সংবাদ শিরোনাম

ফেলে যাওয়া রুমালখানি

বিকেলবেলা বাঁশবাগানের ওদিকটায় গিয়েছিল মৌ। ফাল্গুন মাসের এই সময়টা ভারি সুন্দর। বসন্তকাল। গাছে গাছে ফুল, পাতার রং বদলে গেছে। হাওয়ায় তোলপাড় করে বাঁশবন। একটানা ডাকে কোকিল। মন উদাস হয়।
উদাস মনে বাগানে ঘুরে বাড়ির দিকে ফিরেছে মৌ। উঠোনের কোণে সন্ধ্যামালতির ঝাড়। পাপড়িগুলো সারা দিন ঘুমিয়ে থাকে। বিকেল শেষ হয় আর জাগে, সন্ধ্যা হয় আর গন্ধ ছড়ায়।
উঠোনে এসে সন্ধ্যামালতির গন্ধ পেল মৌ। বারান্দায় দেখতে পেল জরি বসে আছে। হাতে চায়ের কাপ। মা এ সময় চা খায়। জরি এসেছে দেখে তাকেও দিয়েছে এক কাপ।
মৌকে দেখে হাসল জরি। তুমি বাড়ি এসেছ শুনেই এলাম। অনেক দিন তোমার সঙ্গে দেখা হয় না। ভালো আছ?
মৌও হাসল। খুব ভালো আছি। বাড়ি এলেই আমার মন ভালো থাকে।
তাই তো থাকার কথা। মা-বাবাকে ছেড়ে দূরে থাকতে কার ভালো লাগে! তার ওপর পড়াশোনার চাপ, হলের খাওয়া-দাওয়া ভালো না। ছুটিছাটায় বাড়ি এলে ভালো তো লাগবেই।
দুহাতে কাপ ধরে চায়ে চুমুক দিল জরি। সেই ফাঁকে তাকে খেয়াল করে দেখল মৌ। পরনে হালকা সবুজ শাড়ি। সাদা লম্বা ওড়নায় গলা মাথা ঢাকা। জরির চোখ খুব সুন্দর। মুখটা বিষণ্ন। তবু চেহারা যে একসময় ভালো ছিল বোঝা যায়। গায়ের রংও ফরসার দিকেই ছিল। রোদে পুড়ে ম্লান হয়েছে।
তাই হওয়ার কথা। রোদে বৃষ্টিতে এই গ্রাম ওই গ্রাম ঘুরে গরিব মানুষের বাচ্চাকাচ্চা পড়ায়। সারা দিনই ওই কাজ। ক্লাস এইট পর্যন্ত পড়া মানুষ। বাচ্চাকাচ্চাদের অ আ পড়ায়। পয়সা পায় সামান্যই। কোথাও কোথাও পায়ও না। দুপুরবেলা হয়তো ভাতটা খাওয়াল কেউ। বিকেলবেলা চা-নাশতাটা। কোনো কোনো দিন বাড়িও ফেরে না। সন্ধ্যাবেলা বাচ্চা পড়িয়ে ওই গৃহস্থের বাড়িতেই থেকে গেল। তারা হয়তো রাতের খাবারটা দিল। পুরো নাম জরিনা। পরিচিত ছেলেমেয়েরা ডাকে জরিবু।
মৌও তাই ডাকে।
জরি কথা বলে খুব মিষ্টি করে। মুখে হাসিটা লেগেই আছে। গরিব গৃহস্থবাড়ির মেয়ে। বিয়েও হয়েছিল। কিন্তু…
মা-বাবা গত হয়েছে বহুদিন। ভাইবোন যে যার সংসারে। বাপের ভিটেয় একখানা কুঁড়েঘরও জরির আছে। জ্বরজ্বারি হলে, বাড়ি থেকে বেরোতে না পারলে ওই ঘরটায় থাকে। নিজে রান্না করে খায়। দুই ভাই ভাবিরা, তাদের বাচ্চাকাচ্চারা ফিরেও তাকায় না ওর দিকে।
মৌ বলল, তুমি এসে খুব ভালো করেছ জরিবু। আমিও বাড়ি এলাম, বাবা ঢাকায় গেলেন কলেজের কাজে। প্রিন্সিপাল সাহেবদের দৌড়াদৌড়ির অন্ত নেই। কলেজের চেয়ে শিক্ষা বোর্ড, শিক্ষা মন্ত্রণালয়—ওসব জায়গায়ই থাকতে হয় বেশি। তুমি আজ আমাদের বাড়িতে থাকো। রাতভর গল্প করব দুজনে।
জরি হাসল। আচ্ছা বুবু, থাকব।
জরির কোলে বহুদিনের পুরোনো একটা ব্যাগ। গেরুয়া রঙের চটের ব্যাগটায় শাড়ি, গামছা, সায়া, ব্লাউজ এসব থাকে। একনাগাড়ে কয়েক দিন বাড়ি ফেরা না হলে কোনো বাড়িতে নাওয়া-ধোওয়া সেরে শাড়ি বদলায়। পরনের শাড়ি ধুয়ে ওই বাড়িতেই শুকাতে দেয়। ভবঘুরে নারীর জীবন।
এই বাড়িতে কাজের ঝি আছে একজন। মধ্যবয়সী মহিলা। বিলুর মা। সে এখন রান্নাঘরে। মা রান্নাঘরের দিকে গেলেন তদারক করতে। বিলুর মা রান্না করে ভালোই। তবু মেয়ে বাড়ি এলে মা তার খাওয়া-দাওয়া নিয়ে একটু বেশিই ব্যস্ত হন। আজ রাতে পোলাও আর দেশি মুরগি রান্না হচ্ছে। ঢাকায় দেশি মুরগির বেশ দাম। তা-ও দেশি বলে পাকিস্তানি কক মুরগি চালিয়ে দেয়। আর বয়লার মুরগি তো আছেই। ওসব খেতে খেতে মুখ পচে গেছে মৌর। আজকাল গ্রাম এলাকায়ও দেশি মুরগির অভাব। তবু মেয়ে বাড়ি আসছে শুনলে বাবা তার পিয়ন মোয়াজ্জেমকে বলে মুরগি জোগাড় করে রাখে।
ফাল্গুন মাসের সন্ধ্যা হয় হয় সময়ের আলোটা অপূর্ব। সেই আলোয় মৌ যেমন দেখছিল জরিকে, জরিও দেখছিল মৌকে। কী সুন্দর মেয়েটি! পাঁচ ফুট সাত-আট ইঞ্চি লম্বা, উজ্জ্বল শ্যামলা গায়ের রং, টানা সুন্দর চোখ, মুখটা এমন, তাকালে চোখ ফেরানো যায় না। হাসলে মনে হয় শিউলি ফুটেছে থরে-বিথরে। ফিগার ভারতীয় নায়িকাদের মতো। বেগুনি রঙের সালোয়ার-কামিজে দারুণ মানিয়েছে। একদম রাজবাড়ির মেয়েদের মতো।
সেই বাড়ির কথা ভেবে দীর্ঘশ্বাস পড়ল জরির। চায়ে শেষ চুমুক দিয়ে কাপ হাতে উঠল।
মৌ বলল, কোথায় যাচ্ছ?
কাপটা ধুয়ে রাখি।
তোমার ধুতে হবে কেন? বুয়া ধোবে। রেখে দাও।
বুয়া রান্নাবান্না নিয়ে ব্যস্ত। আমিই ধুয়ে রাখি।
কলতলায় গিয়ে কাপটা ধুয়ে রান্নাঘরে রেখে এল জরি। তারপর ব্যাগ থেকে স্পঞ্জের এক জোড়া স্যান্ডেল আর গামছা বের করে আবার গেল কলতলায়। হাতমুখ ধুয়েমুছে, স্যান্ডেল পায়ে ফিরে এল। সন্ধ্যা হয়ে গেছে। এখন চলো তোমার ঘরে গিয়ে বসি।
মৌ আকাশের দিকে তাকিয়ে বলল, ওই দেখো কী সুন্দর চাঁদ উঠেছে। ঢাকায় এত সুন্দর চাঁদ দেখতেই পাই না। এ সময় ঘরে বসে থাকব?
তাহলে কী করবে?
চলো বাগানের দিকে যাই, ঘুরে বেড়াই।
জরি হাসল। বাঁশবাগানে ভূত-পেতনি থাকে। তোমার ভয় করবে না?
আরে ধুত। ভূতে আমার বিশ্বাসই নেই! তোমার আছে?
না। আমি গ্রামকে গ্রাম হেঁটে বেড়াই, রাত বিরাতেও চলাফেরা করি। কোনোদিন কিছু দেখিওনি, ভয়ও পাইনি। একটা বয়সে মানুষকেই ভয় পেতাম। মেয়েমানুষের কত রকমের ভয়! এখন প্রায় বুড়ি। কেউ ফিরেও তাকায় না। মানুষের ভয়ও কেটে গেছে।
ওরা দুজন হাঁটতে হাঁটতে বাগানের দিকে এল।
বাঁশবনের ওপাশে চাঁদ উঠেছে। তোলপাড় করা হাওয়াটা বইছে। উঠোনের দিক থেকে আসছে সন্ধ্যামালতির গন্ধ। অন্য পাখিদের কলকাকলি বন্ধ হয়েছে, ডাকছে শুধু কোকিল আর ঝিঁঝিপোকা। ঝোপঝাড় থেকে বেরিয়েছে জোনাকিরা। টিপ টিপ করে জ্বলছে।
জরি বলল, ও মৌ, তুমি যে নাটক থিয়েটার করতে ওসব এখন আর করো না?
মৌ হাসল। নাটক থিয়েটার না, আমি করি আবৃত্তি। আমাদের একটা আবৃত্তির সংগঠন আছে। মাঝে মাঝে আবৃত্তির অনুষ্ঠান করি। অন্যরা অনেক কবির কবিতা আবৃত্তি করে, আমি করি শুধু রবীন্দ্রনাথের কবিতা। তা-ও একটু আনকমন কবিতা। যেসব কবিতা তেমন পড়া হয় না। যেসব কবিতায় একটু গল্প থাকে।
কোকিলের ডাক বুঝি বন্ধ ছিল কিছুক্ষণ। চাঁদের আলো দেখে আবার ডাকতে শুরু করেছে। এই ডাকে জরি ভুলে গেল কী কথা হচ্ছিল মৌর সঙ্গে। বলল, এই বসন্তকালটা বড় অদ্ভুত, কোকিলের ডাক, চাঁদের আলো সব মিলিয়ে মন খুব উদাস হয়। কত কথা যে মনে পড়ে!
মৌ ঠাট্টার গলায় বলল, কার কথা মনে পড়ে, জরিবু?
জরি উদাস গলায় বলল, পড়ে একজনের কথা। বাদ দাও ওসব। কবিতা শোনাও।
শুনতে পারি। তবে একটা শর্ত আছে।
কী শর্ত?
যার কথা মনে পড়ে তার কথা আমাকে বলতে হবে।
জরি অসহায় গলায় বলল, কোনোদিন যে কাউকে বলিনি!
এ জন্যই তো আমাকে বলবে!
একটু থেমে কী ভাবল জরি, তারপর বলল, আচ্ছা বলব।
ঠিক?
ঠিক।
এবার তাহলে কবিতা শোনো। কবিতার নাম ‘কুয়ার ধারে’:
তোমার কাছে চাইনি কিছু,
জানাইনি মোর নাম,
তুমি যখন বিদায় নিলে
নীরব রহিলাম।
একলা ছিলেম কুয়ার ধারে
নিমের ছায়াতলে,
কলস নিয়ে সবাই তখন
পাড়ায় গেছে চলে।
আমায় তারা ডেকে গেল,
‘আয় গো বেলা যায়।’
কোন্ আলসে রইনু বসে
কিসের ভাবনায়।
কবিতা শেষ না করে মৌ বলল, চলো পুকুরঘাটে গিয়ে বসি। তারপর বাকিটা শোনাই।
জরি কথা বলল না, মৌর সঙ্গে পুকুরঘাটে এল।
বাঁধানো ঘাটলার বিশাল পুকুর। পুকুরজলে চাঁদের আলো পড়ে ঝিলমিল ঝিলমিল করছে। চারপাশে গাছপালা, ঝোপঝাড়। হাওয়া বইছে আগের মতো। কোকিলের ডাক আরও তীব্র হয়েছে। বুনোফুলের মিষ্টি গন্ধ আসছে।
ওরা দুজন সিঁড়িতে বসল।
জরি গম্ভীর গলায় বলল, এবার বাকিটা শোনাও।
মৌ তার মিষ্টি কণ্ঠে আবৃত্তি করতে লাগল…
পদধ্বনি শুনি নাইকো
কখন তুমি এলে।
কইলে কথা ক্লান্তকণ্ঠে—
করুণ চক্ষু মেলে—
‘তৃষাকাতর পান্থ আমি।’
শুনে চমকে উঠে
জলের ধারা দিলেম ঢেলে
তোমার করপুটে।
মর্মরিয়া কাঁপে পাতা,
কোকিল কোথা ডাকে—
বাবলা ফুলের গন্ধ
ওঠে পিল্লপথের বাঁকে।
জরি দিশেহারা গলায় বলল, এ কী! এ কোন কবিতা? এ তো আমার কবিতা! আমাকে নিয়ে লেখা…
মৌ অবাক। কী বলছ জরিবু? তোমাকে নিয়ে লেখা মানে?
আমাকে নিয়ে লেখা, সত্যি আমাকে নিয়ে লেখা। একদম আমার কাহিনি। আমার জীবনেও এমনই ঘটেছিল…। বাকিটা শোনাও, বাকিটা। জরির অস্থিরতা দেখে মৌ একটু দমে গেছে। সেই কিশোরী বয়স থেকে দেখছে জরিকে, কত দিন কত কথা হয়েছে তার সঙ্গে, কত সময় কেটেছে দুজনে গল্প করে, কত রাত ভোর হয়ে গেছে গল্পে কথায়, কোনো দিন এমন অস্থির হতে দেখিনি তাকে, এমন দিশেহারা হতে দেখেনি। আজ এই কবিতা শুনে এমন করছে কেন?
জরি তেমনই অস্থির। বলল, শোনাও মৌ, বাকিটা শোনাও।
মৌ একবার আকাশের দিকে তাকাল, পুকুরজল আর ওপারের গাছপালার দিকে তাকাল। তারপর কবিতার বাকি অংশটুকু আবৃত্তি করল।
যখন তুমি শুধালে নাম
পেলেম বড় লাজ—
তোমার মনে থাকার মতো
করেছি কোন্ কাজ!
তোমায় দিতে পেরেছিলেম
একটু তৃষার জল,
এই কথাটি আমার মনে
রইল সম্বল।
কুয়ার ধারে দুপুরবেলা
তেমনি ডাকে পাখি,
তেমনি কাঁপে নিমের পাতা—
আমি বসেই থাকি।
কবিতা শেষ হওয়ার সঙ্গে সঙ্গে দুহাতে মৌকে জড়িয়ে ধরে শিশুর মতো কাঁদতে লাগল জরি। এ তুমি কোন কবিতা আমাকে শোনালে মৌ? এ তো আমাকে নিয়ে লেখা! সত্যি আমাকে নিয়ে লেখা। হুবুহু আমার জীবন, আমার ঘটনা…এমনই তো ঘটেছিল আমার জীবনে। আমি তো সারা জীবন তার জন্য অমন করে বসে থাকলাম। সেও তো আমার কাছে পানি খেতেই এসেছিল…
মৌ ঠিক বুঝতে পারছে না তার এখন কী করা উচিত। কীভাবে থামাবে জরির কান্না, কীভাবে সামলাবে তাকে?
এ ধরনের পরিস্থিতিতে কি যতক্ষণ ইচ্ছা কাঁদতে দেওয়া ভালো? ধীরে ধীরে কান্না একসময় থেমে আসবে, আপনা-আপনিই স্বাভাবিক হবে মানুষটি। তখন জানা যাবে ঘটনা।
ঠিক আছে, কাঁদুক জরি। যতক্ষণ ইচ্ছা কাঁদুক। কেঁদে কেঁদে হালকা করুক বুকের ভেতর চেপে রাখা বহু বছরের দুঃখবেদনা।
অনেকক্ষণ কেঁদে থামল জরি। আঁচলে চোখ মুছল। গভীর করে একটা

Editor in Chief : Sayed Shakil
Office: Evan plaza, sador model thana road, cox’sbazar-4700. Email: dailycoxsbazar@gmail.com / phone: 01819099070
অনুমতি ছাড়া অথবা তথ্যসূত্র উল্লেখ না করে এই ওয়েব সাইট-এর কোন অংশ, লেখা বা ছবি নকল করা বা অন্য কোথাও প্রকাশ করা বেআইনী