সংবাদ শিরোনাম

শরণার্থী ব্যবস্থাপনায় প্রয়োজন সুষ্ঠু সমন্বয়

প্রাণ বাঁচাতে মিয়ানমার থেকে পালিয়ে আসা রোহিঙ্গাদের আশ্রয় দিতে গিয়ে হিমশিম খেতে হচ্ছে বাংলাদেশকে। স্থান সংকুলান ও ত্রাণ বিতরণসহ এসব শরণার্থী রাখতে গিয়ে দম বন্ধ অবস্থা সরকারের স্থানীয় মাঠ প্রশাসন ও স্বেচ্ছাসেবীদের। বিশেষ করে এসব শরণার্থীর জন্য এখনো নিয়ন্ত্রিত আশ্রয়স্থল ও তাদের নিবন্ধিত করতে না পারায় ত্রাণ বিতরণে কিছুটা বিশৃঙ্খলা দেখা দিয়েছে। ত্রাণ সংকট না থাকলেও বিতরণ ব্যবস্থাপনার অভাবে ত্রাণ পাচ্ছে না অনেক শরণার্থী। স্থায়ী ক্যাম্প না হওয়ায় এবং বিদ্যমান ক্যাম্পগুলোতে স্থান সংকুলানের অভাবে শরণার্থীরা কক্সবাজার, চট্টগ্রাম, বান্দরবান ও রাজধানীসহ দেশের বিভিন্ন স্থানে ছড়িয়ে পড়ছে। ঝুঁকির মুখে পড়ছে অভ্যন্তরীণ নিরাপত্তা।

অন্যদিকে, অস্থায়ী আশ্রয়স্থলে শরণার্থীদের রাখা ও তাদের মধ্যে ত্রাণ বিতরণের ক্ষেত্রে সরকারি নির্দেশনা মানছেন না অনেকেই। শরণার্থী ব্যবস্থাপনার সঙ্গে যুক্ত মাঠ প্রশাসনের সরকারি কর্মকর্তা ও এনজিওগুলোর মধ্যে কাজের সমন্বয়ের অভাব দেখা দিচ্ছে। ত্রাণ নিয়ে অনিয়মের আশঙ্কাও দেখা দিয়েছে। ত্রাণ বিতরণের নামে ক্যাম্পগুলোতে পরিলক্ষিত হচ্ছে সন্দেহভাজন লোকজনের আনাগোনা। শরণার্থী পারাপার থেকে শুরু করে ক্যাম্প পর্যন্ত পৌঁছতে গিয়ে একশ্রেণির অসাধু চক্র তৎপর বলে জানা গেছে।

এমন অবস্থায় শরণার্থী ব্যবস্থাপনায় স্থানীয় মাঠ প্রশাসনকে সতর্ক ও সমন্বিতভাবে কাজ করার পরামর্শ দিয়েছেন বিশেষজ্ঞরা। তাদের মতে, এখন পর্যন্ত শরণার্থী ব্যবস্থাপনায় বড় ধরনের অনিয়ম বা বিশৃঙ্খলা পরিলক্ষিত হয়নি। এমন মানবিক দুর্যোগ বাংলাদেশে এই প্রথম হওয়ায় পরিস্থিতি সামাল দিতে কিছুটা সময় লাগবে। এর জন্য কারোরই পূর্ব দক্ষতা ও প্রশিক্ষণ নেই। তবে সমন্বিত উদ্যোগ থাকলে পরিস্থিতি সামাল দেওয়া বাংলাদেশের পক্ষে সম্ভব।

বিশেষজ্ঞরা এ কথাও বলছেন, এ মুহূর্তে ত্রাণের কোনো সংকট নেই। বিদেশ থেকে প্রচুর ত্রাণ আসছে। দেশের মানুষও অভূতপূর্ব সাড়া দিয়েছে। আশা করছি, আশ্রয়স্থলেরও অভাব হবে না। এখন প্রয়োজন সুষ্ঠুভাবে ও সততার সঙ্গে ত্রাণ বিতরণসহ সার্বিক শরণার্থী ব্যবস্থাপনা চালিয়ে যাওয়া।

এ নিয়ে আশাবাদী শরণার্থী ব্যবস্থাপনায় মূল দায়িত্বে থাকা কক্সবাজার জেলা প্রশাসক মোহাম্মদ আলী হোসেন। গতকাল তিনি প্রতিদিনের সংবাদকে মুঠোফোনে বলেন, পুরো সঠিক ব্যবস্থাপনায় আরো দু-তিনটা দিন সময় লাগবে। ইতোমধ্যেই রাস্তা থেকে রোহিঙ্গাদের সরিয়ে নেওয়া হয়েছে। বালুখালীতে ক্যাম্প হচ্ছে। সেটি হলে সবাইকে একটি জায়গায় রাখা যাবে। তখন ত্রাণ বিতরণেও আর সমস্যা হবে না। আশা করছি ব্যবস্থাপনা ফিরে আসবে।

গত ২৫ আগস্ট থেকে মিয়ানমারে রোহিঙ্গাদের ওপর শুরু হওয়া নির্যাতন এখনো চলছে। আন্তর্জাতিক মানবিক সহায়তাকারী সংগঠনগুলোর জোট ইন্টার সেক্টর কো-অর্ডিনেশন গ্রুপের (আইএসসিজি) তথ্য অনুযায়ী, গতকাল পর্যন্ত বাংলাদেশে চার লাখ নয় হাজার রোহিঙ্গা আশ্রয় নিয়েছে। সব মিলে এ মুহূর্তে বাংলাদেশে প্রায় নয় লাখ রোহিঙ্গা শরণার্থী আশ্রয় নিয়েছেন বলে জানিয়েছেন শরণার্থী বিশেষজ্ঞ আসিফ মুনীর। কিন্তু রোহিঙ্গাদের আসা অব্যাহত থাকায় শেষপর্যন্ত মোট শরণার্থীর সংখ্যা ১০ লাখের কাছাকাছি দাঁড়াতে পারে বলে মনে করছেন তিনি।

এমন পরিস্থিতিতে আশ্রয় নেওয়া রোহিঙ্গাদের রাখতে কী ধরনের ব্যবস্থাপনা দরকার—এ নিয়ে গতকাল দেশের শরণার্থী গবেষকদের সঙ্গে কথা হয়। তারা সুষ্ঠু শরণার্থী ব্যবস্থাপনায় বেশ কিছু পরামর্শ দিয়েছেন। কক্সবাজার প্রশাসনও শরণার্থী ব্যবস্থাপনায় তাদের নানা উদ্যোগের কথা জানিয়েছে। কক্সবাজার জেলা প্রশাসন সূত্র জানায়, এ ব্যাপারে কক্সবাজার জেলা প্রশাসক মোহাম্মদ আলী হোসেন বলেন, ত্রাণ বিতরণ নিয়ে যাতে কোনো রাজনীতি বা অনিয়ম না হয়, সে ব্যাপারে আমরা সতর্ক। কিছুটা বিশৃৃঙ্খলা হচ্ছে, এ কথা সত্যি। আশা করছি আগামী দু-তিন দিনের মধ্যে তা ঠিক হয়ে যাবে।

কক্সবাজার জেলা প্রশাসন সূত্রমতে, প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা আশ্রয় নেওয়া রোহিঙ্গাদের মানবিক সহায়তার ব্যাপারে প্রতিদিন খোঁজখবর নিচ্ছেন। বিভিন্ন স্থানে ছড়িয়ে-ছিটিয়ে থাকা রোহিঙ্গাদের আগামী ১০ দিনের মধ্যে বালুখালী ক্যাম্পে নিয়ে আসার জন্য প্রধানমন্ত্রী নির্দেশ দিয়েছেন। এই সময়ের মধ্যে সেখানে তাঁবুর নির্মাণকাজও শেষ করতে বলেছেন। নির্দেশনা অনুযায়ী, আগামী ১০ দিনের মধ্যে বালুখালী ক্যাম্পে ১৪ হাজার তাঁবু তৈরির কাজ শেষ করবে বাংলাদেশ সেনাবাহিনী। বিশ্বের বিভিন্ন দেশ ও আন্তর্জাতিক বিভিন্ন সংস্থার দেওয়া ত্রাণসামগ্রী ঢাকা ও চট্টগ্রাম থেকে পরিবহন করে কক্সবাজারে জেলা প্রশাসকের দফতরে পৌঁছে দেওয়ার দায়িত্বও পালন করবেন তারা। রোহিঙ্গাদের মধ্যে জরুরি ভিত্তিতে ত্রাণ বিতরণকাজ চালিয়ে যাবে কক্সবাজার জেলা প্রশাসন। কোনো ব্যক্তি, সংগঠন এবং সরকারি-বেসরকারি কোনো সংস্থা ত্রাণ বিতরণ করতে চাইলে তা জেলা প্রশাসনের মাধ্যমে করতে হবে।

এ ব্যাপারে জেলা প্রশাসক মোহাম্মদ আলী হোসেন বলেন, বর্তমানে জেলার ১৬ জায়গায় রোহিঙ্গারা রয়েছেন। এর মধ্যে ১২ জায়গায় বেশি। বালুখালী ক্যাম্প হলে সবাইকে সেখানে নিয়ে যাওয়া হবে। কেন্দ্রীয়ভাবে ত্রাণ বিতরণ করা হবে। আটটি লঙ্গরখানা খোলা হচ্ছে। প্রতিটি লঙ্গরখানা থেকে ১২ হাজার শরণার্থীর খাবার ব্যবস্থা করা যাবে। ১২ জন নির্বাহী ম্যাজিস্ট্রেটের তত্ত্বাবধানে ১২টি কেন্দ্র থেকে ত্রাণ সরবরাহ করা হবে।

পরিস্থিতির সার্বিক শৃঙ্খলায় সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষকে সতর্ক থাকার পরামর্শ দিয়েছেন চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ের আইন বিভাগের অধ্যাপক ও শরণার্থী গবেষক জাকির হোসেন। তিনি বলেন, চার লক্ষাধিক শরণার্থীর মধ্যে ত্রাণ বিতরণ করতে গিয়ে ছোটখাটো কিছু সমস্যা হচ্ছে বটে; তবে সেটি বড় ধরনের সমস্যা নয়। কারণ এমন মানবিক বিপর্যয় ব্যবস্থাপনার পূর্ব অভিজ্ঞতা বাংলাদেশের ছিল না। কিছুটা সময় তো লাগবেই। তবে বালুখালী ক্যাম্পে নেওয়া গেলে আর কোনো সমস্যা থাকবে না। প্রত্যেকের নম্বর থাকবে। ক্যাম্প ও শরণার্থীর নম্বর অনুযায়ী বিতরণ করতে হবে। তবে এ মুহূর্তে ত্রাণ বিতরণ নিয়ে সরকারি কর্মকর্তা ও এনজিওগুলোর মধ্যে সমন্বয়ের অভাব দেখা দিচ্ছে। কেন্দ্রীয়ভাবে ত্রাণ বিতরণের নিয়ম মানতে চাইছে না অনেকে। সেটি মানাতে হবে। সার্বিক ব্যবস্থাপনায় প্রয়োজনীয় লোকবল ও প্রশিক্ষণের অভাব রয়েছে। ত্রাণের সংকট নেই। ব্যক্তিপর্যায়েও প্রচুর ত্রাণ আসছে। দেশের মানুষ মানবিকভাবে এগিয়ে এসেছে। অভূতপূর্ব সাড়া মিলেছে। ফলে অব্যবস্থাপনা ও ত্রাণ নিয়ে যেন কোনো অনিয়ম না হয়, সেটি খেয়াল রাখতে হবে। তা হলে সবাই ত্রাণ পাবে।

‘তবে অভ্যন্তরীণ নিরাপত্তা ও শরণার্থীদের সুরক্ষায় শরণার্থীদের একটি নির্দিষ্ট জায়গায় ক্যাম্পিং করেই রাখতে হবে’-উল্লেখ করে এই গবেষক বলেন, ক্যাম্পগুলোতে প্রয়োজনীয় সবকিছু নিশ্চিত করা গেলে শরণার্থীরা বাইরে যাবে না। তবে তাদের সতর্ক তদারকির মধ্যে রাখতে হবে। কারণ এসব নির্যাতিত রোহিঙ্গার মধ্যে এক সময় প্রতিশোধ স্পৃহা জেগে উঠতে পারে। এবং নিজ দেশে যাওয়ার আকাক্সক্ষা তীব্র হতে পারে। ফলে তারা বিভিন্ন সশস্ত্র সংগঠনগুলোর সঙ্গে মিশে মিয়ানমারে সশস্ত্র হামলা চালাতে পারে। সে ক্ষেত্রে দেশের অভ্যন্তরীণ নিরাপত্তা ঝুঁকির মধ্যে পড়বে। ফলে নিজেদের নিরাপত্তার জন্যই সার্বিক ব্যবস্থাপনায় শৃঙ্খলা আনতে হবে।

এ বিষয়ে নিরাপত্তা বিশ্লেষক মেজর জেনারেল (অব.) আবদুর রশিদ বলেন, রোহিঙ্গাদের ছড়িয়ে পড়ার সংখ্যা বেশি নয়। সেটি নিরাপত্তার জন্য অতটা ঝুঁকিপূর্ণও নয়। তবে সার্বিক ব্যবস্থাপনার জন্য শরণার্থীদের শিবিরের মধ্যেই আটকে রাখতে হবে। সেখানেই তাদের চাহিদাগুলোর সেটা নিরাপত্তার জন্যই দরকার। নিবন্ধন জরুরি। সে কাজে গতি ধীর। যে সীমাবদ্ধতার কারণে শরণার্থী ব্যবস্থাপনায় ঘাটতি পরিলক্ষিত হচ্ছে, সেই সীমাবদ্ধতাগুলো চিহ্নিত করতে হবে। সেটাই পারছি না। ত্রাণ বিতরণে সেনাবাহিনীকে কাজে লাগানো যেতে পারে। ‘শরণার্থী ব্যবস্থাপনায় সরকারের পলিসি ঠিক আছে; কিন্তু ব্যবস্থাপনায় দক্ষতার অভাব রয়েছে’ উল্লেখ করে এই নিরাপত্তা বিশ্লেষক বলেন, ক্যাম্প থেকে শরণার্থীদের যেন বাইরে যেতে না হয়, সেটি নিশ্চিত করতে হবে। অন্তত থাকার নিরাপত্তা দিতে হবে। ত্রাণের সুন্দর ব্যবস্থাপনা এখনো হয়নি। জনবল দরকার। সার্বিক ব্যবস্থাপনার জন্য কাজের সমন্বয় দরকার।

একইভাবে চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ের ভূগোল ও পরিবেশবিদ্যা বিভাগের অধ্যাপক অলক পাল বলেন, এমনিতেই এই বিপুল সংখ্যক শরণার্থী আশ্রয় দিতে গিয়ে নানাভাবে পরিবেশের ওপর নেতিবাচক প্রভাব পড়ছে। এরা পাহাড় কেটে সমতল করছে। গাছপালা কাটছে। বন উজাড় হচ্ছে। জীববৈচিত্র্যের ওপর নেতিবাচক প্রভাব পড়ছে। আগামী শীতে কক্সবাজার ও টেকনাফে পর্যটকদের সংখ্যা কমবে। শরণার্থীর ফলে জাতীয় অর্থনীতিতেও নেতিবাচক প্রভাব পড়বে। তার ওপর এসব শরণার্থী ছড়িয়ে ছিটিয়ে থাকলে এসব নেতিবাচক প্রভাব আরো বাড়বে। ফলে তাদের নিয়ন্ত্রণের মধ্যে আনতে হবে। একটি নির্দিষ্ট জায়গায় রাখতে হবে। যেহেতু রোহিঙ্গাদের ফেরত পাঠানোর বিষয়টা প্রলম্বিত হবে; তাই এদের জন্য ‘সেফ জোন’ করা দরকার।

Editor- Sayed Mohammad SHAKIL.
Office: Evan plaza, sador model thana road, cox’sbazar-4700. Email: dailycoxsbazar@gmail.com / phone: 01819099070
অনুমতি ছাড়া অথবা তথ্যসূত্র উল্লেখ না করে এই ওয়েব সাইট-এর কোন অংশ, লেখা বা ছবি নকল করা বা অন্য কোথাও প্রকাশ করা বেআইনী