সংবাদ শিরোনাম

সিমকার্ডের জবানবন্দি

শফিক হাসান :
আমি নগণ্য এক সিমকার্ড, আমার আবার জবানবন্দি! সবচেয়ে বড় কথা, জড় বস্তুর ‘জবান’ থাকে না। জবান না থাকায় তাদের সবকিছুই থেকে যায়। অব্যক্ত কথামালা গুমরে কাঁদে হৃদয়ে। প্রশ্ন করতে পারেন, জড় বস্তুর হৃদয়ই বা আসে কোত্থেকে! বিলক্ষণ বুঝেছি, জবানবন্দি দেয়ার জ্বালাও কম নয়!
জন্ম হউক যথাতথা কর্ম হউক ভালো বাংলা ভাষায় প্রচলিত জনপ্রিয় একটি প্রবাদ। আমি চার কোনার (তাও আবার এক পাশে খাঁজ কাটা) এক সিমকার্ড, জানি না নিজ জন্মের ঠিকুজি আমার জন্ম বাংলাদেশে হতে পারে আবার বহির্বিশ্বেও হতে পারে। তবে বর্তমানে বাংলাদেশে সেবা দিয়ে যাচ্ছি। জন্মের সাথে কর্মের বড় কোনো সম্পর্ক না থাকলেও যোগসূত্র ঠিকই আছে। সেই ধারাই বহন করে চলেছি। আমার সব কর্মই ভালো বুকে হাত দিয়ে বলতে পারবো না। ভালোর পাশাপাশি অনেক খারাপ দিকও আছে। খারাপের ভেতরেও আবার ভালো থাকে। ভালোমন্দ যাই হোক, এসবে আমার হাত কিংবা পা নেই। নিজেকে নিঃশেষ করে সেবা দিয়ে যাচ্ছি কেবল।
নিজেকে ভালো কোনো কাজে ব্যবহৃত হতে দেখলে আনন্দ পাই, অন্যায়-অপকর্ম দেখলে হৃদয় ফেটে যায়, কান্না আসে। আমি জড়বস্তু, আমার হৃদয় থাকার কথা না, কান্নাও আসার কথা না। তবু আছে, তবু আসে। মানুষের মনুষ্যত্ব আমাকে মুগ্ধ করে, তাদের পৈশাচিকতা চরমভাবে ব্যথিত করে। কত রঙ্গই না জানে মানুষ। অথচ এরা সৃষ্টির সেরা!
মোবাইলফোনের ছোট্ট একটি প্রকোষ্ঠে আমার বসবাস দিনযাপন, রাতযাপন। মানুষের কত হাসি-কান্নার সাক্ষী। আমার সর্বপ্রথম মালিক ছিলেন জনৈক হাবিবুর রহমান। হাবিব সাহেব আমাকে কাজে লাগিয়ে রচনা করেছিলেন প্রেমের ‘স্বর্ণযুগ।’ স্বর্ণযুগ না ছাই দিকভ্রান্ত প্রজন্মের ছেলেমেয়েরা মোবাইল ফোনে একে অন্যের সাথে লাগাতার প্যাঁচাল পাড়তে পারলেই এটাকে প্রেম হিসেবে আখ্যায়িত করে। প্রেম এতো সহজ জিনিস নাকি? স্বর্গ আসে প্রেম স্বর্গে যায় চলে… তাত্ত্বিক কথা থাক। কলিকালের প্রেমিকরা স্বর্গ-নরকের ধার ধারে না; নিজেরাই স্বর্গ বানিয়ে বসবাস করে। বলাবাহুল্য, তাদের স্বনির্মিত স্বর্গটির নাম বোকার স্বর্গ।
প্রথম মালিক হাবিব সাহেব কলেজপড়–য়া ছাত্র। চাঁদপুর থেকে এসে ঢাকার একটি মেসে উঠেছিলেন। পড়াশোনা, আরো অনেক কাজ-অকাজের পাশাপাশি মোটামুটি প্রতিদিন দুই ডজন মেয়ের সাথে প্রেম করতেন। তার হৃদয়ের ‘বিশালতা’ দেখে আমার টাসকি খাওয়ার দরকার ছিল খাইনি। যেহেতু জড়বস্তু বলে আমাদের খাওয়াখাওয়ির কোনো ব্যাপার নেই। মোবাইল ফোন কত সহজেই না মানুষকে মিথ্যাবাদী বানিয়ে দিতে পারে! দেখা যেত, হাবিব সাহেব কাঁঠালবাগানে বসে অবলীলায় বলে দিতেন আমি এখন ফরিদপুরে, মাদারীপুরে। প্রেমের নামে কী সব আজেবাজে কথা বলতেন, কেমন বর্ণিল মিথ্যাচার করতেন ভাবলে আজও লজ্জায় শরীর কালো হয়ে আসে! মনুষ্যপ্রজাতি মিথ্যা, ছল-চাতুরির মাধ্যমে স্বগোত্রীয়দের মাথায় ক্ষুদ্র ও হীনস্বার্থে কাঁঠাল ভাঙতে এতটুকু ইতস্তত করে না!
লজ্জাঝরা এক রাতে হাবিব ফোনে সোনিয়া নামের এক মেয়ের সাথে ফোনে প্রেম (হা হা হা…!) করতে করতে বাসায় ফিরছিলেন। এ সময় ফোনটি ছিনতাই হয়ে যায়। বদলে যায় মালিকানা। আমি ঠাঁই হয় ছিঁচকে সন্ত্রাসী কানা বক্করের কাছে। নামে কানা হলেও বক্কর মোটেও কানা নয়। জানি না, কে বা কারা বক্করকে ‘কানা’ বানিয়ে দিয়েছিলেন! যারাই দিন, তারা যে চোখ থাকিতে অন্ধ কোনো সন্দেহ নেই! কানা বক্কর সাহেব আমাকে ব্যবহার করতে শুরু করলেন বিভিন্ন সন্ত্রাসী ও অপরাধমূলক কাজে। বিভিন্ন মানুষকে হুমকি দেওয়া, চাঁদা চাওয়া, বখরা আদায় করা, অন্যের বউ ভাগিয়ে আনার কসরত আরো কত কী।
বক্কর প্রেমও করতেন। কোনো মেয়ের সাথে না। পুলিশ এবং রাজনীতিকদের সাথে। তার একজন গডফাদারও আছে। মেজাজ ক্ষিপ্ত হলে ‘ফাদার’কেই শালা বলে গালি দিতেন। পুলিশের সঙ্গে বক্করের কী কথা হতো, রাজনীতিকরা কীভাবে তাকে আশ্রয়-প্রশ্রয় দিতেন এসব কথা দুদককে বলা যায় এখানে না। বক্কর একবার ভুল জায়গায় হুমকি দিয়ে বসলেন। আগে বুঝতে পারেননি, যাকে হুমকি দিচ্ছেন তিনি সাধারণ মানুষের মতো চলাফেরা করলেও তলে তলে মাফিয়া ডন! পিঠ বাঁচাতে বক্কর গা ঢাকা দিলেন, আমাকে মোবাইলফোন থেকে খুলে ফেলে দিলেন ময়লার ঝুড়িতে। তারপর কত হাত বদল, কত ঘাটের পানি খাওয়া, কত যে অভিজ্ঞতা সঞ্চয় করেছি! এই পরিক্রমায় কত শত প্রেম-বিরহ, কত অনাচার-সুআচার, ইতিহাসের সাক্ষী হলাম।
হাত থেকে হাতে ঘুরতে ঘুরতে একসময় এসে পড়লাম জনৈক শেখ ফরিদের বাসায়। ফরিদ যে কত বড় প্রেমিক, না দেখলে বিশ্বাস হবে না। টানা দুই ঘণ্টা কোনো মেয়ের সঙ্গে কথা বলতে না পারলে অসুস্থ হয়ে পড়েন। ধারণা করি, পুরো একদিন কথা বলতে না দিলে চিকিৎসার জন্য মেডিকেলে ভর্তি করাতে হবে! তার কার্যক্রম আবার বহুমুখী। মাল্টিমিডিয়া ফোনে ফেসবুক চালান। তাও একটা অ্যাকাউন্টে না, নামে বেনামে অসংখ্য।… বাংলাদেশ ব্যাংক যেমন মানুষের মোট কতটা ব্যাংকে অ্যাকাউন্ট আছে, কত টাকা জমা আছে, টাকার উৎস কী এসব বিষয়ে অনুসন্ধানী কার্যক্রম চালায়; ফেসবুক কর্তৃপক্ষও যদি অ্যাকাউন্ট হোল্ডারদের খোঁজখবর রাখতেন…! ফরিদ টুজি থেকে থ্রিজি-তে উন্নীত হয়েছেন। এসব কি ছাই আমি বুঝি! নতুন উন্মাদনা যুক্ত হয়েছে সেলফি। নিজেই নিজের ছবি তুললে তারে কয় সেলফি। রঙ্গ দেখলে অঙ্গ জ্বলে। উপায়ও নেই সব নীরবে দেখে যেতে হবে। মানুষই একমাত্র প্রাণী যারা কিনা… থাক বলব না, ছোট মুখে বড় কথা ভালো শোনাবে না!
বাংলাদেশ নাকি তৃতীয় বিশ্বের দরিদ্র একটি দেশ আমার বিশ্বাস হয় না। দিনের চব্বিশ ঘণ্টাই এদেশের মানুষ মোবাইলফোনে কথা বলে কীভাবে! প্রতি মিনিটে কত টাকা হাওয়ায় উড়িয়ে দেয় হিসাবটা আমার জানা নাই। প্রকৃত অর্থে অংকটা বড় সন্দেহ নেই। কষ্ট লাগে যখন দেখি এদেশের অসংখ্য শিশু তিনবেলা খেতে পায় না, লাখো মানুষের ঘরবাড়ি নাই, কৃষকরা ফসল ফলিয়ে ভোগ করতে পারে না।… এসব কথা বলা বোধহয় আমার উচিত না সরকার ভেবে বসতে পারে আমি বিরোধী দলের চর!
এত কথায় কাজ কী! তোমরা তোমাদের মতো কাজ-অকাজ করতে থাকো, নিরন্তর সেবা দিতে আমি প্রস্তুত!  আমি নগণ্য এক সিমকার্ড, সত্য ও সুন্দরের প্রতি আমার পক্ষপাত, চাওয়া-পাওয়ার পরোয়া কি তোমরা মনুষ্যসন্তানরা করবে!

মন্তব্য করুন

Editor- Sayed Mohammad SHAKIL.
Office: Evan plaza, sador model thana road, cox’sbazar-4700. Email: dailycoxsbazar@gmail.com / phone: 01819099070
অনুমতি ছাড়া অথবা তথ্যসূত্র উল্লেখ না করে এই ওয়েব সাইট-এর কোন অংশ, লেখা বা ছবি নকল করা বা অন্য কোথাও প্রকাশ করা বেআইনী