সংবাদ শিরোনাম

ত্রাণের আশায় নদীর তীরে অপেক্ষার প্রহর

দেশের উত্তর ও মধ্যাঞ্চলের বন্যাকবলিত বেশির ভাগ জেলায় পরিস্থিতি অপরিবর্তিত রয়েছে। শনিবার মৌলভীবাজার, সিলেট, সুনামগঞ্জ, জামালপুর, নীলফামারী ও টাঙ্গাইলে সরকারি-বেসরকারি উদ্যেগে বন্যার্ত মানুষের মাঝে ত্রাণ বিতরণ করা হয়। মৌলভীবাজারের বড়লেখায় মুক্তিযোদ্ধারা নিজেদের ভাতার টাকায় ৭০০ বন্যার্ত পরিবারকে ত্রাণ দেন। তবে যে পরিমাণ ত্রাণ দেয়া হচ্ছে তা চাহিদার তুলনায় খুবই কম। ক্ষতিগ্রস্ত পরিবারগুলো খাবার ও বিশুদ্ধ পানির অভাবে মানবেতর জীবনযাপন করছে। বন্যার্ত এলাকাগুলোতে নৌকা দেখলেই বানভাসিরা ত্রাণের আশায় নদীতীরে ভিড় করছেন। এদিকে ফরিদপুরসহ কয়েকটি জেলায় তীব্র নদীভাঙন দেখা দিয়েছে। নদীগর্ভে বিলীন হয়ে যাচ্ছে বহু ঘর-বাড়ি ও শিক্ষা প্রতিষ্ঠান।

ব্যুরো ও প্রতিনিধিদের পাঠানো খবর-

জামালপুর, দেওয়ানগঞ্জ, ইসলামপুর ও বকশীগঞ্জ : দেওয়ানগঞ্জে নৌকা দেখলেই বানভাসিরা ত্রাণ নেয়ার জন্য নদীর ধারে ভিড় করছেন। শনিবার বন্যায় ক্ষতিগ্রস্ত ৭টি ইউনিয়ন পরিদর্শন ও ত্রাণসামগ্রীসহ নগদ অর্থ বিতরণ করেন পরিকল্পনা মন্ত্রণালয় সংসদীয় স্থায়ী কমিটির চেয়ারম্যান আবুল কালাম আজাদ এমপি। চুকাইবাড়ি চিকজানীসহ বিভিন্ন এলাকায় এমপি ত্রাণ বিতরণ করবেন- এমন সংবাদ ছড়িয়ে পড়লে নদীতীরবর্তী বন্যাকবলিত এলাকার শত শত নারী-পুরুষ ত্রাণ নিতে ভিড় করেন। বড়খাল, খোলাবাড়ীসহ বিভিন্ন এলাকায় বড় নৌকা দেখলেই বানভাসিরা প্রচণ্ড রোদের মধ্যে পানিতে দাঁড়িয়ে ত্রাণের জন্য অপেক্ষা করেন। শনিবার বিকালে বাহাদুরাবাদ ঘাট পয়েন্টে যমুনায় ১২ সেন্টিমিটার পানি কমলেও বিপদসীমার ৭৫ সেন্টিমিটার ওপর দিয়ে পানি প্রবাহিত হয়। বকশীগঞ্জের বন্যাকবলিত এলাকা মেরুরচর ও সাধুরপাড়া ইউনিয়নে গিয়ে দেখা যায়, ত্রাণের আশায় অধীর অপেক্ষা করছেন বানভাসিরা। এদিকে ইসলামপুরে বন্যা পরিস্থিতির কিছুটা উন্নতি হয়েছে।

চরভদ্রাসন (ফরিদপুর) : ফরিদপুরের চরভদ্রাসন উপজেলায় বন্যা পরিস্থিতির অবনতি হয়েছে। শনিবার পদ্মা নদীর পানি আরও ১৬ সেমি. বেড়ে বিপদসীমার ২০ সেমি. ওপর দিয়ে প্রবাহিত হচ্ছিল। এতে উপজেলার প্রায় দেড় হাজার পরিবার পানিবন্দি হয়ে পড়েছে। বন্যা পরিস্থিতির অবনতির সঙ্গে সঙ্গে পদ্মা নদীর বিভিন্ন পয়েন্টে দেখা দিয়েছে তীব্র ভাঙন। এতে উপজেলা সদরের ফাজেলখারডাঙ্গী গ্রামের ডা. আ. রশিদের বসতভিটাসহ দুই একর ফসলি জমি বিলীন হয়ে গেছে।

বড়লেখা (মৌলভীবাজার) : শনিবার মুক্তিযোদ্ধাদের সম্মানী ভাতা এবং সন্তান কমান্ডের সদস্যদের চাঁদায় যৌথভাবে উপজেলার বিভিন্ন গ্রামের বন্যাকবলিত ৭০০ পরিবারের মাঝে খাদ্যসামগ্রী বিতরণ করা হয়েছে। উপজেলা মুক্তিযোদ্ধা কমান্ডার ও সাবেক উপজেলা চেয়ারম্যান সিরাজ উদ্দিনের নেতৃত্বে সুজানগর ইউনিয়নের বাড্ডা, পাটনা, কটালপুর, বারহালি, উত্তর বাঘমারা, নাজিরখা, তালিমপুর ইউনিয়নের বড়ময়দান, মুর্শিবাদকুরা, গগড়া, হাল্লা, পাবিজুরি, গোপালপুর, কুঠাউরা, শ্রীরামপুর, আহমদপুর গ্রামে এ ত্রাণ বিতরণ করা হয়।

সিলেট : পাহাড়ি ঢলে ক্ষতিগ্রস্ত কানাইঘাটের সুরমা ডাইকের সাতবাঁক ইউনিয়নের চরিপাড়া অংশে ভয়াবহ ভাঙন দেখা দিয়েছে। স্থানীয়রা জানান, চরিপাড়া গ্রামের অধিকাংশ বাড়ি-ঘর ও ফসলি জমি সুরমার ভাঙনে বিলীন হয়ে যাচ্ছে। ভাঙন ঠেকাতে দ্রুত উদ্যোগ গ্রহণ না করলে সাতবাঁক ইউপির বিস্তীর্ণ ফসলি জমি ও এলাকায় ভয়াবহ বন্যা দেখা দেবে। শনিবার বিকালে প্রবাসী নিয়াজ খানের উদ্যোগে ফেঞ্চুগঞ্জ উপজেলায় ত্রাণ বিতরণ করেন স্থানীয় এমপি মাহমুদ উস সামাদ চৌধুরী। উপজেলা ডাকবাংলো প্রাঙ্গণে সাইফুল আলম রাজ্জাকের সভাপতিত্বে ও মো. জয়নাল আবেদীনের পরিচালনায় অনুষ্ঠানে চাল, আলু, পেঁয়াজ, তেল, ডাল, লবণসহ ৬শ’ পরিবারকে ত্রাণ সামগ্রী দেয়া হয়।

সুনামগঞ্জ ও ছাতক : ক্ষতিগ্রস্ত সাড়ে ৩ হাজার ফসলহারা কৃষক পরিবারের মাঝে ক্রাণসামগ্রী ও নগদ অর্থ বিতরণ করেছে ইসলামী ব্যাংক। শনিবার জেলা শহরের শহীদ আবুল হোসেন মিলনায়তনে এ ত্রাণ বিতরণ কর্মসূচির উদ্বোধন করেন ব্যাংকের সিনিয়র ভাইস প্রেসিডেন্ট ও সিলেট বিভাগের হেড অব জোন মুহাম্মদ সাঈদ উল্লাহ। এছাড়া ছাতকে বন্যায় ক্ষতিগ্রস্ত ৫ শতাধিক মানুষের মাঝেও ত্রাণ দিয়েছে ইসলামী ব্যাংক। সেখানে ত্রাণ বিতরণ কার্যক্রমের উদ্বোধন করেন ইসলামী ব্যাংকের ভাইস প্রেসিডেন্ট ও ছাতক শাখা প্রধান মো. দুলাল হোসেন।

ডিমলা (নীলফামারী) : ডিমলায় বন্যায় ক্ষতিগ্রস্তদের মাঝে শনিবার ত্রাণ বিতরণ করা হয়েছে। দুপুরে খালিশা চাপানি ইউনিয়নে ৬৪০ জনকে ১০ কেজি করে চাল ও তিস্তার বসতভিটা বিলীন হওয়া ৮টি পরিবারকে ২ হাজার টাকা করে বিতরণ করা হয়। ত্রাণ ও টাকা বিতরণ করেন নীলফামারীর দায়িত্বে থাকা ত্রাণ ও দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা মন্ত্রণালয়ের উপসচিব আমিনুল ইসলাম।

গাইবান্ধা : শনিবার জেলা প্রশাসক গৌতমচন্দ্র পাল জেলা প্রশাসকের সম্মেলন কক্ষে এক প্রেস ব্রিফিংয়ে জানান, বন্যায় জেলার ফুলছড়ি, সাঘাটা, সুন্দরগঞ্জ ও গাইবান্ধা সদর উপজেলায় ৩০টি ইউনিয়নের ১৯৪টি গ্রাম নিমজ্জিত হয়েছে। এতে ক্ষতিগ্রস্ত হয় ৬০ হাজার ৩৩৮টি পরিবার। লোকসংখ্যার হিসাবে ২ লাখ ৪১ হাজার ২১৩ জন। ঘর-বাড়ি ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে ১২ হাজার ৭৫৭টি। কাঁচা রাস্তা ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে ৮১ কিমি.। ফসলের ক্ষতি হয়েছে ২৫৪ হেক্টর জমির। এছাড়া বন্যার পানিতে ডুবে ৩ জন শিশুর মৃত্যু হয়েছে। বন্যার পানিতে নিমজ্জিত হয়েছে ১৩০টি শিক্ষা প্রতিষ্ঠান। ফলে সেগুলোতে ক্লাস হচ্ছে না। তিনি জানান, ত্রাণ হিসেবে ৩২৫ মেট্রিক টন চাল, ১৮ লাখ টাকা এবং ৪ হাজার শুকনা খাবারের প্যাকেট পাওয়া গেছে। এর মধ্যে ২৯৫ মেট্রিক টন চাল ও ১৭ লাখ ৫০ হাজার টাকা এবং ২ হাজার প্যাকেট শুকনা খাবার বিতরণ করা হয়েছে।

গোলাপগঞ্জ ও ফেঞ্চুগঞ্জ (সিলেট) : বন্যা পরিস্থিতি নিয়ে গোলাপগঞ্জের হাকালুকি হাওরপারের শরীগঞ্জের কালিকৃষ্ণপুর গ্রামের ইসমাইল হোসেন সিরাজ বলেন, ‘পানি এই কমতেছে আবার বাড়তেছে। এক মাস থেকে আমরা পানিবন্দি। আমাদের বসবাস করা দায় হয়ে পড়েছে। সব সময় থাকি আতঙ্কের মাঝে।’ একইভাবে পার্শ্ববর্তী কালিকৃষ্ণপুর, ইসলামপুর, রাংজিওল ও নুরজাহানপুরসহ ১৩টি গ্রামে হাজারও মানুষ এখনও পানিবন্দি। এমন দুর্বিষহ জীবনযাপন করলেও তাদের ভাগ্যে এখনও জোটেনি পর্যাপ্ত ত্রাণ। শনিবার ফেঞ্চুগঞ্জ উপজেলায় বন্যাদুর্গত এলাকায় এক হাজার পরিবারের মধ্যে ত্রাণ বিতরণ করেছেন যুবদলের সাবেক সহসভাপতি আবদুল কাইয়ুম চৌধুরী।

সিরাজগঞ্জ : ত্রাণ বিতরণে জনপ্রতিনিধি, দলীয় নেতাকর্মী বা প্রশাসনের কর্মকর্তা যেই অনিয়ম করুক না কেন, কাউকেই ছাড় দেয়া হবে না বলে জানিয়েছেন দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা ও ত্রাণমন্ত্রী মোফাজ্জল হোসেন চৌধুরী মায়া। তিনি বলেন, বন্যাকবলিত একজন মানুষও যেন না খেয়ে থাকে, বিনা চিকিৎসায় যেন মারা না যায় সে বিষয়ে সচেষ্ট রয়েছে সরকার। শনিবার দুপুরে সিরাজগঞ্জ জেলা প্রশাসক কার্যালয়ের শহীদ সামছুদ্দীন সম্মেলন কক্ষে আয়োজিত জেলা দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা কমিটির জরুরি সভায় প্রধান অতিথির বক্তব্যে মন্ত্রী এসব কথা বলেন।

গোপালপুর ও ভুয়াপুর (টাঙ্গাইল) : শনিবার গোপালপুর উপজেলা পরিষদের চেয়ারম্যান মো. ইউনুছ ইসলাম তালুকদার যমুনায় ভাঙনকবলিত রামাইল, শুশুয়া, তালতলাসহ বিভিন্ন এলাকায় ক্ষতিগ্রস্ত ৫শ’ পরিবারের মাঝে ব্যক্তিগত তহবিল থেকে ত্রাণ বিতরণ করেন।

বগুড়া : দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা ও ত্রাণমন্ত্রী মোফাজ্জল হোসেন চৌধুরী মায়া বলেছেন, বন্যাদুর্গতরা ক্ষতি পুষিয়ে না ওঠা পর্যন্ত সরকারের সহযোগিতা অব্যাহত থাকবে। শনিবার বিকালে বগুড়ার সারিয়াকান্দিতে বন্যাদুর্গত এলাকা পরিদর্শনকালে রৌহদহ বন্যা নিয়ন্ত্রণ বাঁধে আয়োজিত সমাবেশে প্রধান অতিথির বক্তব্যে তিনি এ কথা বলেন। সারিয়াকান্দি উপজেলা আওয়ামী লীগের সভাপতি সাহাদারা মান্নানের সভাপতিত্বে সমাবেশে অন্যদের মধ্যে উপস্থিত ছিলেন বগুড়া-১ আসনের সংসদ সদস্য আবদুল মান্নান, দুর্যোগ ও ত্রাণ মন্ত্রণালয়ের সচিব শাহ কামাল, যুগ্মসচিব মহসিন আলী প্রমুখ।

-যুগান্তর 

Editor- Sayed Mohammad SHAKIL.
Office: Evan plaza, sador model thana road, cox’sbazar-4700. Email: dailycoxsbazar@gmail.com / phone: 01819099070
অনুমতি ছাড়া অথবা তথ্যসূত্র উল্লেখ না করে এই ওয়েব সাইট-এর কোন অংশ, লেখা বা ছবি নকল করা বা অন্য কোথাও প্রকাশ করা বেআইনী
error: Content is protected !!