সংবাদ শিরোনাম

স্বাস্থ্যঝুঁকিতে রোহিঙ্গারা : ৯০০ জনের ১টি শৌচাগার !

নির্যাতনের মুখে মিয়ানমার থেকে পালিয়ে বাংলাদেশে আশ্রয় নিয়েছে চার লাখের অধিক রোহিঙ্গা। মাত্র এক মাসের মধ্যে আসা বিপুল এ জনগোষ্ঠীর আশ্রয় এবং তাদের অন্নের সংস্থান করতে হিমশিম খাচ্ছে বাংলাদেশ সরকার।

ইতোমধ্যে রোহিঙ্গাদের পাশে এসে দাঁড়িয়েছে বাংলাদেশের সাধারণ মানুষ। পাশে দাঁড়িয়েছে বেসরকারি বিভিন্ন দাতা সংস্থা, এনজিও ও বন্ধু রাষ্ট্র। গত শনিবার থেকে রোহিঙ্গাদের আশ্রয় ও ত্রাণসহায়তাসহ বিভিন্ন কার্যক্রমে যুক্ত হয়েছে বাংলাদেশ সেনাবাহিনী। মূলত তাদের তত্ত্বাবধানে এখন থেকে সব কার্যক্রম পরিচালিত হবে। ইতোমধ্যে সেনাবাহিনীর তৎপরতায় খুশি আশ্রয় নেয়া রোহিঙ্গারা।

প্রাথমিক পর্যায়ে লাখ লাখ রোহিঙ্গার আশ্রয় ও খাবারের ব্যবস্থা করা গেলেও এখনও শৌচাগারের (ল্যাট্রিন) ব্যবস্থা নিশ্চিত করা সম্ভব হয়নি। সংশ্লিষ্ট সূত্রে জানা গেছে, কক্সবাজার ও টেকনাফের রোহিঙ্গা ক্যাম্পগুলোতে প্রতি ৯০০ জনের বিপরীতে মাত্র একটি স্যানিটারি ল্যাট্রিন বরাদ্দ দেয়া হয়েছে।

সরেজমিনে দেখা গেছে, গত এক মাস ধরে যত্রতত্র পায়খানা-প্রস্রাবের ফলে চরম স্বাস্থ্যঝুঁকিতে রয়েছেন আশ্রিত রোহিঙ্গারা। বিশেষ করে শিশুরা ডায়রিয়া, কলেরাসহ বিভিন্ন পানিবাহিত রোগে আক্রান্ত হচ্ছে। স্বাস্থ্যঝুঁকিতে রয়েছে উখিয়ার কয়েকটি গ্রামের স্থানীয়রাও।

কক্সবাজার জেলা প্রশাসক সূত্রে জানা গেছে, সরকারি হিসাব অনুযায়ী, এখন পর্যন্ত মোট চার লাখ ৩০ হাজার রোহিঙ্গা নতুন করে বাংলাদেশে প্রবেশ করেছে। রোহিঙ্গা ক্যাম্পগুলোতে সরকারি এবং বিভিন্ন এনজিও কর্তৃক ১২০০টি অস্থায়ী ল্যাট্রিন তৈরির পরিকল্পনা রয়েছে। ইতোমধ্যে তৈরি হয়েছে ৫০০টির মতো। আনুপাতিক হারে ৮৬০ জনের জন্য মাত্র একটি শৌচাগার, যা কখনই পর্যাপ্ত নয়।

সোমবার সরেজমিনে উখিয়ার কুতুপালং, বালুখালী ও ট্যাংখালীতে গিয়ে দেখা গেছে, রোহিঙ্গা ক্যাম্পের পাশে ধানখেতসহ আশপাশের খোলা স্থানগুলোতে মলমূত্র ত্যাগ করছে রোহিঙ্গা শিশুরা। পুরুষরাও বাদ যাচ্ছে না। যে মাঠে খেলাধুলা করছে সেখানেই মলমূত্র ত্যাগ করছে শিশুরা। বয়স ৪-৫ বছরের বেশি নয়। এ বিষয়ে মায়েরাও তেমন সচেতন নন।

অস্থায়ী যেসব শৌচাগার বসানো হয়েছে, পরিষ্কার-পরিচ্ছন্নতার অভাবে সেগুলো দ্বিতীয়বার ব্যবহারেও উৎসাহ হারিয়ে ফেলছে অনেকে। অস্থায়ী এসব শৌচাগারের সামনে মেয়েদের লাইন দেখা গেলেও পুরুষদের তেমন লক্ষ্য করা যায়নি।

এ বিষয়ে জানতে চাইলে বালুখালী ক্যাম্পে অবস্থান নেয়া মিয়ানমারের মংডু থেকে আসা জাহানারা বেগম বলেন, আমাদের ক্যাম্পের বাইরে পর্দা টাঙিয়ে পাঁচটি প্যান বসানো হয়েছে। কিন্তু সারাদিন সেখানে ভিড় লেগে থাকে। বাচ্চা নিয়ে এত সময় বসে থাকা যায় না। বাধ্য হয়ে বাচ্চাকে ক্যাম্পের বাইরে খোলা স্থানে পায়খানা করাই।

কুতুপালং ক্যাম্পেরর ব্লক-৫ এ আশ্রয় নেয়া আফসানা বলেন, শৌচাগার তৈরির জন্য ক্যাম্পের সামনে অনেক প্যান আর বাঁশ রাখা হয়েছে। কিন্তু এখনও তৈরি হয়নি। বাধ্য হয়ে আমাদের রাতের আঁধারে পাহাড়ের ঢাল কিংবা মাঠে যেতে হচ্ছে।

সম্প্রতি জাতিসংঘের শিশুবিষয়ক সংস্থা ইউনিসেফ জানিয়েছে, মিয়ানমার থেকে পালিয়ে আসা রোহিঙ্গাদের মধ্যে দুই লাখের বেশি শিশু, যা এবার আসা মোট শরণার্থীর ৬০ শতাংশ। এছাড়া বাবা-মা বিচ্ছিন্ন হয়েছেন ১৩০০ শিশু।

জাতিসংঘের শরণার্থীবিষয়ক হাইকমিশনার ফিলিপ্পো গ্রান্ডি সম্প্রতি বলেছেন, মিয়ানমারে নির্যাতিত হয়ে আসা ৪ লাখ ৩০ হাজার রোহিঙ্গার সামাল দেয়া বাংলাদেশ সরকারের জন্য বড় চ্যালেঞ্জ হয়ে দাঁড়িয়েছে। তিনি বলেন, রোহিঙ্গাদের খাদ্য, চিকিৎসা ও স্যানিটেশনের ব্যবস্থা করা দরকার। রোহিঙ্গাদের সাহায্যার্থে বিশ্বের সব দাতা সংস্থার এগিয়ে আসা উচিত।

রোহিঙ্গা ক্যাম্পে স্বাস্থ্যসেবায় নিয়োজিত একাধিক চিকিৎসক জানান, শিশুদের শতকরা ৮৫ ভাগই বিভিন্ন রোগে আক্রান্ত। পানিবাহিত বিভিন্ন রোগ- কলেরা, ডায়রিয়া, আমাশয়, সর্দি ও নিউমোনিয়ায় আক্রান্তের হার বেশি। পর্যাপ্ত স্যানিটেশন ব্যবস্থা না থাকায় তারা আরও বেশি অসুস্থ হয়ে পড়ছে। জরুরি ভিত্তিতে তাদের জন্য পর্যাপ্ত খাবার স্যালাইন ও ওষুধ সরবরাহ করা দরকার।

এ বিষয়ে কক্সবাজারের জেলা প্রশাসক (ডিসি) মো. আলী হোসেন বলেন, যত্রতত্র মলমূত্র ত্যাগ রোহিঙ্গা ও স্থানীয় বাংলাদেশি উভয়ের স্বাস্থ্যঝুঁকির কারণ হতে পারে। সর্বোচ্চ গুরুত্ব দিয়ে আমরা রোহিঙ্গাদের স্যানিটেশন সমস্যা সমাধানের চেষ্টা করছি। ইতোমধ্যে ৫০০ ল্যাট্রিন তৈরির কাজ শেষ হয়েছে।

রোহিঙ্গা ক্যাম্পে অবস্থান নেয়া শিশুদের শারীরিক অবস্থা সম্পর্কে কক্সবাজারের সিভিল সার্জন আবদুস সালাম  বলেন, মিয়ানমার থেকে আসা অধিকাংশ শিশু সর্দি, জ্বর, কাশি, নিউমোনিয়া, চর্মসহ নানা রোগে আক্রান্ত। এ পর্যন্ত প্রায় ৫৩ হাজার শিশুকে হাম এবং ২৫-২৬ হাজার শিশুকে পোলিও টিকা খাওয়ানো হয়েছে। উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সগুলোতে জ্বর ও ডায়রিয়া আক্রান্ত অনেক শিশু চিকিৎসা নিয়েছে।

বেসরকারি সংস্থা ‘অ্যাকশন অ্যাগেইনস্ট হাঙ্গার’ এর হিসাব অনুযায়ী, এ পর্যন্ত প্রায় ৫৫ হাজার শিশু অপুষ্টিতে এবং ছয় হাজার ৭৭৫ শিশু মারাত্মক অপুষ্টিতে ভুগছে। অন্তঃসত্ত্বা নারীরাও ভুগছেন অপুষ্টিতে। তাদের জন্য এখনই পুষ্টিকর খাদ্যের ব্যবস্থা করতে হবে। অন্যথায় চরম স্বাস্থ্যঝুঁকিতে পড়বে তারা।

সংশ্লিষ্ট সংবাদ

Editor- Sayed Mohammad SHAKIL.
Office: Evan plaza, sador model thana road, cox’sbazar-4700. Email: dailycoxsbazar@gmail.com / phone: 01819099070
অনুমতি ছাড়া অথবা তথ্যসূত্র উল্লেখ না করে এই ওয়েব সাইট-এর কোন অংশ, লেখা বা ছবি নকল করা বা অন্য কোথাও প্রকাশ করা বেআইনী