সংবাদ শিরোনাম

ছোট গল্প : ত্যাগস্বীকার

“তুই ক্যান ঐ বেডার লগে গেলি? তার থেইকা মইরা যাইতি! আমার মানসম্মানডা বাঁচত…। ক্যান? তর চাইতেও কি রিশকাডা বড় আছিলো আমার কাছে? ক্যান গেছোস ওইখানে?”

আবুলের কণ্ঠ যেন নিচেই নামছে না। আশেপাশের মানুষজনও খুব আগ্রহ নিয়ে দেখছে এই নাটক।
শ্যামলীর মরে যেতে ইচ্ছে করছে। যার জন্য এত বড় ত্যাগস্বীকার, সেই কিনা এই আচরণ করছে?
হঠাৎ আবুলের হ্যাঁচকা টানে শ্যামলীর কয়েক গোছা চুল উপড়ে আসে। সাথে সাথে শ্যামলী ঘুরে দাঁড়ায়, “আর একবার গায়ে হাত তুলছোস কি মরছোস, হারামজাদা!”
বৌয়ের সাহস দেখে আবুল খেই হারিয়ে ফেলল। কয়েক মুহূর্ত আমতা আমতা করে কেটে গেল ওর।
পরক্ষণেই চিৎকার করে উঠল, “আমার লগে চ্যাত দেখাস *গী? আমার লগে? তালাক দিলাম তরে। যা, ঐ কোরবানের দ্বারে যা। তুই আর আমার বৌ না। তুই ঐ খা*কির পুতের পোষা!”

দুইদিন আগের কথাঃ
আজ হরতাল।
হরতালের দিন আবুলের মন-মেজাজ দুটোই বিন্দাস থাকে। পাবলিকের কাছে দ্বিগুণ ভাড়া চাওয়া যায়, পাবলিকও দিতে রাজি হয়। সকাল সকাল তাই নতুন রিকশাটা নিয়ে আবুল বেড়িয়ে পড়ে খ্যাপের আশায়।
সারাটা সকাল ভালোই যায় ওর। আশার চেয়ে বেশি লাভ হয়েছে। এখন দুপুর। তপ্ত রোদে রিকশা নিয়ে বেড়িয়ে পড়ার আগে একটু নাস্তা করা দরকার। বেশ খুঁজে তাই একটা গলির ভিতরে চা-বিড়ির দোকানের সামনে বসে পড়ে আবুল। কামড় বসায় বনরুটিতে।
বৌটার জন্য আজকে কিছু নিয়ে যেতে হবে। অনেকদিন ধরে বেচারীকে কিছু দেওয়া হয় না। বিয়ের পরপর চুড়ি, টিপ কেনা হতো প্রায়। কিন্তু এখন আর সেই প্রেমিক মনটা নেই। সংসারের দাঁড় টানতে গিয়ে আবুল যেমন রিকশাওয়ালা, শ্যামলীও তেমনি ছুটা বুয়া।

ঠিক সেই সময়ই ঘটে গেলো ঘটনাটা…। চোখের পলক ফেলতে না ফেলতেই। অসহায় আবুল শুধু দর্শক হয়ে রইলো।
তিন-চারজন ছেলের একটা দল এসে রাস্তার মোড়ের একটা বাসে আগুন ধরিয়ে দিলো। তাদেরই একজন আবুলের রিকশাটা দেখতে পেয়ে এগিয়ে এলো…।
হতভম্ব আবুল রিকশার মালিক কোরবান মিয়াকে কী বলবে, খুঁজে পেল না।
মাত্র তিন সপ্তাহ হয়েছে নতুন রিকশাটা কোরবান মিয়া ওকে চালাতে দিয়েছে। আবুলের খুব ইচ্ছা ছিলো এক বছরের মধ্যেই রিকশাটা কিনে নেওয়ার মত টাকা জমিয়ে ফেলতে পারবে। কিন্তু এখন…?
সবকিছু শোনার পর শ্যামলীও থ মেরে রইল। পাশে বসে আবুল ঘ্যানঘ্যান করেই চলেছে, “ক্যামনে মিয়ার কাছে যামু? কী কমু হেরে? ক্যামনে এত ট্যাকা মিটামু?”
শ্যামলীও প্রশ্নগুলোর উত্তর জানে না। শুধু জানে মিয়াভাই আজ জবাই করবে ওর জামাইকে। রক্তারক্তি ঘটে যাবে এই বস্তিতে।
ত্বরিত সিদ্ধান্ত নিতে হয় ওকে।
কয়েক বাক্যে আবুলকে সান্ত্বনা দিয়ে বেড়িয়ে আসে শ্যামলী। বলে, “মেমসাহেবের বাসায় যাইতাছি। দেহি, ট্যাকা যোগাড় করতে পারি নাকী।”
তারপর এলোমেলো পায়ে এগিয়ে যায় কোরবানের আস্তানার দিকে।

আবুলের বিশ্বাস করতে কষ্ট হয়, শ্যামলী এতগুলো টাকা যোগাড় করে সেটা কোরবানকে দিয়েও এসেছে। কিন্তু ডুবন্ত মানুষ খড়কুটাকেও আঁকড়ে ধরে বাঁচতে চায়। তাই কষ্ট হলেও আবুল বিশ্বাস করে ব্যাপারটা।
“তুমি কাইলকা আরেকটা রিশকা পাইবা। অহন ঘুমাও তো! আমারেও ঘুমাইতে দ্যাও।” শ্যামলীর তপ্ত কণ্ঠ শুনে অশান্ত মন একটু শান্ত হয় আবুলের।

পরদিন কোরবানের কাছে রিকশা আনতে গিয়ে কোরবানের চোখের দিকে তাকানোর সাহস হয় না আবুলের। কিন্তু কোরবান তার পান খাওয়া লাল দাঁত বের করে হেসে ফেলে। পিচিক করে একগাদা থুথু ফেলে বলে, “আপাতত এই পুরান রিশকাডা দিয়াই কাম চালাও। পরে নতুন রিশকা পাইবা।“
মাটির দিকে তাকিয়ে আবুল ঘাড় নাড়ে।
“আর হুনো। বউডারে যখনই ডাকমু, তখনই পাঠায় দিবা। কুনো ভক্কর চক্কর করবা না। বুচ্ছো?”
কী??
আবুলের মাথায় ঢুকে না কোরবানের কথার অর্থ। মাটি থেকে এইবার ও চোখ কুঁচকে তাকায় কোরবানের দিকে।
“কি কইলা মিয়া?”
আবুলের কণ্ঠে বিপদের আভাস পায় কোরবান। গলা খাঁকারি দিয়ে বলে, “কথা কি উর্দুতে কইলাম নাকি? হুনো নাই? ঠসা হইছ?”

মুহূর্তে আবুলের কাছে সবকিছু পরিষ্কার হয়ে যায়।
কিভাবে শ্যামলী এত দ্রুত টাকা যোগাড় করে আরেকটা রিকশারও ব্যবস্থা করে ফেলেছে, পরিষ্কার হয়ে যায়।
কিন্তু কোরবানের থলথলে মুখে রাম দা দিয়ে কোপ মারার ইচ্ছাটা বহু কষ্টে দমিয়ে আবুল এক দৌড়ে বস্তিতে চলে আসে। বৌটা ভালোমানুষের মত কলতলায় বাসন মাজতে ব্যস্ত। দেখে মাথায় রক্ত চড়ে যায় আবুলের।

অসময়ে আবুলকে বস্তিতে দেখে শ্যামলী যতটা না অবাক হয়, তার চেয়ে বেশি আতংকিত হয় আবুলের রক্তবর্ণ চোখ দেখে।
কোরবান কি সবকিছু বলে দিলো নাকি মানুষটাকে?
কিন্তু শ্যামলীকে আর ভাবার সুযোগ না দিয়ে আবুল খপ করে ওর চুল টেনে ধরে। হিড়হিড় করে টেনে নিয়ে আসে ঘরের মধ্যে। ঠাস ঠাস করে কয়েকটা চড় লাগিয়ে চিৎকার করে উঠে, “তুই ক্যান ঐ বেডার লগে গেলি? তার থেইকা মইরা যাইতি! আমার মানসম্মানডা বাঁচত…।”

Editor in Chief : Sayed Shakil
Office: Evan plaza, sador model thana road, cox’sbazar-4700. Email: dailycoxsbazar@gmail.com / phone: 01819099070
অনুমতি ছাড়া অথবা তথ্যসূত্র উল্লেখ না করে এই ওয়েব সাইট-এর কোন অংশ, লেখা বা ছবি নকল করা বা অন্য কোথাও প্রকাশ করা বেআইনী