সংবাদ শিরোনাম

রোহিঙ্গাদের পুঁজি করে অমানবিক বাণিজ্য

রাখাইনে নির্মম নির্যাতনের শিকার রোহিঙ্গারা পালিয়ে এসে বাংলাদেশে আশ্রয় নিয়েছেন। সরকারি বেসরকারি বিভিন্ন সংগঠন-সংস্থা সামর্থ্য অনুযায়ী অসহায় মানুষগুলোর পাশে দাঁড়াচ্ছে। এসবের মাঝেও রোহিঙ্গা শরণার্থীদের পুঁজি করে অমানবিক ব্যবসা শুরু করেছে স্থানীয় একটি চক্র। ত্রাণ হিসেবে পাওয়া সামান্য অর্থ হাতিয়ে নিতে ফাঁদ পেতেছেন তারা। ‘জায়গা ভাড়া’ দিয়ে হাতিয়ে নেওয়া হচ্ছে রোহিঙ্গাদের শেষ সম্বলটুকু। এমন অবস্থার মুখোমুখি হওয়া রোহিঙ্গা পরিবারগুলো চরম সংকটের মুখে পড়েছে। টেকনাফ-উখিয়া সড়কের মৌচনী এলাকা। গুঁড়িগুঁড়ি বৃষ্টির মধ্যে রাস্তার দুপাশে রোহিঙ্গাদের ঢল। কারো কারো হাতে ব্যাগ-বোচকা। মৌচনী বিজিবি ক্যাম্পের অদূরে মূল সড়কের পাশে কিছু নতুন তাঁবুঘর দেখা গেল। কাছে যেতেই অনেকে বেরিয়ে এলেন। কাদাপানিতে একাকার মানুষগুলোর মুখ মলিন। তারা জানালেন, সেখানে ২৭৫টি তাঁবুঘর গড়া হয়েছে। সবগুলোই হয়েছে গত ১০ দিনে। সরকার অনুমোদিত কয়েকটি রোহিঙ্গা শরণার্থী ক্যাম্পে গেলেও ঠাঁই মেলেনি পরিবারগুলোর। অবশেষে জায়গা মেলে টাকার বিনিময়ে। জায়গাভেদে প্রতিমাসে ৫০০ থেকে তিন হাজার টাকার চুক্তিতে সেখানে তাঁবু গেড়েছে একেকটি পরিবার।

পুলিশের পক্ষ থেকে অবশ্য রোহিঙ্গাদের কাছে বাড়ি ভাড়া না দিতে পুলিশ সদর দপ্তর নির্দেশনাও জারি করেছে। অথচ আইন ভেঙে সেখানে জায়গা ভাড়া দিচ্ছে একটি চক্র। হাতিয়ে নিচ্ছে রোহিঙ্গাদের সর্বস্ব। রহমত উল্লাহ। আট দিন আগে মংডুর উজোং এলাকা থেকে পরিবারের ৮ সদস্য নিয়ে টেকনাফে আসেন। টেকনাফ ও উখিয়ার কয়েকটি রোহিঙ্গা ক্যাম্পে যান। কিন্তু জায়গা না পেয়ে ফিরে আসেন। পরে ত্রাণ সংগ্রহ করতে করতে মৌচনী এলাকায় চলে আসেন। এখানেই খোঁজ পান জায়গা ভাড়ার। কিন্তু হাত তো খালি। ভাড়া নেবেন কীভাবে? অবশেষে কিছু ত্রাণ বিক্রির সিদ্ধান্ত নেন। ত্রাণ দিতে আসা মানুষের কাছে নগদ টাকার জন্য ছোটেন। এক পর্যায়ে দুই হাজার টাকা জমিয়ে ভাড়া নেন একটি জায়গা। কয়েক ফুট দৈর্ঘ্য-প্রস্থের ওই জায়গাতেই তোলেন তাঁবুঘর। বৃষ্টির কারণে ওই ঘরটিরও অবস্থা কাহিল। ভেতরে কিছু গাছের পাতা দিয়ে তার ওপর ঘুমান পরিবারের সবাইকে নিয়ে। বৃষ্টির পানি তাঁবুর মধ্যে গিয়ে কাদায় পরিণত হয়েছে। খোঁজ নিয়ে জানা গেছে, মৌচনীর ওই জায়গায় ২৭৫টি তাঁবুঘরের জায়গা ভাড়া দিয়েছেন স্থানীয় তিন ব্যক্তি। তারা হলেনÑ মোহাম্মাদ, কুতুব ও ফুতু। তাঁবুঘরগুলোর পাশেই ফুতুর পাকা বাড়ি দেখিয়ে দিলেন এক রোহিঙ্গা। কিন্তু সেখানে তাকে পাওয়া গেল না। মৌচনী ছাড়াও টেকনাফ ও উখিয়ার বিভিন্ন স্থানে এমন জায়গা ভাড়া দেওয়া শুরু করেছে স্থানীয় একটি চক্র। তারা হাতিয়ে নিচ্ছে রোহিঙ্গাদের কাছে থাকা সামান্য অর্থের পুরোটাই। বিষয়টি দেখার কেউ নেই। রহমত উল্লাহর সঙ্গে কথা বলার সময় বেশ কয়েকজন হাজির হন সেখানে। তাদের মধ্যে একজন আবদুল হামিদ। পরিবারের ৭ সদস্য নিয়ে আশ্রয় মিলেছে এ জায়গা ভাড়া নেওয়া স্থানটিতে। প্রতিমাসে এক হাজার টাকা ভাড়ায় একটি তাঁবুঘর তুলেছেন তিনি। তাঁবুঘরের জন্য জায়গা ভাড়া নেওয়া বেশ কয়েকজন আমাদের সময়কে বলেন, মিয়ানমার সেনাবাহিনীর অত্যাচারে দেশ ছেড়েছি। কিছুই সঙ্গে আনতে পারিনি। এখানে আসার পর কিছু সাহায্য পাচ্ছি। খাবার কাপড়ের পাশাপাশি সামান্য কিছু টাকাও পাচ্ছি। কেউ ৫০ টাকা, কেউ ১০০ টাকা করে দিয়ে যায়। এই টাকা সব চলে যাবে জায়গা ভাড়ায়। শেষ সম্বল বলেও কিছু থাকবে না। রোহিঙ্গাদের সেবায় নিয়োজিত দেশি-বিদেশি স্বেচ্ছাসেবী কর্মীরা বলছেন, এটি খুবই অমানবিক। এসব রোহিঙ্গা মাত্রই এসেছেন। এখন তাদের টিকে থাকাটাই বড় কথা। তাদের জন্য সরকার ক্যাম্প বানিয়েছে। কিন্তু সেই ক্যাম্পে যদি সবার জায়গা না হয় তা হলে সাময়িকভাবে কোথাও থাকতে পারে। যদিও আইনগত বৈধতা থাকবে না এ থাকার। তবুও মানবিক দিক বিবেচনা করে সেটি সবাই মেনে নিতে পারে। কিন্তু জায়গা ভাড়া দিয়ে রোহিঙ্গাদের কাছে থাকা সামান্য অর্থ কেড়ে নেওয়া চরম অন্যায় এবং অমানবিক। সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষকে এদিকে নজর দেওয়া উচিত বলে মনে করেন তারা। তাঁবুঘরের জন্য জায়গা ভাড়া নিয়েছেন সদুল্লাহ। পরিবারের ৫ সদস্য নিয়ে মংডু থেকে পালিয়ে এসেছেন। কয়েকদিন রাস্তাতেই ছিলেন। এখানে তাঁবুঘর করার অনুমতি পেয়েছেন প্রতিমাসে এক হাজার টাকা ভাড়া দেওয়ার শর্তে। সদুল্লাহ জানালেন, গত ১০ দিনে কয়েকশ’ টাকা জোগাড় করতে পেরেছেন। পুরো মাসে এক হাজার নগদ টাকা তিনি জোগাড় করতে পারবেন কিনা তা নিয়ে দুশ্চিন্তায়। খাবারই ঠিকমতো পাচ্ছি না। তার ওপর আবার জায়গা ভাড়া দেব কীভাবে। কিন্তু থাকা তো দরকার। তাই নিতে বাধ্য হয়েছি। সদুল্লাহর মতো একই অভিজ্ঞতার কথা জানালেন মো. সারোয়ার, হালিমসহ অনেকেই। তাদের একটাই আকুতি, সরকার যেন দ্রুত বৈধ ক্যাম্পে তাদের জায়গার ব্যবস্থা করেন। না হলে এখানে যে কদিন থাকার প্রয়োজন হয় সেটি যেন ভাড়া না দিয়ে থাকতে পারেন। কারণ এই জমির ভাড়ার টাকা দেওয়ার মতো সামর্থ্য-সুযোগ কোনোটিই তাদের নেই বলে জানালেন তারা। এ বিষয়ে স্থানীয় আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর কয়েক সদস্য জানান, মানবিক কারণে বিভিন্ন জায়গায় থাকতে দেওয়া হচ্ছে রোহিঙ্গাদের। তবে কেউ জায়গার জন্য ভাড়া নেবেন সেটি মেনে নেওয়া হবে না। রোহিঙ্গাদের কাছ থেকে টাকা নেওয়ার কোনো সুযোগ নেই। এই বিষয়টি তারা প্রথম জানলেন বলে জানালেন।

Editor- Sayed Mohammad SHAKIL.
Office: Evan plaza, sador model thana road, cox’sbazar-4700. Email: dailycoxsbazar@gmail.com / phone: 01819099070
অনুমতি ছাড়া অথবা তথ্যসূত্র উল্লেখ না করে এই ওয়েব সাইট-এর কোন অংশ, লেখা বা ছবি নকল করা বা অন্য কোথাও প্রকাশ করা বেআইনী