সংবাদ শিরোনাম

ইসির ৭ পরিকল্পনা নির্বাচনের পথে ইসির যাত্রা # তফসিলের আগে রাজনৈতিক অধিকার না পেলে কিছু করার নেই : সিইসি # গণতান্ত্রিক অধিকারের সঙ্গে নির্বাচন অঙ্গাঙ্গিভাবে জড়িত : নজরুল # সমান সুযোগ সৃষ্টি করার দায়িত্ব ইসির : ড. তোফায়েল আহমেদ

সাত কার্যক্রম চূড়ান্ত করে একাদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনের আনুষ্ঠানিক রোডম্যাপ ঘোষণা করেছে নির্বাচন কমিশন (ইসি)। এগুলো হলোÑ আইনি কাঠামো পর্যালোচনা ও সংস্কার, নির্বাচন প্রক্রিয়া সহজ ও যুগোপযোগী করতে সবার পরামর্শ গ্রহণ, সংসদীয় এলাকার সীমানা পুনর্নির্ধারণ, নির্ভুল ভোটার তালিকা প্র্রণয়ন ও সরবরাহ, বিধি অনুসারে ভোটকেন্দ্র স্থাপন, নতুন দলের নিবন্ধন ও নিবন্ধিত দলের নিরীক্ষা এবং সুষ্ঠু নির্বাচনে সংশ্লিষ্ট সবার সক্ষমতা বৃদ্ধির কার্যক্রম গ্রহণ। প্রধান নির্বাচন কমিশনার (সিইসি) কেএম নুরুল হুদা গতকাল আগারগাঁওয়ের ইটিআই ভবনে সংবাদ সম্মেলনের মাধ্যমে রোডম্যাপের বিস্তারিত তুলে ধরেন। এ রোডম্যাপের মধ্য দিয়ে নির্বাচনের পথে আনুষ্ঠানিক যাত্রা শুরু করল ইসি। এদিকে সংসদের বাইরে থাকা প্রধান বিরোধী দল বিএনপি তাৎক্ষণিক প্রতিক্রিয়ায় বলেছে, নির্বাচনকালীন সরকার কী হবে তা চূড়ান্ত না করে শুধু রোডম্যাপ দিয়ে সমস্যার সমাধান হবে না। অন্যদিকে ক্ষমতাসীন আওয়ামী লীগ এই রোডম্যাপকে বাস্তবসম্মত দাবি করে ইসিকে ধন্যবাদ জানিয়েছে।
সংবাদ সম্মেলনে সিইসি বলেন, এটি একটি সূচনা দলিল। কমিশনের কাজ আইনে নির্ধারণ করা আছে। এ মুহূর্তে সরকারের কাজে হস্তক্ষেপ করার অধিকার কমিশনের নেই। রাজনৈতিক দলগুলো সভা-সমাবেশ বা মিছিল-মিটিং করার কোনো অধিকার না পেলে তাতেও কমিশনের কিছু করার নেই। তফসিল ঘোষণার পর এসব দেখার দায়িত্ব নির্বাচন কমিশনের। তিনি আরও বলেন, দেশ-বিদেশের প্রভাবমুক্ত হয়ে একটি সুষ্ঠু নির্বাচন করতে এই রোডম্যাপ ঘোষণা করা হয়েছে। ভোটিং সিস্টেম ইভিএমের দরজা এখনো বন্ধ হয়নি বলেও মন্তব্য করেন তিনি।
এদিকে ইসির ঘোষিত রোডম্যাপের বিষয়ে বিএনপির স্থায়ী কমিটির সদস্য নজরুল ইসলাম খান আমাদের সময়কে বলেন, ‘গণতান্ত্রিক অধিকারের সঙ্গে নির্বাচন অঙ্গাঙ্গিভাবে জড়িত। গণতান্ত্রিক চর্চা না থাকলে নির্বাচন সঠিকভাবে হতে পারে না। তাই এতে কমিশনের দায়িত্ব নেই বলাটা আমি সঠিক মনে করি না। যেসব বিষয় গণতান্ত্রিক পরিবেশ সৃষ্টির অন্তরায় সে সম্পর্কে অভিমত ব্যক্ত করার অধিকার আছে ইসির। কারণ গণতন্ত্রের বাহন হলো নির্বাচন এবং সেই নির্বাচন করার দায়িত্ব ইসির। শুধু নির্বাচন পরিচালনার মধ্যেই তাদের দায়িত্ব সীমাবদ্ধ নয়।
স্থানীয় সরকার ও নির্বাচন বিশেষজ্ঞ ড. তোফায়েল আহমেদ বলেন, রোডম্যাপ তাদের রুটিন ওয়ার্ক। প্রত্যেক নির্বাচনের আগেই এসব করতে হয়। তারা সেই রুটিন ওয়ার্ক করছে। এর বাইরে কিছু দেখা যাচ্ছে না।
গ্রহণযোগ্য নির্বাচন প্রসঙ্গে তিনি বলেন, সব দলের সমান সুযোগ নিশ্চিত করার কথা বলেছেন সিইসি। এখন যে নিবন্ধিত দল সভা-সমাবেশ করতে পারছে না, সেটি দেখবে কে? তাদের তো ইসিই নিবন্ধন দিয়েছে। সুতরাং এসব নিশ্চিত করার দায়িত্বও তাদের। তারা যদি না পারে তা হলে আদালতে যেতে পারে। শুধু বলার জন্য বললে হবে না, কাজ করতে হবে।
আগামী নির্বাচন নিয়ে আওয়ামী লীগ ও বিএনপির মধ্যে তীব্র মতবিরোধ রয়েছে। এ ইস্যুতে সমাধানের কোনো লক্ষণও দেখা যাচ্ছে না। কোনো উদ্যোগও নেই। এমন অনিশ্চিত পরিস্থিতির মধ্যে নির্বাচনী রোডম্যাপ ঘোষণা করে এসবের মধ্যেই নিজেদের করণীয় ঠিক করে সবার অংশগ্রহণে প্রভাবমুক্ত করার প্রত্যয় ব্যক্ত করেছে নির্বাচন কমিশন। নির্বাচন পর্যন্ত এই রোডম্যাপ ধরেই এগোবে ইসি।
রোডম্যাপ প্রকাশকালে কেএম নুরুল হুদা বলেন, এটি একটি সূচনা দলিল। নির্বাচনের পথে কাজের জন্য এ কর্মপরিকল্পনাই সব নয়। সংযোজন-পরিমার্জন করে সবার মতামত নিয়ে আমরা কাজ করে যাব।
তিনি জানান, তফসিল ঘোষণা পর্যন্ত কর্মপরিকল্পনার সাত বিষয় ধরে তারা কাজ এগিয়ে নেবেন। তফসিল ঘোষণার পর ইসির কাজে কোনো ধরনের প্রতিবন্ধকতা এলে আইনানুগ ব্যবস্থা নেওয়া হবে।
এক প্রশ্নে সিইসি বলেন, শুধু সরকার কেন, রাজনৈতিক দল বা যে কোনো দেশি-বিদেশি সংস্থার প্রভাবমুক্ত নির্বাচন করতে পারব আমরা।
২০১৯ সালের ২৮ জানুয়ারির আগের ৯০ দিনের মধ্যে এ সংসদ নির্বাচন করার বাধ্যবাধকতা রয়েছে। এ সংসদ নির্বাচন সামনে রেখে আগামী দেড় বছরের কর্মপরিকল্পনা তুলে ধরেন সিইসি। সুষ্ঠু, নিরপেক্ষ ও গ্রহণযোগ্য নির্বাচনের প্রত্যয় নিয়ে কমিশন কাজ করে যাচ্ছে বলে উল্লেখ করে সংলাপে রাজনৈতিক দলসহ সব ধরনের অংশীজনের সুপারিশের পাশাপাশি সবার সহযোগিতা চান।
সংবাদ সম্মেলনে নির্বাচনী রোডম্যাপ প্রসঙ্গের বাইরে সম্প্রতি জাতীয় সমাজতান্ত্রিক দলের (জেএসডি) সভাপতি আ স ম আব্দুর রবের বাসায় ‘সামাজিক অনুষ্ঠানে’ পুলিশের বাধা দেওয়ার বিষয়টি উঠে আসে। এ ধরনের রাজনৈতিক ‘তৎপরতা’য় বাধা দেওয়ার বিষয়ে ইসির কোনো পদক্ষেপ থাকবে কিনা জানতে চাইলে তিনি বলেন, এটি সরকারের বিষয়। আমরা তফসিল ঘোষণার পর নির্বাচনী পরিবেশ বজায়ে যথাযথ ব্যবস্থা নেব। এখন সরকারের কাছে কোনো অনুরোধ থাকবে না। তবে তফসিল ঘোষণার পর পরিস্থিতির প্রয়োজন হলে অনুরোধ করা হবে।

ইভিএমের সক্ষমতা নিয়ে ভিন্ন সুর
একাদশ সংসদ নির্বাচনে ইলেকট্রনিক ভোটিং মেশিন (ইভিএম) ব্যবহার নিয়ে নির্বাচন কমিশন ও এর সচিবালয়ে দ্বিমুখী অবস্থান স্পষ্ট হয়েছে। জাতীয় নির্বাচনে ইভিএম ব্যবহার সংশয়ের মধ্যে আসন্ন সংলাপের এজেন্ডায় বিষয়টি রাখা হয়নি। এর পক্ষে এক সপ্তাহ আগে ইসির অবস্থান তুলে ধরে সচিব মোহাম্মদ আবদুল্লাহ জানান, আগামী সংসদ নির্বাচনে ইভিএম ব্যবহার করা হবে না বলেই রোডম্যাপের এজেন্ডায় তা রাখা হচ্ছে না। একটি বড় দল এর বিরোধিতাও করছে। তাই সংলাপে এ নিয়ে কেউ মতামত দিলেও ইভিএম ব্যবহার সম্ভব হবে না। তবে গতকাল রোডম্যাপ প্রকাশের সময় সিইসি বলেন, জাতীয় নির্বাচনে ইভিএম ব্যবহার করা যাবে কী যাবে না সে বিষয়ে সংলাপের মতামত দেখা হবে। বাস্তবসম্মত হলে তা ব্যবহারের সুযোগ রয়েছে।
এজেন্ডায় রোডম্যাপ নেই; তবু সংলাপে কোনো দল দাবি করলে স্বল্পসময়ে ইভিএম সম্ভব কিনা ও প্রস্তুতি রয়েছে কিনাÑ জানতে চাইলে সিইসি বলেন, ইভিএমের দরজা আমরা বন্ধ করে দিইনি। স্থানীয় সরকারের কিছু নির্বাচনে তা ব্যবহার হয়েছে। ২০১১ সালে কিছু ভুল ধরা পড়ায় থেমে গেছে। কিন্তু জাতীয় নির্বাচনে তা ব্যবহার করার বিষয়ে আমরা বলছিÑ সংলাপে দলগুলো কী বলে, কী প্রস্তাব দেয় তা দেখব।
তিনি জানান, বর্তমানে ইসির কাছে আগের ৭০০-৮০০ বুয়েটের ইভিএম রয়েছে। কমিশনের নতুন ইভিএমের একটা অবস্থান হচ্ছে। ভোটের জন্য ৪০ হাজার ভোটকেন্দ্রে আড়াই লাখ ইভিএম লাগবে। এটি যে অসম্ভব হবে তা নয়। কমিশন মনে করে, এটির স্কোপ রয়েছে; বন্ধ না রেখে দলের কাছে তুলে ধরতে হবে। এ সময়ে আড়াই লাখ ইভিএম তৈরি, কর্মকর্তাদের প্রশিক্ষণ ও ভোটার সচেতনতার সক্ষমতা রয়েছে কিনা দেখতে হবে। সরকারের সহায়তা ও দলের সম্মতি দেখে ‘বাস্তবসম্মত’ হলে ইভিএম ব্যবহারের সুযোগ রয়েছে বলে উল্লেখ করেন সিইসি। নিজেদের তৈরি ইভিএম নিয়ে বৈঠক শেষে গত ১১ মে এক অনুষ্ঠানে সিইসি বলেছিলেন, জাতীয় নির্বাচনে ইভিএম ব্যবহারের জন্য প্রস্তুতি রয়েছে তাদের। এক্ষেত্রে প্রয়োজনীয় সম্ভাব্যতাও যাচাই করে চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত নেওয়া হবে।
বিএনপি ইতোমধ্যে প্রধান নির্বাচন কমিশনারের সঙ্গে সাক্ষাৎ করে ইভিএম নিয়ে আপত্তির কথা জানিয়েছে। তার পরিপ্রেক্ষিতে দলটিকে সিইসি জানিয়েছে, কারো আপত্তি থাকলে এ প্রযুক্তি ব্যবহার করা হবে না।
সম্প্রতি ইসিতে ব্যাপক রদবদল প্রসঙ্গে সিইসি বলেন, নির্বাচন কমিশন সচিবালয়ের কর্মকর্তাদের বদলি ও পদোন্নতির এখতিয়ার ইসি সচিবালয়ের। এ নিয়ে নির্বাচন কমিশনের কোনো এখতিয়ার নেই। সম্প্রতি ৩৩ কর্মকর্তার বদলি পদোন্নতি নিয়ে নির্বাচন কমিশনার মাহবুব তালুকদারের ইউও নোটের বিষয়ে এ কথা বলেন তিনি।
এক প্রশ্নে সিইসি বলেন, বিষয়টি একজন নির্বাচন কমিশনারের বিষয় নয়; আমার বিষয়ও নয়Ñ এটি ইসি সচিবালয়ের দায়িত্ব। ইসি সচিবালয়ের কে, কোথায় পদায়ন পেল তা তারা দেখবে। বিষয়গুলো ইসি সচিবালয়ের এখতিয়ার। কর্মকর্তাদের বদলি নিয়ে নোট দেওয়ার প্রসঙ্গটি উঠলে ‘এটি তালুকদার সাহেবের প্রোডাক্ট’ সিইসির এমন বক্তব্যে হাসির রোল পড়ে সংবাদ সম্মেলনে। কর্মকর্তাদের বদলি-পদোন্নতি নিয়ে ‘ভুল বোঝাবুঝির অবকাশ নেই বলে উল্লেখ করেন সিইসি।
সংবাদ সম্মেলনে নির্বাচন কমিশনার কবিতা খানম স্বাগত বক্তব্যে বলেন, ১৫ ফেব্রুয়ারি থেকে নিজেদের মেয়াদ শুরুর পর এ পর্যন্ত সব কাজ প্রশ্নের ঊর্ধ্বে রেখে করা হয়েছে। ইসির সুচিন্তিত কাজের অংশই আজকের কর্মপরিকল্পনা কমিশনের কাজের ফসল। আমরা পরিকল্পনা ধরেই এগোচ্ছি। জনগণের সামনে সুষ্ঠু ও সুন্দর, সবার অংশগ্রহণে নির্বাচন করতে চাই আমরা। সততা ও শক্তির স্বাক্ষর যে আমরা রাখতে পারি সে জন্য সবার সহযোগিতা চাই। নির্বাচন কমিশন সচিব মোহাম্মদ আবদুল্লাহ অনুষ্ঠান সঞ্চালনা করেন। এ সময় উপস্থিত ছিলেন নির্বাচন কমিশনার মাহবুব তালুকদার, রফিকুল ইসলাম, শাহাদত হোসেন চৌধুরী ও অতিরিক্ত সচিব মোখলেসুর রহমান।

Editor- Sayed Mohammad SHAKIL.
Office: Evan plaza, sador model thana road, cox’sbazar-4700. Email: dailycoxsbazar@gmail.com / phone: 01819099070
অনুমতি ছাড়া অথবা তথ্যসূত্র উল্লেখ না করে এই ওয়েব সাইট-এর কোন অংশ, লেখা বা ছবি নকল করা বা অন্য কোথাও প্রকাশ করা বেআইনী
error: Content is protected !!