রেফারেল সিস্টেম চালু না থাকায় যে রোগীর মেডিসিনের চিকিৎসকের কাছে যাওয়ার কথা, সে যাচ্ছে হৃদরোগ বিশেষজ্ঞ চিকিৎসকের কাছে; গ্যাস্ট্রোলজির রোগী যাচ্ছে মেডিসিনের চিকিৎসকের কাছে। এতে রোগীর আর্থিক ক্ষতি হচ্ছে, সময় নষ্ট হচ্ছে। পাশাপাশি হাসপাতাল ও বিশেষজ্ঞ চিকিৎসকের চেম্বারে অপ্রয়োজনীয় ভিড় জমছে। প্রকৃত রোগীর স্বাস্থ্যসেবাও বিলম্বিত হচ্ছে।

রেফারেল পদ্ধতি কী :চিকিৎসা বিশেষজ্ঞরা জানান, বর্তমানে দেশে ওয়ার্ডভিত্তিক কমিউনিটি ক্লিনিক, ইউনিয়ন সাব সেন্টার, উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্স, জেলা হাসপাতাল, মেডিকেল কলেজ হাসপাতালসহ বিভিন্ন টারশিয়ারি ও বিশেষায়িত হাসপাতাল চালু রয়েছে। কিন্তু প্রত্যন্ত অঞ্চলের কেউ অসুস্থ হয়ে পড়লেও চিকিৎসার জন্য সরাসরি ঢাকায় চলে আসছেন। অথচ প্রথমে তার কমিউনিটি ক্লিনিক অথবা ইউনিয়ন উপ-স্বাস্থ্যকেন্দ্রে যাওয়ার কথা। সেখানকার নির্দেশনা অনুযায়ী যাওয়ার কথা উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে। এরপর পর্যায়ক্রমে জেলা, বিভাগ এবং সবশেষে টারশিয়ারি ও বিশেষায়িত হাসপাতালে চিকিৎসার জন্য আসার কথা।

রেফারেল পদ্ধতির ওপর বিদেশে প্রশিক্ষণ নিয়েছেন রাজধানীর শহীদ সোহরাওয়ার্দী হাসপাতালের পরিচালক অধ্যাপক ডা. উত্তম কুমার বড়ূয়া। তিনি বলেন, সরকারি হাসপাতাল থেকে সরকারি হাসপাতালে, বেসরকারি হাসপাতাল থেকে সরকারি হাসপাতালে এবং সরকারি হাসপাতাল থেকে বেসরকারি হাসপাতালে চিকিৎসার জন্য রোগী রেফারেল পদ্ধতির মাধ্যমে চিকিৎসা নিতে পারেন। অর্থাৎ যে রোগীর যেখানে সুচিকিৎসা নিশ্চিত হবে, এটি তাকে সেখানে পাঠানোর একটি ব্যবস্থাপনা।

ডা. উত্তম কুমার বড়ূয়া বলেন, রেফারেল পদ্ধতি চালু না থাকায় রোগীরা বেশিরভাগ ক্ষেত্রে নিজস্ব সিদ্ধান্তে বিশেষজ্ঞ চিকিৎসকের কাছে যান। এতে রোগীর আর্থিক অপচয়, সময় নষ্ট ও ভোগান্তি হয়। আবার যে হাসপাতাল ও চিকিৎসকের কাছে রোগী যান, তাদেরও সময়ের অপচয় হয়। অনেক বিশেষজ্ঞ চিকিৎসক আছেন- যাদের চেম্বারে প্রতিদিন ২০০-৩০০ রোগী দেখতে হয়। এতে তিনি রোগীকে সময় নিয়ে দেখতে পারেন না। রেফারেল পদ্ধতিতে রোগী সরাসরি টারশিয়ারি হাসপাতাল এবং বিশেষজ্ঞ চিকিৎসকের কাছে যেতে পারবেন না, এতে জনগণের সুচিকিৎসা নিশ্চিত করা সম্ভব হবে।

বড় হাসপাতালে উপচেপড়া ভিড় :কার্যকর রেফারেল পদ্ধতি চালু না থাকায় টারশিয়ারি ও বিশেষায়িত হাসপাতালে অতিরিক্ত রোগী ভিড় করছেন। এ তালিকায় রয়েছে ঢাকা মেডিকেল, মিটফোর্ড, সোহরাওয়ার্দীর পাশাপাশি হৃদরোগ, কিডনি, চক্ষুবিজ্ঞান, নিউরো সায়েন্স, জাতীয় বক্ষব্যাধি হাসপাতাল, ক্যান্সার গবেষণা ইনস্টিটিউটসহ বিভিন্ন সরকারি টারশিয়ারি ও বিশেষায়িত হাসপাতাল। এসব হাসপাতালে শয্যাসংখ্যার তুলনায় অতিরিক্ত রোগী ভিড় জমাচ্ছেন। নামিদামি বিশেষজ্ঞ চিকিৎসকদের ব্যক্তিগত চেম্বারেও রোগীর উপচেপড়া ভিড় জমছে। এসব চিকিৎসক ব্যক্তিগত চেম্বারে দৈনিক মাত্র তিন-চার ঘণ্টায় গড়ে ২০০-৩০০ রোগীর ব্যবস্থাপত্র দিচ্ছেন! দেশের দুটি শীর্ষস্থানীয় সরকারি মেডিকেল কলেজে রোগীর পরিসংখ্যান বিশ্নেষণ করেও রোগীর উপচেপড়া ভিড় সম্পর্কে নিশ্চিত হওয়া গেছে।

ঢাকা মেডিকেল কলেজ ও হাসপাতালে গত বছরের ১ জানুয়ারি থেকে ডিসেম্বর পর্যন্ত এক লাখ ৩৩ হাজার ২৬৩ রোগী ভর্তি হন। অর্থাৎ মাসে গড়ে প্রায় সাড়ে আট হাজার রোগী ভর্তি হয়েছেন। এই সময়ে জরুরি বিভাগ ও বহির্বিভাগ মিলে আরও চার লাখ দুই হাজার ১৪১ রোগী চিকিৎসা নিয়েছেন। এ হিসাবে প্রতিদিন গড়ে এক হাজারের বেশি রোগী চিকিৎসা নিয়েছেন। একই সময় রাজধানীর শহীদ সোহরাওয়ার্দী হাসপাতালে ৫৬ হাজার ৫২২ রোগী ভর্তি হয়েছেন। জরুরি বিভাগ ও আউটডোরে প্রতিদিন গড়ে ৩-৪ হাজার রোগী চিকিৎসা নিয়েছেন।

ঢাকা মেডিকেল কলেজ ও হাসপাতালের পরিচালক ব্রিগেডিয়ার জেনারেল একেএম নাসিরউদ্দিন সমকালকে বলেন, ঢাকা মেডিকেলে কোনো রোগী এলে তাকে ফেরানো হয় না। শয্যা খালি না থাকলেও রোগীকে ফ্লোরে রেখে চিকিৎসা দেওয়া হয়। অনেক রোগী জেলা কিংবা বিভাগীয় পর্যায়ে এমনকি ঢাকার অন্যান্য সরকারি হাসপাতালে না গিয়ে সরাসরি ঢাকা মেডিকেলে চলে আসেন। এতে বাড়তি চাপ নিতে হচ্ছে। এমন ভিড় না থাকলে হয়তো আরও উন্নত চিকিৎসা নিশ্চিত করা সম্ভব হতো।

রেফারেল পদ্ধতি চালুর সিদ্ধান্ত বাস্তবায়ন হয়নি :স্বাস্থ্য অধিদপ্তর সূত্র জানাচ্ছে, ২০১৬ সালের সেপ্টেম্বরে হাসপাতালগুলোতে রেফারেল ব্যবস্থা চালু করার বিষয়ে অধিদপ্তরের হাসপাতাল শাখা থেকে একটি উদ্যোগ নেওয়া হয়েছিল। সরকারি হাসপাতালে আনুষ্ঠানিকভাবে এ পদ্ধতি চালুর বিষয়টি অনেক দূর এগিয়েছিল। ওই বছরই রংপুর ও নীলফামারী জেলায় পাইলট প্রকল্প চালু করা এবং পর্যায়ক্রমে সারাদেশের সরকারি হাসপাতালকে এ কার্যক্রমের আওতায় আনার পরিকল্পনা নেওয়া হয়েছিল। কিন্তু অজ্ঞাত কারণে তা আর কার্যকর হয়নি। তখন স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের হাসপাতাল শাখার লাইন ডিরেক্টর ছিলেন অধ্যাপক ডা. শামিউল ইসলাম। তিনি সমকালকে বলেন, রংপুর ও নীলফামারী অঞ্চলের স্বাস্থ্য কর্মকর্তা, চিকিৎসক, নার্সসহ সংশ্নিষ্ট সবার সঙ্গেই তখন এ নিয়ে আলোচনা হয়েছিল। কেন এ সিদ্ধান্ত বাস্তবায়ন হয়নি তা তার জানা নেই।

এ বিষয়ে স্বাস্থ্য অধিপ্তরের মহাপরিচালক অধ্যাপক ডা. আবুল কালাম আজাদ বলেন, কার্যকর রেফারেল পদ্ধতি চালুর জন্য কাজ চলছে। বিশেষজ্ঞদের মতামতও নেওয়া হয়েছে। বিষয়টি অনেক দূর এগিয়েছে।

Editor in Chief : Sayed Shakil
Office: Evan plaza, sador model thana road, cox’sbazar-4700. Email: dailycoxsbazar@gmail.com / phone: 01819099070
অনুমতি ছাড়া অথবা তথ্যসূত্র উল্লেখ না করে এই ওয়েব সাইট-এর কোন অংশ, লেখা বা ছবি নকল করা বা অন্য কোথাও প্রকাশ করা বেআইনী