সংবাদ শিরোনাম

উখিয়া-টেকনাফে লঙ্গরখানা চালু

উখিয়ায় হঠাৎ ভারী বর্ষণে হাজার হাজার রোহিঙ্গাদের মাঝে চরম দুর্ভোগ নেমে এসেছে। আশ্রয়হীন শত শত রোহিঙ্গা আশ্রয়ের আশায় অনিশ্চিত যাত্রার দিকে এগিয়ে গেলেও আশ্রয় মিলছে না। নারী শিশুদের দুর্ভোগ যেন অবর্ণনীয়। কুতুপালং, বালুখালী সহ কয়েকটি রোহিঙ্গা আশ্রয় শিবিরে নির্মিত রোহিঙ্গাদের কয়েক শত খুপরি ঘর ভেঙ্গে গেছে। রাস্তা ঘাট সব কিছুতে কাদায় একাকার হওয়ায় জন দুর্ভোগও বেড়েছে অনেক। শরনার্থীদের খাদ্য চাহিদা মিটাতে সরকারের পক্ষ থেকে উখিয়া ও টেকনাফে ছয়টি লঙ্গর খানার মাধ্যমে প্রতিদিন এক লক্ষ রোহিঙ্গার মাঝে রান্না করা খাবার বিতরন করা হচ্ছে।
উখিয়া টিভি রিলে কেন্দ্রের দক্ষিণে বালুখালী খাল সংলগ্ন একটি ব্যক্তি মালিকানাধীন জমিতে খুপরি করে সাময়িক আশ্রয় নিয়েছিল ৪/৫ শত রোহিঙ্গা পরিবারের অন্ততঃ তিন হাজারের মত রোহিঙ্গা। সোমবার সন্ধ্যা থেকে শুরু হওয়া মাঝারি, ভারী বর্ষন ও খালের জোয়ারের পানিতে চরম দুর্ভোগ নেমে এসেছে এসব আশ্রিত রোহিঙ্গাদের জীবনে। প্রবল বর্ষন ও জোয়ারের পানিতে তলিয়ে যায় তাদের বসতি। সেখানকার অবলা রোহিঙ্গা নারী সুফিয়া খাতুন (৩২) চার ছোট শিশুদের নিয়ে হাটু পানিতে দাড়িয়ে কান্না করছে। কোথায় যাবে, আশ্রয় কোথায় পাবে সে শংকায়। সে জানালো অন্যান্যদের সাথে এখানে সেও পলিথিন দিয়ে এতিম ছোট শিশুদের নিয়ে মোটামুটি মাথা গোজার ঠাই করেছিল। গত ১১দিন ধরে রাস্তার পাশে মানুষের দেয়া ভিক্ষা ও ত্রান নিয়ে ছেলে মেয়েদের নিয়ে কোন রকমে বেঁচে ছিল। কিন্তু ঘরটি তলিয়ে যাওয়ায় এখান থেকে প্রায় সকল রোহিঙ্গারা অন্যত্রে চলে যাচ্ছে।
তবে সুফিয়া পড়েছে মহা বিপাকে, কারন তার সাথে কোন পুরুষ বা উপযুক্ত ছেলে, ভাই না থাকায় সে কোথায় গিয়ে উঠবে জানে না। সে জানালো অন্যান্য স্থানে রোহিঙ্গারা যেখানে আশ্রয়ের জন্য যাচ্ছে সেখানে নাকি ঘর করতে টাকা দিতে হয়। কিন্তু তার কাছে কোন টাকা নেই। পথ ঘাট জানা শোনা না থাকায় সে সরকার নির্ধারিত স্থানেও যেতে পারছে না। অপর প্রতিবেশীদের অনেকে সেখানে না গিয়ে অন্যত্র চলে যাচ্ছে। ফলে সুফিয়া পড়েছে দুঃচিন্তায়। গতকাল সকালে দেখা গেছে উক্ত স্থানে আশ্রয় নেয়া হাজার তিনেক রোহিঙ্গা যাদের অধিকাংশ নারী ও শিশু তাদের চরম দুর্ভোগে পড়তে হয়েছে। তবে আকাশ মেঘাচ্ছন্ন থাকলেও গতকাল মঙ্গলবার সকাল ১০টার পর থেকে বৃষ্টি তেমন আর হয়নি। বৃষ্টি ও প্রচুর লোকজনের পদভারে ও হাঁটাহাঁটিতে কুতুপালং থেকে থাইংখালী পর্যন্ত প্রায় ৮কি:মিটার উখিয়া-টেকনাফ সড়ক কাদায় একাকার হয়ে পড়েছে। এতে জন চলাচল ব্যহত হচ্ছে।
উখিয়ার পালংখালী ইউনিয়নের বাঘঘোনা, হাকিমপাড়া ও তাজনিমার খোলা এলাকায় আশ্রয় নেয়া প্রায় ২৫ হাজার রোহিঙ্গা শরনার্থীদের মাঝে ও বৃষ্টির কারনে চরম দুর্ভোগ পোহাতে দেখা গেছে। উখিয়া-টেকনাফ সড়ক থেকে কয়েক কি:মিটার ভেতরে বন বিভাগের সামাজিক বনায়নের পাহাড় ও টিলাগুলোতে এ তিনটি আশ্রয় স্থল গড়ে উঠেছে। তবে এ তিনটি শরনার্থী শিবিরে যাতায়াতের রাস্তা খুবই ভাঙ্গাচুরা ও কর্দমাক্ত হওয়ায় দুর্ভোগ আরো বেড়েছে। তা ছাড়া এ তিনটিতে এখনো বিশ্ব খাদ্য কর্মসূচীর চাউল, বিস্কুটের মত খাবার সাহায্য পায়নি বলে এসব অস্থায়ী শিবিরের রোহিঙ্গাদের অভিযোগ। বাঘঘোনা শরনার্থী শিবিরে প্রায় ৭/৮ হাজার রোহিঙ্গার অবস্থান। এখানকার রোহিঙ্গা শাদত উল্লাহ (৪৮), মৌলভী এজাহার মিয়া (৫২), হাকিম পাড়াও একই সংখ্যক রোহিঙ্গার অবস্থান। সেখানকার রোহিঙ্গা এলম বাহার (৩৫), কামাল উদ্দিন (৩০), মছুমা খাতুন (৪০) ও তাজ নিমার খোলায় আশ্রয় নিয়েছে প্রায় ৫/৬ হাজার রোহিঙ্গা।
এখানে রোহিঙ্গা আব্দুল গফুর (৫২) সহ অনেকে জানান পাহাড়ির ভেতর অবস্থান হওয়ায় রাতে হাতির ভয় থাকে। ইতিমধ্যে এখানে বন্যাহাতির হামলায় এক শিশু নিহত হয়েছে। এখানকার শরনার্থীদের কেউ কেউ আইওএম সহ বিভিন্ন জনের দেয়া তেরপালিন সহ স্থানীয় মেম্বারদের মাধ্যমে বিভিন্ন ব্যক্তি, সংগঠন ও সংস্থার কাজ থেকে কিছু কিছু ত্রানের ব্যবস্থা করা হলেও কুতুপালং ও বালুখালীতে যেভাবে শরনার্থীরা চাউল সহ অন্যান্য ত্রান পাচ্ছে তা তারা এখানে পাচ্ছে না। তাদের অনেকেই নিজ দেশ থেকে একেবারে খালি হাতে আসায় টাকা পয়সা ও সহায় সম্পদ সাথে না থাকায় চরম খাদ্য সংকটে রয়েছে। এসব পরিবারে মধ্যে কিছু কিছু পরিবার রয়েছে যারা রাখাইনে খুবই স্বচ্ছল ও মোটামুটি অর্থসম্পন্ন হলেও এখানে পড়েেেছ বিপাকে। কারন তাদের হাতে না কোন টাকা পয়সা আছে না পারছে ত্রানের জন্য ঘন্টার পর ঘন্টা রাস্তায় অপেক্ষা করতে না পারছে কোথাও কায়িক শ্রম দিতে।
অন্যদিকে সরকার নির্ধারিত উখিয়ার কুতুপালং থেকে বালুখালী পর্যন্ত দুই শরনার্থী শিবিরের মাঝ খানে দুই হাজার একর বনভূমির উপর পর্যায়েক্রমে গড়ে তোলা হচ্ছে রোহিঙ্গাদের জন্য ১৪ হাজার আবাসন সেড। এতে প্রতি সেডে ৬ থেকে ১০ পরিবারের বসবাসের সুযোগ থাকবে। সেডগুলো নির্মান হওয়ার আগেই হাজার হাজার রোহিঙ্গা ঐসব জমিতে আশ্রয়ের জন্য অপেক্ষা করতে দেখা গেছে। এছাড়াও এখনো উখিয়ার বিভিন্ন স্থানে ও ঘুমধুম তুমব্রু এলাকায় বিচ্ছিন্ন ও বিক্ষিপ্ত ভাবে সাময়িক আশ্রয় নেয়া রোহিঙ্গাদেরও পর্যায়েক্রমে নির্ধারিত স্থানে নিয়ে আসার কার্যক্রম চলছে এবং তা একটু সময় লাগতে পারে বলে কক্সবাজার জেলা প্রশাসনের তদারকি কর্মকর্তা ও অতিরিক্ত জেলা প্রশাসক (শিক্ষা) মাহিদুর রহমান জানান। তিনি বলেন, নির্দিষ্ট স্থানের বাহিরে অস্থায়ী ভাবে গড়ে উঠা তাজনিমার খোলা, বাঘঘোনা ও হাকিমপাড়া থেকে সব রোহিঙ্গাকে পর্যায়েক্রমে স্থানান্তর করে নিয়ে আসা হবে।
এদিকে গতকাল মঙ্গলবার থেকে উখিয়া ও টেকনাফে ছয়টি স্থানে সরকারী ভাবে রোহিঙ্গা শরনার্থীদের জন্য লঙ্গর খানা খোলা হয়েছে। গতকাল প্রাথমিক ভাবে এসব লঙ্গর খানার মাধ্যমে ৪০ হাজার শরনার্থীকে রান্না করা খাবার বিতরন করা হয়েছে। উখিয়ার কুতুপালং ১,২ বালুখালী ১,২ ও টেকনাফে স্থাপিত ২টি লঙ্গর খানার আজ বুধবার থেকে এক লক্ষ রোহিঙ্গাকে রান্না করা খাবার সরবরাহ করা হবে বলে তিনি জানান। অন্যদিকে গতকাল দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা ও ত্রান সচিব শাহ কামাল জানিয়েছেন প্রায় চার লক্ষাধিক আশ্রিত রোহিঙ্গাদের মধ্যে খাদ্য সংকট থাকার কথা নয়। কারন বিশ্ব খাদ্য কর্মসূচী ইতিমধ্যে ২লাখ ৫৩ হাজার, কক্সবাজার জেলা প্রশাসন ১লাখকে ও আইএনজিও এসিএফ বাকি রোহিঙ্গার মাঝে খাদ্য বিতরন করে আসছে। ত্রান বিতরনে শৃংখলা ফিরাতে কঠোরতা অবলম্বন করে জেলা প্রশাসনের অনুমতি ছাড়া কাউকে যত্রতত্র ত্রান বিতরন করতে বারন করা হচ্ছে বলে তিনি জানান। তবে গতকাল মঙ্গলবারও সর্বত্র কতিপয় ব্যক্তি, প্রতিষ্ঠান সড়কের ধারে রোহিঙ্গাদের মাঝে বিভিন্ন ধরনের ত্রান সামগ্রী ছুড়ে ফেলে বিতরন করতে দেখা গেছে।

Editor- Sayed Mohammad SHAKIL.
Office: Evan plaza, sador model thana road, cox’sbazar-4700. Email: dailycoxsbazar@gmail.com / phone: 01819099070
অনুমতি ছাড়া অথবা তথ্যসূত্র উল্লেখ না করে এই ওয়েব সাইট-এর কোন অংশ, লেখা বা ছবি নকল করা বা অন্য কোথাও প্রকাশ করা বেআইনী