সংবাদ শিরোনাম

বৃটিশবিরোধী আন্দোলনে কক্সবাজার সরকারি উচ্চ বিদ্যালয়

কালাম আজাদ :

হাজার বছর ধরে বিকশিত বাঙালি জাতি বিজাতীয় শাসন-শোষণে পিষ্ট হয়েছে দীর্ঘকাল। কিন্তু একটি সার্বভৌম রাষ্ট্র গড়ার মতো চেতনা, ঐক্য ও অবস্থা সে সময়ে হয়নি। তাই বলশালী রাজরাজড়াদের দখলী সত্ত্ব মেনে নিতে বাধ্য হয়েছে। কিন্তু বৃটিশ শাসনামলে বাঙালির রাজনৈতিক সত্তা দ্র্রত বিকশিত হতে আরম্ভ করে। শোষক ও লুণ্টক বৃটিশ সাম্রাজ্যের অন্যায় আর জুলুমের বিরুদ্ধে লড়তে গিয়ে বাঙালির রাজনৈতিক সত্তা পুষ্ট ও পোক্ত হয়ে ওঠে। ১৮২৬ সালের ১৭ জানুয়ারী যুক্ত প্রদেশের সৈয়দ আহমদ (১৭৮৬-১৮৩১) এর নেতৃত্বে সংগঠিত ওয়াহন আন্দোলনের মধ্যে দিয়ে বৃটিশ বিরোধী আন্দোলনের যাত্রা শুরু হয়। এরপর ফরাজি আন্দোলন, তিতুমীরের বিদ্রোহ(১৮৩০), ১৮৫৭ সালের সিপাহী সিপ্লব, ১৮৫৬-৬০ খ্রিস্টাব্দের নীলকর বিদ্রোহ, ১৯০৬ সালের বঙ্গবঙ্গ বিরোধী স্বদেশী আন্দোলনসহ বেশ কয়েকটি বিদ্রোহ এ বাংলায় সংঘঠিত হলেও ১৯১৯ সালের খেলাফত আন্দোলন ও অসহযোগ আন্দোলনের মধ্যে দিয়ে কক্সবাজারের লোকেরা রাজনীতি সচেতন হয়ে উঠে। এ সময় থেকে বৃটিশ কর্মকর্তা হিরাম কক্সের নামানুসারে নামকরণকৃত কক্সবাজারের রাজনীতির চিত্র পাওয়া যায়। দেশের দক্ষিণের সীমান্ত জেলা হিসেবে কক্সবাজারের গুরুত্বও ছিলো অত্যাধিক। খেলাফত আন্দোলন ও বৃটিশবিরোধী যুব বিদ্রোহের আন্দোলনে কক্সবাজার জেলার একমাত্র ঐতিহ্যবাহী স্কুল হিসেবে কক্সবাজার মধ্য ইংরেজি উচ্চ বিদ্যালয় (বর্তমানে সরকারি বালক উচ্চ বিদ্যালয়)’র অবদানও কম নয়। ইতিহাস পাঠ ও নিরীক্ষা করে জানা যায়, বৃটিশ বিরোধী খেলাফত আন্দেতালন থেকেই কক্সবাজার হাই স্কুলের চাঙ্গা চাঙ্গা ভাব ছিলো। খেলাফত কমিটির ছাত্র ফ্রণ্টের আলীমুদ্দিন, আবদুস সালাম, আবুল কাসেম চৌধুরী, আবুল কাসেম মিয়াজী প্রমুখ স্বদেশীদের উদ্যোগে আয়োজন করা হয় বৃটিশবিরোধী খেলাফত আন্দোলনের এক সভায়। ওই সভায় বিখ্যাত ভারতীয় স্বাধীনতাসংগ্রামী দেশপ্রিয় যতীন্দ্রমোহন দাশগুপ্ত, চট্টগ্রাম খেলাফত কমিটির সদস্য চকরিয়ার মাওলানা বদিউজ্জামাল আল কাদেরী, রামুর বিখ্যাত বৃটিশবিরোধী আন্দোলনের সংগ্রামী আবদুল মজিদ সিকদার (যিনি ১৯২১ সালে উখিয়ার কোটবাজারে বক্তৃতাদানকালে বৃটিশ বাহিনী কর্তৃক গ্রেফতার জেল খাটেন), বিশ্বকবি রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের জমিদারীর প্রভাবশালী কর্মকর্তা রামুর সন্তান বিপ্লবী রাস মোহন বড়ুয়া, খরুলিয়ার মাওলানা ওয়াজেদ আলী মক্কী, উজির আলী চৌধুরী, রত্মেশ্বর চক্রবর্তী, শরৎচন্দ্রপাল রায় বাহাদুর, আহমদ মিয়াজী, উজির আলী সিকদার প্রমুখ বক্তৃতা রেখেছিলেন। আহমদ মিয়াজী আলীমুদ্দিন চৌধুরী, আবুল কাসেম চৌধুরী, বদিউর রহমান চৌধুরী, ওয়াজেদ আলী ছিলেন কক্সবাজার হাই স্কুলের ছাত্র। ওই সভার মধ্য দিয়ে কক্সবাজারে স্বদেশী দ্রব্য বর্জনের যাত্রা শুরু হয় বলে ইতিহাস পাঠে জানা যায়। ১৯২১ সালের দক্ষিণ ভারতের মালবারে দুর্ধর্ষ মুসলমান বিদ্রোহী কর্র্তৃক বেশ কয়েকজন ইউরোপিয় ও হিন্দু হত্যা এবং ১৯২২ সালের ৪ ফেব্রুয়ারি আসামের গৌরক্ষপুর জেলার চৌরিচৌরা থানায় সংঘটিত ২১ পুলিশ ও চৌকিদার হত্যায় মর্মাহত হয়ে মহাত্মা গান্ধী অসহযোগ স্থগিত করে দিলেও খেলাফত আন্দোলন ১৯২৪ সালে মোস্তফা কামাল পাশা তুরস্কের নেতৃত্ব গ্রহণপূর্বক খিলাফত অবসান ঘোষণা করে তুরস্ককে প্রজাতান্ত্রিক রাষ্ট্র ঘোষণা পর্যন্ত এ আন্দোলন চলে। এরমধ্যে বিপ্লবীরা কিন্তু থেমে নেই। যুগান্তর, অনুশীলন প্রমুখ বিপ্লবী সংগঠনের মাধ্যমে জড়ো হতে থাকে বিপ্লবীরা। মাস্টারদা সূর্যসেন সারা বাংলায় ছড়িয়ে দেয় বিপ্লবী আন্দোলন। কক্সবাজারেও মাস্টারদার একনিষ্ট সহকর্মী বিধু সেনকে দায়িত্ব দেন কক্সবাজার বিপ্লবী গ্রাম সংগঠনকে সংগঠিত করার। কক্সবাজারে জন্মগ্রহণকারী বিধু সেন দায়িত্ব পেয়ে সর্বপ্রথম মন দেন ওই সময়ের শহরের একমাত্র স্কুল, যেখানে তিনিও পড়েছেন- যে স্কুলে অর্থাৎ হাই স্কুলের দিকে মন দেন। তার সততা, নিষ্টা ও কর্মতৎপরতায় কক্সবাজার হাই স্কুলের প্রবোধ কুমার রক্ষিত (পরবর্তীতে নামকরা আইনজীবী), অমৃতাঙ্কুর সেন গুপ্ত (চট্টগ্রাম কমিউনিস্ট পার্টির প্রথম অর্গানাইজ কমিটির সভাপতি ও পরবর্তীতে প্রথম জেলা কমিটির সাধারণ সম্পাদক), শৈলেশ্বর চক্রবর্তী ( এডভোকেট রত্মেশ্বর চক্রবর্তীর ছেলে, জ্যোতিশ্বর চক্রবতীর ছোট ; চট্টগ্রাম ইউরোপিয়ান ক্লাব আক্রমণে ব্যর্থ হয়ে ব্যর্থ মুখ মাস্টারদাকে না দেখাতে পটাশিয়াম খেয়ে আত্মহুতি দেন)সহ অনেক শিক্ষার্থী। আর এসব কাজে সহযোগিতা করতেন বদিউর রহমান চৌধুরী, রত্মেশ্বর চক্রবর্তী। বিধু সেন সফল হন এক সংগঠক হিসেবে। তারই অর্গানাইজ করা শিক্ষার্থী শৈলেশ্বর চক্রবর্তী, নির্মল লালা ঐতিহাসিক চট্টগ্রাম যুব বিদ্রোহ- অস্ত্রাগার দখল, চট্টগ্রাম পুলিশ লাইন আক্রমণ এবং জালালাবাদ যুদ্ধের প্রখ্যাত সৈনিক। এবং ঐতিহাসিক জালালাবাদ যুদ্ধের সৈনিক। নির্মল লালা ছিলেন মাস্টারদা সূর্যসেন দলের সর্বকনিষ্ট কর্মী এবং কক্সবাজার হাই স্কুলের ৮ম শ্রেণির ছাত্র। চট্টগ্রামের বোয়াখালী হাওলা গ্রামের নিম্ন মধ্যবিত্ত পরিবারে ১৯১৫ সালের জানুয়ারি মাসে জন্ম গ্রহণ করলেও বিশের দশকের শুরুতে তার পিতা যাত্রা মোহন লালা কক্সবাজারে স্থিত হন। তিনি মাস্টারদা সূর্যসেনের সঙ্গে পুলিশ লাইন আক্রমণে অংশগ্রহণ করেন এবং জালালাবাদ যুদ্ধে বীরত্বের সাথে যুদ্ধ করে শহিদ হন। আর শৈলেশ্বর চক্রবর্তী অস্ত্রাগার আক্রমণ এবং ঐতিহাসিক জালালবাদ যুদ্ধের অংশ নেন। এবং ১৯৩২ সালের ১০ আগস্ট ৬ সদস্য বিপ্লবীদের ইউরোপিয়ান ক্লাব আক্রমণের নেতৃত্বে দেন। বিপ্লবী দলের কথামত আক্রমণের সবুজ সংকেত না পেয়ে আক্রমণে ব্যর্থ মুখ মাস্টারদাকে কীকরে দেখাবে মুখ-এ চিন্তা করে পটাশিয়াম খেয়ে আত্মহত্যা করেন।
এখন আসা যাক নির্মল লালা কিভাবে ঐতিহাসিক জালালাবাদ যুদ্ধের শহিদ হন সে কথায়। নির্মল লালা অগ্নিযুগের সশস্ত্র বিপ্লবী। চট্টগ্রাম যুব বিদ্রোহের অগ্রনায়ক মাস্টারদা সূর্যসেনের অন্যতম সহযোদ্ধা। ঐতিহাসিক চট্টগ্রাম পুলিশ লাইন আক্রমণ এবং জালালাবাদ যুদ্ধের প্রখ্যাত সৈনিক। ১৯৩০ সালের ২২ এপ্রিল সংঘটিত জালালাবাদ যুদ্ধেই শহীদ হন তিনি। কক্সবাজার ইংরেজি উচ্চ বিদ্যালয়ে অধ্যয়নকালে ১৯০৫ সালে প্রতিষ্ঠিত কক্সবাজার পাবলিক লাইব্রেরি এবং বিপ্লবীদের গ্রাম সংগঠনের ব্যক্তিগত সংগ্রহ থেকে মুক্ত চিন্তা এবং ফরাশি বিপ্লব, সিপাহী বিদ্রোহ, রুশ বিপ্লব, বিপ্লবী সংশ্লিষ্ট বইপত্র পড়ে বিপ্লবী মন নাড়া দেয় এবং দেশকে বৃটিশের কবল থেকে মুক্ত করার স্বপ্ন দেখতেন। সে ক্ষেত্রে যুদ্ধে যাওয়ার সংকল্প করতেন তিনি। সে সংকল্পে বিধু সেনকে ধরে তিনি খুব বেশি জোর করে যে সেও ইংরেজদের সাথে যুদ্ধ যাবে। তাই দলের প্রধান নেতা মাস্টারদা সূর্যসেনকে দেখার জন্য তিনি অত্যন্ত আগ্রহান্বিত হয়ে উঠেন। একদিন নিজেই উদ্যোগী হয়ে বিধু সেনের সহায়তায় উপস্থিত হন চট্টগ্রাম শহরের কংগ্রেস অফিসস্থ মাস্টারদার কাছে। কয়েকদিন চট্টগ্রামে থাকার পর ‘শিগগিরই একটা কিছু ঘটতে যাচ্ছে ’ তা বুঝতে পেরে নির্মল সোজা মাস্টারদা সূর্যসেনের কাছে গিয়ে আবদার ধরল : ‘আপনারা শীগগিরই একটা কিছু করবেনÑ আমি বেশ বুঝতে পারছি। আমাকে কিন্তু নিতে হবে আপনাদের সঙ্গে।’ ১৪ বছর বয়সী নির্মলের এই ধরনের অস্বাভাবিক দাবি শুনে সূর্যসেন তাকে জিজ্ঞেস করলেন : ‘ক’দিন হয় পার্টিতে এসেছ ?’-‘প্রায় দু’ মাস হবে’ নির্মল বলল। ‘কোন ক্লাসে পড়’ ?‘ক্লাস এইটে’‘বয়স কত’‘চৌদ্দ’। ‘এইটুকু বয়সে তুমি করে আমাদের সঙ্গে যাবে ?
অনেক করেও মাস্টারদা সূর্যসেনকে রাজী করতে না পেরে নির্মল অত্যন্ত বিচলিত হয়ে ফিরে আসেন কক্সবাজারে। কক্সবাজারে পৌঁছে ছুটে যান কক্সবাজার বিপ্লবী গ্রাম সংগঠনের সমন্বয়ক বিধু সেনের কাছে। উন্মাদ পাগলের মতো হয়ে বিধু সেনের কাছে আরজি জানালো :‘বিধুদা যেমন করেই হোক আমি যাবই আপনাদের সঙ্গেÑমাস্টারদাকে রাজী করবার কি কোনো উপায় নেই ? ’বিধু সেন তার অবস্থার গুরুত্ব বুঝতে পেরে বললেন :‘তুমি আবার গিয়ে মাস্টারদাকে ধরÑ এ ছাড়া তো আর আমি অন্য কোনো উপায় দেখছি না।’বিধু সেনের কাছ থেকে এ ধরনের অভয় পেয়ে নির্মল ফের উপস্থিত হন চট্টগ্রাম কংগ্রেস অফিসে। যাওয়ার সময় প্রতিজ্ঞা করলেন এবার সে আর কক্সবাজারে ফিরে আসবে না।
১৯৩০ সালে কক্সবাজার হাই স্কুলে যারা পড়তেন তাদের অনেকেরই বই কেনার স্বার্থ ছিলো না, যারা গরীব ছিলেন। তা উপলব্ধি করতে পেরে নিজের সামর্থের ভিতরে নির্মল লালা গরীব সন্তানদেরকে সহায়তা করেন। চট্টগ্রামে বিপ্লবীদের সাথে যুদ্ধে অংশ করার নিমিত্তে কক্সবাজার ছেড়ে আসার আগের দিন তার সহপাঠীদের ভিতর বন্ধু স্থানীয় কয়েকজনকে ডেকে নিজের বই, খাতা সব বিলিয়ে দিল। তারা অবাক হয়ে এ ধ রনের অস্বাভাবিক দানের কারণ জিজ্ঞেস করতেই আবেগভরা কণ্ঠে তিনি বলেনÑ ‘ভাই, আমি আর পড়বো না। আমার সমস্ত বই পত্র তোমাদের দিয়ে যাচ্ছি। যার যা প্রয়োজন নিয়ে নাও। আমি আর কক্সবাজারে ফিরবো না।’
সহপাঠীরা নির্মল লালার কথার প্রকৃত অর্থ বুঝতে পারলো না। অপলক দৃষ্টিতে নির্মলের দিকে তাকিয়ে রইলো তারা। শুধু বই পত্র নয়, তার অত্যন্ত প্রিয় সুটকেসও তার এক বন্ধুকে দান করে দিলেন। বই পত্র বন্ধুদের দান করে বিপ্লবী কর্মকাণ্ডে যুক্ত হওয়ার অভিপ্রায়ে মাস্টার দা সূর্যসেনের সাথে সাক্ষাৎ করতে চট্টগ্রামে চলে যান।
চট্টগ্রাম শহরের সাথে কক্সবাজারের দূরত্ব প্রায় একশো মাইল (১৫১ কিলোমিটার)। তিনি একশো মাইল অতিক্রম করে উপস্থিত হন চট্টগ্রামস্থ কংগ্রেস অফিসে বিপ্লবী দলের নেতা মাস্টারদা সূর্যসেনের দরবারে এবং চূড়ান্তভাবে কক্সবাজার ছেড়ে আসার কাহিনিও জানান তাকে। এও জানান যে, ‘এবার সে বদ্ধপরিকর হয়ে এসেছেÑকিছুতেই নিবৃত্ত হবে না। নাছোড়বান্দার মতো নির্মল লালা লেগে থাকলো মাস্টারদা সূর্যসেনের সঙ্গে এবং এক রকম জোর করেই মাস্টারদাকে বাধ্য করলো তার আবদার মেনে নিতে। তারপর জড়িয়ে পড়েন সশস্ত্র বিপ্লবে। তখন নির্মল লালাকে মাস্টারদা এবং আরো কয়েকজন বিপ্লবী ছাড়া বিপ্লবী দলের কেউ তাকে চিনতো না। চট্টগ্রাম বিদ্রোহ শুরু হওয়ার আগে মাস্টারদা সূর্যসেন যারা ছোট, যাদের নাম পুলিশের খাতায় উঠেনি তারা বাড়ি চলে যাওয়ার জন্য নির্দেশ দেন কিন্তু তাতে সর্বকনিষ্ঠ সৈনিক নির্মললালাসহ অনেকে যুদ্ধ ময়দানে শরিক হওয়া ছাড়া কোথাও যাবেন না বলে সাফ জানিয়ে দেন।
জামাল উদ্দিন তার ‘ভারতের স্বাধীনতা সংগ্রাম, মাস্টারদা সূর্যসেন ও তার সাথীরা’ গ্রন্থে (২২৯ পৃষ্টায়) লিখেছেনÑ ‘এক সময় মাস্টারদা কাছে ডেকে সস্নেহে বলেছেন- ‘তোমরা যারা ছোট, পুলিশের খাতায় নাম নেই তারা বাড়ি ফিরে যাও’। কিন্তু সাথীদের ছেড়ে যেতে সে (নির্মল লালা) রাজী নয়। দৃঢ়সংকল্পে সে বলেছে- ‘মাস্টারদা, মরতে এসেছি, ফিরে যাওয়ার জন্য তো আসি নি।’
১৯৩০ সালের ১৮ এপ্রিল সূর্যসেন (১৮৯৪-১৯৩৪) সশস্ত্র অভ্যুত্থানের মাধ্যমে চট্টগ্রাম অস্ত্রাগার দখল করেন। চট্টগ্রামের যুব বিদ্রোহীরা বৃটিশদের হাত থেকে বীর চট্টলাকে ১৮-২২ এপ্রিল পর্যন্ত মোট ৪ দিন মুক্ত এবং স্বাধীন রাখে। যুদ্ধের এক পর্যায়ে মাস্টারদা সূর্যসেনের নেতৃত্বে একদল যুব বিদ্রোহী চট্টগ্রামে বৃটিশ পতাকা (ইউনিয়ন জ্যাক) নামিয়ে সর্ব ভারতীয় স্বাধীনতার পতাকা উত্তোলন করেন। ওই সময় কক্সবাজারের নির্মল লালাও উপস্থিত ছিলেন। বিপ্লবী সৈনিক হিসেবে তিনি পুলিশ লাইন আক্রমণে অংশ করেছিলেন।
১৮ এপ্রিল চট্টগ্রাম অস্ত্রাগার দখলের পর তারা ১৯ এপ্রিল ভোর হওয়ার আগেই পুলিশ লাইন ত্যাগ করে পাহাড় জঙ্গলের ভিতরে ঢুকে পড়ে। সারা দিন উচু নিচু পাহাড় অতিক্রম করে শহর থেকে কয়েক মাইল দুরে এক নিভৃত স্থানে সবাই স্থিত হলো। সঙ্গে রসদ না থাকায় ২০ এপ্রিল এক রকম অনাহারে কাটালেন তিনিসহ সবাই। ২২ এপ্রিল ঐতিহাসিক জালালাবাদ পাহাড়ে একটি উপযুক্ত স্থান বেছে নিয়ে বিশ্রাম নেয়ার সময় এক রক্ষীর মাধ্যমে বিকালের দিকে বিপ্লবীরা খবর পান ‘দূরে মিলিটারী দেখা যাচ্ছে’। রক্ষীর হুঁশিয়ারী সংকেত পাওয়ার সঙ্গে সঙ্গে সবাই প্রস্তুত হয়ে গেল। বিকেল প্রায় ৫টায় ইংরেজ কর্ণেল ডলাস স্মিথ, ক্যাপ্টেন টেট এবং চট্টগ্রাম ডেপুটি ইন্সপেক্টর জেনারেল (পুলিশ বিভাগের) মি. ফারমারের নেতৃত্বে সুর্মাভ্যালি লাইট হর্স ও ইস্টার্ন ফ্রন্টিয়ার রাইফেল এবং মিলিটারির ফৌজ নিয়ে জালালাবাদস্থ বিপ্লবীদের উপর আক্রমণ শুরু করে। এ সংঘর্ষে মিলিটারি বাহিনির মূল পরিকল্পনা অনুযায়ী সোজাসুজি আক্রমণ চালিয়ে পাহাড় দখল করে বিদ্রোহীদের বন্দী করার পরিকল্পনা ভেস্তে যাওয়ায় এবং ওই সংঘর্ষে কয়েকজন নিহত হওয়ায় কর্ণেল ডলাস স্মিথের নেতৃত্ব মিলিটারি ফৌজ পৃষ্টপ্রদর্শন সাজোয়া ট্রেনে চট্টগ্রামের দিকে চলে যান। বেশ কিছুক্ষণ নালার ভিতর কোণঠাসা হয়ে থাকার পর মিলিটারি বাহিনী বাধ্য হয়ে তাদের পূর্ব পরিকল্পনা বাদ দিয়ে নতুন কৌশল হিসেবে জালালাবাদেরই দুটো উচু পাহাড় বেছে নিয়ে মেশিন গান খাটিয়ে বিদ্রোহীদের অবস্থানস্থল জালালাবাদের পাহাড় চূড়ায় অতর্কিত হামলা চালিয়ে ক্ষত বিক্ষত করে দেয় বৃটিশ বাহিনী। দেখতে দেখতে লুটিয়ে পড়ে বিদ্রোহীদের দশ জন। আহত অম্বিকা চক্রবর্তী, অর্ধেন্দু শেখর দস্তিদার, বিনোদ বিহারী চৌধুরী, সুরেশ সেনসহ আরো কয়েকজন। যুদ্ধে মরণপণ লড়াইয়ে ব্রিটিশ বাহিনীর মেশিন গানের গুলিতে গুলিবিদ্ধ হয়ে প্রথমে বিপ্লবী হরিগোপাল বল (টেগরা) মাটিতে লুটিয়ে পড়েন। হরিগোপালের লুটিয়ে পড়ার সঙ্গে সঙ্গেই দলের সর্বকনিষ্ঠ সৈনিক নির্মল লালাও লুটিয়ে পড়েন। নির্মল লালা যেখানে যুদ্ধ করতে লাগলেন তার পাশেই জিওসি লোকনাথ বলও মাটিতে শুইয়ে রাইফেল চালাচ্ছিলেন। হয়তো তার (লোকনাথ বলের) পিপসা পেয়েছে বলে মনে করে নির্মল বলল- ‘ লোকদা, আমার সঙ্গে একটি কাঁচা আম আছে। খেয়ে নিন’- বলেই আমটি এগিয়ে দিল। মৃত্যুর মুখোমুখি দাড়িয়ে তিনি দৃঢ়চিত্তে উত্তেজনাবশত দাড়িয়ে পড়লো। শত্র“পক্ষকে নিশানা করে একের পর এক গুলি ছুড়ে দেন। এমনি সময়ে লুইসগানের গুলিতে সে মারাত্মক আহত হয়ে মাটিতে লুটিয়ে পড়েন। তারই রক্তমাখা সবুজ আমটি লোকনাথ বল খেয়ে নির্মলের সবুজ মনের প্রতি শ্রদ্ধা জানালেন এবং পিপাসা নিবারণ করলেন। এ সময় অপরিচিত সহযাত্রীরা চিৎকার কলে উঠল, ‘মাস্টারদা, একটি ছোট ছেলের গলায় গুলি লেগে পড়ে গেল। ’
এখানে নির্মলকে মাস্টারদা, লোকনাথ বলসহ মুষ্টিমেয় কয়েকজন ছাড়া তেমন একটা চিনতো না। জালালাবাদ যুদ্ধের সেই দিনের স্মৃতি সম্পর্কে বলতে গিয়ে ওই সময়ের বিপ্লবী আনন্দ প্রসাদ গুপ্ত (চট্টগ্রামের প্যারেডস্কোয়ার নিবাসী যোগেন্দ্রমোহন গুপ্তের পুত্র, যাকে ধরিয়ে দেওয়ার জন্য বৃটিশ সরকার ৫০০ টাকার পুরষ্কার ঘোষণা করে সরকারি ইস্তাকার করে প্রত্যেক থানায় প্রেরণ করেছিলেন) ‘চট্টগ্রাম বিদ্রোহের কাহিনী ’ গ্রন্থে (৫৪ পৃষ্টায়) বলেনÑ ‘মাত্র ১৪ বছর ছিল তার বয়স ! গুলি লাগতেই সে হঠাৎ লাফ দিয়ে উঠে দাঁড়ালÑ মাত্র অল্প একটুক্ষণের জন্যে সে দাঁড়াতে পেরেছিল।… সবার দৃষ্টি পড়লো নির্মলের ওপরÑ ‘শুয়ে পড়, শুয়ে পড়, দাঁড়িয়ে থেক না গুলি লাগবে’।Ñ শুয়েই সে পড়ল, আর উঠল না ! বন্দেমাতরম’-শেষবারের মতো তার তরুণ কণ্ঠের জয়ধ্বনি শুনতে হল সবাই…. তারপর তার রক্তাক্ত কিশোর দেহ জালালাবাদের মাটি আঁকড়ে পড়ে রইÑ চিরদিনের জন্য।’ বাস্তবায়ন হয় নির্মল লালার দেশ রক্ষায় প্রাণ দেয়ার বাসনা এবং সত্যি সত্যি তিনি আর কক্সবাজারে আসেন নি। দেশকে বৃটিশ কবল থেকে মুক্ত করতে প্রাণ দেন।
প্রিয় পাঠক এখন আসা যাক শহিদ বিপ্লবী শৈলেশ্বর চক্রবর্তীর কিভাবে শহিদ হলেন সে কথায়। মাস্টারদা সূর্য সেনের নির্দেশে ২০ বছরের তরুণ কর্মী শৈলেশ্বর চক্রবর্তী দুই বার পাহাড়তলী ইউরোপিয়ান ক্লাব আক্রমণের নেতৃত্ব দেন। প্রথমবার ব্যর্থ হয়ে দ্বিতীয় বার ১৯৩২ সালের ১০ আগস্ট ইউরোপিয়ান ক্লাবে এক বড় অনুষ্ঠান হবে এমন খবর পেয়ে মাস্টারদা সুর্যসেন শৈলেশ্বর চক্রবর্তীকে নেতা করে ৫ সদস্যের একটি বিপ্লবী দলকে ইউরোপিয়ান ক্লাব আক্রমণের নির্দেশ দেন (৫ বিপ্লবীর অন্যরা হলেন, কালীকঙ্কর দে, মহেন্দ্র চৌধুরী, সুশীল চক্রবর্তী ও বীরেশ্বর রায়)। পড়ৈকোড়া গ্রামের রমনী চক্রবর্তীর বাড়ি কুন্তলা ছিল বিপ্লবী দলের গুপ্ত শিবির। এই গুপ্ত শিবিরে মাস্টারদা সুর্যসেন ও প্রীতিলতাকে রেখে তারাকেশ্বর চক্রবর্তী (ফুটুদা), কালিকঙ্কর দে ও শৈলেশ্বর চক্রবর্তী পাহাড়তলী ক্লাবের নিকটস্থ গ্রাম কাট্টলী চলে আসেন। কাট্টলী শিবির থেকে আক্রমণে অংশগ্রহণের জন্য রওয়ানা হন তারা। তারাকেশ্বর চক্রবর্তী (ফুটুদা) বোমা, রিভলবার, রাইফেল ও তরবারিতে সজ্জিত বিপ্লবী দলকে যাত্রা করিয়ে দেন বলে ওই ইউরোপিয়ান ক্লাবের আক্রমণে অংশগ্রহণকারী বিপ্লবী সৈনিক বীরেশ্বর রায় (১৯১৩-১৯৯১) ‘পাহাড়তলী ইউরোপিয়ান ক্লাব আক্রমণ’ নামক স্মৃতিকথায় উল্লেখ করেছেন। এ ক্লাবের অতি কাছের ঢালে আড়াল নেয় বিপ্লবীরা। তাদের উপর নির্দেশ ছিল নিচ থেকে সবুজ সংকেত পার সঙ্গে আক্রমণ করার। কিন্তু ওই দিন রাত নটা পর্যন্ত অপেক্ষা করেও কোনো ধরনের সবুজ সংকেত না আসায় সবাইকে ব্যর্থ মনোরথে ফিরে যেতে হয় শহরের কাট্টলী গ্রামে। এই ব্যর্থতার আঘাত সহ্য করতে না পেরে ক্ষোভে সমুদ্র তীরবর্তী কাট্টলী গ্রামের বিপ্লবী ঘাটিতে সাথীদেরকে ডেকে বললেন, চিঠি রইলো, আমি চললাম বলে পটাশিয়াম সানাইড খেয়ে আত্মহত্যা করেন১০
চিঠিতে লেখা ছিল,
‘ মাস্টারদা, আপনার অযোগ্য এবং অধম শিষ্য জন্মের তরে বিদায় লইতেছে। যে কাজে দায়িত্ব আমার উপর অর্পন করিয়াছেন তাহা সমাপন করিতে পারি নাই। ব্যর্থতার গ্লানি ও পরাজয়ের কলঙ্ক মাখানো এই মুখ আপনাকে কী করিয়া দেখাইব ? আপনার কৃত সহকর্মীদের পাশে এই অকৃতি অক্ষমের অবস্থায় মানায় না। তাই আজ জন্মের মতো যাই।
ইতি
আপনার অযোগ্য শিষ্য
শৈলেশ্বর’
যে রাতে শৈল ব্যর্থতার দায়ভার সহ্য করতে না পেরে আত্মহত্যা করেছিলেন সে রাত ছিলো মহররমের রাত। কাট্টলীস্থ বঙ্গোপসাগরের তীরে বালি খুড়ে গভীর গর্ত করা হলো। গর্তের মধ্যে পাতা হল শৈল’র শেষ শয্যা। বিপ্লবী দলের জাতীয় পতাকায় ঢেকে দেওয়া হলো তার দেহ। বিপ্লবী সাথীরা শবদেহ ফুলে ফুলে ঢেকে ফেললেন।
শৈলশ্বর চক্রবর্তীর দাদা (বড় ভাই) জ্যোতিশ্চর চক্রবর্তী তখন বিপ্লবী দলে যুক্ত থাকার অপরাধে দেউলি ডিটেনশন ক্যাম্পে বন্দি ছিলেন। দেউলি ক্যাম্পে চট্টগ্রামের সুরেশ সেনসহ আরো কয়েকজন বিপ্লবী তার সঙ্গে কারা জীবন করছিলেন ওই সময়। একদিন চট্টগ্রামে যারা বিভিন্ন বিপ্লবী কার্যকলাপ সম্বন্ধে আলাপ-আলোচনা করছিলেন এমন সময় জ্যোতিশ্চর চক্রবর্তী সেখানে উপস্থিত হলেন। কথা প্রসঙ্গে শৈলশ্বর চক্রবর্তীর আত্মহত্যার ঘটনা প্রকাশ হয়ে পড়ল। এই মর্মান্তিক ঘটনা শুনে শোকাহিভূত হয়ে পড়লেন জ্যোতিশ্বর চক্রবর্তী।
এ যুববিদ্রোহের আন্দোলন ছাড়াও ভারত ছাড় আন্দোলনে কক্সবাজার হাই স্কুলের অবদান ছিলো শরদিন্দু দস্তিদারের ‘ জীবনস্মৃতি’ সূত্রে জানা যায়। কিন্তু ওই স্কুলের কারা কারা জড়িত ছিলেন তা জানা যায় না। আশা করি সে তথ্যও একদিন বের হয়ে আসবে। সেই আশায় আজকে শেষ করলাম।
কালাম আজাদ : কবি, সাংবাদিক- গবেষক। প্রকাশিত গ্রন্থ : ৩, সর্বশেষ গ্রন্থ : রাজাকারনামা (২০১০)

Editor- Sayed Mohammad SHAKIL.
Office: Evan plaza, sador model thana road, cox’sbazar-4700. Email: dailycoxsbazar@gmail.com / phone: 01819099070
অনুমতি ছাড়া অথবা তথ্যসূত্র উল্লেখ না করে এই ওয়েব সাইট-এর কোন অংশ, লেখা বা ছবি নকল করা বা অন্য কোথাও প্রকাশ করা বেআইনী