সংবাদ শিরোনাম

মরহুম এডভোকেট খালেকুজ্জামান শাহাদাত বাষির্কীর বিশেষ ক্রোড় পত্র

মোঃ খালেকুজ্জামান।
জন্ম : ১৬ জানুয়ারী ১৯৫৩।মৃত্যু : ২৮ সেপ্টেম্বর’২০০১।

পিতা : মরহুম ফরিদ আহমদ। সাবেক জাতীয় সংসদ সদস্য ও ১৯৫৭ সালে গঠিত আইআই চুন্দ্রীগড় মন্ত্রীসভার সাবেক কেন্দ্রীয় শ্রম মন্ত্রী।
মৃত্যু : ২৮ সেপ্টেম্বর’২০০১ রামু বাইপাসের বর্তমান ‘খালেকুজ্জামন চত্বরে’ লাখো মানুষের জনসভায় হেসে হেসেই তিনি দুনিয়া থেকে চলেযান। ২০০১ সালের ১লা অক্টোবরের জাতীয় সংসদ নির্বাচনের মাত্র তিনদিন আগে তৎকালীন ৪ দলীয় জোটের মনোনীত প্রার্থী কক্সবাজার-রামুর জনগণের ভালবাসায় সিক্ত এড. খালেকুজ্জামান কক্সবাজার-রামুবাসীর ভালবাসার মূল্য দিতে গিয়ে তাঁর জীবন উৎসর্গ করেছিলেন।

শিক্ষা জীবন : (ক) উপস্নাতক পর্যায় : ধানমন্ডি সরকারি উচ্চ বিদ্যালয়, মোমেনশাহী ক্যাডেট কলেজ ও ঢাকা সরকারি কলেজ। এসএসসি এবং এইচএসসি বিজ্ঞান বিভাগের পরীক্ষায় কৃতিত্বের সাথে উত্তীর্ণ। (খ) স্নাতক পর্যায়ঃ বিএ. এলএলবি ৩য় স্থান, এমবিএ (ঢা.বি) প্রথম স্থান।
স্নাতকত্তোর : (ক) তথ্য প্রযুক্তি বিশেষজ্ঞ : ঢাকাস্থ আমেরিকার একটি বহুজাতিক কম্পিউটার কোম্পানী এনসিআর এর অধিনে পদ্ধতি বিশ্লেষক (System Analyst) হিসাবে পেশাগত জীবন শুরু ১৯৭৯ সালে। (খ) কম্পিউটার বিজ্ঞানে উচ্চতর শিক্ষা ঃ মিশরের কায়রো, সাইপ্রাসের নিকোশিয়া, পাকিস্তানের করাচী, যুক্তরাজ্যের লন্ডন, যুক্তরাষ্টের ডেটন, আটলান্টা ও নিউইয়র্ক এ অবস্থিত এনসিআরের স্কুল থেকে কম্পিউটার বিজ্ঞানে উচ্চতর শিক্ষা গ্রহণ করেন।

পেশাগত কৃতিত্ব : (ক) আমেরিকার উইচিটা ও ক্যানসাসে অবস্থিত এনসিআরের সফটওয়্যার উন্নয়ন কেন্দ্রে পেশাগত প্রশিক্ষণ অত্যন্ত সফলতার সাথে সম্পন্ন করেন এবং লব্ধ প্রযুক্তিগত অভিজ্ঞতা দিয়ে এনসিআরের প্রোপ্রাইটরি অপারেটিং সিসটেম এন্ড কমপাইলারকে আন্তর্জাতিক ভাবে ব্যবহার উপযোগী করতে তিনি বিশেষ অবদান রাখেন। (খ) বাংলাদেশে অবস্থিত বিভিন্ন আন্তর্জাতিক ব্যাংক ও হোটেলে বৃহৎ ও ক্ষুদ্রায়তর কম্পিউটার স্থাপনে তিনি সহায়তা করেন। (গ) বাংলাদেশে অবস্থিত কুয়েত এয়ারওয়েজের কার্যালয়ে অত্যন্ত সুপরিকল্পিতভাবে পরস্পরের উপর ক্রিয়াশীল মেন্যুচালিত সফটওয়্যার প্যাকেজ স্থাপন করে তিনি সকলের প্রশংসা কুড়িয়েছেন। (ঘ) ইন্টারেকটিভ ব্যাংকিং সফটওয়্যার বিষয়েও তাঁর দক্ষতা রয়েছে। বাংলাদেশে অবস্থিত ২টি বিদেশী ব্যাংকে ইন্টারেকটিভ সফটওয়্যার স্থাপনেও তিনি সহযোগিতা করেন। (ঙ) একজন তন্ত্র বিশে¬ষক হিসেবেও তিনি পদ্ধতির উপর এক জরিপ পরিচালনা করেন এবং ফাইজার, স্কুইব, পিডিবি, সাধারণ বীমা করপোরেশন, জীবন বীমা করপোরেশন, বিআইডাব্লিউটি, বাংলাদেশ সেনাবাহিনী, কৃষি ব্যাংক, সোনালী ব্যাংকসহ বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানে তিনি বিশেষজ্ঞ পরামর্শক হিসেবে দায়িত্ব পালন করেছেন। (চ) এনসিআরের একজন ইনস্ট্রাক্টর হিসেবে তিনি অসংখ্য কম্পিউটার ট্রেনিং কোর্স পরিচালনা করেন এবং কম্পিউটার সম্পর্কিত মৌলিক বিষয়েও শিক্ষা দান করেন। (ছ) জাতীয় কম্পিউটার কাউন্সিল এবং সাধারণ বীমা করপোরেশনের তিনি কম্পিউটার পরামর্শক। এছাড়াও পাকিস্তানের করাচীতে এনসিআর-এর জন্য কম্পিউটারাইজড হিসাব চালু করেন। (জ) বাংলাদেশ টেলিভিশনে সফটওয়্যার ও হার্ডওয়্যার সম্পর্কিত বুনিয়াদী শিক্ষার উপর তাঁর পরিবেশিত অনুষ্ঠানগুলো অত্যন্ত সমাদৃত হয়েছে। (ঝ) কম্পিউটার সফটওয়্যার ও কম্পিউটার প্রযুক্তির অগ্রযাত্রা সম্পর্কে কম্পিউটার ব্যবহারকারীদের মধ্যে সচেতনতা সৃষ্টিতে তিনি বলিষ্ঠ ভূমিকা পালন করেন। শুধু তা নয়, বাংলাদেশ থেকে কম্পিউটার সফটওয়্যার রফতানিতে তাঁর অবদান প্রশংসার দাবি রাখে।


আইন পেশায় কৃতিত্ব : একজন আইনজীবী হিসেবে দেশের বিভিন্ন আদালতে মামলা পরিচালনা করে তিনি খ্যাতি অর্জন করেন। ক্রিমিনাল ল, ল অব কন্ট্রাক্ট এন্ড এজেন্সী, ইন্ডাষ্ট্রিয়াল এন্ড লেবার ল, ল অব ব্যাংকিং এন্ড ইন্সুরেন্স, ল্যান্ড ল, ল অফ আরবিট্রিশন, ল অফ রীট, ল অফ এ্যাডমিরালটি, ল অফ প্যাটান্ট, ডিজাইন এন্ড কপি রাইট আইন সম্পর্কে তাঁর যথেষ্ট অভিজ্ঞতা রয়েছে।
আইন সভার অভিজ্ঞতা : সপ্তম জাতীয় সংসদের তিনি সদস্য ছিলেন। সংসদ সদস্য হিসাবেও তাঁর যথেষ্ট সুনাম রয়েছে। সংসদে তাঁর গঠনমূলক ভূমিকা সকলের কাছে সমাদৃত হয়েছে। মহামান্য রাষ্ট্রপতির ভাষণ ও বাজেটের উপর আলোচনায় অংশগ্রহণ করে রাষ্টপতির ভাষণকে বিমান বালার হাসি এং বাজেটকে ছলনাময়ী সুন্দরী নারী হিসাবে আখ্যায়িত করেন। তাঁর সাবলীল ও বুদ্ধিদীপ্ত ভাষণে ক্ষমতাসীন বিরোধী দলের সকল সদস্য প্রীত হন এবং ক্ষমতাসীন দলের সদস্যদের অনুরোধে মাননীয় স্পীকার তাঁর বক্তৃতার সময় আরো বর্ধিত করেন। ইহা সংসদীয় ইতিহাসে একটি নজিরবিহীন ঘটনা। তিনি আইন, বিচার ও সংসদীয় সম্পর্কিত স্ট্যান্ডিং কমিটির অন্যতম সদস্য ছিলেন। সংসদে উত্থাপিত বিলগুলো যাচাই বাছাইয়েও তাঁর যথেষ্ট আবদান রয়েছে। এবং জননিরাপত্তা আইন এর প্রতি তিনি নোট অব ডিসেন্ট জানান। এছাড়াও সংসদীয় দলের প্রতিনিধি হিসেবে যুক্তরাষ্ট্র সফর করেন।
শিক্ষকতা :
Internaional University of Business, Agriculture and Technologyর ফ্যাকাল্টির অন্যতম সদস্য। উক্ত বিশ্ববিদ্যালয়ের বিবিএ ও এমবিএ প্রোগ্রামের একজন প্রভাষক। মৃত্যুর আগ পর্যন্ত দীর্ঘ ছয় বছর ধরে তিনি উক্ত বিশ্ববিদ্যালয়ে শিক্ষাকতায় নিয়োজিত ছিলেন।
প্রকাশনা :
তাঁর লিখিত গ্রন্থ এখনও প্রকাশিত হয়নি। তবে তাঁর অনেক প্রবন্ধ পত্র-পিত্রকায় প্রকাশিত হয়েছে। বিশেষ করে তাঁর প্রবন্ধ Computerisation in Bangladesh a two edged sword মর্নিং সানের ৪-৫ অক্টোবর/৯২ তারিখের সংখ্যায় প্রকাশিত হয়। অন্যদিকে Merketing of Computers Software in Bangladesh প্রবন্ধটি Kings HNK ম্যাগাজিনে প্রকাশিত হয়।
সেমিনার, আলোচক/বিশেষজ্ঞ ব্যক্তি হিসাবে অংশগ্রহণ
(ক) বাংলাদেশ লিগ্যাল এইড সার্ভিসেস ট্রাস্টের উদ্যোগে ঢাকাস্থ সিরডাপ মিলনায়তনে আয়োজিত OMBUDSMAN শীর্ষক সেমিনারে তিনি বিশেষজ্ঞ আলোচক হিসাবে অংশগ্রহণ করেন। (খ) সেন্টার ফর ষ্ট্যাটেজিক এন্ড পীস্ ষ্ট্যাটিজী কর্তৃক সিরাডাপ মিলনায়তনে আয়োজিত বাংলাদেশের স্বাধীনতা, আশা এবং বাস্তবতা শীর্ষক গোল টেবিল বৈঠকে তিনি আলোচক হিসাবে অংশগ্রহণ করেন। (গ) এমবিএ সমিতি কর্তৃক হোটেল শেরাটনে আয়োজিত শিল্পনীতি শীর্ষক গোল টেবিল বৈঠকে একজন বিশেষজ্ঞ আলোচক হিসাবে অংশগ্রহণ করেন।
(ঘ) খান ফাউন্ডেশন কর্তৃক প্লানিং একাডেমী মিলনায়তনে আয়োজিত Road to Democtatic Local Govenment Structure in bangladesh শীর্ষক গোল টেবিল বৈঠকে তিনি একজন আলোচক হিসাবে অংশগ্রহণ করেন। (ঙ) এমবিএ সমিতি কর্তৃক প্ল্যানিং একাডেমী মিলনায়তনে আয়োজিত Good Governess শীর্ষক সেমিনারে তিনি আলোচক হিসাবে অংশগ্রহণ করেন। (চ) RMMFU নামে একটি সংস্থা কর্তৃক ব্র্যাক সেন্টারে আয়োজিত National law for Refugees শীর্ষক আলোচনায় সভায় তিনি একজন বিশেষজ্ঞ আলোচক হিসেবে অংশগ্রহণ করেন। (ছ) ট্রান্সপারেন্সী ইন্টারন্যাশনাল কর্তৃক সিরডাপ মিলনায়তনে আয়োজিত সেমিনারে তিনি একজন অতিথি আলোচক হিসেবে অংশগ্রহণ করেন। (জ) ইউএনডিপি’র সহায়তায় বাংলাদেশ জাতীয় সংসদ কমিটি অব পার্লামেন্টারী স্টাডিজ এর প্রথম সম্মেলনে Community in Bangladesh, বিষয়ের উপর তাঁর লিখিত প্রবন্ধটি উপস্থাপন করেন। (ঝ) সেন্টার ফর ষ্ট্যাটেজিক এন্ড পীস স্টাডি কর্তৃক আয়োজিত Neutrality and Security in fleetion টেবিল বৈঠকে তিনি অংশগ্রহণ করেন। (ঞ)  Best কর্তৃক সিরডাপ মিলনাতয়নে আয়োজিত Information শীর্ষক গোল টেবিল বৈঠকে তিনি অংশগ্রহণ করেন। (ট) বাংলাদেশ টেলিভিশন এর সংলাপেও তিনি অংশ গ্রহণ করেন।
বিদেশ ভ্রমণ : তিনি সাইপ্রাস, মিশর, ফ্রান্স, গ্রীস, হংকং, ভারত, পাকিস্তান, থাইল্যান্ড ও যুক্তরাজ্য ভ্রমণ করেন।
সমাজ সেবা : তিনি বিভিন্ন সামাজিক সংগঠনের সাথে জড়িত। এছাড়া আইবিএ, মির্জাপুর এক্স ক্যাডেট এসোসিয়েশন, ঈদগাঁও ফরিদ আহমদ কলেজ, নাদেরুজ্জামান উচ্চ বিদ্যালয়, আশরাফুল উলুম মাদ্রাসা, ফরিদা রহমান এতিমখানার সাথেও তিনি জড়িত ছিলেন। সমাজের দরিদ্র অসহায় মানুষের জন্য তিনি আদর্শগতভাবে রাজনীতিতে জড়িত এবং অত্র জেলার সফল রাজনীতিক হিসেবে অগ্রণী ভূমিকা পালন করে গেছেন। তিনি অমায়িক, সদালাপী এবং সৎ ও অত্যন্ত ন্যায়পরায়ন ব্যক্তি ছিলেন।

সাড়া জাড়ানো পার্লামেন্টারিয়ান, কক্সবাজারের মাটি ও মানুষের প্রিয় নেতা মরহুম খালেকুজ্জামানকে স্মরণ করেছেন বিশিষ্টজনেরা।

স্মৃতি তুমি বেদনা
প্রফেসর মোশতাক আহমদ
ছায়া ঢাকা, পাখী ডাকা বিষন্ন এক নির্জন আরন্যক দুপুর। কলেজ ছুটি হয়ে গেছে অনেক আগে। থেমে গেছে ছেলে-মেয়েদের কলকোলাহল। উদাস দৃষ্টি মেলে তাকিয়ে আছি বাইরের অবারিত শ্যামল প্রকৃতির পানে। পত্র পল্লবের আড়াল থেকে করুন সুরে একটানা ডেকে যাচ্ছে স্বজন হারা এক ঘু ঘু। তন্ময় হয়ে ভাবছিলাম স্বপ্নিল-বর্ণিল মুছে যাওয়া দিনগুলোর কথা। কেমন এক অব্যক্ত অনুভূতিতে আচ্ছন্ন হয়ে আছে দেহ মন। জীবনের চাওয়া-পাওয়ার হিসাব মিলাতে গিয়ে ব্যর্থতার পাল্লাটাই যেন ভারি হয়ে উঠছে। কবি গুরুর বেদনার্থ উচ্চারণ অনুরণিত হচ্ছিল হৃদয়ের গহীন গহনে ঃ
‘তুই শুধু ছিন্ন বাধা পলাতক
বালকের মত
সারাদিন বাজাইলি বাঁশি’
এমন এক অপার্থিব মুহুর্তে যখন আমি মগ্ন চৈতন্য তখন হঠাৎ করে সরে গেলো দরজার পর্দা। ভেতরে ঢুকে দরজার পাশেই দাঁড়িয়ে পড়লেন এক সুদর্শন যুবক। তাঁর পেছনে পেছনে আমার অফিস কক্ষে ঢুকলেন আমারই স্কুল জীবনের শ্রদ্ধেয় শিক্ষক, কক্সবাজারের বিশিষ্ট শিল্পপতি জনাব আবুল কাশেম সাহেব। যুবকের পরনে সাদা মাঠা পায়জামা পাঞ্জাবী, চোখ মুটো মর্মভেদী প্রদীপ্ত প্রতিভার ঔজ্জ্বল্যে দেদীপ্যমান। মুখের দিকে তাকাতেই অত্যন্ত বিনয়ের সাথে পরিচয় দিলেন ‘আমি খালেকুজ্জামান’।
স্মৃতির দুয়ার খুলে গেলো আকস্মাৎ। মনের পর্দায় ভেসে উঠলো পুরানো ঢাকার অভয় দাশ লেইনের সেই লাল ইটের বাড়িটি। ও বাড়িতে সপরিবারে বাস করতেন পুর্ব পাকিস্তান হাইকোর্টের লব্ধ প্রতিষ্ঠিত আইনজীবী জনাব মৌলভী ফরিদ আহমদ। যিনি ১৯৫৪ সালে যুক্তফ্রন্টের প্রার্থী হিসেবে নির্বাচিত হয়েছিলেন পূর্ব পাকিস্তান লেজিসলেটিভ এসেম্বিলির সদস্য। আমি তখন ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ইংরেজী বিভাগের অনার্স দ্বিতীয় বর্ষের ছাত্র। পূর্ব পরিচয় সূত্রে ছুটির দিনে আমরা সে বাসায় যেতাম আর গল্প গুজবে সারাটা বেলা কাটিয়ে খাওয়া দাওয়া করে বিকালে ফিরে আসতাম হলে। জনাব ফরিদ আহমদ অত্যন্ত স্নেহ করতেন আমাকে। বিশেষ করে তাঁর সহধর্মীনি রিজিয়াবুর স্নেহের পরশ আমার সে দূর প্রবাস জীবনে মায়ের কথা সাময়িকভাবে ভুলিয়ে দিত। সেই ফরিদ-রিজিয়া দম্পতির স্নেহের ২য় সন্তান। তরুণ আইনজীবী, আইন ব্যবসা শুরু করেছেন হাইকোর্টে। সুযোগ্য পিতার সুযোগ্য সন্তান। ইতিমধ্যেই বিশিষ্ট আইনজীবী হিসেবে প্রতিষ্ঠিত করেছেন নিজেকে।
খালেককে দেখেছি তাঁর শৈশবে। আজ সুদীর্ঘ দিন পর তাঁকে দেখে এক অভাবনীয় অনুভূতিতে মনটা আচ্ছন্ন হয়ে গেল। তাঁদের বাসায় গেলেই গেটের সামনে আমাদের প্রথম দেখা হতো তাঁর সাথে। সম্ভাষণ জানানোর জন্য যেন অপেক্ষা করে আছেন। লজেন্সের ছোট প্যাকেটটি হাতে তুলে দিতেই দিতেন সে ভোঁ দৌড় আর তৃপ্তির হাসি হেসে মাকে জিজ্ঞেস করতেন, বলো তো মা, আমার মুঠোয় কি? সেই খালেক বাল্য কৈশোরের চৌকাঠ পেরিয়ে আজ ভরা যৌবনে পর্দাপন করেছেন। তিনি আজ কক্সবাজার রামু নির্বাচনী এলাকার সংসদ সদস্য পদপ্রার্থী। আলাপচারিতার এক পর্যায়ে বললেন মায়ের নির্দেশ আমার সাথে যেন অবশ্যই দেখা করে। পরামর্শ চাইছে নির্বাচনী প্রচারণায় কিভাবে নামবেন। দীর্ঘদিনের ব্যবধান। দেখা সেই কবে তাঁর ছেলেবেলায়। তাঁর রাজনৈতিক ধ্যান-ধারণা কিংবা কর্মকা- সম্মন্ধে আমার জানা নেই কিছুই। আামার কাছে চাইছেন পরামর্শ। কিইবা বলি তাঁকে।
তাঁর অসামান্য বাক বৈদগ্ধ্য আর আন্তর্জাতিক রাজনীতি সম্পর্কে স্বচ্ছ ধারণা ও গভীর জ্ঞান দেখে বুঝতে বাকি রইলো না এ যুবকের মধ্যে সুপ্ত আছে এক অসীম সম্ভাবনা। তাঁেক শুধু বললাম, মামা আপনি এলাকায় নবাগত। এলাকার আমজনতার কাছে কোন পরিচিতি নেই। জনতার কাছে যান। তাদের সাথে পরিচিত হন। আমার দৃঢ় বিশ্বাস আপনাকে ফিরিয়ে দেবে না। আমার প্রতীতি জন্মেছিল জনগণ এ যুবকের আকর্ষণীয় ব্যক্তিত্বের সান্নিধ্যে এলেই বুঝতে পারবে এ সেই ব্যক্তিত্ব যিনি পারবেন তাদের আশা আকাঙ্খার প্রতিফলন ঘটাতে জাতীয় রাজনীতিতে। নির্বাচনের ফলাফল ঘোষিত হলো। স্বল্প ভোটের জন্য খালেক জিততে পারলেন না। স্বভাবতই মুষড়ে পড়লাম। নির্বাচনের পর আবার তাঁর সাথে দেখা। হাস্যোজ্জ্বল সেই মুখ-চোখ। নির্বিকার ও শান্ত কন্ঠেই বললেন, মামা এবার হেরে গেলাম।
তাঁকে তো সান্ত¡না দেয়া যায় না। এ যুবক তো সে ধাতের নয়। তবুও আড়ষ্ট কন্ঠে বললাম, Cheer-up, my boy বললাম, আপনি রাজনীতিতে নবাগত। হয়তো জনতার বৃহত্তর অংশের কাছে সমেয়র স্বল্পতার কারণে পৌঁছাতে পারেননি। আগামীতে জনতার পাশে থেকে জনতাকে সাথে নিয়ে আপনার নির্বাচন কর্মকা- চালিয়ে যান। জনতা নিরাশ করবে না। এলো ১৯৯৬ সালের সংসদ নিবাচন, জনতার রায় গেলো তাঁর পক্ষে। বিপুল ভোটের ব্যবধানে সংসদ সদস্য নির্বাচিত হলেন খালেক।
নির্বাচনোত্তর তাঁর জনসংযোগের এক পর্যায়ে এলেন রামু কলেজে। সবার সাথে কোলাকুলি। ঠোঁটে লেগে আছে সেই আলৌকিক হাসির রেখা। বললাম, Khaleque Never Forget Your People , মাথা নেড়ে সায় জানালেন খালেক। জনতাকে ভালবেসেছিলেন খালেক। জনতাও তাঁকে বিনিময়ে দিয়েছে অফুরন্ত ভালবাসা। এ যাবৎ কক্সবাজার রামু এলাকায় জনতার এতো কাছে কোন নেতা এসেছেন কিনা আমার জানা নেই।
সংসদে গিয়েই চমক সৃষ্টি করলেন খালেক। সাংসদ হিসেবে জীবনের প্রথম বক্তব্য দিয়েই দৃষ্টি কাড়লেন সমগ্র জাতির। দেশের মানুষ হৃদয়ঙ্গম করতে পারলো, বাংলার ভাগ্যাকাশে উদিত হয়েছে এক উজ্জ্বল নক্ষত্র। তাঁর দল তখন বিরোধী আসনে। এলাকার উন্নয়নে তেমন একটা অবদান রাখতে পারছেন না। এ মর্মজ্বালা তিনি মাঝে মাঝে ঘনিষ্টজনদের কাছে ব্যক্ত করেছেন। তার পরও তাঁর সীমিত সাধ্যের মধ্যে জনগনের কল্যাণে, এলাকার উন্নয়নে যা করে গেছেন তা তাঁর প্রবল প্রতিপক্ষও র্নিদ্বিধায় স্মরণ করেন। স্থানীয় স্কুল, কলেজ, মাদ্রাসা মসজিদের উন্নয়নে রেখে গেছেন এক অনবদ্য অবদান। রামু কলেজ, কক্সবাজার সিটি কলেজ ও ইদগাঁও ফরিদ আহমদ কলেজ, রামু হাই স্কুল, নাদেরুজ্জামান হাই স্কুলসহ বিভিন্ন শিক্ষা প্রতিষ্ঠান উন্নয়নে তিনি পালন করেছেন প্রশংসনীয় ভূমিকা।
কম্পিউটার বিজ্ঞান শিক্ষা প্রবর্তনের জন্য তিনি প্রতি শিক্ষা প্রতিষ্ঠানে গিয়ে উদ্ভদ্ধ করেছেন কর্তৃপক্ষকে, আর তাঁর সে মহতী উদ্দ্যোগের সুফল ভোগ করছেন এলাকাবাসী। আজ বেশ কিছু স্কুল-কলেজে কম্পিউটার বিজ্ঞান শিক্ষা কোর্স চালু করা হয়েছে। যতদূর জানি তিনি ছিলেন একজন অত্যন্ত মেধাবী ও সফল কম্পিউটার বিজ্ঞানী। বাংলাদেশে কম্পিউটার শিক্ষা বিস্তার তথা কম্পিউটারের ব্যাপক ব্যবহার জনপ্রিয় করে তোলার ক্ষেত্রে তাঁর ভূমিকা অনস্বীকার্য।
এলাকার আর্থ-সামাজিক উন্নয়নের অবকাঠামো সৃষ্টিতেও তাঁর ছিল প্রবল আকাঙ্খা। পেশাগত জীবনে বিনা পারিশ্রমিকে তিনি অনেক অসহায় মানুষের মামলা পরিচালনা করে তাদেরকে কৃতজ্ঞতার পাশে আবদ্ধ করে গেছেন। দুঃস্থ মানুষের দুঃখ দুর্দশা ষ্পর্শ করে যেত তাঁর কোমল হৃদয়, মানুষের দুঃখের কথকতা শুনতে শুনতে তাঁর দু’চোখ বেয়ে অশ্রু গড়িয়ে যেতেও দেখেছি।
পৃথিবীর অনেক দেশ ভ্রমণ করার দুর্লভ সুযোগও তার ভাগ্যে জুটেছিল। বিভিন্ন সংস্কৃতির সংস্পর্শে আসার ফলে এক উদার ও আধুনিক মনের মানুষ হয়ে উঠেছিলেন তিনি। সুখী সমৃদ্ধ বাংলাদেশ তথা সুশীল সমাজ গঠনের স্বপ্ন দেখতেন তিনি। তাঁর আলাপারিচতার মধ্যে এ প্রত্যয় ফুটে উঠতো। সময় পেলেন না তিনি। আশৈশব লালিত স্বপ্নের সফল রূপায়ন দেখে যাবার সৌভাগ্য হলো না তাঁর। অথচ তাঁর মুখে উচ্চারিত হতো Robert Frost- এর অমর বাণী :
The woods are lovely
dark and deep
But I have promises to keep
And miles to go before I sleep
And miles to go before I sleep

খালেক নেই। বেঁচে আছে তাঁর স্মৃতি। খালেক, তোমার কীর্তির চেয়ে তুমি যে মহৎ। জনগণ হারিয়েছে এক মহান ব্যক্তিত্বকে উল্কার মতো ছিল যার উত্থান আর উল্কার মতো ছিল যার তিরোধান। তাঁকে আর দেখা যাবে না ছুটে যেতে গ্রামে থেকে গ্রামান্তরে। আর দেখা মিলবে না দুঃখী মানুষের মুখে হাসি ফুটাবার দৃঢ় প্রত্যয়ে উদ্দীপ্ত এক মানুষকে। কবি গুরুর চিত্তে যে নরশ্বতার চেতনা বারে বারেই বাঙ্খময় হয়ে উঠেছে তাঁরই যেন প্রতিফলন পাই খালেকের জীবনে, তার জীবনাচরণে ঃ
স্ফুলিঙ্গ তার ক্ষণকালের
পাখায় পেল ছন্দ,
উড়িয়ে গিয়ে ফুরিয়ে গেল
এই তারই আনন্দ।
প্রচার বিমুখ এ যুবক ছিলেন অত্যন্ত ধীশক্তির অধিকারী। কলেজ-বিশ্ববিদ্যালয় জীবনে তাঁর মেধার সুস্পষ্ট স্বাক্ষর রেখে গেছেন তিনি। মির্জাপুর ক্যাডেট কলেজ থেকে মাধ্যমিক পাশ করেন অত্যন্ত কৃতিত্বের সাথে। পরবর্তীতে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের Institute of Business Administration থেকে প্রথম শ্রেণীতে প্রথম স্থান অধিকার করে পাশ করেন MBA, IUBAT এর একজন সফল শিক্ষক হিসেবে তিনি ছাত্র-ছাত্রীদের শ্রদ্ধা ও প্রশংসা অর্জন করেছেন। LLB পরীক্ষাতেও তিনি তাঁর প্রতিভার পরিচয় দিয়েছেন।
সদালপী, নিরহংকার, সহজ সরল এ দুর্লভ ব্যক্তিত্ব খালেকুজ্জামান। মানুষকে সহজে আপন করে নেবার এক সহজাত ক্ষমতা ছিল তাঁর।
মনে পড়ে ২০০১ সালের নির্বাচনের প্রাক্কালে রামু উপজেলা মিলনায়তনে নির্বাচনে আইন-শৃঙ্খলা নিশ্চিত করার উদ্দেশ্যে উপজেলা কর্তৃপক্ষ সব দলের নেতা এবং এলাকার বিশিষ্ট ব্যক্তিদের এক সভা আহ্বান করে। আমন্ত্রিত ছিলেন নির্বাচনে প্রতিদ্বন্দ্বিতাকারী সকল প্রার্থী। তৎকালীন জেলা প্রশাসক এর উপস্থিতিতে সভা আরম্ভ হয়। প্রার্থীদের মধ্যে উপস্থিত ছিলেন কেবল খালেক।
তাঁর বক্তব্যে তিনি বললেন, আমি সন্ত্রাসে বিশ্বাস করি না, আমার দলে সন্ত্রাস নেই। আমার প্রতিপক্ষ জনাব মোস্তাক আহমদ চৌধুরীও একজন ভালো মানুষ। আমি জানি, তিনিও সন্ত্রাসের ঘোর বিরোধী। তাঁর দলও সন্ত্রাসীদের পশ্রয় দেয় না। নির্বাচনে ইনশা-আল্লাহ আইন-শৃঙ্খলার কোন বিঘœ ঘটবে না। এ দৃঢ় বিশ্বস আমার আছে।
কতবড় মাপের মানুষ হলে প্রতিপক্ষ প্রার্থীর ব্যাপারে এ প্রশংসনীয় মন্তব্য করতে পারেন আরেকজন প্রতিদ্বন্দ্বী প্রার্থী। মানব সেবার মহান ব্রতে উদ্দীপিত ছিল তাঁর চৈতন্যলোক। শিক্ষা দীক্ষায়, চলনে-বলনে, প্রজ্ঞায় মননে খালেক রেখে গেছেন এক স্মরণীয় বরণীয় দৃষ্টান্ত আগামী প্রজন্মের জন্য।
মানুষের ভালোবাসা পেতে হলে মানুষকে ভালবাসতে হয় এ সত্যটাই পরিস্ফুট হয়ে উঠেছে তাঁর জীবনে। আমার স্নেহাম্পদ খালেক, আমার নেতা খালেক, গণমানুষের আশা আকাঙ্খার মূর্তপ্রতীক খালেক, দুঃখী মানুষের একান্ত আপনজন খালেক আজ আর নেই। অকালেই চলে গেলেন তিনি।
খালেক তুমি ঘুমাও পরম প্রশান্তিতে, অনন্ত শয়ানে। আমরা তোমার স্মৃতি নিয়ে জেগে আছি এ বাংলায়।
………

এডভোকেট খালেকুজ্জামানকে যেমন দেখেছি
ফজলুল করিম
‘আমি অর্থের রাজনীতি করি না। আমি অস্ত্রের রাজনীতি করি না। আমার রাজনীতি ভালবাসার রাজনীতি। আমার রাজনীতি মানুষের কল্যাণের রাজনীতি।’ কথা কয়টি বলেছিলেন মরহুম এডভোকেট খালেকুজ্জামান। সুবিধাবাদী, স্বার্থান্ধ, নোংরা রাজনীতিতে গোটা জাতি যখন বীতশ্রদ্ধ, অর্থের ছড়াছড়ি এবং অস্ত্রের ঝনঝনানিতে মানুষ হতবাক; স্বজনপ্রীতি আর আত্মীয়তোষণের রাজনীতিতে যখন দেশের মানুষ তাদের ভবিষ্যৎ নিয়ে হতাশাগ্রস্ত, কালোবাজারী, হাইজ্যাক, ছিনতাই এবং রাহাজানি যখন পুরো দেশটাকে গ্রাস করে ফেলছিল। ঠিক তখন বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী দলের পতাকা হাতে রাজনৈতিক অঙ্গনে এডভোকেট খালেকুজ্জামানের আগমন যেন একটা বিস্ফোরণ। তাঁর বজ্র-নির্মোষ ঘোষণায় দ্বিধাগ্রস্ত জনতা চমকে উঠল। নিস্তেজটা কেটে গেল। পিটপিটিয়ে তাকাল মানুষ সে আগুন্তকের দিকে। কে এ ব্যক্তি? মরুভূমির বুকফাটা তৃষ্ণার মধ্যে সামান্য বারিদান! শান্ত, স্নিগ্ধ, সমাহিত চেহারার লোকটি জনতাকে কাছে ডাকলেন, তাঁর মনের কথা বললেন। উৎকর্ন হল জনতা, শুরু হলো কানাকানি। কথায় বলে-ঘরপোড়া গরু সিঁদুরে ভয় পায়। পরিবেশকে বদলানো সময় সাপেক্ষ ব্যাপার। চালবাজী ও ধোকাবাজীতে অতিষ্ট জনতা ভাবতে শুরু করল-এ নতুন ধোকাবাজী নয়তো ? জাতীয রাজনীতির এ সন্ধিক্ষণে নিঃস্পৃহ জনতা ভোট দিল ১৯৯১ সনের নির্বাচনে। ফলাফল যা হবার তাই হলো। দল ক্ষমতায় গেল। কিন্তু জনাব খালেকুজ্জামান নির্বাচিত হলেন না। মাত্র কয়েকশ ভোটের ব্যবধানে তিনি হেরে গেলেন। রাজনীতিতে নবাগত খালেক সাহেব হাতে প্রচুর সময় পেলেন। তিনি গেলেন মানুষের দ্বারে দ্বারে। তাঁর অমিয়বাণী, ন্যায়নিষ্ঠা কাজ গরীব-দুঃখি-মেহনতি মানুষের প্রতি অকৃত্রিম ভালবাসা। সর্বোপরি সত্য ও ন্যায়ের প্রতি তাঁর আপোষহীন সংগ্রাম মানুষ উপলব্ধি করল।

আসল ১৯৯৬ সনের জাতীয় নির্বাচন। আবার প্রতিদ্বন্দ্বিতা। আবার ভোটযুদ্ধ ভাবতে অবাক লাগে তাঁর নিকটতম প্রতিন্দ্বন্দ্বীকে প্রায় আধাআধি ভোটের ব্যবধানে পরাজিত করে খালেক সাহেব সাংসদ নির্বাচিত হলেন; কিন্তু দল ক্ষমতায় যেতে পারল না। এশিয়া মহাদেশের অন্যতম শ্রেষ্ঠ পার্লামেন্টারিয়ান, সত্যের সৈনিক, ন্যায়ের ধ্বজাধারী, আপোষহীন নেতা মরহুম মৌলভী ফরিদ আহমদের ২য় ছেলে এডভোকেট খালেকুজ্জামান। পিতার মত তিনিও কক্সবাজারের রাজনীতিতে জড়িয়ে পড়েন। কক্সবাজার ছিল তদানীন্তন পাকিস্তানের একটা অখ্যাত মহকুমা। সঠিক নেতৃত্বের অভাবে প্রচুর সম্ভাবনাময় কক্সবাজার ছিল বলতে গেলে সভ্য জগতের অগোচরে। জনাব ফরিদ আহমদের নেতৃত্বে এবং ঐকান্তিক প্রচেষ্টায় কক্সবাজার তৎকালীন পাকিস্তান তথা বিশ্বের দৃষ্টি আকর্ষণ করে এবং প্রসিদ্ধি লাভ করে। আজ কক্সবাজার পৃথিবীর একটা চেনাজানা শহর। বহুমুখি জ্ঞানের অধিকারী এডভোকেট খালেকুজ্জামান সাহেব রাজনীতিতে আসবেন এমন কোন পূর্ব সিদ্ধান্ত ছিল না। বহুধা বিভক্ত কর্মক্ষেত্রে তাঁর প্রতিভা বিকাশের অনুকুল স্থান বেছে নিতে তিনিও বোধ হয় কিছুটা দ্বিধাগ্রস্ত ছিলেন। একদিকে তিনি যেমন ছিলেন শ্রেষ্ঠ তার্কিক, অন্যদিকে তিনি ছিলেন একজন বিশিষ্ট কম্পিউটার বিজ্ঞানী। একদিকে ছিলেন প্রখ্যাত শিক্ষক, অন্যদিকে ছিলেন বিদগ্ধ আইনজীবী। তবে যেখানেই তিনি অবস্থান করেছেন এবং সে অবস্থান স্বল্প সময়ের জন্য হলেও তাঁর প্রতিভার ছাপ রেখে তিনি সকলকে বিমোহিত করেছেন। আর্ন্তজাতিক খ্যাতি সম্পন্ন কমপক্ষে দশটি বাণিজ্যিক ও সামাজিক প্রতিষ্ঠানের তিনি ছিলেন বিশেষজ্ঞ কম্পিউটার পরামর্শক। মৃত্যুর আগ পর্যন্ত তিনি সে সব পদে বহাল ছিলেন।
উশৃঙ্খল বা অসামাজিক জীবন তাঁকে কোনদিন স্পর্শ করতে পারেনি। পিতার মত তিনি সব সময় ধর্মীয় বিধান অনুসারে জীবন যাপনে অভ্যস্ত ছিলেন। তিনি ছিলেন অধ্যয়ন প্রিয়। বই ছিল তাঁর নিত্যদিনের সঙ্গী। জ্ঞান আহরণের অতৃপ্ত বাসনা যেন সব সময় তাঁকে তাড়া করে ফিরেছে। তাঁর ছাত্র জীবন বিশ্লেষণ করলে তা বুঝা যায়। প্রচলিত নিয়মে আমাদের দেশে মাধ্যমিক স্তর হতে চর্চার ক্ষেত্রকে বিজ্ঞান, মানবিক এবং বাণিজ্য এ তিন শাখায় বিভক্ত করা হয়েছে। জ্ঞানের তিনটি শাখার প্রতিই তাঁর প্রচ- আগ্রহ ছিল। তাই তিনি মাধ্যমিক স্তর শেষ করেছেন বিজ্ঞান শাখায়। স্নাতক করেছেন মানবিক শাখায় এবং স্নাতকোত্তর করেছেন বাণিজ্য শাখায়। বিরল প্রতিভার এ লোকটি প্রতিটি শাখাতেই কৃতিত্ব প্রদর্শনে সক্ষম হয়েছিলেন। কতটুকু মেধার অধিকারী হলে একজন ছাত্র এ খাপছাড়া জ্ঞান চর্চায় প্রতিটি ক্ষেত্রে কৃতিত্ব অর্জন করতে পারে তা ভাববার বিষয়।
ব্যক্তিত্বের দ্বন্দ্ব, স্বার্থের টানাটানি দলীয় রাজনীতিকে অনেক সময় ক্ষতবিক্ষত করে। এর পরিনাম যে কত ভয়াবহ সেটা আমাদের চেয়ে আর কেহ বেশি বুঝবেন না। রাজনৈতিক অঙ্গনে খালেক সাহেবও তার ব্যতিক্রম ছিলেন না। তিনি দলের ভিতর হতে যেমন বিরোধিতার সম্মুখীন হয়েছেন, তেমনি দলের বাহির হতেও প্রচ- প্রতিদ্বন্দ্বিতার মোকাবিলা করেছেন। রাজনীতি করতে গিয়ে এ শান্ত শিষ্ট লোকটি নির্মমভাবে আক্রান্ত হয়েছেন। অশালীন ভাষায় গালিগালাজ শুনেছেন এবং লাগামহীন বিশ্রী সমালোচনা সহ্য করেছেন। কিন্তু তিনি কোনদিন প্রতিপক্ষকে আক্রমণ করেন নাই। আক্রমণ করার জন্য প্ররোচিত করেন নাই। তাঁর শত শত জনসভায় ভুলক্রমেও কারো বিরুদ্ধে আক্রমণাত্মক ভাষা ব্যবহার করেন নাই। সাধারণ মানুষের একজন হয়ে তাদের সাথে মিশবার চেষ্টা করেছেন। তাদের দুঃখ কষ্টের ভাগী হতে চেয়েছেন। সহজ সরল খেটে খাওয়া মানুষগুলোর সমস্যা লাঘবে কি করা যায় সে ব্যাপারে অনন্তর ভেবেছেন।
তিনি তিন তিনবার নির্বাচনে লড়েছেন। তাঁর নির্বাচনী কৌশল ছিল প্রচলিত নিয়মের ব্যতিক্রম। তিনি দৃঢ়ভাবে বিশ্বাস করতেন পারিপার্শ্বিকতার ছাপে আচ্ছন্ন মানুষের মানসিক সত্তাকে বিমুক্ত করতে পারলে সত্যকে সহজে প্রতিষ্ঠিত করা যায়। ২০০১ সালের তাঁর নির্বাচন ছিল তার উৎকৃষ্ট প্রমাণ। দলীয় কোন্দল এবং প্রচলিত রাজনীতির উল্টো পথে চলার কারণে তাঁর কর্মী বাহিনী খুব বেশি ছিল এ কথা বলা যাবে না। অঢেল টাকা পয়সা খরচ করে প্রচারে বৈচিত্র সৃষ্টি করবেন সে উপায়ও তাঁর ছিল না। কিন্তু তিনি শ্রম দিয়েছেন সীমাহীন।
কক্সবাজার সদর উপজেলা এবং রামু উপজেলার এমন কোন গ্রাম বা মহল্লা নাই যেখানে তাঁর কদম পড়েনি। এমন লোক খুব কমই আছে যার সাথে কুলাকুলি করেননি বা দুটো কথা বলেননি। জনগণের মধ্যে এক অভূতপূর্ব সাড়া সৃষ্টি করেছিলেন তিনি। দুইটি উপজেলায় প্রায় সব মানুষ যেন রাজনৈতিক মত পার্থক্য ভুলে এক কাতারে এসে দাঁড়িয়েছিলেন। ফলে নির্বাচনের কাছকাছি এসে তাঁর প্রতিপক্ষ প্রতিদ্বন্দ্বিতা করার স্পৃহা অনেকটা হারিয়ে ফেলেছিলেন। দুঃখের বিষয় সে নির্বাচনের ফলাফল তিনি দেখে যেতে পারেননি। নির্বাচনের মাত্র দুইদিন আগে তিনি ইহধাম ত্যাগ করে জান্নাতবাসী হয়েছেন। এলাকার জনগণ ভোট পার্থক্যে তাঁর প্রতিদ্বন্দ্বীকে পরাজিত করে রাজনৈতিক ইতিহাসে রেকর্ড সৃষ্টি করতেন।
খালেক সাহেব দীর্ঘদিন বাঁচেন নাই। মাত্র ৪৮ বৎসর বয়সে তিনি পরলোক গমণ করেন। প্রতিভা বিকাশের অনুকূলে বয়সে তিনি লোকান্তরিত হয়েছেন। কবির ভাষায় বলতে গেলে-
‘জন্মিলে মরিতে হবে অমর কে কোথায় কবে,
চিরস্থির কবে নীর হায়রে জীবন নদে!’
প্রকৃতির অমোঘ নিয়মে খালেক সাহেব মৃত্যুবরণ করেছেন। কিন্তু সে মৃত্যু ছিল অভাবনীয়, অচিন্তনীয়। সেদিন ছিল শরতের স্বচ্ছ বিকাল। আকাশে সাদা মেঘের আনাগোনা। উত্তপ্ত প্রকৃতি। রামু বাইপাসের পাশে প্রায় দেড় কিলোমিটার জায়গা লোকে লোকারণ্যে। খালেক সাহেবের নির্বাচনী জনসভা। মাঝখানে সুউচ্চ মঞ্চ। বিশাল সমাবেশের কথা চিন্তা করে মঞ্চ হতে অনেক দূর পর্যন্ত মাইক্রোফন টনানো হয়েছে। রাজনৈতিক নেতৃবৃন্দ বক্তব্য রেখে চলছেন। সভার বিশেষ আকর্ষণ প্রিয় নেতা তখনও সভাস্থলে এসে পৌঁছাননি। সকলের উৎসুক দৃষ্টি। কবে আসবেন নেতা? বেলা পাঁচটা বাজে। সভার সামনের দিক হতে একটা খোলা পিক-আপ অতি মন্থর গতিতে মঞ্চের দিকে এগিয়ে আসছে। চারদিকে কানফাটা তালি আর গগন বিদায়ী স্লোগান। বাংলাদেশ-জিন্দাবাদ। বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী দল-জিন্দাবাদ। খালেক ভাই এগিয়ে চলো- আমরা আছি তোমার সাথে। জীপের উপর দাঁড়িয়ে নেতা। হাত তুলে জনতার অভিবাদনের জবাব দিচ্ছেন। প্রসন্ন চেহারা, মুখে মৃদু হাসি। মঞ্চের ২০/৩০ ফুটের মধ্যে জীপ থামল। জনতার ভিড় ঠেলে সামনে যাওয়া সম্ভব নয় দেখে তিনি নেমে পড়লেন। কিন্তু এ কি? তিনি লুটিয়ে পড়ছেন। জনগণ কাঁধে করে মঞ্চে এনে শুইয়ে দিলেন। তারপর হাসপাতালে এবং সব শেষ। ২৯ সেপ্টেম্বর স্থানীয় জেলে পার্কে তাঁর সর্বশেষ নির্বাচনী জনসভা হবার কথা ছিল। তাঁর সর্বশেষ নির্বাচনী সভা হলো তাঁর নামাজে জানাজা। প্রায় চার লক্ষ লোক জানাজায় শরীক হয়ে নেতাকে শেষ শ্রদ্ধা জানালেন এবং পিন পতন নীরবতার মাধ্যমে তাঁর বিদেহী আত্মার মাগফেরাত কামনা করলেন। কক্সবাজারের ইতিহাসে এ জানাজা ছিল সর্ববৃহৎ জানাজা। খালেক সাহেব চলে গেছেন। কিন্তু আামদের জন্য তিনি রেখে গেছেন কয়েকটি প্রশ্ন ঃ
ক. আমাদের রাজনীতিকে কি অস্ত্রমুক্ত করা যায় না?
খ. কালো টাকার প্রভাব কি রাজনীতির অঙ্গনে প্রবাহমান থাকবে?
গ. স্বার্থপরতা, স্বজনপ্রীতি, দূর্নীতি, ধোকাবাজী হতে সমাজকে কি মুক্ত করা সম্ভব নয়?

……………………….
খালেক ভাই তাঁর কথা রেখেছেন
মুহাম্মদ শামসুল হক শারেক
তুখোড় বক্তা ইসলামী ব্যক্তিত্ব তৎকালীন পাকিস্তান জাতীয় পরিষদ সদস্য ও মন্ত্রী মৌলবী ফরিদ আহমদের একনিষ্ট ভক্ত ছিলেন আমার বাবা। এ সুবাদে মৌলবী ফরিদ আহমদের নাম অনেক শুনেছি আমি। কিন্তু জীবনে তাঁকে দেখেছি একবার। তাও ছোট বেলায় উখিয়া ষ্টেশনের এক জনসভায়। ডক্টর ফজলুর রহমানের কুরআন শরীফ নিয়ে মনগড়া মন্তব্য ও লেখালেখির প্রতিবাদে তিনি বক্তব্য দিচ্ছিলেন ওই জনসভায়। তখন থেকে কেন যেন আমিও তাঁর ভক্ত হয়ে যাই। পরবর্তীতে তাঁরই যোগ্য সন্তান সাবেক এমপি মরহুম এড. খালেকুজ্জামান ও সাবেক এমপি ইঞ্জিনিয়ার মোহাম্মদ সহিদুজ্জামানের সাথে গড়ে উঠে আমার পরিচিতি ও হৃদ্যতা ।
১৯৯৬ সালে দৈনিক হিমছড়ি প্রকাশ করে আমি সাংবাদিকতায় আত্ম নিয়োগ করি। এ সুবাদে দেশের অনেক ভিভিআইপি, ভিআইপি ও গুরুত্বপূর্ণ মানুষের সাথে আমার পরিচিত হওয়ার সুযোগ হয়। তখন জাতীয় সংসদ নির্বাচনের প্রচারণা চলছিল। শহরের রুমালিয়ারছরা ষ্টেশনে একটি গ্রোসারী সপে আমি কেনাকাটা করছিলাম। সময়টি সম্ভবত মাগরিবের পর। আমি আঁচ করতে পারলাম পেছন দিক থেকে আমাকে কেউ জড়িয়ে ধরেছেন। তাঁর হাত দুটি ছাড়িয়ে নিয়ে আমি পেছনে ফিরে দেখি অমলিন হাস্যোজ্জ্বল চেহারা নিয়ে আস্সালামু আলাইকুম বলে অত্যন্ত বিনয়ের সাথে বললেন “শারেক ভাই আমি খালেকুজ্জামান। আপনাকে কষ্ট দিলাম”। সেখানে দাড়িঁয়েই তাঁর সাথে কুশল বিনিময় হল। ইতিমধ্যে সেখানে যোগ দিলেন তৎকালীন শ্রমিক দলের নেতা হামিদ উদ্দিন ইউসুফ গুন্নু। এভাবে আমার সাথে পরিচয় হয় কক্সবাজারের অত্যন্ত একজন মেধাবী, বিনয়ী ও যোগ্য নেতা মরহুম এডঃ খালেকুজ্জামানের সাথে। তাঁর পিতা মৌলবী ফরিদ আহমদের প্রতি আমার শ্রদ্ধা ছিল বিধায় সেদিন প্রথম সাক্ষাতেই খালেক ভাইকে আমার অনেক পরিচিত এবং খুব আপনজন বলেই মনে হয়েছিল।
খালেক ভাই তখন এমপি। হঠাৎ করেই একদিন দেখি রুমালিয়ার ছড়া (বাবুল ম্যানশনে) দৈনিক হিমছড়ি কার্যালয়ে এসে তিনি হাজির। তখন আজকের মত এত সংবাদ পত্র কক্সবাজারে ছিলনা। এভাবে হঠাৎ করে হিমছড়ি অফিসে খালেক ভাইয়ের উপস্থিতি আমাকে আবিভুত করেছিল। আমি কিছু দিনের জন্য শিশু শিক্ষা প্রতিষ্ঠান আলহেরা একাডেমীর পরিচালনার দায়িত্বে ছিলাম। পরের দিন ছিল একাডেমীর পুরষ্কার বিতরণী অনুষ্ঠান। দৈনিক সৈকত সম্পাদক বন্ধুবর মাহবুবুর রহমানকে আমি অনুরোধ জানালাম পরের দিন অনুষ্ঠানে খালেক ভাইকে প্রধান অতিথি করার জন্য। প্রস্তাবটি তাঁকে জানানোর সাথে সাথেই রাজি হয়ে গেলেন নিরহংকারী বিনয়ী নেতা খালেকুজ্জামান। পরের দিন যথারীতি প্রধান অতিথি হিসেবে অনুষ্ঠানে যোগ দিলেন এবং আলহেরা একাডেমীর উন্নয়নে তিনি উল্লেখযোগ্য ভূমিকা পালন করেন।
আমাদের দেশের রাজনীতিতে দলাদলি, গ্রুপিং এর ঘটনা অনেক পুরানো হলেও আজকের মত কুৎসিত দৃশ্য হয়ত অতীতে ছিল না। চরম মতদ্বৈততার পরেও সেকালে রাজনীতিবিদদের মধ্যে পরষ্পর সৌহার্দ্য, এবং শান্তিপূর্ণ সহাবস্থানের কথাও ইতিহাসে রয়েছে। কিন্তু মতদ্বৈততা থেকে এখন হানাহানি, খুনাখুনী পর্যন্ত গড়াচ্ছে রাজনীতিবিদদের সর্ম্পক। এটি আরো কুৎসিত হয় যখন একই দলের মধ্যে এই অবস্থার সৃষ্টি হয়। দলীয় কোন্দলের কারণে এ রকম একটি কঠিন এবং নির্মম পরিস্থিতি মোকাবেলা করতে হয়েছিল এডভোকেট খালেক্জ্জুামানকে।
২০০১ সালে জাতীয় নির্বানের ডামাডোল শুরু হয়েছে। কক্সবাজার সদর আসনে বিএনপির মনোনয়ন নিয়ে চলছিল প্রচ- গ্রুপিং। ওই পরিস্থিতিতে খালেক ভাই কক্সবাজার সদর ও রামুর তৃণমূল নেতা কর্মীদের এক প্রতিনিধি সভা আহবান করলেন আলীর জাঁহালে উর্মি কমিউনিটি সেন্টারে। দৈনিক সৈকত সম্পাদক মাহুবুবুর রহমানের অনুরোধে ওই সভার সংবাদ কভার করার জন্য আমিও গিয়েছিলাম সেখানে। আগে থেকে আমার ধারণা ছিল ’৯৬’র সংসদে খালেক ভাই বিরোধী দলের এমপি থাকার কারণে হয়ত তৃণমূলে জনগনের কাছে তিনি পৌছঁতে পারেননি বা তেমন জনসম্পৃক্ততা গড়ে উঠেনি। কিন্তু না উর্মি কমিউনিটি সেন্টারে গিয়ে আমার ধারণা পাল্টে যায়। সেখানে গিয়ে কিছুটা আচঁ করা গেল কক্সবাজার সদর ও রামুর তৃণমূলে এড. খালেকুজ্জামানের অবস্থান এবং তাঁর প্রতি দলীয় নেতা-কর্মীসহ সর্বস্থরের মানুষের ভালবাসা ও সমর্থন। সেদিন উর্মি কমিউনিটি সেন্টারের প্রতিনিধি সভায় রামু-কক্সবাজারের তৃণমূল প্রতিনিধি যারা উপস্থিত ছিলেন সদর আসনে এমপি হওয়ার মত ভোট যোগাড় করতে তারাই যথেষ্ট বলে আমার মনে হল।
সভাস্থলে ঢুকতেই খালেক ভাই আমাকে ডেকে নিয়ে চেয়ার খালি করে তাঁর কাছে নিয়ে বসালেন। একটু পরে অন্য একজন গুরুত্বপূর্ণ নেতাকে চেয়ার ছেড়ে দিয়ে আমি বাইরে ওয়েটিং রোমে অপেক্ষা করছিলাম। সাংবাদিক মাহবুবুর রহমান ও বিএনপি নেতা নুরুস সোলতানকে ব্যতিব্যস্ত দেখে কোন সংঘাত-সংর্ঘষ হতে পারে এই ভেবে আমি উদ্বিগ্ন হয়ে পড়লাম। হ্যাঁ ঠিকই গুলি আর ককটেলের প্রচন্ড আওয়াজে প্রকম্পিত হল উর্মি কমিউনিটি সেন্টার। বুঝা গেল সম্মেলন স্থলে সন্ত্রাসী হামলা হয়েছে। উপস্থিত লোকজন দিকবিদিক ছুটাছুটি করছে। গুলিতে আহত হলেন খালেক ভাইসহ অনেকেই। নিবেদিত প্রাণ কর্মীরা তাঁকে আগলে রেখে আত্ম রক্ষার চেষ্টা করছিল গুলি ককটেল ও লাঠি নিয়ে হামলা ও মারাত্মক অঘটন থেকে। তার পরে ও খালেক ভাইয়ের বাম হাতের আঙ্গুলে গুলি লেগে রক্তাক্ত হন তিনি। মোবাইলটি পড়ে গিয়ে ভেঙ্গে যায়। তাঁর সহকর্মীরা খালি হাতে হামলাকারীদের প্রতিরোধ করতে দেখা যায়। এ তান্ডব চলাকালে র্পাশ্ববর্তী আর্মি শেডের ল্যান্ড ফোন থেকে আইন শৃঙ্খলা বাহিনীকে খবরটি আমি জানাই।
সভা পন্ড করে দিয়ে হামলাকারীরা পালিয়ে যায়। কিন্তু খালেকুজ্জামানের সমর্থনে সভায় আগত তৃণমূল প্রতিনিধিরা দিক-বিদিক ছুটোছুটি করলেও কেউ পালিয়ে যায়নি। পুনরায় সংগঠিত হয়ে শুরু হয় প্রতিনিধ সভা। এসময় শারিরীক ভাবে আহত ও মানসিক ভাবে বিপর্যস্ত খালেকুজ্জামান উপস্থিত প্রতিনিধিদের লক্ষ্য করে আবেগময় ও হৃদয়গ্রাহী এক বক্তব্য রাখেন। খালেক ভাই বললেন, ‘সম্মানিত রামু-কক্সবাজারের মুরব্বিগণ, আপনারা আমার পিতৃতুল্য। আমার বাবা আজীবন দেশে ও জাতির জন্য কাজ করে ছিলেন। তিনি নির্মম ভাবে শহীদ হয়েছেন। আজকে আপনাদের সামনেই আমার উপর সন্ত্রসী হামলা হল। তারা আমার বাবার মত আমাকেও দুনিয়া থেকে বিদায় দিতে চেয়েছিল। আল্লাহর মেহেরবানিতে আমি বেঁচে থাকলেও শারীরিক ভাবে আহত এবং মানসিক ভাবে বিপর্যস্ত
। আমার অনেক সহকর্মী ভায়েরা আহত হয়েছেন, রক্তাক্ত হয়েছেন।’ তিনি আরও বলেন, ‘ঢাকার অনেক আরাম আয়েশের জীবন ছেড়ে আপনাদের ভালবাসায় আমি এই কঠিন জীবন বেছে নিয়েছি। রামু কক্সবাজারের মাঠে-ঘাটে, পথে-প্রান্তরে, পাড়ায়-মহল্লায় আমি আপনাদের পরীক্ষিত বন্ধু। যারা আজকে আমার উপর হামলা করেছে তারা চায় আমি কক্সবাজারের রাজপথ ছেড়ে, আপনাদের ছেড়ে চলে যাই। আমি আপনাদের কাছে জানতে চাই হামলাকারীরা যা চায় আমি তা করব কিনা ? আপনারা যদি বলেন আমি ঢাকায় ফিরে গিয়ে সেই আরাম আয়েশের জীবন যাপন করব। আর যদি বলেন আপনারা আমার পাশে থাকবেন, আমিও আপনাদের পাশে থেকে জীবন উৎসর্গ করে আপনাদের ভালবাসার মূল্য দিতে চেষ্টা করব।’ তখন সমস্বরে উপস্থিত সবাই জানালেন ‘না। আমরা আপনাকে ছাড়ব না, আপনিও আমাদের ছেড়ে চলে যাবেন না।’
সবচাইতে বড় কথা হলো ওই ঘটনায় তিনি রক্তাক্ত হলেন, তাঁর সহকর্মীরা আহত হলেন। কিন্তু মামলা হামলার মত কোন ঘটনা করে তিনি তার প্রতিশোধ নিলেন না। তিনি দেখালেন অহিংসা, সৃষ্টি করলেন ভালবাসা ও মমতার সেতু বন্ধন।
আরো দেখা গেছে, জীবন দিয়ে খালেক ভাই তাঁর সেই কথা রেখেছেন। উর্মি কমিউনিটি সেন্টারের প্রতিনিধি সভায় সেদিন সন্ত্রাসী হামলার পরে তিনি যে বলে ছিলেন ‘যদি বলেন আপনারা আমার পাশে থাকবেন, আমিও আপনাদের পাশে থেকে জীবন উৎসর্গ করে আপনাদের ভালবাসার মূল্য দিতে চেষ্টা করব’।
৪ দলীয় জোটের মনোনীত প্রার্থী কক্সবাজার-রামুর জনগণের ভালবাসায় সিক্ত খালেক ভাই কক্সবাজার-রামুবাসীর ভালবাসার মূল্য দিতে গিয়ে তাদের জন্য তিনি তাঁর জীবন উৎসর্গ করেছেন। ২৮ অক্টোবর’২০০১ রামুর লাখো মানুষের জনসভায় হেসে হেসেই তিনি দুনিয়া থেকে চলে গেলেন।
রামু-কক্সবাজারের জনগন সেদিন তাদের ভালবাসার মানুষটির এভাবে চলে যাওয়া মেনে নিতে পারেনি। তারা ভুলতে পারেনি খালেক ভাইয়ের নিরহংকারী অমলিন চেহারা। তারা খালেক ভাইয়ের ভালবাসার মূল্যায়ন করেছিলেন পরবর্তীতে তাঁর ছোট ভাই ইঞ্জিনিয়ার মুহাম্মদ সহিদুজ্জামানকে বিপুল ভাবে ভোট দিয়ে এমপি বানিয়ে। মরহুম এড, খালেকুজ্জামান অহিংস রাজনীতি ও সবাইকে ভালাবাসার যে রাজনীতি দিয়ে কক্সবাজার-রামুবাসীর মন জয় করেছিলেন আজ আমাদের সমাজে তার বড়ই অভাব অনুভূত হচ্ছে।
……………………….
জাতীয় সংসদে মরহুম খালেকুজ্জামানের উক্তি
‘সংসদ একটি স্কুলের মত’
জাতীয় সংসদে বক্তব্য রাখতে গিয়ে বাকপটু মরহুম খাকেুজ্জামান অনেক পা-িত্যময় বক্তব্য রেখেছিলেন। একদিন তিনি টোনা-টোনির গল্পের উপমা দিয়ে বলেছিলেন ‘টোনা যদি পিঠা খেতে চায় তাহলে টুনিকে তার প্রয়োজন। সরকারী দল যদি সফল হতে চায় তবে বিরোধী দলের সাহয্য প্রয়োজন। তিনি বলেন, সংসদ একটি স্কুলের মতো। যেখানে একেক দল একেক বিষয়ে পড়ালেখা করছে। বিএনপি পড়ছে ভূগোল নিয়ে। এজন্য তারা দেশের সীমান্ত, সার্বভৌমত্ব ইত্যাদি রক্ষার কথা বলে। জামায়াত পড়ছে ইসলামিয়াত নিয়ে। জাতীয় পার্টি অংকের ছাত্র। তারা হিসাব করতে থাকে কিসে সরকারী দল খুশি বা নাখোশ হয়। জাসদ সঙ্গীতের ছাত্র। যে সরকার আসে তার সাথে সুর মিলিয়ে সঙ্গীত সাধনা শুরু করেন। আওয়ামী লীগ ইতিহাসের ছাত্র। এজন্য তারা বর্তমান-ভবিষ্যত বাদ দিয়ে শুধু অতীতের কথা, বিগত দিনের কথা বলে। এসব বলতে বলতে তারা বর্তমান এবং ভবিষ্যত প্রজন্মের কাছে হারিয়ে যাবে। নিজেরাই একদিন হয়ে যাবে বিগত’।

…………………………..

প্রান্তিক, অবহেলিত মানুষের নেতা

মোহিব্বুল মোক্তাদীর তানিম

১৯৯৬ সালে সংসদ অধিবেশনের কোন এক কার্যদিবসে বিরোধীদলীয় একজন তরুণ সদস্য নিস্পৃহ , সাবলীল অথচ বলিষ্ঠ কন্ঠে বলে চলেছেন , ” … আমরা রাজনীতিবিদ ও রাজনৈতিক দলগুলো সবাই সবার বিরুদ্ধে লড়াই করছি। তাতে আমরা এক দল হেরেছি, অন্য দল জিতেছে। কিন্তু এরকম লড়াইয়ে বারবার কেবল জনগণ হেরেছে। আসুন আমরা একবার রাজনৈতিক দল গুলো হার মেনে নিয়ে জনগণকে বিজয়ী হওয়ার সুযোগ করে দেই। “ গতানুকতিকতার বাইরে এমন অকপটে, সাহসী, শ্রুতিমধুর তথাপি গণতান্ত্রিক, রাজনৈতিক বক্তব্যে সাড়া পড়ল মহান সংসদে, মিডিয়ায় আশানুরুপ কভারেজ আসল আর সর্বোপরি দেশব্যপী সচেতন জনগণের মনণে আগমন বার্তা পৌছাল নব নেতৃত্বের । তরুণ সাংসদ এর মধ্যেই তাঁর নির্বাচনী এলাকায় মানুষের ভালবাসায় সিক্ত হয়েছেন। ক্ষণজন্মা মরহুম এডভোকেট খালেকুজ্জামান কক্সবাজার-রামু বাসির নেতৃত্বে থেকেই একাধারে নিজ রাজনৈতিক দলের নীতি নির্ধারণী সহ বিভিন্ন গুরুত্বপূর্ণ ইস্যুতে নিজেকে জড়িয়ে, পরামর্শ দিয়ে নিজেকে প্রমাণ করেছিলেন জাতিয়তাবাদী আদর্শের সৎ দেশপ্রেমিক সৈনিক হিসেবে।

৪৮ বছরের জীবন তাঁর। আইন বিষয়ে সম্মান পাশ করেছেন, আই বি এ থেকে ফার্স্ট ক্লাস ফার্স্ট হয়ে এম বি এ করেছেন আর পেশাজীবন শুরু করেছেন একজন কম্পিঊটার প্রকৌশলী হিসেবে। আইন-ব্যবসা-প্রযুক্তি এই ত্রয়ী দক্ষতার সমণ্বয় করে মরহুম খালেকুজ্জামানের জীবন যেন একজন সত্যিকারের জনপ্রতিনিধি হয়ে উঠার গল্প – যে গল্পের করুণাত্নক সমাপ্তি লাখো জনতার ভালবাসার অংশগ্রহণের মাঝখানে আর এটি এমনই এক মৃত্যুঞ্জয়ী জননেতার গল্প যার সমাপ্তির মাঝেই যেন অনেকে খুঁজে পান নতুন করে শুরু করার প্রেরণা, জীবনকে সময়ের ফ্রেমে না বেঁধে তাকে সঠিকভাবে পরিচালিত করার সুনির্দেশনা। তৃতীয় বিশ্বের এক অনুন্নত অথচ সম্ভাবনাময়ী দেশের এক প্রান্তের এক অঞ্ছলের নেতা হয়ে ও তাঁর ক্ষণ জীবন আমাদের মনে করিয়ে দেয় মার্টিন লুথার কিং এর বর্ণবাদ বিরোধী আদর্শিক সংগ্রামের ডাক কিংবা শহীদ প্রেসিডেন্ট জিয়াউর রহমানের জাতিয়তাবাদী চেতনা, যারা চল্লিশের কোটায় জীবন অধ্যায় থেকে হারিয়ে গিয়েছেন কিন্তু রেখে গেছেন হাজারো বছরের নির্দেশনা, অনুপ্রেরণা। প্রত্যাশিত জীবন সময়ের চেয়ে অনেক কম সময় পেয়ে ও যারা অনেকের আলোকিত জীবনের জন্য এখনো বেঁচে আছেন নিশানা হয়ে। মরহুম খালেকুজ্জামান এখনো তাঁর লাখো সমর্থক, স্বজনদের কাছে ছায়া সঙ্গী হয়ে আছেন একজন ভাল মানুষ হিসেবে। দীপ্তিময় শিক্ষাজীবন, অনুকরণীয় পেশাজীবন, সাবলীল সাংসদ, গণমানুষের সাহচর্যময় জননেতা আর সবকিছুকে ছাপিয়ে স্বকীয় নেতৃত্বগুণ দিয়ে মানুষকে মোহিত করার আশ্চর্যময় যাদুকরী ক্ষমতার এ নেতাকে নিয়ে কিছু লিখার দায়বদ্ধতা আমার কয়েকটি কারণে। প্রথমত- মরহুম খালেকুজ্জামানের রাজনৈতিক জীবনের প্রায় পুরো সময়জুড়ে স্থানীয় গণসংযোগ, সভা-সমাবেশ-মিছিলে অংশগ্রহণ কিংবা সিদ্বান্ত গ্রহণের মত গুরুত্বপুর্ণ সময়ে আমার বাবা মরহুম মাহাবুবর রহমান চৌধুরী ছিলেন তাঁর ঘনিষ্ঠ সহযোদ্ধা, দ্বিতীয়ত- উনার বহুমাত্রিক শিক্ষা, পেশা ও রাজনীতিতে প্রত্যক্ষ অংশগ্রহণের বৈচিত্র্যময় অথচ সফল পদার্পণ আমাকে প্রবলভাবে আকর্ষিত করে।

মরহুম খালেকুজ্জামান শুধুই একজন পার্লামেণ্টেরিয়ান হিসেবে নয়, উনি নিজেকে প্রমাণ করেছেন একজন সফল রাজনৈতিক সংগঠক, জনপ্রিয় নেতা ও সর্বোপরি একজন প্রকৃত সমাজ সেবক হিসেবে। আর ঘনিষ্ঠ স্বজন-বন্ধুমহলে তো তাঁর আরো অনেক গুণাবলি আছেই।

সংসদে সমালোচনার পন্থা যে কটুক্তি কিংবা ব্যক্তি আক্রমণ করা নয়, হাস্য রসাত্নক উপমা দিয়ে ও যে অনেক কঠিন বিষয়ের সহজ বিশ্লেষণ করা যায় তা খালেকুজ্জামান প্রমাণ করেছেন অনেকবার। সংসদে ভাষণ দিতে গিয়ে রাষ্ট্রপতির ভাষণ কে তুলনা করেছেন বিমানবালার হাসির সঙ্গে, বাজেটের উপর আলোচনা করতে গিয়ে বাজেটকে তুলনা করেছেন ছলনাময়ী সুন্দরী রমণীর সঙ্গে। “বাজেটে ভাল কথা আছে, তাই প্রথম দর্শনেই গরীব একে ভালবাসবে কিন্তু একদিন এ বাজেট ধনীর রাণী হয়ে গরীবকে ফাঁকি দিবে। “ – রসাত্নক কিন্তু চিন্তাশীল বিশ্লেষণ মরহুম খালেকুজ্জামানের। ১৯৯৬ সালে তৎকালীন আওয়ামীলীগ সরকারের সঙ্গে করা ভারতের পানি চুক্তি সম্পাদনের পর প্রাপ্য পানি না পাওয়া নিয়ে অনুযোগ করে তিনি সংসদে বলেন “ চাঁদ দেখা কমিটির মত একটি জাতীয় পানি দেখা কমিটি করা হোক। অনেকে বলেন পানি দেখা যায়, অনেক বলে যায়না। যেদিন পানি দেখা যাবে সেদিন সবাই আতশবাজি ফুটিয়ে উৎসব করবে“ ।

একবিংশ শতাব্দিতে গণতান্ত্রিক রাজনীতিতে বিরোধী দল যে সরকারের সঙ্গেই অভিচ্ছেদ্য অংশ এবং জনগণের সেবক, তাও স্বভাবসুলভ রসিকতায় সংসদে বলেছেন টুনা-টুনির গল্পের সঙ্গে তুলনা করে। টুনা যেমন পিঠা খেতে টুনির প্রয়োজনীয়তা অনুভব করে একইভাবে সরকারের ও বিরোধী দলের সাহচর্য প্রয়োজন, লক্ষ্যে পৌছানোর নিমিত্তে। আইন, বিচার ও সংসদ বিষয়ক স্থায়ী কমিটির সদস্য থাকাকালীন সময়ে সুদুরপ্রসারী পরামর্শ ও নির্দেশনা দিয়ে প্রশংসিত হয়েছেন সচেতন মহলে । ছিয়ানব্বই থেকে দুহাজার এক – পাঁচ বছরের সংসদে প্রতিনিধিত্বকালীন সময়ে সংসদ সদস্য হিসেবে নিজ এলাকার দাবি তুলে ধরা, জাতিয় রাজনীতির গুরুত্বপুর্ণ ইস্যুতে নিজের মৌলিক বক্তব্য নির্দলীয় আবহে উপস্থাপন করার মত সৎ সাহস এবং সর্বোপরি দেশের সার্থ সংশ্লিষ্ট এজেণ্ডাতে নিজের মূল্যবোধকে বারবার চিনিয়েছেন। জাতিয় নেতা হিসেবে নিজেকে আবিভূত করার পর্যায়ে এলাকাবাসীকে গর্বিত করেছেন, নিজে থেকেছেন নিরহংকার ও আত্নোনিবেদিত। তাইতো নব্বই পরবর্তী সময়কার নেতৃত্ব দেওয়া জাতিয় রাজনীতিবিদরা খালেকুজ্জামানকে এখনো হৃদয় নিংড়ানো ভালবাসায় স্নরণ করেন।

একানব্বইয়ের নির্বাচনের পর হাল ধরেছেন কক্সবাজার জেলা বি এন পি র। সাংগঠনিক দক্ষতার পাশাপাশি নেতা-কর্মীদের কে দলীয় কার্যক্রমে অধিক সক্রিয় করে তুলেন সেসময় । রাজনীতি যে মানুষের জন্য এ কথা উনার কর্মের মাধ্যমেই প্রতিফলিত হয়েছে বারবার। মানুষের ঘরের দরজায় গিয়ে কুশলাদি বিনিময়োত্তর ব্যক্তিগত, সামাজিক সমস্যা উত্তোরণের উপায় নিয়ে ব্যস্ত থেকেছেন দিনের পর দিন। নিজের সীমাবদ্ধতাকে স্বীকার করেছেন খোলা মনে। নির্বাচন পুর্ববর্তী সময়ে আইন -শৃঙ্খলা কমিটির মিটিংয়ে প্রতিদ্বন্ধী প্রার্থী সম্বন্ধে প্রশংসা করতে বিব্রত কিংবা কুন্ঠিত হননি। সন্ত্রাসকে ভর করে দলীয় শক্তি বৃদ্ধ্বির চেষ্টা করেছেন – এমন অপবাদ সে সময়ের রাজনৈতিক শত্রুরা ও দিতে পারবে বলে মনে হয়না। বিরোধী দলীয় সংসদ সদস্য হয়ে রাজপথে থেকে সরকারের অপশাসন কিংবা অব্যবস্থাপনার প্রতিবাদ করেছেন নিজ যুক্তিতে দলীয় নেতা-কর্মীদের পাশে রেখে। একানব্বই থেকে ছিয়ানব্বই – এ পাঁচ বছর এমপি না হয়ে ও নিজ দল ক্ষমতায় – এ সুযোগের সুষ্ঠু ব্যবহার করে রামু-কক্সবাজারের অনেক উন্নয়নমূলক প্রকল্পের বাস্তবায়ন করেছেন। অথচ টেন্ডারবাজি, দলবাজি, আমলাদের অন্যায়ভাবে প্রভাবিত করার প্রয়াসঃ এসব নিজে যেমন পছন্দ করতেন না , কর্মী-সমর্থকদের ও নিরুৎসাহিত করেছেন প্রবলভাবে। এ কারণেই হয়ত রাজনীতির দুষ্টচক্রের বাইরে ছিলেন তিনি। বস্তুত, একজন খালেকুজ্জামানের স্বল্প সময়ের রাজনৈতিক সচেতনতা, কর্মকান্ড একজন সচেতন নাগরিককে জাগিয়ে তুলতে পারে দেশের জন্য, নিজ এলাকার জন্য কিছু করার প্রতিজ্ঞাবদ্ধ্ব হওয়ার তাড়না জাগ্রত করিয়ে । তারুণ্যের রাজনীতি বিমুখতা প্রশ্নবিদ্ধ হতে পারে তাঁর বহুমাত্রিক শিক্ষাজীবন, স্বপ্নীল কর্মজীবনের মোহ থেকে বেরিয়ে এসে মাটি, মানুষের জন্য কাজ করার অভিপ্রয়াস কিংবা আমৃত্যু সংগ্রামের নমুনায়।

মনে পড়ছে নব্বই সালের গোড়ার দিকে – আমি তখন প্রথম শ্রেণীর ছাত্র, কোন এক রাজনৈতিক সভায় যেটি হচ্ছিল রামুর জোয়ারিয়ানালা মাদ্রাসা গেইট এলাকায়। আব্বু তখন ঐ সভার আয়োজক ছিলেন কিংবা সভাপতিত্ব করছিলেন। প্রধান অতিথি ছিলেন কর্নেল অলি আহমদ। ঐ সময়ের সম্ভাব্য বি এন পি তরুণ প্রার্থী খালেকুজ্জামান তাঁর বক্তৃতা শুরু করেছিলেন এভাবে “আমার দাদার গ্রাম বৃহত্তর জোয়ারিয়ানালা, আমার বাবার গ্রাম জোয়ারিয়ানালা, আমার গ্রাম এখানে… এখানকার মাটি, মানুষের সঙ্গে আমার বন্ধন চিরদিনের…” ।

কিছু বুঝিনি মর্মার্থ তখন। মনে আছে শুধু বাড়িতে এসে এ কথাগুলো বলছিলাম নিজেকে সভার বক্তা কল্পনা করে। বাড়ির সবাই হেসেছিল শিশুর শিশুসুলভ আচরণে। কিন্তু কজন নেতার এ ক্ষমতা থাকে যে একটি পাবলিক রাজনৈতিক সমাবেশে একজন অবুঝ শিশুর চিন্তায় কিংবা অনুকরণে ঢুকে যেতে পারে। বাড়ীর আঙ্গিনায় শৈশবের এই বুলি আওড়ানো থেকেই হয়ত উৎসাহিত হয়ে স্কুল, কলেজ, ভার্সিটিতে প্রতিযোগিতামূলক বিতর্কে নিজেকে তুলে ধরতে পেরেছি। দৈবক্রমে, আব্বুর সঙ্গে রামুতে উনার শেষ জনসভায় ও উপস্থিত ছিলাম আমি । মনে আছে লাখো জনতার জোয়ারে মৃদু হাস্যমান খালেকুজ্জামান এগিয়ে আসছিলেন মঞ্চের দিকে। কিন্তু জীবন মঞ্চের নাট্যায়ন যে কখনো কখনো ট্র্যাজেডি কিংবা বিয়োগান্তক হয়। আজ এক যুগ পরে মরহুম খালেকুজ্জামানের শারীরিক উপস্থিতি নায় ঠিকই, কিন্তু তাঁর বিদেহী আত্না হয়ত বারে বারে ফিরে আসে কক্সবাজার – রামুর অবহেলিত, প্রান্তিক মানুষের কাছে তাদের প্রাপ্যতা মিটানোর তাগিদ নিয়ে।

…………………………..

My Friend Khaleque

I often wonder how to define a friend. I don’t think I will ever find the right definition. The dictionary defines it as a person who likes and knows well another person. I am not sure how well this captures the notion of a friend. But I know one thing without any uncertainty. When I think of Khaleque, the first thing that comes to my mind is the word ‘friend’. I have never had a friend better than Khaleque.
I met him first in 1977, at the campus of Dhaka University, when both of us joined the MBA program of the Institute of Business administration. Within a couple of days of our introduction to each other, we knew that we will get along and get along rather well. We felt as if we had known each other for ages. We discovered an enormous amount of similarities in our preferences and in our world view. Better yet, we discovered that we like our differences. I think that is what made us click and click so fast.
Life will be never the same again. In a way both of us lost our individuality because we felt that whatever we do, we must do together. we come to the campus together, entered classroom together, studied together, ate together, sang together and when we parted company, most often late in the evenings, we looked forward to seeing each other early next morning. Simply to put, we were bosom buddies.
Khaleque was a brilliant student. He topped our class with 19 As and one B. I was a distant second. Based on this information you would think he was the typical good student’ who attends all classes, does all his homework very studiously, and remains clung to his studies all the time. Yes, he attended all classes, did all his homework and studies. But Khaleque was not the typical good student who dose not know how to enjoy life. Khaleque did. He enjoyed food specially Bangladeshi food; loved music particularly Bangla and Hindi; was addicted to sports, particularly cricket, and appreciated every other aspect of life that a normal human-being loves to enjoy. He was solely responsible for making me develop a preference for Indian popular, Lalon and Baul music. I have never liked any other music since meeting Khaleque.
Khaleque had the unique ability to excel in anything that he found interesting. When we studied MBA, computer education was not a part of our curriculum. After finishing MBA, the first real job Khaleque took was that of a computer programmer at NCR. He learnt and excelled in computer programming on the job. But his heart was never in business administration or computer programming. His heart was in law. It did not take too long for him to finish the study of law and start practicing. Even that was not fully satisfying for him. He was destined for politics and took it up as soon as the country embraced the system of parliamentary democracy. He never looked back because he found an occupation to which he belonged heart and soul.
Khaleque had a great sense of humor. He could define humor in all kinds of things from the very simple, such as a television show, to the very complex, such as the national budget. His speeches in the parliament on the national budget used to be a treat not just in terms of the depth of issues grasped but also the way he used to present them, entertaining members on all sides of the aisle. The man knew how to speak and he could speak both in public and private.
Khaleque loved to live. He appreciated life. My last interaction with him occurred about a month before his death. He came to my house at around 10 at night and spent about an hour with me. Our entire conversation was about life. I told him that I don’t feel that excited about life anymore. He disagreed strongly and in his usual style lectured me on why I should try to enjoy life more. He said he was enjoying it profusely. He said he was in perfect health. He tied very hard to convince me to give up smoking. ‘Why breathe carbon?’ he asked. While leaving, he suggested that I should drop by his house on my way back from the office after election to spend some time with him. ‘I will drop you after dinner and on the way we will listen to this fabulous latest Jagjit album’, he said.
I was watching late night news on that fateful day. I was not paying much of an attention. The newscaster said Mr. Md. Khalequzzaman, BNP’s candidate from Cox’s Bazar-3 has died today. I could not believe what I was hearing. I called some of my Friends and my brother. They all confirmed. Never in my wildest or the worst nightmares could I imagine the death of Khaleque and sometimes I still find it very hard to believe he is no more. I feel his death happened only in my nightmare. Alas!
I try to come to terms with Khaleque’s Death by remembering a prayer that was first brought to my attention by Khaleque himself. “God, Give me the courage to change what I can, the serenity to accept what I cannot, and wisdom to know the difference!

Zahid Hussain
Senior Economist
The World Bank

Editor in Chief : Sayed Shakil
Office: Evan plaza, sador model thana road, cox’sbazar-4700. Email: dailycoxsbazar@gmail.com / phone: 01819099070
অনুমতি ছাড়া অথবা তথ্যসূত্র উল্লেখ না করে এই ওয়েব সাইট-এর কোন অংশ, লেখা বা ছবি নকল করা বা অন্য কোথাও প্রকাশ করা বেআইনী