সংবাদ শিরোনাম

পাহাড়ধসে প্রাণহানি আর কত?

বৃষ্টি হলেই নগরীতে সৃষ্টি হয় জলাবদ্ধতা। আর বৃষ্টি একটু স্থায়ী হলেই ঘটে পাহাড়ধসের ঘটনা। প্রাণ হারায় গরিব অসহায় মানুষ। এর পরই শুরু হয় প্রশাসনের তোড়জোড়। সরিয়ে নেওয়া হয় ঝুঁকিপূর্ণ পাহাড়ে বসবাসকারীদের। কিছুদিন না যেতেই আবার গড়ে ওঠে বসতি। আবার পাহাড়ধস, আবার প্রাণহানি।

বর্ষার বৃষ্টির সঙ্গে পাহাড়ধস ও প্রাণহানি-শব্দ দুটি যেন মানুষের জীবনের সঙ্গে সমার্থক হয়ে যাচ্ছে। প্রায় প্রতি বছরই পাহাড়ধসে প্রাণহানির ঘটনা বাড়ছে। গত ১০ বছরে শুধু চট্টগ্রামেই মারা গেছে অন্তত ২৩৮ জন। এর বাইরে কক্সবাজার ও তিন পার্বত্য জেলায়ও প্রাণহানির ঘটনা আছে অনেক। এর মধ্যে চলতি জুন মাসেই তিন পার্বত্য জেলা ও কক্সবাজারে মারা গেছে ১৫৯ জন। যা নিকট অতীতের সব রেকর্ড ছাড়িয়ে গেছে।

কখন থামবে এই মৃত্যুযাত্রা?-এমন প্রশ্নের উত্তর নেই কারো কাছেই। অপরিকল্পিতভাবে পাহাড়া কাটা, বৃক্ষ নিধনসহ প্রকৃতির সঙ্গে মানুষ যে অনাচার করছে, প্রকৃতিও যেন তারই প্রতিশোধ নিচ্ছে। এমন কথাই সবার মুখে উচ্চারিত হচ্ছে। কিন্তু প্রকৃতির প্রতি মনুষ্যসৃষ্ট অনাচার কবে বন্ধ হবে?-এই প্রশ্নেরও উত্তর নেই।

প্রকৃতির ওপর অনাচারজনিত সমস্যার কারণকেই পাহাড়ধসের অন্যতম কারণ বলে স্বীকার করা হলেও মনুষ্যসৃষ্ট অনাচার বন্ধে কার্যকরী পদক্ষেপ নেই। শুধু বর্ষা মৌসুম এলেই শক্তিশালী পাহাড় ব্যবস্থা কমিটির সভা অনুষ্ঠিত হয়। হাঁকডাক করে কিছু লোককে পাহাড়ের পাদদেশ থেকে সরিয়ে নেওয়া হয়। এর পর প্রবল বর্ষণ হলেই পাহাড়ধসে। আর পাহাড়ধসের করুণ পরিণতি ভোগ করতে হয় মৃত্যুর মধ্য দিয়ে।

বিশেষজ্ঞদের মতে, চট্টগ্রামের পাহাড়ের গঠনশৈলী বালুমিশ্রিত হওয়ায় ধসের ঘটনা বেশি হচ্ছে। এর সঙ্গে যুক্ত হয়েছে পাহাড়ের বৃক্ষনিধন, পাহাড় ন্যাড়া করে জুমচাষ, পাহাড় কেটে আবাসিক ভবন গড়ে তোলাসহ নানাবিধ অত্যাচার। বালুমিশ্রিত এই পাহাড়গুলো কতোটা ক্ষতের ভার সইতে পারবে-এমন হিসাবও করা হয় না। ফলে নির্বিচারে পাহাড় নিধন হয়। আর বর্ষা মৌসুমে অতিবর্ষণ হলেই পাহাড় ভেঙে পড়ে মানুষের উপর। সেই ভাঙনে পরিবারের পর পরিবার যেন নির্বংশ হয়ে যাচ্ছে। আবার স্বজন হারিয়ে অনেকের স্বপ্ন যাচ্ছে অন্ধকারে হারিয়ে।

চট্টগ্রাম বিভাগীয় কমিশনার কার্যালয় সূত্র জানায়, চট্টগ্রাম নগরীতে স্থানীয় প্রভাবশালী ও সরকারি দলের লোকজন পাহাড়ের পাদদেশে অবৈধভাবে ঘর-বাড়ি ও বস্তি তৈরি করে। অবৈধভাবে গড়ে ওঠা এসব ঘরে বিদ্যুৎ, পানি ও গ্যাস সংযোগও দেওয়া হয় প্রস্তাব বিস্তার ও অবৈধ আর্থিক লেনদেনের মাধ্যমে। এর পর ঘরগুলো ভাড়া দেওয়া হয় স্বল্প আয়ের মানুষের কাছে।

আবার নগরীর বাইরে দেখা গেছে, জেলার প্রায় সব উপজেলায় পাহাড় আছে। এসব পাহাড়ের পাদদেশে হাজার হাজার মানুষ বসতঘর তৈরি করে দীর্ঘকাল ধরে বসত করছে। পাহাড়ের পাদদেশে বসত করা মানুষগুলোও প্রান্তিক জনগোষ্ঠী। ফলে পাহাড় যেন শুধু গরিবদের প্রাণই নেয়। চলতি মাসে রাঙ্গুনিয়া ও চন্দনাইশে যাঁরা পাহাড়ধসে মারা গেছেন, তাঁরা সবাই প্রান্তিক পর্যায়ের জনগোষ্ঠী।

শক্তিশালী পাহাড় ব্যবস্থাপনা কমিটির হিসাব অনুযায়ী, চট্টগ্রাম নগরীর লালখান বাজার মতিঝর্ণা, বাটালি হিল, খুলশী, পাহাড়তলী, টাইগারপাস, জঙ্গল পাহাড়তলী, কাছিয়াঘোনা, লেবুবাগান, ভাটিয়ারিসহ সীতাকুণ্ডের

সলিমপুর, লতিফপুর, আমবাগান, বাটালি হিল রেলওয়ে কলোনি, পাহাড়তলী রেল কলোনি, বায়েজিদ বোস্তামি, হাটহাজারী উপজেলার এক নম্বর দক্ষিণ পাহাড়তলী সিটি করপোরেশন ওয়ার্ডের শাহ আমানত কলোনির অনেক মানুষ পাহাড়ে ঝুঁকিপূর্ণভাবে বসবাস করছেন। এর বাইরে জেলার হাটহাজারী, রাউজান, রাঙ্গুনিয়া, ফটিকছড়ি, সীতাকুণ্ড, মিরসরাই, বোয়ালখালী, পটিয়া, চন্দনাইশ, আনোয়ারা, সাতকানিয়া, লোহাগাড়া ও বাঁশখালী উপজেলায় ছোট-বড় অনেক পাহাড় আছে। এসব পাহাড়ের পাদদেশে হাজার হাজার পরিবার থাকে। জেলা পর্যায়ে ঝুঁকিপূর্ণ পাহাড়ে বসতি করে এমন পরিবারের সংখ্যা অন্তত ২৫ হাজার এবং চট্টগ্রাম মহানগরীতে কয়েক বছর আগের তালিকা অনুযায়ী ৬৬৬টি পরিবার বলে জানিয়েছেন

শক্তিশালী পাহাড় ব্যবস্থাপনা কমিপির সদস্য সচিব ও চট্টগ্রামের অতিরিক্ত জেলা প্রশাসক (রাজস্ব) আবদুল জলিল। নগরীতে তালিকা করা হলেও জেলা পর্যায়ে কোনো ধরনের তালিকা করা হয়নি বলে তিনি নিশ্চিত করেছেন।

পরিবেশ আন্দোলনকারীদের অভিযোগ, প্রশাসনের উদাসীনতা, রাজনৈতিক দলের নেতাদের প্রভাব এবং তদন্ত কমিটির সুপারিশ বাস্তবায়ন না করার কারণে পাহাড়ধস ও প্রাণহানি রোধ করা যাচ্ছে না। এসব প্রতিবন্ধকতা দূর করতে প্রশাসনকে অবশ্যই দল নিরপেক্ষভাবে কাজ করতে হবে।

পরিবেশ আন্দোলনের সংগঠক শরীফ চৌহান বলেন, ‘পাহাড়কাটা ও দখলে জড়িতরা চিহ্নিত হলেও প্রশাসন কখনোই তাদের বিরুদ্ধে কোনো ব্যবস্থা নেয়নি। দখলকারীরা তাদের অবস্থানে অক্ষতই আছে। শুধু বর্ষা এলেই যে পাহাড়টি ধসে সেখান থেকে কয়েকজন বসতকারীকে সরানো হয়। অথচ প্রতিবছরই নির্বিচারে নতুন পাহাড় কেটে বসতি স্থাপন চলছে। ’

Editor- Sayed Mohammad SHAKIL.
Office: Evan plaza, sador model thana road, cox’sbazar-4700. Email: dailycoxsbazar@gmail.com / phone: 01819099070
অনুমতি ছাড়া অথবা তথ্যসূত্র উল্লেখ না করে এই ওয়েব সাইট-এর কোন অংশ, লেখা বা ছবি নকল করা বা অন্য কোথাও প্রকাশ করা বেআইনী