সংবাদ শিরোনাম

রোহিঙ্গা : শৃংখলায় ফেরাতে প্রশাসনের হিমশিম

রশিদা বেগম (২৮), ৬ সন্তানের জননী। এক সপ্তাহের পূর্বে মিয়ানমারের দুর্গম রাচিডং এলাকার শিলখালী গ্রাম থেকে ১২দিন পায়ে হেঁটে পাহাড়, জঙ্গল, কাদা মাড়িয়ে বাংলাদেশে পালিয়ে এসে কোন রকমে জান বাঁচাতে পেরেছে। স্বামী হাবিব উল্লাহ (৩২)কে সেনাবাহিনীর লোকজন ঘর থেকে বের করে চোখের সামনে গুলি করে হত্যা করে। ৬ ছেলে মেয়ের মধ্যে একেবারে বড় ছেলে হামিদের বয়স ১০। ছোটটি মাত্র ৩ মাসের বয়সী। স্বামী হারিয়ে প্রতিবেশীদের সাথে নিজের ও বুকের ধন ছয় ছেলে মেয়ে জীবন বাঁচাতে পালিয়ে বাংলাদেশে এসে নিজেকে খুবই নিরাপদ মনে করছে রশিদা বেগম।
গতকাল রোববার বিকেল সাড়ে চারটার দিকে উখিয়া টিভি রিলে কেন্দ্রের সামনে ব্যক্তি মালিকানাধীন একটি রাবার বাগানে শত শত রোহিঙ্গাদের সাথে সেইও সেখানে আশ্রয় নিয়েছে। তিন হাত প্রস্থ ও পাঁচ হাত দৈর্ঘ্যরে ছোট একটি খুপড়িতে বৃদ্ধমা, ছেলে মেয়েদের নিয়ে বসে রয়েছে। বাগানের রাস্তার ধারে তার বসতি। রাস্তা দিয়ে যে কোন লোক দেখেই রশিদা বেগম হাত পেতে থাকে খাবারের জন্য। কিন্তু খাবার মিলছে না। তার সাথে কথা বলে জানা গেল এ ছোট্ট খুপড়িতে মা সহ আট জনের বসবাস। গত এক সপ্তাহ ধরে এখানে এসে আশ্রয় নিলেও কোন ত্রান সহযোগীতা পাওয়া যাচ্ছে না। কারন তাদের সাথে কোন পুরুষ বা মোটামোটি উপযুক্ত কোন ছেলে নেই। যাদের ঘরে পুরুষ লোক রয়েছে তারা হুড়ো হুড়ি করে রাস্তার ধারে ত্রান বিতরন করতে আসা লোক জনের কাজ থেকে একাধিক ত্রান নিতে পারছে। এধরনের শত শত রশিদা নানা সংকটের মধ্যে দিন কাটাতে দেখা গেছে।
রশিদার অবস্থা জানতে চাইলে কান্নায় ভেঙ্গে পড়ে সে কিছু খাবার চায়। সাথে তার বৃদ্ধ মা এলেম বাহার (৬০) ও ছোট ছোট শিশুরা মায়ের কান্না দেখে সকলেই এক সাথে কান্নার রোল ফেলে দেয়। জানতে চাইলে রশিদা খাতুনের মত রাবার বাগানে আশ্রয় নেয়া শত শত রোহিঙ্গা পরিবার জানালো এপর্যন্ত বিশ্ব খাদ্য কর্মসূচি বা সরকারী, অন্যান্য এনজিওর প্রদত্ত কোন ত্রান সামগ্রীর টোকেন তারা পায়নি। স্থানীয় প্রশাসনের সাথে যোগাযোগ করে জানা যায় এখানে অস্থায়ী ভাবে আশ্রয় নেয়া রোহিঙ্গারা সরকার নির্ধারিত কুতুপালং ও বালুখালী শরনার্থী শিবির সংলগ্ন স্থানে সরে না যাওয়া পর্যন্ত সরকারী ভাবে নিয়ন্ত্রিত কোন ত্রান সুবিধা এদের দেওয়া হবে না। এসব রোহিঙ্গাদের প্রায় সকলে স্থান ও পথ ঘাট না চেনায় নির্ধারিত স্থান কোথায় তা জানা না থাকায় সেখানে যেতে পারছে না বলে জানা গেছে। গত দুই দিন ধরে রাবার বাগানে আশ্রয় নেয়া রোহিঙ্গাদের নিজ উদ্যেগে সরিয়ে নির্ধারিত ক্যাম্পে যাওয়ার জন্য প্রশাসনের পক্ষ থেকে বলা হয়েছে। কিন্তু নানা কারনে তারা সেখানে যায়নি।
প্রায় এক ঘন্টা পর গতকাল বিকেল সাড়ে পাঁচটার দিকে আবার রশিদা খাতুনের খুপড়ির কাছে গেলে সেখানে রশিদা খাতুনদের আশ্রয় নেয়া খুপড়িটি আর দেখা যায়নি। কারন এসময়ের মধ্যে সরকারের ম্যাজিষ্ট্রেট, পুলিশ, বিজিবি, আনসার, গ্রাম পুলিশ সহ স্থানীয় প্রশাসন এসব রোহিঙ্গাদের ব্যক্তি মালিকানাধীন রাবার বাগান থেকে উচ্ছেদ করে দেওয়া হচ্ছে। উক্ত রাবার বাগানে আশ্রয় নেয়া রোহিঙ্গারা প্রশাসনের নিকট বার বার কাকুতি মিনতি করে জানাচ্ছে অন্তত পক্ষে আজকের (রোববার) রাতটা এখানে থাকতে দেওয়া হউক। কাল সকালে তারা নিজ উদ্যেগে স্থানীয় পুরাতন রোহিঙ্গাদের সাথে যোগাযোগ করে সরকার নির্ধারিত স্থানে চলে যাবে। কিন্তু প্রশাসনের লোকজন তাদের কোন কথা শুনেনি।
তা ছাড়া শনিবার মধ্যরাত থেকে বঙ্গোপসাগরে সৃষ্ট নি¤œ চাপের কারনে গুড়ি থেকে হালকা, মাঝারি ধরনের ঝড় বৃষ্টি হচ্ছে। এতে খাদ্য, পানি ও চিকিৎসা সংকটে থাকা অসংখ্য রোহিঙ্গাদের দুর্ভোগ নেমে আসতে দেখা গেছে। অনেক রোহিঙ্গা নারী ও শিশুদের রাস্তার দু’পাশে দাড়িয়ে বৃষ্টিতে ভিজে কাদায় দাড়িয়ে থেকে ত্রানের অপেক্ষা ও ভিক্ষা করতে দেখা গেছে। এসব নারী ও শিশুদের খুব কাতর দেখাচ্ছিল। তবে গতকাল রোববার বিকেল থেকে বৃষ্টি কমে এসেছে। এরপরও গত এক সপ্তাহ ধরে সাময়ীক ভাবে রাবার বাগানে আশ্রয় নেয়া অন্তত ৫/৭ হাজার রোহিঙ্গাদের খুপড়ি ভেঙ্গে দেওয়ায় তারা পড়েছে চরম দুর্ভোগে। রাবার বাগানে রোহিঙ্গা বস্তি উচ্ছেদে দায়িত্ব পালনকালে বান্দবান জেলা প্রশাসনের নির্বাহী ম্যাজিষ্ট্রেট মোঃ আজিজুর রহমান জানান সরকারের সিদ্ধান্ত অনুযায়ী বান্দরবান জেলায় কোন রোহিঙ্গা আশ্রয় দেওয়া হবে না।
তা ছাড়া কক্সবাজার-উখিয়া-টেকনাফ সড়ক সংলগ্ন হওয়ায় এসব রোহিঙ্গাদের অধিকাংশ ত্রানের আসায় অহেতুক রাস্তায় ভীড় করে। এতে নানা ধরনের দুর্ঘটনা ঘটছে। তা ছাড়া সরকারের নির্ধারিত স্থানের বাহিরে ছড়িয়ে ছিটিয়ে থাকা রোহিঙ্গাদের সরকার নিয়ন্ত্রিত কোন ধরনের ত্রান ও অন্যান্য সুবিধা প্রদান করা হবে না। অন্যদিকে গতকাল রোববার থেকে সরকারের উচ্চ পর্যায়ে নির্দেশে কক্সবাজার জেলা ও উখিয়া, টেকনাফ উপজেলা প্রশাসনের তদারকি জোরদার করা হয়েছে। উখিয়ার কুতুপালং থেকে টেকনাফ পর্যন্ত সড়কের দু’পাশ থেকে ছড়িয়ে থাকা রোহিঙ্গাদের নির্ধারিত স্থানে সরিয়ে নেয়া, পূর্বে ন্যায় যত্রতত্র যখন তখন রোহিঙ্গাদের মাঝে যে কেউ ত্রান বিতরন নিয়ন্ত্রন করা, যানজট নিরসন সহ বিভিন্ন পদক্ষেপ নিতে দেখা গেছে। কক্সবাজার ও বান্দরবানের জেলা প্রশাসনের নেতৃত্বে উখিয়া, টেকনাফ ও নাইক্ষ্যংছড়িতে একাধিক নির্বাহী ম্যাজিষ্ট্রেট পুলিশ, বিজিবি, আনসার সহ বিভিন্ন স্থানে দায়িত্ব পালন করতে দেখা গেছে। উখিয়া গুচ্ছ গ্রাম এলাকায় স্থাপিত অস্থায়ী ত্রান নিয়ন্ত্রন পক্ষে রোহিঙ্গাদের জন্য বিভিন্ন ব্যক্তি, প্রতিষ্ঠান, সংস্থা, সংগঠনের ব্যানারে আনা বিভিন্ন প্রকারের ত্রান সামগ্রী বিতরন কঠোর ভাবে নিয়ন্ত্রন করতে দেখা গেছে।
গতকাল পূর্বের দিনগুলির মত বিচ্ছিন্ন ভাবে সড়কের উপর দাড়িয়ে যত্রতত্র রোহিঙ্গাদের মাঝে ত্রান বিতরন কার্যক্রম অনেকটা নিয়ন্ত্রনে আসতে দেখা গেছে।
সরকার নির্ধারিত উখিয়ার কুতুপালংয়ে দুইটি, বালুখালীতে দুইটি, তাজনিমার খোলায় একটি ও হাকিম পাড়া এলাকায় ১টি ত্রান বিতরন পয়েন্টে স্থানীয় প্রশাসনের প্রতিনিধিদের উপস্থিতিতে ত্রান বিতরন কার্যক্রম চালাতে দেখা গেছে। এতে অনেকটা শৃংখলা ফিরিয়ে আসলেও কিছু কিছু ব্যক্তি পর্যায়ের ত্রান বিতরনকারীদের অতি উৎসাহী হয়ে সড়কের বিভিন্ন স্থানে প্রশাসনের আড়ালে বিভিন্ন প্রকারের ত্রান ও নগদ টাকা বিতরন করতে দেখা গেছে। এতে সড়কের কিছু কিছু ত্রান বিতরন কালে যানজটের সৃষ্টি হতে দেখা যায়। তবে পূর্বের দিনগুলো মত উখিয়া থেকে টেকনাফ সড়কে গতকাল তেমন যানজট ও জন জট চোখে পড়েনি। উখিয়া উপজেলা নির্বাহী অফিসার মোঃ মাঈন উদ্দিন বলেন, সড়কের দু’পাশে বিপুল সংখ্যক অতিরিক্ত লোক আশ্রয় নেয়ায় এবং তাদের নির্ধারিত স্থানে আবাসন নির্মানের প্রক্রিয়া চলমান থাকার পরও নানা সীমাবদ্ধতার কারনে সব কিছুতে শৃংখলা ফিরিয়ে আনতে একটু সময় লাগবে।

Editor- Sayed Mohammad SHAKIL.
Office: Evan plaza, sador model thana road, cox’sbazar-4700. Email: dailycoxsbazar@gmail.com / phone: 01819099070
অনুমতি ছাড়া অথবা তথ্যসূত্র উল্লেখ না করে এই ওয়েব সাইট-এর কোন অংশ, লেখা বা ছবি নকল করা বা অন্য কোথাও প্রকাশ করা বেআইনী