সংবাদ শিরোনাম

কক্সবাজার রেড ক্রিসেন্ট ‘শনির আখড়া’

কক্সবাজার রেড ক্রিসেন্ট সোসাইটি যেন শনির আখড়া। প্রকল্পের অর্থ ব্যবহারে নানা অনিয়ম,উপকারভোগিদের তালিকা প্রনয়নে স্বজন প্রীতি, ত্রানের কার্ড বিক্রি করে অসহায় দরিদ্রদের কাছ থেকে মোটা অংকের অর্থ অদায়, আর্ন্তজাতিক এ সংস্থাকে নিজেদের তালুক হিসাবে ব্যবহার করে অনৈতিক ফায়দা হাসিলের কারনে এর প্রকৃত সেবা বঞ্চিত হচ্ছে কক্সবাজরের ২৩ লাখ মানুষ। গুরুত্বপূর্ণ এ আর্ন্তজাতিক সংগঠনে দীর্ঘদিন যাবৎ ঘাপটি মেরে থাকা একটি শক্তিশালী চক্র অগোচরে বরাদ্দ পাওয়া অনেক ত্রাণ ও নগদ অর্থ নয়ছয় করে ভুঁড়িভোজন করলেও কারো যেন মাথা ব্যথা নেই।

এদিকে সম্প্রতি ঘূর্নিঝড় মোরা আক্রান্তদের প্রায় ৪ হাজার ক্ষতিগ্রস্থ পরিবারকে দেওয়া ১১ লাখ ২০ হাজার টাকার ত্রাণ বিতরণে নানা অনিয়মের অভিযোগ পাওয়া গেছে। মোরায় আক্রান্তদের তালিকা প্রনয়নে মাঠকর্মীরা নানা অনিয়ম,স্বেচ্ছাসারিতা এবং টাকার বিনিময়ে কার্ড বিক্রির অভিযোগ করেছেন ত্রাণ বঞ্চিত মোরায় আক্রান্তরা।

চকরিয়ার সাহারবিল, পেকুয়ার উজানটিয়া, রামুর কচ্ছপিয়া, গর্জনিয়া, টেকনাফের শামলাপুর ও সাবরাং এবং সদও উপজেলার বাংলাবাজার, জিলংঝা, শহরের সমিতি পাড়ায় উক্ত ত্রাণ বিতরন করা হয়। রেড ক্রিসেন্টের কাছ থেকে উক্ত ১১ লাখ ২০ হাজার টাকার ত্রান সুষ্ঠুভাবে বিতরন করার দাবি করলে ও তালিকা থেকে থকে বাদ দেওয়া হয় ক্ষতিগ্রস্তের দিক দিয়ে অগ্রাধিকার পাওয়া অনেক পরিবার। সদরের সবচেয়ে ক্ষতিগ্রস্থ পিএমখালী, ভারুয়াখালী, চৌফলদন্ডি, ইসলামপর, পোকখালীতে অনেক পরিবার পানিতে নিমজ্জিত হলেও রেড ক্রিসেন্টের কোন ত্রান সহায়তা সেখানে পৌছেনি বলে দাবি করেন উক্ত ইউনিয়নের জনপ্রতিনিধিগণ।

ফলে জেলার বৃহৎ ক্ষতিগ্রস্থদের বাইরে রেখে শুধুমাত্র ত্রান বিতরনের নামে আইওয়াশ করছে বলে দাবি ক্ষতিগ্রস্থ অনেকে।আপদকালিন সময়ে প্রতি বছর জাতীয় ও আর্ন্তজাতিকভাবে বিভিন্ন প্রকল্পে বরাদ্দকৃত অর্থ ও ত্রাণ অনেকটা চৃুপিসারে ভাটোয়ারার অভিযোগ রয়েছে ইউনিট কার্যকরি কমিটির সম্পাদকসহ কয়েকজন প্রভাবশালী সদস্যের বিরুদ্ধে।

উক্ত কমিটির মেয়াদ ৩ বছর হলেও বর্তমান কমিটির সম্পাদকের বিরুদ্ধে নীতিমালা বর্হিভুতভাবে পদ ধরে রাখতে নানা কুটকৌশল চালানোর অভিযোগ অনেকের। ২০১৩ সালে বর্তমান সম্পাদক একই পদে দায়িত্ব পালন কালিন সময়ে “ আরলি রিকভারি প্রজেক্টে” বন্যায় ক্ষতিগ্রস্থ রামু, সদর, চকরিয়া ও পেকুয়ার প্রায় অর্ধলক্ষ ক্ষতিগ্রস্থ অসহায় মানুষের জন্য বরাদ্দকৃত নগদ টাকা ও ত্রাণ আত্মসাতের অভিযোগ এখনো সচেতন কক্সবাজার বাসি ভুলে যায়নি। মিডিয়ায় আলোচিত তখনকার ত্রাণ আত্মসাতের বিষয়টি মন্ত্রণালয় পর্যন্ত জেলা সম্পাদকের বিরুদ্ধে অভিযোগ দিয়েছিল বঞ্চিত ভানবাসি মানুষ। কক্সবাজার সদর উপজেলার পিএমখালীতে মোটা অংকের অর্থের বিনিময়ে সে সময় ত্রাণের কার্ড বিক্রির সময় স্থানিয় আওয়ামীলীগ নেতারা ছনখোলা এলাকা থেকে তৎকালিন সম্পাদকসহ ৪ জনকে ধাওয়া করেছিল। ১২শ কার্ড বিক্রি করে সে সময় বিপুল টাকা হাতিয়ে নেওয়ার কারনে ত্রান না পেয়ে সে সময় জেলা প্রশাসকের কার্যালয়ের সামনে ২ শতাধিক অসহায় মহিলা সমবেত হয়ে সম্পাদক ও তৎকালিন সভাপতির বিরুদ্ধে মিছিল করেছিল প্রতারনার শিকার আনজুমনআরারা। সমস্যার আজো কোন কিনারা হয়নি। ফেরত পায়নি ত্রানের কার্ড দিয়ে হাতিয়ে নেওয়া প্রায় ২০ লাখ টাকা।
মানুষ ঠকানোর কারিগরেরা আজো হট সিটে বসে দিব্যি আরামে প্রকল্পের টাকা আত্মসাৎ করে যাচ্ছে দেদারছে।

কথায় বলে মরার উপর খাঁড়ার গা। তারপরও প্রাণ বাঁচাতে না দিয়ে উপায় নেই। আর সেই সুযোগে পেট মোটা করছেন অসাধু কর্মকর্তা। ঘটনাটি ঘটেছে রোহিঙ্গাদের মধ্যে বাংলাদেশ রেডক্রিসেন্ট সোসাইটির ত্রান বিতরণে।

জানা গেছে, উখিয়া ও টেকনাফের নিবন্ধিত ও অনিবন্ধিত রোহিঙ্গাদের মধ্যে বিভিন্ন দাতা সংস্থার দেয়া ত্রান বিতরণ করে বাংলাদেশ রেডক্রিসেন্ট সোসাইটি। এসব ত্রাণ বিতরণ করে কক্সবাজার ইউনিট কার্যালয়ের প্রকল্প সমন্বয়ক সেলিম আহমেদ। ত্রাণ বিতরণের তিনটি প্রকল্পে হরিলুট করার অভিযোগ উঠেছে তাঁর বিরুদ্ধে। সেলিম আহমদের দুর্নীতিতে সদর দপ্তরের রিলিফ বিভাগের পরিচালক নাজমুল আজম খানের জড়িত থাকারও অভিযোগ উঠেছে। এঘটনায় জেলা ইউনিট থেকে ইতোমধ্যে সদর দপ্তরসহ বিভিন্ন দপ্তরে অভিযোগ করা হয়েছে।

অভিযোগ সূত্রে জানা গেছে, মিয়ানমারের আরাকান রাজ্যে মুসলিম রোহিঙ্গাদের উপর সেই দেশের সেনাবাহিনীর ভয়াবহ নির্যাতনের কারণে দলে দলে রোহিঙ্গারা বাংলাদেশে পালিয়ে এসে উখিয়ার কুতুপালং, বালুখালী, টেকনাফের লেদা নয়াপাড়া এলাকায় আশ্রয় নেয়। মিয়ানমার সরকারের নির্যাতন শিকার হয়ে বাংলাদেশে আসা রোহিঙ্গাদের জন্য ত্রাণ সামগ্রি ‘ফুড ফ্রুটিলা’ পাঠায় মালয়েশিয়া। বাংলাদেশ সরকারের পক্ষ থেকে সেই ফুড ফ্রুটিলা বিতরণের দায়িত্ব দেওয়া হয় বাংলাদেশ রেড ক্রিসেন্ট সোসাইটিকে। ওই ফুড ফ্রুটিলা প্রোগ্রামে ৪৭৫ টন খাদ্য সামগ্রি ছিল। প্রতিটি প্যাকেটে চাল, ডাল, তেলসহ ৩৫ ধরণের খাদ্য সামগ্রি ছিল। সেগুলোর ১৫ হাজার ২৫০ টি প্যাকেট করা হয়। পরে সেগুলো প্রতি পরিবারে একটি করে প্যাকেট বিতরণ করা হয়। প্যাকেট বিতরণ আগে তালিকা করার সময় প্রতি পরিবারে একটি করে কার্ড দেওয়া হয়। ওই সময় প্রতি কার্ডে ১ হাজার টাকা করে আদায় করা হয়। সম্পূর্ণ বিনামূল্যে বিতরণের জন্য দেওয়া হলেও প্যাকেট প্রতি রোহিঙ্গাদের কাছ থেকে ১ হাজার টাকা করে আদায় করায় ক্ষোভ প্রকাশ করেছে খোদ জেলা ইউনিটের ম্যানেজিং কমিটি।

জানা গেছে, বাংলাদেশ রেডক্রিসেন্ট সোসাইটির রোহিঙ্গাদের মধ্যে ত্রাণ বিতরণ কার্যক্রম দেখাশুনা করেন কক্সবাজার জেলা ইউনিটের ডাইজেস্টার রেসপন্স প্রোগ্রামের সমন্বয়ক সেলিম আহমেদ। সেলিম আহমেদ বিনামূল্যের ফুড ফ্রুটিলা প্রোগ্রামে ১৫২৫০ রোহিঙ্গা পরিবারের কাছ থেকে ১ কোটি সাড়ে ৫২ লাখ টাকা হাতিয়ে নিয়েছেন। ওই টাকার সরাসরি ভাগ নিয়েছেন বাংলাদেশ রেডক্রিসেন্ট সোসাইটি সদর দপ্তরের রিলিফ বিভাগের পরিচালক নাজমুল আজম খান। একারণে ওই দুর্নীতির বিষয়ে অভিযোগ করেও কোন প্রতিকার আসেনি।

ফলে রেড ক্রিসেন্টের মত মানবতা ও স্বেচ্ছাসেবি সংগঠনের সুফল চলে যাচ্ছে মুষ্টিমেয় কয়েকজনের হাতে। বঞ্চিত হচ্ছে জেলার অসহায় দরিদ্ররা।

কক্সবাজার রেড ক্রিসেন্টকে সাধারন মানুষের কাছে গ্রহনযোগ্য ও সুফল পাওয়ার উপযোগি করতে “থলের বিড়াল” বের করতে হবে। দূর্নীতি, স্বজনপ্রীতি, ত্রাণের কার্ড বিক্রিকারিদের কবল থেকে মহতি এ সংগঠনকে উদ্ধার করে সাধারণ মানুষের কাজে লাগার উপযোগি করার জন্য সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের হস্তক্ষেপ কামনা করেছেন সুফলবঞ্চিত জনসাধারণ।

সূত্রমতে, এমআরআরও প্রকল্পে কুতুপালং ক্যাম্পের নিবন্ধিত ৬ হাজার ৫০০ রোহিঙ্গা পরিবারকে ত্রাণ সামগ্রি দেওয়া হয়। এই ননফুড প্রকল্পের ৬ হাজার ৫০০ উপকারভোগি পরিবারের কাছ থেকেও আদায় করা হয়েছে ১ হাজার টাকা করে। সেখানে সেলিম আহমেদ দুর্নীতির মাধ্যমে হাতিয়ে নিয়েছেন ৬৫ লাখ টাকা। এই প্রকল্পটি বর্তমানেও চলমান। এছাড়াও পপুলেশন মুভমেন্ট প্রোগ্রামে ৫হাজার রোহিঙ্গা পরিবারকে খাদ্য সামগ্রির প্যাকেট দেওয়া হয়। সেখানে প্রতি প্যাকেটে সাড়ে ৬ হাজার টাকার খাদ্য সামগ্রি ছিল। সেখানেও প্যাকেট প্রতি ১হাজার টাকা করে হাতিয়ে নিয়েছে সেলিম আহমেদ। পপুলেশন মুভমেন্ট প্রোগ্রাম থেকে সেলিম সিন্ডিকেট লুটে নিয়েছেন প্রায় ৫০ লাখ টাকা। যদিও এসব প্রকল্পের ত্রান গুলো বিনামূল্যে দেওয়ার কথা। এভাবেই রোহিঙ্গাদের ত্রাণের প্রতিটি প্রকল্প থেকে সেলিম সিন্ডিকেট হাতিয়ে নেয় লাখ লাখ টাকা।

জানা গেছে, বাংলাদেশ রেডক্রিসেন্ট সোসাইটির (বিডিআরসি) দুর্নীতিবাজ কর্মকর্তা সেলিম আহমেদ দীর্ঘ ২৭ বছর ধরে কক্সবাজার ইউনিটে কর্মরত রয়েছেন। স্বাভাবিকভাবে একটি ইউনিটে ৫ বছরের বেশি সময় থাকার নিয়ম না থাকলেও ২৭ বছর ধরে বহাল রয়েছেন সেলিম আহমেদ। দীর্ঘ এই সময়ে অনিয়ম-দুর্নীতির মাধ্যমে কোটি কোটি টাকার মালিক বনেছেন তিনি। তাকে সরাসরি সহযোগিতা করেন সদর দপ্তরের রিলিফ বিভাগের পরিচালক নাজমুল আজম খান। একারণে বহুবার অভিযোগ করেও কোন প্রতিকার আসেনি।

এবিষয়ে জানতে চাইলে সেলিম আহমেদ বলেন, ফুড ফ্রুটিলা প্রোগ্রামের খাদ্য সামগ্রি বিতরণ ও তালিকা করার সময় প্রশাসন ও আরসিওয়াই কর্মীরা ছিল। কার্ডের বিনিময়ে টাকা নেওয়ার অভিযোগটি সম্পূর্ণ মিথ্যা।

সদর দপ্তরের রিলিফ বিভাগের পরিচালক নাজমুল আজম খানের বক্তব্য নেওয়ার জন্য একাধিকবার মোবাইলে চেষ্টা করলেও রিসিভ না করায় তার পাওয়া যায়নি।

Editor- Sayed Mohammad SHAKIL.
Office: Evan plaza, sador model thana road, cox’sbazar-4700. Email: dailycoxsbazar@gmail.com / phone: 01819099070
অনুমতি ছাড়া অথবা তথ্যসূত্র উল্লেখ না করে এই ওয়েব সাইট-এর কোন অংশ, লেখা বা ছবি নকল করা বা অন্য কোথাও প্রকাশ করা বেআইনী