সংবাদ শিরোনাম

গুলি করে পুলিশের ‘দুঃখপ্রকাশ’!

মুন্সীগঞ্জের ঢাকা-নবাবগঞ্জ সড়কের কামারকান্দা এলাকায় পুলিশের চেকপোস্টে সাহাদাত হোসেন শ্যামল (২০) নামে এক তরুণের পায়ে গুলিবিদ্ধ হওয়ার ঘটনা ঘটেছে। ওই তরুণ ও তার বন্ধুদের অভিযোগ, কিছু বুঝে ওঠার আগেই শ্যামলের পায়ে পুলিশ গুলি করে। পুলিশের পক্ষ থেকে বলা হচ্ছে এটি ছিল ‘অনিচ্ছাকৃত’; এর জন্য ‘সরি’ও বলা হয়।

তাৎক্ষণিকভাবে শ্যামলের চিকিৎসা ব্যয় গ্রহণের প্রতিশ্রুতি দিয়ে হাসপাতালে নিয়ে যাওয়া হয়। তবে পরদিন শ্যামলসহ ৬ জনের বিরুদ্ধে সরকারি কাজে বাধা দেওয়ার অভিযোগে মামলা করে পুলিশ। ওই ৬ বন্ধু ঢাকার কেরানীগঞ্জে মোটর মেকানিকের কাজ করেন।

গুলিবিদ্ধ শ্যামল ঢাকা মেডিক্যাল কলেজ হাসপাতালের বার্ন অ্যান্ড প্লাস্টিক সার্জারি ইউনিটে বর্তমানে পুলিশ পাহারায় চিকিৎসাধীন। এ ঘটনার নিরপেক্ষ তদন্ত দাবি করে শ্যামলের পরিবার জানিয়েছে, দায়ী পুলিশের বিচার করতে হবে।

পুলিশের দাবি, প্রথমবার চেকপোস্টে থামার সংকেত মানেননি তারা। দ্বিতীয় দফায় একই সড়কে সংকেত দেওয়ার পর থেমেই পুলিশের ওপর চড়াও হন। মারামারির সময় শটগান ছিনিয়ে নিতে গেলে ‘ধস্তাধস্তিতে’ একটি গুলি বেরিয়ে শ্যামলের পায়ে বিদ্ধ হয়। তবে পুলিশের ওপর হামলার এমন ঘটনার পর আসামিদের রিমান্ডে নিয়ে জিজ্ঞাসাবাদ করেনি পুলিশ। এমনকি ঘটনার একমাস পেরিয়ে গেলেও মামলার তদন্তে কার্যত কোনো অগ্রগতি নেই। শ্যামলের বাবার নাম মো. ওহাব আলী। গ্রামের বাড়ি ঢাকার কেরানীগঞ্জের ঘাটারচরে। ৫ ভাই, ১ বোনের মধ্যে শ্যামল সবার ছোট। কাজ করেন স্থানীয় একটি মোটর মেকানিকের গ্যারেজে। মাস ছয়েক আগে বিয়ে করেছেন।

গত ১৪ মার্চ রাত ১০টার দিকে তারা ৬ বন্ধু তিনটি মোটরসাইকেলযোগে মধুসিটির সামনে থেকে ঢাকা-নবাবগঞ্জ সড়ক ধরে মরিচার দিকে যাচ্ছিলেন। ওই ৬ জনের মধ্যে তিনজনের সঙ্গে কথা বলেছেন এ প্রতিবেদক। তারা জানান, তাদের বন্ধু সজিব ম-লের বিয়াই জনি সিদ্ধার বাড়ি ওই এলাকায়। জনি তার আরেক বন্ধু গোবিন্দকে নিয়ে বেড়াতে এসেছিলেন সজিবের বাড়িতে। পরে রাতে গ্যারেজের কাজ শেষে তারা জনি ও গোবিন্দকে এগিয়ে দিতে যান। ওই সড়ক রাতের বেলা অপরাধপ্রবণ হয়ে ওঠে। মরিচা পৌঁছানোর কিছুক্ষণ আগে পুলিশের একটি টহল দল লাইটের আলো জে¦লে থামার সংকেত দেয়। কিন্তু তারা না থেমে সামনে এগিয়ে যান। জনি ও গোবিন্দকে নামিয়ে দিয়ে মিনিট দশেক পরে একই সড়কে বাকি চার বন্ধু ফেরার সময় আবার থামার সংকেত পান তারা।

মোটরসাইকেল থামানোর সঙ্গে সঙ্গে শ্যামলের পায়ের গোড়ালিতে গুলি করেন কনস্টেবল মো. রাসেল। সজিব ম-ল আমাদের সময়কে বলেন, ‘আমরা গুলি করে দিতে দেখেই প্রতিবাদ করি। পুলিশকে বললাম ভাই এইটা কি করলেন। তখন তারা বলে, ভাই হয়ে গেছে। এখন কী করব। চলে যান না হলে ঝামেলায় পড়বেন। তখন বলি এতরাতে তাকে হাসপাতালে নিব কীভাবে, আপনারা একটু সাহায্য করেন। এর মধ্যে খবর পেয়ে ঘটনাস্থলে ছুটে আসে জনি ও গোবিন্দ। অনেক বলার পর একটি অটোরিকশায় পুলিশ কনস্টেবল রাসেল ও আরেক কনস্টেবলসহ ঢাকা মেডিক্যালের উদ্দেশে রওয়ানা হয়। কিন্তু অটো ছেড়ে দেওয়ার সঙ্গে সঙ্গে রাসেল লাফ দিয়ে নামতে গিয়ে পড়ে যান। এতে তার হাত পা ছুলে যায়। কারণ রাসেল ভয় পাচ্ছিলেন সামনে আমাদের বাড়ির দিকে গেলে উত্তেজিত জনতা যদি কিছু করে।’ গ্রেপ্তারের পর সজিবসহ সবাইকে পুলিশ বেদম পেটান বলেও তাদের অভিযোগ।

গুলিবিদ্ধ শ্যামলের বড় ভাই জোমশে আলী নিজেও পেশায় মোটর মেকানিক। তিনি আমাদের সময়কে বলেন, ‘ঘটনা শুনে রাতেই ছুটে যাই আমরা। তখন পুলিশ বলে, শ্যামলের চিকিৎসার খরচ আমরা দেব। পরদিন গিয়ে শুনি পুলিশ উল্টো আমার ভাইসহ তাদের সবার নামে মামলা দিয়ে দিছে।’

তবে পুলিশের এএসআই মো. শহিদুল ইসলাম বাদী হয়ে পরদিন ১৫ মার্চ সিরাজদিখান থানায় মামলা করেন। মামলার আসামিরা হলেনÑ সজিব ম-ল, শ্রী কৃষ্ণ বাড়ৈ, গোবিন্দ সিদ্ধা, জনি সিদ্ধা, সাহাদাত হোসেন শ্যামল ও মো. রাকিব।

মামলার এজাহারে উল্লেখ করা হয়, এএসআই শহিদুল ইসলামের নেতৃত্বে কনস্টেবল মো. দুলাল, মো. সোহেব, মো. শরীফসহ সঙ্গীয় ফোর্স নিয়ে চেকপোস্ট ও টহল কার্যক্রম চালাচ্ছিল। এ সময় থামার সংকেত না মেনে তিনটি মোটরসাইকেল বেপরোয়া গতিতে চলে যায়। ফেরার সময় কামারকান্দা পুলিশ বক্সের সামনে সংকেত দিলে তারা মোটরসাইকেল থামিয়েই পুলিশের ওপর চড়াও হয়। পুলিশের ইউনিফর্ম খুলে নেওয়ার চেষ্টাসহ অস্ত্র ছিনিয়ে নিতে টানাটানি করে। ধস্তাধস্তির এক পর্যায়ে শর্টগানের গুলি বেরিয়ে শ্যামলের পায়ে বিদ্ধ হয়। এ সময় ওই ৬ তরুণ গাছের ডাল দিয়ে পুলিশকে পিটিয়ে আহত করে। তাদের মারধরের শিকার গুরুতর আহত কনস্টেবল রাসেলকে সিরাজদিখান উপজেলা স্বাস্থ্য কপ্লেক্সে ভর্তি করা হয়।

এ ঘটনায় অংশ নেওয়া পুলিশ সদস্যরা সবাই সিরাজদিখান পুলিশ তদন্ত কেন্দ্রে কর্মরত। জানতে চাইলে সিরাজদিখান পুলিশ তদন্ত কেন্দ্রের ইনচার্জ পরিদর্শক সাইফুল ইসলাম বলেন, ‘আমি তো আর ঘটনাস্থলে ছিলাম না। ফোর্সের কাছ থেকে যেটা শুনেছি, সেভাবেই মামলা হয়েছে। এজাহারের বাইরে আমাদের কোনো বক্তব্য নেই।’ ঘটনার ২০ দিন পর গত ৪ এপ্রিল শ্যামল ছাড়া মামলার অন্য ৫ আসামি আদালত থেকে জামিনে বেরিয়ে এসেছেন।

ওই ৫ জনের দুজন বলেন, ‘মোটরসাইকেল ফিরিয়ে দেওয়ার জন্য ১৫ হাজার টাকা নেন তদন্ত কর্মকর্তা এসআই আসাদুজ্জামান। কিন্তু মোটরসাইলে ফিরিয়ে না দিয়ে টাকা ফেরৎ দিয়ে বলেন, মোটরসাইল আদালত থেকে নিতে হবে। সেটি মামলার আলামত হয়ে যাওয়ায় দিতে পারছি না।’

ওই ৬ তরুণ ও তাদের পরিবারের অভিযোগের বিষয়ে জানতে চাইলে মামলার তদন্ত কর্মকর্তা শেখরনগর পুলিশ তদন্ত কেন্দ্রের এসআই আসাদুজ্জামান আমাদের সময়কে বলেন, ‘ভাই আমি ঘটনার দিন ঢাকায় ছিলাম। নারায়ণগঞ্জে মামলার সাক্ষী দিতে গিয়েছিলাম। আমি ঠিক বলতে পারব না। পূর্ণাঙ্গ রিপোর্ট না হওয়া পর্যন্ত কিছু বলা যাবে না। সাক্ষীদের জেরা অব্যাহত আছে। না না আমি কোনো টাকা নেইনি।’ তবে মামলার এজাহারে তিনি ঘটনাস্থলে ছিলেন বলে উল্লেখ করা হয়েছে।

শ্যামলের বড় ভাই জোমশে আলী বলেন, ‘অন্য পুলিশ কর্মকর্তাদের দিয়ে নিরপেক্ষ তদন্ত করা হোক। তা হলেই তো বোঝা যাবে কে দোষী কে নির্দোষ। কারণ ঘটনার দুদিন পর গিয়ে দেখি রাসেল তদন্ত কেন্দ্রে ঘুরছেন। তিনি বললেন, ভাই পুলিশ যদি কিছু নাও করে আমি নিজে টাকা দেব চিকিৎসার জন্য। আপনার ভাইয়ের জন্য আমার খারাপ লাগছে। আর এখন তাদের সবার সুর পাল্টে গেছে।’

চিকিৎসকরা জানান, গুলি লেগে শ্যামলের পায়ের গোড়ালির মাংস-হাড্ডিসহ বেরিয়ে গেছে। অস্ত্রোপচারের পর বার্ন ইউনিটে স্থানান্তর করা হয়েছে। ওই পায়ে দাঁড়াতে পারবে কি পারবে না সেটি এখনই বলা যাচ্ছে না। হাসপাতালে গিয়ে দেখা যায়, তাকে হাতে ‘হ্যান্ডকাফ’ পরিয়ে শিকল দিয়ে বেঁধে চিকিৎসা দেওয়া হচ্ছে। মামলার বাদী এএসআই শহিদুল ইসলামের সঙ্গে যোগাযোগ করা হলে তিনি একটি মামলার সাক্ষী দিতে আদালতে থাকায় পরে কথা বলবেন জানিয়ে ফোন কেটে দেন।

Editor in Chief : Sayed Shakil
Office: Evan plaza, sador model thana road, cox’sbazar-4700. Email: dailycoxsbazar@gmail.com / phone: 01819099070
অনুমতি ছাড়া অথবা তথ্যসূত্র উল্লেখ না করে এই ওয়েব সাইট-এর কোন অংশ, লেখা বা ছবি নকল করা বা অন্য কোথাও প্রকাশ করা বেআইনী