সংবাদ শিরোনাম

ওপারে এখনো জ্বলছে আগুন ধাপে ধাপে দালাল, ঝুঁকিতে দুই লাখ শিশু

রোহিঙ্গা নিধনের আগুন এখনো জ্বলছে মিয়ানমারে। দেশটির সেনাবাহিনী গতকালও রাখাইন রাজ্যের মংডু এলাকার গর্জনদিয়া, সারাপাড়া, বড়ডেইল ও খোনকারপাড়া গ্রামে আগুন জ্বালিয়ে দেয়।

একই সঙ্গে হেলিকপ্টার থেকে দাহ্য পদার্থ ছড়িয়ে দেওয়া হয়। অবশ্য ওই পারে অঝরধারায় বৃষ্টি নামায় আগুন বেশিক্ষণ স্থায়ী হয়নি। মিয়ানমার বাহিনী যখন আগুন দেয় তখন বসতবাড়ি ছেড়ে পালিয়ে আসা রোহিঙ্গারা টেকনাফের শাহপরীর দ্বীপ থেকে নির্বাকদৃষ্টিতে নিজেদের বাড়িঘর পোড়ার দৃশ্য দেখেন। এ সময় অনেকেরই চোখে পানি আসতে দেখা যায়। মিয়ানমার থেকে কোনোমতে জীবন বাঁচিয়ে যখন রোহিঙ্গারা বাংলাদেশে অনুপ্রবেশ করছেন, তখন এখানেও দালালদের খপ্পরে পড়ে সর্বস্বান্ত হচ্ছেন অনেকেই। হুমকি-ধমকি ও পদে পদে প্রতারণার শিকার হচ্ছেন তারা। নো ম্যানস ল্যান্ড ও মিয়ানমারের ওপার থেকে এখনো প্রায় চার লাখ লোক ফেরার অপেক্ষায় প্রহর গুনছে বলে বাংলাদেশে অনুপ্রবেশ করা রোহিঙ্গাদের সঙ্গে আলাপ করে জানা গেছে। জোলেখা বেগম। মধ্যবয়সী এক রোহিঙ্গা নারী। গত ছয় দিন তিনি মিয়ানমারের শেষ প্রান্তের নাইক্যান দ্বীপে আটকে ছিলেন। মিয়ানমারের সামরিক জান্তাদের হাত থেকে প্রাণ বাঁচাতে রাছিদংয়ের রাজার বিল পাড়ি দিয়ে স্বামী আবদুস শুক্কুর পরিবাবের আট সদস্যকে নিয়ে এক কাপড়ে বেরিয়ে আসেন। প্রায় ৪০ কিলোমিটার পথ পাড়ি দিয়ে মিয়ানমারের ওই দ্বীপে আসতে সক্ষম হন তিনি। তাদের বাড়িঘরও জ্বালিয়ে দেওয়া হয়েছে। দ্বীপে কোনোমতে আসতে পারলেও অনুপ্রবেশ করতে পারছিলেন না বাংলাদেশে। কারণ তার হাতে নগদ কোনো টাকা ছিল না। শেষ পর্যন্ত জোলেখার শেষ সম্বল সোনার কানের দুলের বিনিময়ে গতকাল শাহপরীর দ্বীপে আনতে রাজি হন সালাম মাঝি।

শুধু জোলেখা বেগমই নন, তার মতো হাজার হাজার নারী-পুরুষ অর্থাভাবে নাইক্যান দ্বীপে আটকে রয়েছেন। পাঁচ থেকে দশ হাজার টাকার বিনিময়ে রোহিঙ্গা পারাপার করছেন নাফ নদের মাঝিরা। তাদের হাতে এখন জিম্মি রোহিঙ্গারা। এর বাইরেও রোহিঙ্গাদের ঘাটে ঘাটে প্রতারিত হতে হয়। প্রাণ নিয়ে কোনোমতে বেঁচে আসা সর্বশেষ সম্বলটুকুও লুট করে নিয়ে যায় দালালরা। ওই দ্বীপ থেকে আসা কয়েকজন রোহিঙ্গা গতকাল বাংলাদেশ প্রতিদিনকে জানান, আরও অন্তত ৫০ হাজার রোহিঙ্গা নাইক্যান দ্বীপে খোলা আকাশের নিচে আটকে রয়েছেন। বাংলাদেশে অনুপ্রবেশের অপেক্ষায় তারা। সেখানে তারা খুবই দুর্বিষহ জীবন কাটাচ্ছেন। না খেয়ে, না ঘুমিয়ে খোলা আকাশের নিচে বৃষ্টিতে ভিজতে হচ্ছে তাদের। এদিকে শাহপরীর দ্বীপের ঠিক উল্টোপাশে গর্জনদিয়া নামের একটি পাড়ার বাসিন্দা সালিমুল ইসলাম গতকাল দেখছিলেন নিজের এবং স্বজনদের বাড়িঘর পোড়ার দৃশ্য। মংডুর গর্জনদিয়া গ্রামের বাসিন্দা করিমুদ্দিন ও আবদুল খালেকের মধ্যে দেখা হয় শাহপরীর দ্বীপের জেটিতে। নিজের বাড়ি পোড়ানোর দৃশ্য দেখছিলেন তারা। কান্নাজড়িত কণ্ঠে তারা জানান, মুহূর্তেই তাদের সবকিছু শেষ করে দেওয়া হয়েছে। এখন তারা একেবারেই নিঃস্ব। জানা গেছে, শাহপরীর দ্বীপ থেকে নাইক্যান দ্বীপে রাতে ও দিনে অনেক বাংলাদেশি মাঝি ছোট ছোট ইঞ্জিন নৌকা যাচ্ছে রোহিঙ্গাদের আনার জন্য। কিন্তু আবদুস শুক্কুরদের মতো অনেক রোহিঙ্গা নিঃস্ব হয়ে এপারে আসার অপেক্ষায় থাকলেও আসতে পারছে না কেউই। কারণ প্রতিজন রোহিঙ্গাকে শাহপরীর দ্বীপে নিয়ে আসতে নৌকার মাঝিরা নিয়ে নিচ্ছে পাঁচ থেকে দশ হাজার টাকা। অবশ্য আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর কাছে এ ধরনের অভিযোগ আসার পর টাকার অঙ্ক কিছুটা কমে গেছে। এমন নির্মম অভিযোগে বেশ কয়েকজন মাঝির নৌকাও ভেঙে দেওয়া হয়েছে। শুধু জোলেখার পরিবার নয়, তাদের মতো মিয়ানমারের নলবনিয়ার নোয়াপাড়ার ৬০ বছরের রমিজা খাতুন, কুইন্যাপাড়ার করিম উল্লাহ (৬৫), মেরুল্যা পুবপাড়ার নূর ছালামসহ (৬০) অসংখ্য অসহায় রোহিঙ্গা এভাবে প্রতারিত হয়েছেন। যেখানে বাংলাদেশের সরকার ও সাধারণ মানুষ দুর্দশাগ্রস্তদের পাশে দাঁড়িয়েছে, সেখানে কিছু দালাল ও নৌকার মাঝিদের হাতে এখনো রোহিঙ্গারা জিম্মি। প্রাণভয়ে পালিয়ে আসা রোহিঙ্গারা জিম্মিদশা থেকে মুক্তি চান।

সরেজমিনে গিয়ে এর উল্টোটিও চোখে পড়েছে। উখিয়ার মূল শরণার্থী ক্যাম্পে প্রধানমন্ত্রী পরিদর্শনে আসায় গতকাল ত্রাণ দিতে পারেনি বেসরকারি কোনো সংস্থা। কিন্তু শাহপরীর দ্বীপে নতুন আসা রোহিঙ্গাদের মধ্যে একাধিক সংগঠন নগদ টাকা, খাবার, পানি ও নতুন কাপড় দিয়ে অকাতরে সহযোগিতা করে যাচ্ছে। ব্যক্তিগত উদ্যোগেও অনেককে অসহায় রোহিঙ্গাদের সহযোগিতা করতে দেখা গেছে। জাতিসংঘের বিশ্ব খাদ্য সংস্থার ত্রাণ সহায়তাও দিচ্ছে মুক্তি নামে একটি এনজিও। সেখানে প্রতিটি নারী ও পুরুষ প্রত্যেকেই ২৫ কেজি করে চাল পাচ্ছেন। পালিয়ে আসা রোহিঙ্গাদের সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে, মিয়ানমারে সেনাবাহিনী, বর্ডার গার্ড পুলিশ ও উগ্র বৌদ্ধদের নির্যাতনের শিকার হয়ে প্রাণ বাঁচাতে বাংলাদেশে অনুপ্রবেশকারী রোহিঙ্গারা প্রতারিত হচ্ছেন ঘাটে ঘাটে। সহায়সম্বল ও স্বজনদের হারিয়ে প্রাণের ঝুঁকি নিয়ে এপারে আসার জন্য মঙ্গলবার বেলা ২টা পর্যন্ত কেবল মিয়ানমারের নাইক্যান দ্বীপেই অপেক্ষা করছে অর্ধলক্ষাধিক রোহিঙ্গা। সেখান থেকে নৌকাযোগে শাহপরীর দ্বীপের ব্রিজঘাটে আসতে জনপ্রতি দুই থেকে পাঁচ হাজার টাকা হাতিয়ে নিচ্ছে একটি সংঘবদ্ধ চক্র। ব্রিজঘাট থেকে পায়ে হেঁটে শাহপরীর দ্বীপের মাঝের ঘাট আসার পর আবারও নৌকাযোগে হারিয়েখালী আসতে দিতে হচ্ছে মাথাপিছু ৫০ থেকে ১০০ টাকা। সেখান থেকে টেকনাফ হয়ে কুতুপালং ও বালুখালীসহ শরণার্থী ক্যাম্পে পৌঁছে দিতে তারা নিচ্ছে মাথাপিছু ৫০০ থেকে এক হাজার টাকা। এভাবে পদে পদে নির্যাতিত রোহিঙ্গারা এপারে এসে দালাল চক্রের হাতে প্রতারিত হচ্ছে। শাহপরীর দ্বীপের হারিয়েখালী ঘাটে কথা হয় বৃদ্ধা রমিজা খাতুনের সঙ্গে। তার ডান হাত তখন কাপড়ে মোড়ানো ও বাঁশের কঞ্চি দিয়ে বাঁধা। ব্যথায় কাতরাতে কাতরাতে কাদামাখা দীর্ঘ পথ ধরে তবু হাঁটতে হচ্ছে তাকে। হাতে কী হয়েছে—জানতে চাইলে ছলছল চোখে বলেন, ‘সোমবার তাদের বাড়িঘরে মিয়ানমারের মিলিটারিরা আগুন লাগিয়ে দিলে ঘর থেকে পালিয়ে বেরোনোর সময় এক মিলিটারি লাটির আঘাতে তার ডান হাতের কনুই ভেঙে দেয়। ’ নাইক্যান দ্বীপ থেকে এপারে আসতে কত টাকা দিতে হয়েছে—প্রশ্ন করলে তিনি বলেন, দুই ছেলেসহ তিনজনের জন্য বার্মিজ টাকায় ৫০ হাজার টাকা দিতে হয়েছে। এদিকে মিয়ানমার থেকে আসা নতুন শরণার্থীর সংখ্যা প্রায় তিন লাখ ৭০ হাজার বলে ধারণা করা হচ্ছে। ইউনিসেফ জানিয়েছে, অন্তত দুই লাখ শিশু ঝুঁকির মুখে রয়েছে।

 

Editor- Sayed Mohammad SHAKIL.
Office: Evan plaza, sador model thana road, cox’sbazar-4700. Email: dailycoxsbazar@gmail.com / phone: 01819099070
অনুমতি ছাড়া অথবা তথ্যসূত্র উল্লেখ না করে এই ওয়েব সাইট-এর কোন অংশ, লেখা বা ছবি নকল করা বা অন্য কোথাও প্রকাশ করা বেআইনী