সংবাদ শিরোনাম

শেখ মুজিবুর রহমান : বাঙালির স্বাধীনতার প্রতীক

শেখ মুজিবুর রহমান (১৭ মার্চ ১৯২০-১৫ আগস্ট ১৯৭৫), প্রতিকৃতি: মাসুক হেলালআমি আমার ভালোবাসার কথা বলতে এসেছিলাম
বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান বাঙালির জাতীয় ইতিহাসে প্রবল এক ব্যক্তিত্ব। ১৯৬০-এ দশকের দ্বিতীয় ভাগে হয়ে উঠেছিলেন বাঙালির স্বাধীনতার ব্যক্তি-প্রতীক। এ নিয়ে লিখেছেন জন পি থর্প। লেখক যুক্তরাষ্ট্রের বিভিন্ন বিশ্ববিদ্যালয়ে সামাজিক বিজ্ঞানে অধ্যাপনা করেছেন। বাংলাদেশ ছিল তাঁর গবেষণার অন্যতম এলাকা। তাঁর মূল লেখা ‘শেখ মুজিবুর রহমান, অা সাইক্লোন অ্যান্ড দ্য ইমার্জেন্স অব বাংলাদেশ’ প্রকাশিত হয়েছিল সাউথ এশিয়া রিসার্চ-এর নভেম্বর ১৯৮৭ সংখ্যায়। বর্তমান রচনা মূল লেখার নির্বাচিত অংশের ঈষৎ সংক্ষেপিত অনুবাদ। শোকাবহ আগস্টে বঙ্গবন্ধুর মৃত্যুবার্ষিকী সামনে রেখে ছাপা হলো রচনাটি

মানুষকে রাস্তায় বন্দুকের ধোঁয়া ওঠা নলের সামনে পাঠানোর জন্য শুধু ‘ঔপনিবেশিক শোষণ’, ‘নৃতাত্ত্বিক সীমাবদ্ধতা’ বা ‘শ্রেণিস্বার্থ’ যথেষ্ট নয়। বাংলাদেশের অভ্যুদয় ব্যাখ্যা করতে গিয়ে বহু গবেষক এসব ধারণা প্রয়োগ করে সমাজ-কাঠামোগত বিশ্লেষণ হাজির করেছেন। আর্থসামাজিক বৈষম্য দিয়েও এই আন্দোলনে মানুষের এমন গণহারে অংশগ্রহণের বিষয়টিকে ব্যাখ্যা করা যায় না, এমনকি পাকিস্তানি সামরিক বাহিনী যখন তীব্র বলপ্রয়োগ করছে তখনো। এটা বোঝার জন্য বিশ্ববীক্ষা, মূল্যবোধ ও সংস্কৃতি যে মানুষের মধ্যে অভিন্ন প্রতীকী মূল্যবোধ গড়ে তোলার মাধ্যমে তাকে অনুপ্রাণিত করে, তা বোঝা দরকার। শেখ মুজিবুর রহমান একটি বিশেষ বিশ্ববীক্ষা ও মূল্যবোধ সঞ্চার করেছিলেন।

এই প্রতীকী আচরণ মানুষের এক অপরিহরণীয় সামাজিক সত্য, মানুষ হওয়ার এক মৌলিক উপাদান। মানুষ যখন একে অপরের সঙ্গে কথা বলে, বস্তুর নামকরণ করে, কোনো কিছুর দাবি করে ও কিছু মাত্রায় পরস্পরকে বুঝতে পারে, তখন তারা এক রকম প্রতীকী ব্যবহারের মধ্যে প্রবেশ করে। মানবীয় এই প্রতীকী ব্যবস্থাই আসলে মানুষের সামাজিক ও ব্যক্তিক মনস্তত্ত্বের ছাঁচ গড়ে দেয়। রাষ্ট্রের সঙ্গে রাষ্ট্রের বিরুদ্ধ প্রতীকী মডেল ও বৃহত্তর বিশ্বের প্রক্রিয়াকে মেলানোর মাধ্যমে মানুষ আসলে বুঝতে পারে, সে কে, ব্যক্তি হিসেবে সমাজের মধ্যে তাঁর স্থান কোথায়।

শেখ মুজিব পূর্ব পাকিস্তানের বাঙালিদের মুখপাত্র হিসেবে বক্তৃতার মাধ্যমে শ্রোতাদের মধ্যে আত্মসত্তার বোধ এবং সামাজিক শ্রেণির অন্তর্গত মানুষ হিসেবে তাঁরা কোথায় যাচ্ছেন, সেই বোধ সৃষ্টি করেছেন। ক্লিফোর্ড গিয়ার্টজের ভাষায়, শেখ মুজিব মানুষকে ভাবাদর্শের সন্ধান দিয়েছেন। শেখ মুজিব নিজের ও তাঁর শ্রোতৃমণ্ডলীর রাজনৈতিক মূল্যবোধ ও লক্ষ্যের উত্তরণ ঘটাতে ঘটাতে পরিশেষে পাকিস্তানি সেনাদের গর্জে ওঠা বন্দুকের নলের সামনে দাঁড়ানোর দৃঢ়তা ও সাহসে উজ্জীবিত করার জন্য জনগোষ্ঠীর প্রতীকী ঐতিহ্যের ওপর নির্ভর করেছিলেন। এই প্রতীকী আচরণের ব্যাখ্যা অন্যান্য সমাজব্যবস্থা বিশ্লেষণের সঙ্গে অসংগতিপূর্ণ নয়। বস্তুত, পাকিস্তানের সামাজিক ব্যবস্থার নানা ঐতিহাসিক ঘটনাচক্র ছাড়া শেখ মুজিবের পক্ষে বাংলাদেশের মুখপাত্র হওয়া সম্ভবপর ছিল না। বিভিন্ন ঘটনার মধ্য দিয়ে শেখ মুজিব বাংলাদেশের প্রতীকী মডেলকে আরও দানা বেঁধে উঠতে সহায়তা করেন।

আসলে ১৯৭০ সালের নির্বাচনকে ঘিরে জনপরিসরে রাজনৈতিক আকাঙ্ক্ষা গড়ে উঠতে শুরু করে। ঘূর্ণিঝড়-পরবর্তী সরকারের পদক্ষেপকে কেন্দ্র করে তা জনরোষে পরিণত হয়। নির্বাচনের পর সে আবেগ আনন্দময় এবং মার্চের শেষ দিকে তা উচ্ছ্বসিত হয়ে ওঠে। এর প্রতিটি স্তরেই গণতান্ত্রিক রাজনৈতিক প্রক্রিয়াকে পেছন থেকে ছুরি মারার আশঙ্কা ছিল। নেতা হিসেবে শেখ মুজিব যেমন এই পরিস্থিতির একজন জাতক ছিলেন, তেমনি তিনি এই পরিস্থিতি সৃষ্টি করতেও ভূমিকা রেখেছেন।

ঘূর্ণিঝড় (সাইক্লোন)-পরবর্তী পরিস্থিতিকে শেখ মুজিব ব্যবহার করতে পেরেছিলেন দারুণভাবে। এই দুর্যোগের পর তিনি প্রচারণার মাধ্যমে বাঙালিদের কেন্দ্রীয় সরকারের মুখোমুখি অবস্থানে দাঁড় করিয়ে দিলেন। বিশেষ করে স্বায়ত্তশাসনের প্রশ্নে এই প্রচারণাকে তিনি অনন্য এক স্তরে নিয়ে গেলেন। পূর্ব বাংলার জীবনে ঘূর্ণিঝড় কোনো সংকট নয়, বরং এক স্বাভাবিক প্রাকৃতিক অনুষঙ্গ। কিন্তু এই ঘূর্ণিঝড়ের পর শেখ মুজিব পূর্ব পাকিস্তানের জনমনে এমন ধারণা সৃষ্টি করতে সক্ষম হলেন যে তাদের জীবন এক প্রবল হুমকির মুখে। যতক্ষণ তাঁরা দেশের রাজনৈতিক ব্যবস্থার বৈপ্লবিক রূপান্তর ঘটাতে না পারছেন, ততক্ষণ এই হুমকি থেকে নিস্তার নেই।

১৯৭১ সালের মার্চ মাসের মধ্যে শেখ মুজিব এক ভাবাদর্শ সৃষ্টি করলেন, যা বাঙালির চেতনাকে একটা সামষ্টিক রূপ দিতে সক্ষম হলো। ব্যাপারটা এমন জায়গায় চলে গেল যে মানুষ তখন শুধু প্রতিবাদ নয়, দীর্ঘদিনের অধীনতাকে সক্রিয়ভাবে প্রতিরোধ করার অবস্থানে চলে গেল। শেখ মুজিব কিছু প্রতীক নির্মাণ করলেন, যা মানুষের আবেগকে রাজনৈতিক লক্ষ্যে ময়দানে নামতে অনুপ্রাণিত করে অবশেষে পাকিস্তান সেনাবাহিনীর বিরুদ্ধে সশস্ত্র যুদ্ধের দিকে ধাবিত করে। অনেকেই মনে করতেন, শেখ মুজিব বাংলাদেশের যে প্রতীকী রূপ দিয়েছিলেন, তার জন্য লড়াই যেমন করা যায়, তেমনই জীবনও বিসর্জন দেওয়া যায়।

‘এবারের সংগ্রাম স্বাধীনতার সংগ্রাম’ ১৯৭১–এর ৭ মার্চে ঢাকার রেসকোর্স মাঠে বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান। ছবি: আফতাব আহমেদনির্বাচনী প্রচারণা

১৯৭০ সালের নির্বাচনের মাধ্যমে সংবিধান সভা গঠন করার কথা ছিল, যার মাধ্যমে পাকিস্তান গণতান্ত্রিক ব্যবস্থা ফিরে আসবে। এই নির্বাচনের মাধ্যমে পাকিস্তানের দুই অংশের জন্য জনসংখ্যা-ভিত্তিক প্রতিনিধি নির্বাচিত হওয়ার কথা ছিল। তৎকালীন পূর্ব পাকিস্তানের জন্য এ ছিল এক নতুন অভিজ্ঞতা। আগের নির্বাচনে পাকিস্তানের দুই অংশের প্রতিনিধিত্ব সমান ছিল। ফলে সংখ্যাগরিষ্ঠ অংশটি বঞ্চিত হতো। এই প্রথমবারের মতো পূর্ব পাকিস্তানের রাজনৈতিক নেতাদের সামনে পাকিস্তানের কেন্দ্রীয় ক্ষমতা লাভ করার সুযোগ এল। বাঙালিরা ভাবল, পশ্চিম পাকিস্তান এত দিন তাঁদের সঙ্গে যে অন্যায় করে আসছিল, তা নিরসন করার সুযোগ এসেছে। ফলে নির্বাচনের প্রচারণা ছিল ব্যাপক, মানুষের আগ্রহও ছিল তুঙ্গে।

প্রচারণার সময় শেখ মুজিবের কথামালায় যে প্রতীকীগুলো উপাদান ছিল—পরবর্তীকালে যা বাংলাদেশের প্রতীকে রূপান্তরিত হয়—তখনো সেগুলো ক্যারিশম্যাটিক রূপ লাভ করেনি। সেসব প্রতীকী রূপ পায় নভেম্বরের ঘূর্ণিঝড়ের পরে। তাঁর প্রচারণার আবেদনের সারমর্ম দাঁড়ায় এ রকম: ছয় দফার ভিত্তিতে পূর্ব পাকিস্তানের স্বায়ত্তশাসন জরুরি, শহীদদের রক্তের বিনিময়ে বাংলাদেশের স্বায়ত্তশাসন যৌক্তিক ও আইনানুগ।

নির্বাচনের প্রচারণার সময় শেখ মুজিব এ বিষয়ে জোর দেন যে প্রাদেশিক স্বায়ত্তশাসনের ব্যাপারে কোনো আপস করা হবে না। তিনি এই নির্বাচনকে আওয়ামী লীগের ছয় দফার দাবির ন্যায্যতার প্রশ্নে গণভোট মনে করতেন। বাংলাদেশের জন্য যেসব শহীদদের রক্ত ঝরেছে, জনতার রায় পেলে তাঁদের স্মৃতির উদ্দেশে শেখ মুজিব এই কর্মসূচি বাস্তবায়ন করার প্রতিশ্রুতি দেন। তাঁর ব্যবহৃত কিছু শব্দের সংক্ষিপ্ত ব্যাখ্যা দেওয়া প্রয়োজন।

স্বায়ত্তশাসন

১৯৭০ সালের মধ্যে ‘স্বায়ত্তশাসন’ পাকিস্তানের রাজনীতিতে বিরোধীদের পবিত্র দাবিতে পরিণত হয়। এই শব্দটি দিয়ে বস্তুত ১৯৬৬ সালের ছয় দফা কর্মসূচিতে যে আলগা ফেডারেশনের প্রস্তাব দেওয়া হয়েছিল, সেটিই বোঝানো হয়েছে। সেখানে বলা হয়েছিল, স্বাধীন পাকিস্তানের মধ্যে পূর্ব পাকিস্তানের বাঙালিদের মুক্ত নাগরিকত্ব দেওয়া হবে।

শেখ মুজিব সব সময়ই স্বাধীনতা (ইনডিপেনডেন্স) ও মুক্তির (ফ্রিডম) সঙ্গে স্বায়ত্তশাসনকে (অটোনমি) যুক্ত করতেন। ইংরেজিতে কথা বলার সময় শেখ মুজিব স্বায়ত্তশাসনকে অন্য দুটি শব্দের থেকে আলাদা করে দেখাতেন। ‘স্বাধীনতা’ বলতে তিনি বোঝাতেন ১৯৪৭ সালে ব্রিটেনের কাছ থেকে পাওয়া স্বাধীনতাকে। ‘মুক্তি’ বলতে বোঝাতেন স্বাধীন দেশে ‘মুক্ত নাগরিকদের’ (ফ্রি সিটিজেনস) অধিকার।

১৯৪৭ সালে প্রতিষ্ঠার পর পাকিস্তান স্বাধীন থাকার কথা। কিন্তু বাংলায় কথা বলার সময় শেখ মুজিব এই তিনটি শব্দের ধারণার মধ্যে পার্থক্য করার ব্যাপারে সতর্ক থাকতেন না। তিনটি আলাদা তাৎপর্যের ইংরেজি শব্দের সাধারণ বাংলা ছিল ‘স্বাধীনতা’। ফলে শেখ মুজিব ইংরেজিতে যা বলতেন, তা রাজনৈতিকভাবে আপত্তিকর না হলেও বাংলায় এই দ্ব্যর্থবোধকতার কারণে তাঁর লড়াকু ও স্বাধীনতাকামী সমর্থকেরাও উৎফুল্ল হতেন।

ছয় দফা কর্মসূচি

আওয়ামী লীগের ১৯৬৬ সালের ছয় দফা কর্মসূচি বাস্তবায়নের মাধ্যমে স্বায়ত্তশাসন অর্জন করা হবে। শেখ মুজিব এ প্রস্তাব পেশ করেছিলেন মূলত ১৯৬৫ সালের ভারত-পাকিস্তান যুদ্ধের পর। এই যুদ্ধের শুরুতে অধিকাংশ বাঙালি মুসলমানই পাকিস্তান পক্ষে ছিলেন। যুদ্ধ যত এগোতে শুরু করল, ততই পরিষ্কার হয়ে গেল যে পূর্ব পাকিস্তান পশ্চিম পাকিস্তানের ক্ষমতাকেন্দ্র থেকে বিচ্ছিন্ন; ভারতীয় আক্রমণের মুখে সে একদম প্রতিরক্ষাহীন। এই বিচ্ছিন্নতার কারণে অনেকের মনে গভীর নিরাপত্তাহীনতা সৃষ্টি হলো। আইয়ুব খানের সরকারের পশ্চিম পাকিস্তানকেন্দ্রিক নীতির পরিণতি কী হতে পারে, এ যুদ্ধ থেকে সেটা পরিষ্কার বোঝা গেল। ১৯৬৬ সালের ফেব্রুয়ারি মাসে শেখ মুজিব পেশ করলেন তাঁর ছয় দফা: প্রাপ্তবয়স্কদের সর্বজনীন ভোটাধিকার, ফেডারেল রাষ্ট্রব্যবস্থা—যার হাতে থাকবে প্রতিরক্ষা ও পররাষ্ট্র মন্ত্রক, প্রাদেশিক সরকারের নিজস্ব মুদ্রাব্যবস্থা, রাজস্ব বিভাগ, বৈদেশিক বাণিজ্য ও আধা সামরিক বাহিনী।

এই ছয় দফার সঙ্গে আগের স্বায়ত্তশাসনের দাবির পার্থক্য হলো, এতে রাজস্ব ও বৈদেশিক বাণিজ্যের চুক্তি করার ক্ষমতা প্রাদেশিক সরকারের হাতে দেওয়া হয়েছে। যা হোক, এই ছয় দফা দাবি পূর্ব পাকিস্তানের রাজনীতির গতিমুখ বদলে দিল। এর আগে পূর্ব পাকিস্তানের রাজনৈতিক তৎপরতার মাজেজা ছিল পূর্ব পাকিস্তানের জন্য আরও বেশি কিছু করার জন্য পশ্চিম পাকিস্তানের কাছে দেন-দরবার করা। এবার আওয়ামী লীগ দাবি করল, পূর্ব পাকিস্তানের বাঙালিদের নিজেদের জন্য আরও বেশি কিছু করার সুযোগ দিতে হবে।

আইয়ুব খান সরকার খুব দ্রুত এই ছয় দফা কর্মসূচি দমন করল। গ্রেপ্তার করা হলো শেখ মুজিবসহ শীর্ষ আওয়ামী লীগ নেতাদের। ১৯৬৭ সালের ডিসেম্বর মাসে ষড়যন্ত্র করে পূর্ব পাকিস্তানকে পশ্চিম পাকিস্তানের কাছ থেকে বিচ্ছিন্ন করার অভিযোগে তাঁদের বিরুদ্ধে শুরু হলো বিচার। বিচারের সময় পূর্ব পাকিস্তানজুড়ে ছয় দফা নিয়ে ব্যাপক আলোচনা হলো। ১৯৭০ সালের নির্বাচনী প্রচারণায় ছয় দফার ভিত্তিতে যে স্বায়ত্তশাসনের দাবি তোলা হয়েছিল, সে প্রশ্নে আর আপস করার সুযোগ থাকল না। শেখ মুজিব আর তখন ছয় দফার যথার্থতা, অযথার্থতা বা সম্ভাব্যতা নিয়ে কথা বলেননি। আওয়ামী লীগ নির্বাচনে প্রয়োজনীয় সংখ্যাগরিষ্ঠতা পেলে এসব দাবি সংবিধানে যুক্ত করা হবে।

বঙ্গবন্ধু যেভাবে স্বাধীনতার প্রতীক হয়ে উঠলেনবাংলাদেশ

শেখ মুজিবের প্রচারণায় তৃতীয় গুরুত্বপূর্ণ উপাদানটি ছিল দেশ। বাঙালির কাছে দেশ মানে হচ্ছে বাস্তুভিটা ও তার আশপাশের খেতখোলা। আরেকটু সম্প্রসারিত হয়ে হয়তো পাশের গ্রাম, বাজার ও সংশ্লিষ্ট শহর পর্যন্ত ছড়ানো। এটুকু ছাড়া আর সবকিছুই বিদেশ। মাটিই দেশের প্রধান অনুষঙ্গ। যে মানুষেরা এই মাটি থেকে জাত—যারা একই খাবার খায়, একই ভাষায় কথা বলে, একই পোশাক পরে—তারা একই দেশের মানুষ।

আঞ্চলিক উপভাষায় দেশ শব্দটি দিয়ে বাঙালিরা কাউকে সমগোত্রীয় মনে করে, আবার কাউকে আলাদা করে। বাঙালি জাতীয়তাবাদীরা শব্দটির আরও বৃহত্তর অর্থ দিতে চেয়েছেন। তাঁরা এর আন্তজেলা ব্যঞ্জনাকে রূপান্তরিত করার চেষ্টা করেছেন আন্তজেলায়—এক বৃহৎ বাঙালি সংহতি-চেতনায়।

উদাহরণ হিসেবে বলা যায়, সেই ১৯২০-এর দশকে চিত্তরঞ্জন দাশ পুরো বাংলার পরিপ্রেক্ষিতে দেশ শব্দটি ব্যবহার করেছেন। শেখ মুজিব যে বাংলাদেশ শব্দটি ব্যবহার করেছেন, তাতে তিনি বেশ নিরাপদভাবেই বাঙালি জাতীয়তাবাদী ঐতিহ্যের মধ্যে থেকেছেন, যদিও তিনি কথাটি বলেছেন পূর্ব পাকিস্তানের প্রেক্ষাপটে। শেখ মুজিবের যুক্তি ছিল এ রকম: যারা বাংলাদেশের মাটিতে থাকে, তারা সবাই একই চেতনাসম্পন্ন মানুষ। ফলে এই মাটিতে যা হচ্ছে, তার নিয়ন্ত্রণ হাতে নেওয়ার নৈতিক অধিকার তাঁদের আছে। পাকিস্তানের একটি প্রদেশ হওয়ায় এ অঞ্চলের মানুষ সে অধিকার পায়নি। তারা পশ্চিম পাকিস্তানের শোষণের শিকার হয়েছে।

শেখ মুজিব যে দেশের কথা বলেছেন, তা মানুষের মনে এক আদিম সন্তুষ্টি উৎপাদন করেছে, যেটা আবার বাঙালির লক্ষ্যকে প্রতীকী মূল্যও দেয়। অবাঙালি মুসলমানেরা দেশকে বিদেশ (পাকিস্তান) থেকে আলাদা হিসেবেই দেখল। নির্বাচনী প্রচারণায় শেখ মুজিব খুব সতর্কতার সঙ্গে ‘বাংলাদেশ’ শব্দটির ব্যবহার পূর্ব পাকিস্তানের প্রদেশের মধ্যে সীমাবদ্ধ করেন। কিন্তু দেশের মতো একটি স্থানীয় ও আঞ্চলিক শব্দকে সর্বজনীন রূপ দেওয়ার যে অন্তর্নিহিত দ্ব্যর্থবোধকতা রয়েছে, তার মধ্য দিয়ে শেখ মুজিবের কিছু সমর্থক বিচ্ছিন্নতার দাবিও তোলেন। স্বাধীনতার (স্বায়ত্তশাসন ও মুক্তি) মতো দেশ শব্দটিরও নানামাত্রিক অর্থ রয়েছে। শেখ মুজিবের কথামালার এই নানাবিধ ব্যঞ্জনার কারণে তাঁর প্রচারণার আবেদন অংশত ভাবাদর্শের রূপ নেয়। ফলে শেখ মুজিব নতুন শব্দ ব্যবহার না করেও তাঁর বক্তব্যের আবেদন বেশ বিপ্লবী করে তুলতে পারতেন।

শহীদের রক্ত

শেখ মুজিব বলতেন, বাংলাদেশের স্বায়ত্তশাসনের দাবি যথাযথ ও যৌক্তিক। এর রাজনৈতিক ইতিহাসে যাঁরা রক্ত দিয়েছেন, তাঁদের সবার প্রতি কৃতজ্ঞতা প্রকাশ করা হয়েছে। এই শহীদদের শ্রদ্ধা জানানোর প্রথা ১৯৭০ সাল নাগাদ প্রায় প্রতিষ্ঠিত হয়ে যায়। এমনিতে ২১ ফেব্রুয়ারি শহীদ দিবস হিসেবে পালিত হতো। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের কেন্দ্রীয় শহীদ মিনার ভাষা আন্দোলনের শহীদদের প্রতি শ্রদ্ধা জানানোর মূল জায়গা।

এখানকার সব স্কুল-কলেজেও শহীদ মিনার আছে। বিভিন্ন রাজনৈতিক আন্দোলনে যাঁরা মারা গেছেন, তাঁদেরও ১৯৭০ সালের মধ্যে শহীদ হিসেবে গণ্য করা হলো। ১৯৬৭ সালের আগরতলা ষড়যন্ত্র মামলায় যাঁরা সামরিক কারাগারে মারা যান, তাঁরাও শহীদদের কাতারে নতুন করে স্থান পান। কালো পতাকা তোলা, কালো ব্যাজ পরা এবং খালি পায়ে শহীদ মিনারে যাওয়ার মধ্য দিয়ে শহীদদের প্রতি শ্রদ্ধা জানানোর রীতি গড়ে ওঠে। ফলে ২১ ফেব্রুয়ারি সত্যিকার অর্থেই বাঙালির জাতীয় দিবসে পরিণত হয়।

বিষয়টা আরও জটিল হয়ে যায় এ কারণে যে শহীদদের রক্ত যেমন পূর্ব পাকিস্তানের জাতীয়তাবাদী প্রতীকে পরিণত হয়, তেমনি এই রক্ত মুসলমানদেরও প্রতীকে পরিণত হয়। এই প্রতীকের ধর্মীয় ভিত্তিও আছে। ৬৩২ খ্রিষ্টাব্দে হজরত মোহাম্মদের (সা.)-এর মৃত্যুর পর নেতৃত্ব নিয়ে দ্বন্দ্ব-সংঘাত সৃষ্টি হয়। প্রথমত, হাসানকে বিষ প্রয়োগে হত্যা করা হয়। এরপর হোসেন ৬৮০ খ্রিষ্টাব্দে কারাবালার যুদ্ধে প্রাণ হারান। প্রতিবছর মহররমের সময় তাঁদের এই শাহাদাতবরণের দিবস পালন করা হয়। এই দিনটি মুসলিম বর্ষপঞ্জিতে বছরের প্রথম দিন। বাঙালি সুন্নি মুসলমানেরা এই দিনটি উত্তর ভারতের মুসলমানদের মতো তত জাঁকজমকের সঙ্গে পালন না করলেও মহররমের মিছিলের সঙ্গে তারা ২১ ফেব্রুয়ারির মিছিলের মিল খুঁজে পায়। যে অবাঙালি মুসলমানদের হাতে বাঙালিরা শহীদ হয়েছেন, তাঁদের অনেকে আবার শিয়া সম্প্রদায়ভুক্ত। এও এক অসামঞ্জস্য।

বঙ্গবন্ধু, ১৯৭৫ ছবি: আহমেদ সাজ্জাদুল আলম ববিশেখ মুজিব কিছু প্রতীক নির্মাণ করলেন, যা মানুষের আবেগকে রাজনৈতিক লক্ষ্যে ময়দানে নামতে অনুপ্রাণিত করে অবশেষে পাকিস্তান সেনাবাহিনীর বিরুদ্ধে সশস্ত্র যুদ্ধের দিকে ধাবিত করে

যে ভাষা আন্দোলনে বাঙালি প্রথম শহীদ হন, সেটি নিঃসন্দেহে নৃতাত্ত্বিক, জাতীয়তাবাদী ও ধর্মনিরপেক্ষ ব্যাপার ছিল। তা ছাড়া এ আন্দোলনটি কিন্তু ইসলামের জাতি গঠনের ভূমিকা থেকে মোটেই বিচ্ছিন্ন নয়। পূর্ব পাকিস্তানের অনেক মুসলমানই ভাবতেন, পাকিস্তান—যার অর্থ পবিত্র ভূমি—সেই পাকিস্তানে কীভাবে পূর্ব পাকিস্তানের সঙ্গে বিমাতাসুলভ আচরণ করা হচ্ছে। কীভাবে সেখানে বাঙালি মুসলমানদের হত্যা করা হচ্ছে। কথা হলো, আওয়ামী মুসলীম লীগ যে ১৯৫৩ সালে তথাকথিত ধর্মনিরপেক্ষ হলো, সেটা কিন্তু মুসলিম মূল্যবোধকে অস্বীকার করে নয়। পাকিস্তানের নেতারা ইসলামের নামে যে সাম্প্রদায়িকতা শুরু করেছিল, তাতে বিরক্ত হয়ে তাঁরা মুসলিম শব্দটি নাম থেকে বাদ দিয়েছিলেন। শেখ মুজিবুর রহমান এ সময় রাজনৈতিক নেতা হিসেবে পরিপক্ব হয়েছেন। বাঙালি শহীদের রক্ত কথাটি তখন তিনি বহুবার ব্যবহার করেছেন। আসলে এই শহীদের রক্ত ছিল পূর্ব পাকিস্তানের দাবির ইসলামি যুক্তি, যেটা বাংলা ভাষার চেয়েও অনেক কার্যকর প্রতীক ছিল।

শেখ মুজিব এ দাবিও করেছিলেন যে শহীদদের রক্তের প্রতি সত্যনিষ্ঠ থাকতে বাঙালিদের দাবির ব্যাপারে অবিচল থাকতে হবে। তখন আন্দোলন চালিয়ে যাওয়া শহীদদের রক্তের প্রতি শ্রদ্ধা দেখানোর শামিল ছিল। এ ধরনের দৃঢ়তা প্রয়োজনীয় ছিল, কারণ নির্বাচন হবে কি না, সে নিয়েই অনেক সন্দেহ ছিল। তিনি বারবার এ ব্যাপারে সতর্ক করে দিতেন, ফলে মানুষের সন্দেহ আরও পাকাপোক্ত হতো। শিক্ষক, ছাত্র, দোকানদার, রিকশাচালক—সবাই এ ব্যাপারে নিশ্চিত ছিলেন যে নির্বাচন হবে না। বন্যার কারণে নির্বাচন অক্টোবর মাস থেকে পিছিয়ে ডিসেম্বর মাসে নিয়ে যাওয়ার কারণে এ সন্দেহ আরও ঘনীভূত হয়।

শেখ মুজিব এই সন্দেহ কাজে লাগিয়ে শহীদদের রক্তের প্রতি শ্রদ্ধা জানাতে গণ-আন্দোলন শুরু করার প্রতিশ্রুতি দিয়েছিলেন। এতে তাঁর প্রচারণায় মানুষের উৎসাহ সৃষ্টি হয়। নির্বাচন হোক বা না হোক, তিনি ইতিবাচক ও ধারাবাহিক আন্দোলন চালিয়ে যাওয়ার প্রতিশ্রুতি দিয়েছিলেন।

শেষমেশ, সাংস্কৃতিক বীর হিসেবে শেখ মুজিব যে ভাবমূর্তি গড়ে তোলেন, তাতে তাঁর বিশ্বাসযোগ্যতা বেড়ে যায়। মানুষের মনে জাতীয়তাবাদী নেতাদের যে শহীদ-স্মৃতি ছিল, তার সঙ্গে শেখ মুজিবের মিল ছিল গভীর। কারণ, বাংলাদেশের জন্য আন্দোলন করতে গিয়ে তিনি বহুদিন জেল খেটেছেন। আগরতলা ষড়যন্ত্র মামলার বিচার প্রকাশ্যে করার কারণে সাহিত্যিক, ছাত্র, কর্মী ও জনতা সহিংস হয়ে উঠেছিল। তার জেরে আইয়ুব খানের পতন হয়, তবে তাঁর পতনের আরও কিছু কারণ ছিল। ১৯৬৯ সালের ফেব্রুয়ারি মাসে শেখ মুজিব যেদিন ছাড়া পান, সেদিন ঢাকায় এক বিশাল বিজয় মিছিল হয়েছিল। দিনটিতে শেখ মুজিবকে আনুষ্ঠানিকভাবে বঙ্গবন্ধু উপাধি দেওয়া হয়। এই ধরনের উপাধি সাধারণত দেওয়া হয় বাঙালি রাজনৈতিক বীরদের। ১৯৬৯ সালে শেখ মুজিব বাঙালি জাতীয়তাবাদী আদর্শ ও আকাঙ্ক্ষার মূর্ত প্রতীক হয়ে ওঠেন। অন্য কোনো রাজনীতিবিদ তাঁর ধারেকাছেও যেতে পারেননি। তাঁর জনসভায় নিয়মিতই লাখ দশেক লোক হতো। শেখ মুজিব নিজের ক্যারিশমা সম্পর্কে সচেতন ছিলেন। সে কারণে তিনি সব সময়ই নিজেকে পূর্ব পাকিস্তানের মুখপাত্র হিসেবে দাবি করতেন।

মোদ্দা কথা হলো, শেখ মুজিব বিভিন্ন প্রতীকের এক জটিল সমন্বয় তৈরি করেছিলেন, যা বাঙালির আগ্রহকে রাজনৈতিক লক্ষ্যের দিকে ধাবিত করেছিল। ‘বাংলাদেশ’, ‘স্বায়ত্তশাসন’ প্রভৃতি শব্দের দ্ব্যর্থবোধকতার জন্য এবং ছয় দফা কর্মসূচির শিথিল ও আদর্শ রূপের জন্য শেখ মুজিবের পক্ষে এটা দাবি করা সহজ ছিল যে তিনি পাকিস্তানের অখণ্ডতাকে হুমকি জানাচ্ছেন না। ফলে একই সময়ে শেখ মুজিবের বিপ্লবী সহচরদের পক্ষে বাংলাদেশের স্বাধীনতার কথা প্রচার করা সম্ভব হয়েছে, তাঁর নিজের প্রতীক ও শব্দ ব্যবহার করেই। একই শব্দের এ রকম ভিন্ন ব্যাখ্যা দেওয়া সম্ভব হয়েছে বলে এসব প্রতীক জ্যোতির্ময় হয়ে উঠেছে। আর নভেম্বরের ঘূর্ণিঝড়ে তৎকালীন পূর্ব পাকিস্তানে ব্যাপক ধ্বংসযজ্ঞ হওয়ায়, এসব প্রতীক পুনর্বিন্যস্ত করা সম্ভব হয়েছে। এতে শেখ মুজিবের পক্ষে শহীদের রক্তের প্রতীকের ওপর মূল জোর দেওয়া সম্ভব হয়েছে।

 

১৯৭০ সালের নির্বাচন ও তার পরিণাম

মন্তব্য করুন

Editor in Chief : Sayed Shakil
Office: Evan plaza, sador model thana road, cox’sbazar-4700. Email: dailycoxsbazar@gmail.com / phone: 01819099070
অনুমতি ছাড়া অথবা তথ্যসূত্র উল্লেখ না করে এই ওয়েব সাইট-এর কোন অংশ, লেখা বা ছবি নকল করা বা অন্য কোথাও প্রকাশ করা বেআইনী