সংবাদ শিরোনাম

নায়ক রাজ্জাকের প্রস্থানে কি চলচ্চিত্র জগতে বড় শূন্যতা তৈরি হয়েছে?

বাংলাদেশের চলচ্চিত্রের ইতিহাসের প্রথম সুপার স্টার, নায়ক রাজ্জাক আকাশচুম্বী জনপ্রিয়তা পেয়েছেন।

নায়ক রাজ হিসেবে পরিচিত আব্দুর রাজ্জাক প্রায় তিন দশক বাংলাদেশের সিনেমায় নায়ক হিসেবে দাপটের সাথে অভিনয় করে একটা শক্ত প্রভাব বলয় তৈরি করেছিলেন।

৭৫ বছর বয়সে তাঁর মৃত্যুতে একটা অধ্যায়ের প্রস্থান হওয়ার কথা অনেকে বলছেন। তাঁর চির বিদায়ে বাংলাদেশের সিনেমা জগতে শূন্যতা তৈরি হয়েছে বলে অনেকে মনে করছেন।

ঢাকায় কেন্দ্রীয় শহীদ মিনারে নায়ককে শেষ শ্রদ্ধা জানাতে স্বর্বস্তরের মানুষের ঢল নেমেছিল। তাদের মধ্যে তরুণ তরুণী থেকে শুরু করে ষাটের বেশি বয়সের নারী পুরুষকে দেখা যায়।

তাদের অনেকে বলছেন, রাজ্জাক অভিনীত সিনেমা দেখলে তাঁরা যেন নিজের জীবনকে খুঁজে পেতেন।

তাদের অনেকের কাছে নায়কের চলে যাওয়ায় সিনেমা জগতেই বড় শূন্যতা তৈরি হয়েছে। সেটা পূরণ করা সম্ভব হবে কিনা, এনিয়েও অনেকে সন্দেহ প্রকাশ করেছেন।

বাংলাদেশের সিনেমার সাদাকালো যুগ থেকে শুরু করে রঙিন যুগ পর্যন্ত দাপটের সাথে অভিনয় করেন রাজ্জাক।

তাঁর জন্ম ভারতের পশ্চিমবঙ্গের কলকাতায় ১৯৪২ সালে।

শৈশবেই বাবা আকবর হোসেন এবং মা নিসারুন্নেছাকে হারান। কলেজে পড়ার সময় কলকাতায় মঞ্চে এবং চলচ্চিত্রে টুকটাক কাজ করতেন।

নায়ক হওয়ার বাসনায় কলকাতায় অনুকূল পরিস্থিতি না পেয়ে ১৯৬৪ সালে রাজ্জাক তাঁর স্ত্রী লক্ষ্মী এবং শিশুপুত্র বাপ্পাকে নিয়ে শরণার্থী হয়ে ঢাকায় আসেন।

পরিবার নিয়ে তিনি ঢাকার কমলাপুর এলাকায় মাসিক ৮০ টাকা ভাড়ায় একটি বাসায় উঠেছিলেন।

এরপর রাজ্জাক সংগ্রাম শুরু করেছিলেন। তাঁর সেই সময়টা খুব কষ্টের ছিল বলে জানিয়েছেন চলচ্চিত্র বিষয়ক সাংবাদিক আব্দুর রহমান।

নায়ক রাজ্জাক বাংলাদেশের সিনেমায় সহকারী পরিচালক হিসেবে কাজ শুরু করেছিলেন।

সেসময় দু’একটি সিনেমায় ছোট চরিত্রে অভিনয় করেছিলেন। তিনি নজরে পড়ে যান জহির রায়হানের।

জহির রায়হানের ‘বেহুলা’ ছবিতে সুচন্দার বিপরীতে অভিনয়ের সুযোগ পেয়েই রাজ্জাক বাজিমাত করেন।

১৯৬৭ সালে ছবিটি ব্যাপক জনপ্রিয়তা পেয়েছিল। সেই থেকে তাঁর শুরু হয়েছিল বড় পর্দায় নায়ক হিসেবে পথ চলা।

এরপর আর তাঁকে পিছনে ফিরে তাকাতে হয়নি। একের পর এক সিনেমা করে তিনি নায়ক রাজ হিসেবে পরিচিতি পান।

৫০ বছর ধরে চলচ্চিত্র শিল্পে তিনি তিনশোর বেশি ছবিতে অভিনয় করেছেন।

রোমান্টিক নায়ক হিসেবে তিনি যেমন খ্যাতির শীর্ষে উঠে যান । আবার জীবন থেকে নেয়ার মতো সিনেমায় নিজেকে ভেঙ্গে ভিন্ন ধরনের চরিত্রে অভিনয় করেও দর্শকপ্রিয়তা পেয়েছিলেন।

বিকল্প ধারার চলচ্চিত্র নিমার্তা মোরশেদুল ইসলাম মনে করেন, রাজ্জাক সুযোগ পেয়ে সেটাকে যথাযতভাবে কাজে লাগিয়েছেন।

“রাজ্জাক বিভিন্ন ধরনের চরিত্রে অভিনয় করেছেন। কখনও একটা গন্ডির মধ্যে নিজেকে আবদ্ধ রাখেননি। তিনি যেমন নীল আকাশের নীচে, ময়নামতি, অবুঝ মন বা আবির্ভাবের মতো একের পর এক রোমান্টিক ছবিতে কাজ করেছেন। একইসাথে একেবারে অন্য ধরনের ছবি যেমন জীবন থেকে নেয়া, আলোর মিছিলের মতো একটু রাজনৈতিক ছবিতে তিনি অভিনয় করেছেন।”

“পুরোপুরি ভিন্ন ট্র্যাকের অশিক্ষিত বা ছুটির ঘন্টাসহ সামাজিক বা বক্তব্যধর্মী ছবিতে কাজ করেছেন। আবার রংবাজ ছবিতে খলনায়ক চরিত্রে অভিনয় করেছেন। যে ছবিটি ছিল বাংলাদেশের চলচ্চিত্রের টার্নিং পয়েন্ট” বলছিলেন মোরশেদুল ইসলাম।

‘রংবাজ’ দিয়েই রোমান্টিক নায়ক রাজ্জাক নিজেকে একেবারে ভিন্নভাবে উপস্থাপন করে বাংলাদেশে অ্যাকশনধর্মী সিনেমার সূচনা ঘটিয়েছিলেন সেই ১৯৭৩ সালে।

রাজ্জাক, সুচন্দা, শবনম, কবরী, ববিতা এবং শাবানাসহ তখনকার অনেক অভিনেত্রীকে নিয়ে একের পর এক সিনেমায় অভিনয় করেছেন এবং সব সিনেমাই ব্যবসা সফল হয়েছে।

এর মধ্যে রাজ্জাক-কবরী জুটি ব্যাপক জনপ্রিয় হয়েছিল। সুভাষ দত্ত পরিচালিত ‘আবির্ভাব’ সিনেমার মাধ্যমে রাজ্জাক-কবরী জুটির শুরু হয়েছিল। এই জুটি নীল আকাশের নীচে, রংবাজসহ বেশ কিছু ছবি উপহার দেয়।

কবরী মনে করেন, নায়ক রাজ্জাক বিভিন্ন ধরনের চরিত্রে অভিনয়ের ভাল সুযোগ যেমন পেয়েছেন। একইসাথে সে সময় তাদের পেশাদারিত্ব এবং সিনেমা জগতে শক্ত টিমওয়ার্কের বিষয়কে অন্যতম তিনি শক্তি হিসেবে দেখতে চান।

“আমাদের পেশাদারিত্বের বিষয়কে আমরা অত্যন্ত সম্মান করতাম। আমরা কাজটাকে নামাযের মতো কিংবা পূজার মতো ভক্তি করতাম।আর আমাদের সিনেমা জগত তখন একটা পরিবারের মতো ছিল। এগুলো একজনের বড় হওয়ার পিছনে একটা শক্তি হিসেবে কাজ করেছে।”

একইসাথে কবরী মনে করেন, রাজ্জাকের ভাগ্যও কাজ করেছে। কারণ অনেক মেধাবী এবং সৃষ্টিশীল পরিচালকের সাথে রাজ্জাক কাজ করার সুযোগ পেয়েছিলেন। তিনি উল্লেখ করেছেন, সুযোগ না পেয়ে সিনেমা জগতেই অনেক মেধাবী হারিয়ে গেছে।

তবে সুযোগ এবং অন্যদের সহযোগিতার পাশাপাশি নিজের চেষ্টা এবং পরিশ্রম যেমন প্রয়োজন। তেমনি মেধার বিষয়কেও গুরুত্ব দিতে চান বাণিজ্যিক ছবির পরিচালক এবং প্রযোজক গাজী মাজহারুল আনোয়ার।

“রাজ্জাককে নিয়ে ১৮টি ছবি করেছি। প্রতিটি ছবির ক্ষেত্রেই মনে হয়েছে, রাজ্জাক যেন চলচ্চিত্রে নতুন এসেছেন। নতুন করে শিখছেন। এছাড়া যেহেতু শুরুটা চিল খুব কষ্টের। সেটা রাজ্জাক সবসময় মনে রাখতেন। এসব গুণ তাঁকে শীর্ষে নিয়ে গেছে।”

‘ঢাকা ৮৬’ এবং ‘চাপা ডাঙার বউস’হ বেশ কয়েকটি সিনেমাও পরিচালনা করেছেন রাজ্জাক।

যদিও অনেকে মনে করেন, সে সময় হাতে গোনা কয়েকজন সিনেমায় কাজ করতেন। ফলে কোন প্রতিযোগিতা না থাকায় এক ধরণের ফাঁকা মাঠে রাজ্জাক একটা অবস্থান করেছেন।

কিন্তু রাজ্জাকের সমসাময়িক নায়ক আলমগীর শক্তিমান অভিনেতা হিসেবে এসেবে এসেছিলেন।

তারপর জাফর ইকবাল, বুলবুল আহমেদ, সোহেল রানা নামে পরিচিত মাসুদ পারভেজ এবং ফারুকসহ অনেকে এসেছেন।

সবার মাঝে রাজ্জাকের স্বকীয়তা ছিল বলে তিনি জনপ্র্রয়িতার শীর্ষেই থেকেছেন। এটা বিরল বলে মনে করেন মোরশেদুল ইসলাম।

“রাজ্জাকের সমসাময়িক অন্যরাও ভাল করেছেন।কিন্তু তাঁরা কেউ রাজ্জাকের জনপ্র্রিয়তার কাছে যেতে পারেননি। আর এখনকার জনপ্রিয় নায়ক হিসেবে যদি সাকিব খানের কথা বলি। এসব জনপ্রিয়তা সাময়িক।

কিন্তু রাজ্জাকের জনপ্রিয়তা দীর্ঘ সময়ের। তাঁর মৃত্যুর পর সাধারণ মানুষের ঢলে সেটা দেখা গেছে। সুতরাং তিনি কালোত্তীর্ণ হতে পেরেছেন”- বলেন মোরশেদুল ইসলাম।

মি: ইসলাম যেমনটা বলছিলেন যে রাজ্জাকের পরে অনেকেই জনপ্রিয়তা পেয়েছেন, কিন্তু সেটা কালোত্তীর্ণ হতে পারেনি।

অনেকে মনে করেন, রাজ্জাকের অনেক পরে সালমান শাহ একটা ভিন্ন ধরনের ক্রেজ বা নিজের একটা বাজার তৈরি করতে পেরেছিলেন। অবশ্য অল্প বয়সেই তাঁর মৃত্যু হয়।

টেলিভিশন ব্যক্তিত্ব ফরিদুর রেজা সাগর মনে করেন, রাজ্জাক যে সময়কে উত্তীর্ণ করতে পেরেছেন, সে ধরনের অভিনেতা সব সময় পাওয়া মুশকিল।

“মহানায়ক, নায়ক রাজ এরা কিন্তু ক্ষণজন্মা হয়। আবার কত বছর পর আমরা আরেকজন নায়ক রাজ পাবো সেটা কিন্তু আমরা জানি না।

যারা আলাদা নায়ক আছেন, তারা প্রত্যেকে নিজের নিজের ভূমিকায় অনেক উজ্জ্বল। কিন্তু একজনতো মাথার মুকুট থাকেন। রাজ্জাক ভাই সেরকম মাথার মুকুট ছিলেন” বলেন ফরিদুর রেজা সাগর।

রাজ্জাক যে রাজ্জাক হয়ে ওঠেন, সেটি শুধু তাঁর ব্যক্তিগত পাওয়াই নয়। বাংলাদেশের সিনেমায় তাঁর একটা প্রভাব তৈরি হয়।

আর তাঁর অনুপস্থিতিতে সিনেমায় শূন্যতা তৈরি হয়েছে বলে দর্শকরা যেমন মনে করেন। এর সাথে জড়িতদেরও অনেকে একইভাবে ভাবছেন।

গাজী মাজহারুল আনোয়ার বলছিলেন, এই শূন্যতা হয়তো পূরণ হবে , কিন্তু এই শূন্যতা পূরণে অনেক সময় নেবে।

তবে ভিন্ন বক্তব্যও আছে। রাজ্জাক এবং তাঁর সময়ের নায়ক বা অভিনেতারা বেশ কয়েক বছর ধরে চলচ্চিত্রের সাথে সক্রিয়ভাবে জড়িত ছিলেন না।

তারা হয়তো মাঝে মধ্যে কাজ করেছেন ।ফলে রাজ্জাকের প্রস্থানে একটা শূন্যতা হলেও কাজ থেমে নেই বলে মনে করেন সোহেল রানা নামে পরিচিত অভিনেতা মাসুদ পারভেজ।

“আমরা কয়েকজন গত চার পাঁচ বছর ধরেতো চলচ্চিত্র জগতেই নেই। রাজ্জাক সাহেব কী গত পাঁচ বছরে কোনো ছবি করেছেন? হয়তো দু’একটা ছবি করেছেন। আমি একটা করেছি।

কাজেই কোনো চলতি জিনিস যখন হঠাৎ করে বন্ধ হয়ে যায়, তখন শূন্যতা হয়। সিনেমা জগতেতো তেমন হঠাৎ করে কিছু হয়নি। আমরাতো অনেক আগে থেকেই সক্রিয় নেই। ফলে শূন্যতা হয়নি। এখনও নতুন অনেক মেধাবী নায়ক নায়িকা কাজ করছে” বলছিলেন অভিনেতা মাসুদ পারভেজ।

কাজ থেমে নেই । নতুন নতুন নায়ক বা অভিনেতারা আসছেন।

কিন্তু সিনেমা এখন দর্শক টানতে পারছে না এবং কোন অভিনেতার নামে একের পর এক সিনেমা দর্শক প্রিয়তা পাচ্ছে, সেটা বলা যায় না।

কবরী বলেছেন, এখন বিনোদনের অনেক মাধ্যম এসেছে, সে কারণে বাণিজ্য সফল সিনেমা হওয়া বা বড় মাপের অভিনেতা তৈরি হচ্ছে না বলে তিনি মনে করেন।

“আজকে ছবির জগতটা কিন্তু অনেক দূরে সরে গেছে। আমাদের সময়ে ক্যারিশম্যাটিক বিষয়টা কিন্তু এখন নেই। তখন বিনোদনের অন্য মাধ্যম না থাকায় সব পরিবারে সিনেমাই ছিল বিনোদনের কেন্দ্র। এছাড়া যারা নতুন এসেছে তারাও সিনেমার অবস্থানকে ধরে রাখতে পারেনি। আর আমরাতো কাজ করিই না।”

এখন মানুষের সামনে বিনোদনের অনেক ক্ষেত্র যেমন তৈরি হয়েছে। পুরোনো অভিনেতাদের মতো একনিষ্ঠতা বা চেষ্টার অভাবের কথাও উঠছে।

সব মিলিয়ে চলচ্চিত্র শিল্প একটা অস্থির সময় পার করছে। আর এমন প্রেক্ষাপটে নতুন কোন অভিনেতা শূন্যতা পূরণ করে নায়ক রাজ্জাককে ছাপিয়ে যেতে পারবেন, এ নিয়ে সিনেমার সাথে জড়িতদেরই অনেকের সন্দেহ রয়েছে।

Editor in Chief : Sayed Shakil
Office: Evan plaza, sador model thana road, cox’sbazar-4700. Email: dailycoxsbazar@gmail.com / phone: 01819099070
অনুমতি ছাড়া অথবা তথ্যসূত্র উল্লেখ না করে এই ওয়েব সাইট-এর কোন অংশ, লেখা বা ছবি নকল করা বা অন্য কোথাও প্রকাশ করা বেআইনী